পুষ্পের_হাতে_পদ্ম (পর্ব- ১০/ অন্তিম পর্ব)

0
3786

#পুষ্পের_হাতে_পদ্ম (পর্ব- ১০/ অন্তিম পর্ব)
– সুমাইয়া বিনতে আ. আজিজ

ভাবির পেট ফুলে ঢোল হয়ে গেছে শুনে আমার এবার সিরিয়াস টাইপের চিন্তা হতে লাগল। তাকবীরের সেই অভিশাপের কথা মনে পড়ে গেল। বাচ্চাটা বোধহয় এবারও নষ্ট হয়ে যাবে! ভাবি কি তবে সত্যি সত্যিই কখনো নিজের বাচ্চা কোলে নিতে পারবে না? মা ডাক শুনতে পারবে না? ভাবতেও বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।

বিছানা থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে মাত্রই চিড়ুনিটা হাতে নিয়েছি, ওমনিই বাইরে বড় কাকির চিৎকার শুনতে পেলাম। চিৎকার শুনে চিড়ুনি হাতেই দৌড়ে গেলাম বাইরে। কাকি পাগলের মতো উঠানে গড়াগড়ি করছে আর বিলাপ করছে, “হায় রে আমার বেটি রে। তোর এইডা কী অইলো রে বেটি? ওই বেটি রে। তুই কহোনে গেলি রে।”

প্রথমে কাকির বিলাপের আগামাথা কিছুই আমার বোধগম্য হলো না। কিন্তু পরক্ষণে যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ধপাস করে বসে পড়লাম উঠানেই। চোখ দিয়ে কপোল বেয়ে অনবরত জল ঝরে যাচ্ছে। অথচ সেই জল হাত দিয়ে মোছার শক্তিটুকুও আমি পাচ্ছি না।

কুয়াশার মতো গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে৷ এই বৃষ্টির স্পর্শে শরীর ভিজে না। কিন্তু মন পুলকিত হয়। আজ মন পুলকিত হওয়ার মতো অবস্থা নেই। ভাবির বাচ্চাটা আবারো যে নষ্ট হবে সেটার ব্যাপারে আমি ৯৯% নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু স্বয়ং ভাবিকেই যে আল্লাহ এভাবে নিয়ে যাবেন তা তো কল্পনাতেও আনতে পারিনি কখনো!

কী হলো এটা? কিভাবে হলো? কেন হলো? কেন আমি বুঝতে পারলাম না যে ও একেবারেই চলে যাবে? কেন বুঝতে পারলাম না যে ও সত্যি সত্যিই এত অসুস্থ? কেন কালকে ওকে একটু সময় দেয়ার প্রয়োজনবোধ করলাম না আমি? ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে, অনুশোচনায়। কিচ্ছু মানতে পারছি না, কিচ্ছু না!

অথর্বের মতো উঠানের এক কোণেই বসে রইলাম ঘণ্টাখানেক। আমার পরনে ভাবির বানিয়ে দেয়া একটা সুতার কাজ করা নীল রঙের ছয়ছাট গোল সুতি জামা। এইতো এই রোজার ইদেই এটা ও আমাকে গিফট করেছে। পুরো জামা বানানো এবং সুতার কাজ, সবটা ভাবি নিজ হাতে করেছিল। হাতের কাজ এতটা নিখুঁত হয়েছিল যে, মনেই হচ্ছিল না এটা কোনো আনাড়ি হাতের কাজ। হুবুহু এটার মতো করে ও নিজেও একটা বানিয়েছে। ওর খুব ইচ্ছে ছিল আমরা দুজনে একরকম জামা পরে ফটোশুট করব। সেই ইচ্ছে থেকেই এরকমটা করেছিল ও। গতকাল বান্ধবীর বাড়ি যাব বলে জামাটা পরে গিয়েছিলাম। এসে আর খোলা হয়নি। এখন এই মুহূর্তে আমার সাথে সাথে ওর দেয়া জামাটা ওর বিরহে উঠানে লুটোপুটি খাচ্ছে।

ঘণ্টাখানেক পর ভাবির লাশ নিয়ে আসা হলো সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে। আমি এগিয়ে গেলাম লাশের দিকে। একদিনের ব্যবধানে ওর শরীরটা ডাবল হয়ে গিয়েছে। পেট তো ফুলেছেই, সেই সাথে শরীর আর মুখটাও ফুলে গেছে। একদমই চিনতে পারছিলাম না ওকে। এটা ওর আসল চেহারা না।

আচ্ছা, এটা কি আসলেই ভাবি? নাও তো হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, ভুল করে অন্য কাউকে পুষ্প ভেবে ওরা নিয়ে এসেছে। নাহ্, এতবড় ভুল করার তো কথা নয়। আচ্ছা, মানলাম এটা পুষ্প। কিন্তু ও কি সত্যি সত্যিই মরে গিয়েছে? নাকের কাছে একটু হাত দিয়ে দেখব নাকি? আমার কী হলো জানি না; আমি সত্যি সত্যিই পাগলের মতো ওর নাকের কাছে হাত দিলাম এটা চেক করার জন্য যে ও আসলেই মারা গিয়েছে কিনা। চেক করে যখন দেখলাম ও সত্যিই নিঃশ্বাস নিচ্ছে না, তখন আর নিজেরে সামলাতে পারলাম না। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসলো। একবার মনে হলো পুরো পৃথিবীটাও যেন ঘুরছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে।

আমার যখন জ্ঞান ফিরে তখন যোহরের আজান দিচ্ছে। ভাবিকে সবাই শেষবার দেখার জন্য উঠানে ভীড় জমিয়েছে। ওর বাপের বাড়ি থেকে অনেক মানুষ এসেছে ওর লাশ দেখতে। এমনকি পলাশ দুলাভাইও সমস্ত অভিমান চূর্ণবিচূর্ণ করে পুতুল পুতুল বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে এসেছিল। যদিও এক পলকের বেশি দেখতে পারেননি। মূর্ছা গিয়েছিলেন তিনিও। জানাযা পড়ার সৌভাগ্যও হয়নি তাঁর। আরেকটা চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, ভাবির প্রাক্তন শ্বশুরবাড়ির লোকও এসেছিল ভাবিকে শেষ বিদায় দিতে। ভাবির প্রাক্তন শ্বশুর, শাশুড়ি, জা সহ আরো কয়েকজন প্রতিবেশী।

সবার মতো আমিও ভাবিকে শেষ দেখা দেখার জন্য উঠানে যেতেই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হলো।

একজন যুবতী মেয়ে গর্ভাবস্থায় মারা গিয়েছে। মেয়েটির স্বামী মেয়েটির লাশের খাটিয়ার পাশে বসেছে প্রাণপ্রিয়া স্ত্রীকে শেষ দেখা দেখবে বলে। খাটিয়ার পাশে বসে যেই না স্ত্রীর গালে একটুখানি হাত বুলাবে বলে হাতটা বাড়াতে গেল তখনই আশেপাশে থেকে তথাকথিত এক শিক্ষিত লোকের দল চিল্লিয়ে উঠল, “না না! ছোঁয়া যাবে না, ছোঁয়া যাবে না। গুনাহ হবে এখন বউকে স্পর্শ করলে!”

বেচারা স্বামী আহত চোখে সবার দিকে একবার করে তাকিয়ে হাতটা গুটিয়ে নিলো। খাটিয়ায় মুখ ঠেকিয়ে অথর্ব, ব্যথিত, বিষন্ন দৃষ্টিতে অপলকভাবে কয়েক সেকেন্ড…মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকার পরেই আবার সেই তথাকথিত শিক্ষিতরা চিল্লানো শুরু করল, “এত দেখা যাবে না, এত দেখা যাবে না। গুনাহ হবে, গুনাহ হবে!”

স্বামী বেচারা এবার হাত জোর করে, হ্যাঁ হাত জোর করে সবার উদ্দেশ্যে মিনতি করে বলল, “আর একটু দেখমু আমি।”

কিন্তু নাহ্! ওইসব শিক্ষিতরা কোন হাদিসে যেন পেয়েছে যে, মৃত্যুর সাথে সাথেই নাকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এমন অবস্থায় তো এক নজর মুখ দেখাও গুনাহ্! সেখানে মুখ একটু হলেও তো তারা দেখিয়েছে। বেশিক্ষণ দেখানো যাবে না। গুনাহ্ হবে! গুনাহ্!
স্বামী স্ত্রীর লাশের চেহারা দেখলে তো গুনাহ হবে। অথচ হাজারো নন-মাহরাম যখন লাশের মুখ দেখছে তখন গুনাহ হচ্ছে না!

আকিব ভাই এত করে আকুতি মিনতি করার পরেও তারা ওসবকে উপেক্ষা করে তাদের মনগড়া হাদিসের উপর আমল করে ভাবির মুখ ঢেকে দিল। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না। আমার কী হয়েছিল আমি জানি না। আমি আমার স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে গিয়ে সেদিন উঠোন ভর্তি লোকের সামনে গর্জে উঠেছিলাম। মুরুব্বি গোছের যে মহিলাটি এতক্ষণ ভাইকে তার মৃত বউয়ের মুখ দেখা ও ছোঁয়া থেকে বিরত রেখেছিল তার দিকে আংগুল তুলে হুংকারের সহিত বলেছিলাম, “আপনি কোন হাদিসে পাইছেন যে মরার সাথে সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়?”

সেই মহিলার জবাবের অপেক্ষা না করে আমি আকিব ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম, “ওই আকিব ভাই, তুই তোর বউরে যেমনে ইচ্ছা, যতক্ষণ ইচ্ছা দেখ। ছুঁইতে চাইলে ছুঁ। চিন্তা করিস না, পাপ হইব না। কারো ভিত্তিহীন কথায় কান দেয়ার প্রয়োজন নাই।”

আমার কথায় মুহূর্তখানেক সময় পুরো উঠোন জুড়ে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করল। পরিচিত, অপরিচিত; উপস্থিত প্রতিটি সদস্য বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ আমার এহেন প্রতিবাদে। অথচ আকিব ভাই যেন এরকম কিছু একটার অপেক্ষাই করছিল। এত বিরহের মাঝেও তার মুখখানা সহসা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আমি লোকজনের ভীড় ঠেলে খাটিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে ভাবির মুখটা পুনরায় খুলে দিয়ে বললাম, “নে, দেখ তোর বউরে।”

উঠান জুড়ে এবার গুঞ্জন শোনা গেল। আমাকে ঘিরে ছিঃ ছিঃ কলরবে মুখোরিত উঠান। আম্মা খানিকটা দূর থেকে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, “বড়দের সাথে বেয়াদবি কোন হাদিসে জায়েজ লেখা আছে?”

আম্মাকে বললাম, “উচিত কথা বলাকে যদি তোমরা বেয়াদবি মনে করো তাইলে আমার আর কীই-বা করার আছে? হালালকে হারাম আর হারামকে হালাল সাব্যস্ত করা কতবড় গুনাহ্ তুমি জানো না? ইসলামে তো বরং মৃত স্ত্রীকে নিজ হাতে গোসল করাইয়া দেয়ার অনুমোদনও দেয়া হইছে স্বামীকে। সেখানে আকিব ভাই গোসল করাতে আসে নাই। জাস্ট একটাবার মন ভরে ভাবিকে দেখতে চাইছে, সেটাও হারাম হারাম করে দেখতে দিতেছে না তারা। এটা হারাম তারা কই পাইছে? দেখাক তো আমাকে একটা সহিহ দলিল।”

আম্মা আর কথা বাড়ালেন না। আমিও আশেপাশের কারো কথাকে আর পাত্তা দিলাম না। তাকিয়ে রইলাম আকিব ভাইয়ের সেই অসহায় মুখটার দিকে। খুব গভীর ভাবে ওর ভেতরটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিলাম। কাল অসুস্থ হয়ে যাওয়া ভাবিকে বিছানায় শুইয়ে ভাবির পাশে বসে ভাইয়ের বাচ্চাদের মতো কান্না করাটা আমাকে ওই মুহূর্তে গভীরভাবে ভাবাচ্ছিল।

কাল আকিব ভাইয়ের অমন পাগলের মতো কান্না করাকে নিছক বাড়াবাড়ি বলে মনে হচ্ছিল আমার! একটাবারও মনে হয়নি যে, ছেলেরা এত সহজে কান্না করতে পারে না। বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া তারা কান্না করে না। হয়তো ভাবির আসন্ন মৃত্যুর খবর আকিব ভাইয়ের মন আগেই পেয়ে গিয়েছিল। নয়তো ওভাবে কাল কাঁদল কেন সে? তখনও কিন্তু ভাবির অবস্থা গুরুতর ছিল না। তখনও কেউ বুঝতে পারেনি যে, পুষ্প একেবারে চলেই যাবে! পুষ্প নিজেও কি কিছু বুঝতে পেরেছিল? ওর তো কিছুই হয়েছিল না। প্রেগন্যান্ট ছিল। প্রেগন্যান্সির আড়াই মাস রানিং। খেতে পারত না, শরীর দুর্বল। তাই হুট করে এমন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ব্যস, আর কিচ্ছু না।

কেউ বুঝিনি এভাবে ভাবি চলে যাবে। ভাইও বুঝতে পারেনি। ভাবতেও পারেনি, এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে পারেনি। দুজন দুজনকে কী পরিমাণ ভালোবাসতো সেইটা আমি দেখেছি, আমরা দেখেছি। কাউকে বলে বোঝানো যাবে না সেসব। হুট করে সেই প্রাণপ্রিয়া স্ত্রীর এভাবে চলে যাওয়াকে ঠিক কিভাবে মেনে নেয়া যায়?

ভাবিকে দাফন করে এসে আকিব ভাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। নড়েও না, চড়েও না। না বলে কোনো কথা। যেন সে বোবা! আর বড় কাকি তো সারাদিন বিলাপ করে কান্নাকাটির উপরেই ছিল। আম্মা কতবার বুঝিয়েছেন এভাবে বিলাপ করা হারাম; কিন্তু কে শোনে কার কথা? ভাবির মৃত্যুর পর একবছরেরও বেশি সময় অবধি কাকি নিয়ম করে প্রতিদিন একবার করে ভাবির জন্য কাঁদতেন। নিত্য বিলাপ করে এত কান্নার ধৈর্য্য কোত্থেকে পেত কে জানে! এই দীর্ঘদিনেও তাকে কেউ কখনো বুঝাতে পারেনি যে, এভাবে বিলাপ করার দরুন পুষ্পর কোনো লাভ হবে না। উলটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এদিকে আমি…আকিব ভাইয়ের মতো আমিও বোবা বনে চলে গিয়েছি। কথার বলার শক্তি আমিও পাচ্ছি না। না পাচ্ছি কান্না করার শক্তি। কান্নাগুলো গলা অবধি এসে আটকে যাচ্ছে শুধু। অশ্রু হয়ে ঝড়ছে না। ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা। গলা কাটা মুরগির মতো ছটফটানি অন্তর জুড়ে। অথর্ব হয়ে বসে আছি জায়নামাজের উপর। ভাবছি, ভাবি এখন কেমন আছে? আদৌ ভালো আছে তো?

সে কখনো নামাজের ধার ধারেনি। না করেছে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো আমল। সবার মতো হয়তো ভেবেছিল, আরেকটু বয়স হলে আল্লাহর পথে আসবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর পেল কই? গতকাল এই সময়ও কি ও বুঝতে পেরেছিল যে আর কয়েক ঘণ্টা পরই ওকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে হবে?

আচ্ছা, তাকবীরের অভিশাপটা এভাবে কেন লাগলো? সে তো শুধু মা হতে না পারার ব্যাপারটা বলেছিল। মৃত্যু কামনাও কি করেছিল? এভাবে কেন লাগল ওই অভিশাপ? এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল তাকবীরের সেই অভিশপ্ত বাণ! যে বাণ শুধু পুষ্পর সন্তানকেই কেড়ে নেয়নি; পুষ্পকেও কেড়ে নিয়েছে!
কেন এমনটা হলো? ও সন্তানহীনা হয়েই না হয় বেঁচে থাকত আমাদের মাঝে। মরতে কেন হলো ওকে?

মাঝেমধ্যে মনে হয়, তাকবীর তো ওকে ভালোবাসত। তবে সে কেন ওভাবে পুষ্পকে অভিশাপ দিতে গিয়েছিল? উন্মাদের মতো ভাবি, যদি সে পুষ্পকে ওভাবে অভিশাপ না দিত তাহলে হয়তো পুষ্পর জীবনটা আজ অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হয় যে, তাকবীর পুষ্পকে মুখ ফুটে অভিশাপ না দিলেও কি বিশেষ কোনো লাভ হতো পুষ্পর? সে আর যাই হোক, কখনো কি তাকবীরের দীর্ঘশ্বাসগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারত?

কোথায় যেন পড়েছিলাম, “যে ভালোবাসে সে অভিশাপ দেয় না, কিন্তু ‘রূহের হায়’ বলে একটা কথা আছে।”

হ্যাঁ! ওই ‘রূহের হায়’ জিনিসটাকেই একটা সময়ের পর ভয় পেত পুষ্প। যখন সে আকিবের হাত ধরে পালিয়ে এসেছিল তখন সে নিজের মধ্যে ছিল না। আবেগ ও ঘোর ওকে আপাদমস্তক আচ্ছাদিত করে রেখেছিল। তাই কম বয়সী পুষ্প ভয়ংকর বাস্তবতার প্রলয়ঙ্কারী আর্তনাদ ওই মুহূর্তে অনুধাবন করতে পারেনি। কিন্তু আস্তে আস্তে যত দিন গত হয়েছে, ততই বাস্তবতা ওর সামনে নিষ্ঠুর রূপ ধারণ করে দাঁড়িয়েছে। আর যতই সে ভাগ্যের নিষ্ঠুরতার সম্মুখীন হয়েছে, ততই সে অনুতপ্ত হয়েছে৷ অনুতপ্ততার আগুনে ও দিনকে দিন কিভাবে দগ্ধ হয়েছে তা স্বচোক্ষে দেখেছি আমি।

পুষ্পর মুখের দিকে যতবার তাকাতাম ততবারই “Revenge of Nature” বাক্যটার সত্যটা উপলব্ধি করতে পারতাম। পুষ্পর শেষ পরিণতি আমাকে আরেকবার যেন চোখে আংগুল দিয়ে খুব ভালোভাবে দেখিয়ে দিয়ে গেল যে, প্রকৃতি আসলেই কাউকে ক্ষমা করে না। কাউকেই না!

১৮

ছোট্ট একটা পুতুল, যার মুখটার সাথে নামের ভীষণ মিল; পুষ্প। হয়তো জন্মের পর ওর ফুলের মতো সুন্দর মুখটি দেখেই ওর নাম পুষ্প রাখা হয়েছিল।

আজ অর্ধযুগ পরেও তার পুষ্পসদৃশ মুখটা হুটহাট ভেসে উঠে চোখের সামনে। আজও ওর চঞ্চলতা, দুষ্টুমি, মান-অভিমান, আদর-আহ্লাদগুলো স্মৃতির মানসপটে এসে হামাগুড়ি দেয়। আজও কেন যেন মনে হয় ও মরেনি। হয়তো-বা উঠানেই কোনো একটা কাজ করছে। ঘর থেকে বেরুলেই হয়তো-বা ওর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠের ‘নন্দি’ ডাকটা শুনতে পাব!

ভাবি আজ নেই আমাদের মাঝে। তবুও ভাবিকে অনুভব করি প্রতিনিয়তই। প্রতি তাহাজ্জুদে ওর জন্য কেঁদেকেটে দুয়া করে ওর মাগফিরাত কামনা করা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
মাঝে মাঝে ওকে বড্ড বেশি মনে পড়ে। মনে পড়ে ওর অনাগত সন্তানটাকে।

মাঝেমধ্যে ওর স্মৃতিগুলো যেন একটু বেশিই তাড়া করে। আমি রুমে ঢুকে দরজা-জানালা বন্ধ করে ওর চুপটি করে বসে ওর স্মৃতিগুলো হাতড়াই। গভীরভাবে ডুবে যাই ওর স্মৃতির মাঝে। আমি অশ্রুভেজা চোখ দু’টো বন্ধ ওকে ফিসফিস করে ডাকি, “ভাবি, ভাবি?”

আচমকা ওর কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। সেই মধুর ডাকটা। যে ডাক আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দের ছিল। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে সে আমার মতোই ফিসফিস করে আমাকে আবেগমাখা স্বরে ডাকে, “নন্দি!”

আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। ঝরঝরিয়ে কান্না করে দেই। কান্না করতে করতে ওকে জিজ্ঞেস করি , “ভালো আছিস তুই ভাবি?”

ভাবি যেন মুচকি হাসে। মুচকি হেসে আমাকে সান্ত্বনার স্বরে বলে, “কান্দিস না নন্দি। আমি ভালো আছি।”

ইশ! কত্ত সুন্দর ওর এই হাসিটা। অথচ আমি বরাবরের মতোই টের পাই যে, হাসিটা কপট। এই হাসির আড়ালে এক সমুদ্র হিমায়িত অশ্রু। সেই হিমায়িত অশ্রুদের সে গলতে দিতে চায় না কখনো। কারো কপট হাসিও এত সুন্দর, এত নিখুঁত হয় বুঝি? আমি অবিশ্বাস্য স্বরে আবারো শুধাই, “তুই সত্যিই ভালো আছিস ভাবি?”

ভাবির মুখটায় এবার আঁধার নেমে আসে। কাঁপা কাঁপা বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে, “হ, ভালো আছি।”

খানিকটা সময় পর ভাবি যেন কেঁদে দেয়। কেঁদে দিয়ে বলে, “তোগো ছাইড়া আমার এইখানে একটুও ভাল্লাগে না নন্দি।”

আমার কান্নার বেগ আরো বেড়ে যায়। আমি কপট রাগান্বিত স্বরে অভিযোগ করে ওকে জিজ্ঞেস করি , “তোরে যাইতে বলছিল কে? ক্যান চইলা গেলি ওইভাবে?”

ভাবি এবার আর কথা বলে না। নন্দি বলেও ডাকে না। জানি, ভাবি আর কথা বলবে না এখন। এই প্রশ্নের জবাব ও কখনোই দেয় না। সাড়া পাবো না জেনেও ভাবিকে ডাকতে থাকি আমি। অভিমানী স্বরে জিজ্ঞেস করি, “ভাবি, ভাবি? কথা বলবি না আর আমার সাথে?”

পরিশিষ্টঃ

সেদিনের মতো আজও পুকুরঘাটটা কৃষ্ণচূড়ার রক্তলালে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলেছে। ভোরের ফুরফুরে বিশুদ্ধ হাওয়া গায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। ঘাটের সিঁড়ির উপর আকাশপানে চেয়ে বসে আছি আমি। সূর্য্যি মামার দেখা নেই। আকাশটা ভীষণ মেঘলা। ঠিক আমার মনের আকাশের মতো…

আজ এক বিশেষ দিন। ভাবির ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিবছর এই দিনে ভাবির আত্মার মাগফিরাতের জন্য আকিব ভাই নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী গরীবদের ভালো-মন্দ তৃপ্তি সহকারে খাওয়ায়। আজও ৫০ জনের মতো লোকের খাবারের আয়োজন করা হবে। আকিব ভাই বিয়ে করেনি এখনো। কখনো করবে কিনা সেটাও জানা নেই কারো।

ভোরে উঠেই বাড়ির উঠোনে বসে মা-চাচিরা মিলে পেঁয়াজ, রসুন ছুলাচ্ছে। আমাকেও ডেকেছিল। যাইনি আমি। আমার এক গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফিনিশিং দেয়া বাকি এখনো।

পুকুরঘাটে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে কট কট কর্কশ শব্দ তুলে টাইপিং করে যাচ্ছিলাম। মাঝেমধ্যে আকাশ পানে তাকিয়ে এলোমেলো শব্দগুলোকে মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। ভাবি এখন পাশে থাকলে নির্ঘাত বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপটা সামনে থেকে ছোবল মেরে নিয়ে বলত, “রাখ ছে এহন এইসব। আমি আইছি, এহন আমার সাথে কথা কবি।”

আমি উলটা বিরক্ত হয়ে বলতাম, “তোর এই হুটহাট ছোবল মারার অভ্যাসটা বাদ দিবি কি? মেজাজ খারাপ হয় কিন্তু।”

ও আমার কথায় অভিমান করে গাল ফুলিয়ে চলে যেত সেখান থেকে। এদিকে আমি মুচকি হেসে উৎসর্গপত্র লিখতে শুরু করতাম ওর নামে।

এখনও উৎসর্গপত্র লিখছি ওর নামে। তবে আজকের শব্দগুলো ভিন্ন, ভীষণ আলাদা, ভীষণ বিষণ্ণ। এই শব্দ, এই বাক্য কখনো ভাবি দেখবে না, ছুঁবে না, পড়বে না। কখনো নিজেকে উপন্যাসিকার পাতায় দেখে সারপ্রাইজড হয়ে সে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলবে না, “তুই সত্যি সত্যিই আমারে নিয়া উপন্যাস লেইখা ফালাইছস নন্দি?”
আমি মুচকি হেসে বলতাম, “উঁহু, উপন্যাসিকা।”

আচ্ছা, সে কি খুশিতে কেঁদে ফেলত? জড়িয়ে ধরত আমাকে?
সন্তপর্ণে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই চোখ দু’টো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। ঠিক একই সময়ে আমার অশ্রুকে আড়াল করতে আকাশ তার অশ্রুবর্ষণ করতে লাগল। স্বীয় অশ্রু লুকানো থেকে অব্যাহতি পেয়ে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ল্যাপটপ নিরাপদ জায়গায় লুকাতে।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here