পুষ্পের_হাতে_পদ্ম (পর্ব- ০৫)

0
1910

#পুষ্পের_হাতে_পদ্ম (পর্ব- ০৫)
– সুমাইয়া বিনতে আ. আজিজ

হঠাৎ পুষ্পর কানে দূর কোথাও থেকে একটা গানের সুর ভেসে আসলো,

“আলেয়ার পিছে, ঘুরে মিছে মিছে,
বুঝিনি সে আলোর ভাষা;
আজকে তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি, কাকে বলে ভালোবাসা!”

কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকার পর পুষ্প বুঝতে পারল যে, গানের এই সুরটা দূরের কোনো জায়গা থেকে নয়; বরং তার বুকের গহীন থেকে বুকের চামড়া চিড়ে এই গানের সুর বের হচ্ছে।

১১

এদিকে এভাবে ছেলে বিয়ে করার দরুন নিত্য কাঁদতে কাঁদতে আমার বড় কাকির শোচনীয় অবস্থা একদম দেখার মতো। একে তো ছেলে বিয়ে করে নিয়েছে আরেকজনের বউ, তার উপর আবার সেই আদরের দুলালি নাকি সামান্য ভাতটাও ফুটাতে জানে না!

আকিব ভাই ওই সময়টাতে খুব একটা ফোন দিতে চাইত না বাড়িতে। তবে কাকি নিজে থেকেই ভাইকে, ভাবিকে ফোন দিতেন খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য। প্রতিবারই পুষ্প ভাবির সাথে কথা বলার সময় রাগে কিংবা ক্ষোভে উনার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে আসত। যেন এই মুহূর্তে ভাবি সামনে থাকলে ওকে আস্ত গিলে খেত কাকি! কিন্তু খুব কষ্টে উনি নিজের রাগটা সামলে হাসিমুখে কথা বলতেন পুষ্প ভাবির সাথে।

ভাবি কথা বলত একটু ন্যাকা স্বরে, আহ্লাদ করে। এরকম আহ্লাদমাখা ন্যাকা ন্যাকা স্বর প্রেমিকের কাছে মধুর মতো লাগলেও অন্যদের কাছে মধুর মতো লাগার কথা না। বরং প্রেমিকের কানে যে স্বর মধু বর্ষণ করে সেই একই স্বর অন্য কারো কানে ক্ষেত্রবিশেষে বিষ বর্ষণও করে। আর পুষ্পর গলার স্বর, কথা বলা ভঙ্গি; সবটাই কাকির কানে যেন বিষ বর্ষণই করত। আর সেজন্যই বোধহয় কাকি ভাবিকে ফোন দেয়ার সময় তাঁর জা সম্পর্কিত মহিলাদের নিজের কাছে বসিয়ে ফোনে লাউড স্পিকার দিয়ে তীর্যক স্বরে বলতেন, “আকিব্বার বউর লগে কতা কই হুন বেক্কেই। দ্যাহিস কেমনে ডং কইরা কতা কয়।”

আকিব ভাই সাভারের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছিল। ফ্যাক্টরির কাছাকাছিই পুষ্পকে নিয়ে থাকার জন্য এক রুমের একটা বাসায় ভাড়া নিয়েছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্না করে খেয়ে ফ্যাক্টরিতে যেত, আবার রাতে এসে নিজে রান্নাবান্না করত তারপর খেত। পুষ্প তো রান্নাবান্নার র-ও জানে না। ও রাঁধবে কিভাবে? আর আমাদের আকিব ভাই-ই বা কিভাবে তার পুতুল পুতুল বউকে দিয়ে কষ্ট করে রান্না করাবে? পুতুল পুতুল বউকে ঘরের মধ্যে পুতুল বানিয়েই রেখেছিল সে। সারাদিন শুয়ে বসে থাকা, ফোন ঘাটাঘাটি করা ছাড়া পুষ্পর কোনো কাজ ছিল না। আকিব রান্না করে রেখে গেলে খেতে পারত, নয়তো না খেয়ে থাকত।

এগুলো শুনে বড় কাকির অবস্থা আরো বেহাল। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বিলাপ করে কান্না করতেন আর বকাবকি করতেন আকিব ও পুষ্পকে। শো-পিচ বিয়ে করে এনেছে। শো-পিচকে ঘরে সাজিয়ে রাখলেই পেট ভরবে। মানুষ বিয়ে করার পর বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে কাজে বের হয়। আর উনার বলদ ছেলে বেছে বেছে এমন মেয়েকে বিয়ে করেছে যার হাতের রান্না খেয়ে সকালে কাজে যাওয়া তো দূরের কথা, বরংচ’ তাকেই সকালে উঠে রান্নাবান্না করে বউকে খাইয়ে তারপর কাজে যেতে হয়। এই মেয়ে তো সাক্ষাৎ ডাইনী! তাঁর ছেলের মাথা মটকে খাওয়ার জন্য, এই অভাবের সংসারকে ধ্বংস করার জন্যই ওই মেয়ে উনার ছেলেকে এভাবে বিয়ে করেছে। এসব বলে বিলাপ করে কাকি কাঁদতে থাকতেন অনবরত। সেই সাথে কাটা গায়ে নুন-মরিচ মাখানোর কাজটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য পাড়া-পড়শীরা তো আছেই। তাদের ছিঃ ছিঃ কলরবে আমাদেরই তো টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছিল। আকিব ভাইয়ের পরিবারের কথা আর কী বলব!

ওদিকে আকিব-পুষ্প সংক্রান্ত ঝামেলার জন্য নাহার আপুর সংসারেরও বেহাল অবস্থা। পুষ্পর বাবা-মা অর্থাৎ নাহার আপুর শ্বশুর-শাশুড়ি প্রথম দিকে নাহার আপুকে উঠতে-বসতে কথা শোনাতে লাগলেন। ওর শ্বশুর হুংকার দিয়ে বলেন, “আমাহো ম্যায়া ফিরত না দিলে ওই বাড়ির ম্যায়া রাহুম না এই বাইত্তে।”

পরিস্থিতি একসময় এমন হলো যে, নাহার আপু মনে মনে ভেবেই নিয়েছিল যে দুলাভাই ওকে তালাক দিবে। অবশ্য এসব হুমকি-ধমকি পরবর্তীতে কোনো কাজে লাগেনি। আগেই বলেছি, পলাশ দুলাভাই মানুষ হিসেবে খাঁটিদেরও খাঁটি। উনিই আপুর পক্ষে গিয়ে উনার বাবা-মাকে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে, এখানে নাহারের কোনো হাত নেই। তাহলে এসবের জন্য নাহার কেন শাস্তি পাবে?

নাহার আপুর শ্বশুর-শাশুড়ি মেয়ের শোকে ব্যাপারটা মন থেকে তৎক্ষনাৎ মানতে না পারলেও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আর অশান্তি সৃষ্টি করেননি। তবে ছেলের অগোচরে আড়ালে-আবডালে উঠতে-বসতে নাহার আপুকে এসব নিয়ে খোঁচা মেরে কথা শুনাতেও অবশ্য তাঁরা ছাড় দেননি।

প্রায় দুইমাস ঢাকা শহরে গা ঢাকা দিয়ে থাকার পর আকিব ভাই বউ নিয়ে বাড়িতে আসে। বউ বাড়িতে তোলা নিয়ে বড় কাকা কিংবা কাকি; কারোরই অমত ছিল না। তাঁরা ছিলেন একটু ভিজা-বিড়াল টাইপের বাবা-মা। দিনের পর দিন সন্তানদের অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে বরং প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন। ছেলেরা তাঁদের ভয় পাবে কোত্থেকে? বরং তাঁরাই তো ছেলেদের ভয়ে ঠকঠক করেন। ছেলেরা রাতকে দিন বললে দিনই সঠিক, দিনকে রাত বললে রাতই সঠিক। তাঁদের যখন কেউ বলে ছেলেদের সামনে মিনমিন না করে কঠোর হতে, ছেলেদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে; তখন তাঁরা সবাইকে যুক্তি দেখিয়ে বলে, “পোলাগো শাসন করবার যাইয়া অগো চোখে খারাপ অইয়্যা লাভ কী? পরে দেহা যাইবো বুইড়া বয়সে বাত দিবো না।”

কাকা-কাকির এমন যুক্তি শুনে আমার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠে। নির্বোধ পিতা-মাতা! যে সন্তান এখনই বাবা-মায়ের চরম অবাধ্য, সেই সন্তানের পক্ষে পরবর্তীতে বৃদ্ধ বাবা-মাকে ফেলে দেয়া যে অস্বাভাবিক কিছু না; বরং একটু বেশি মাত্রায়ই স্বাভাবিক, সেটা এই নির্বোধ দুইজন পিতা-মাতাকে কিভাবে বুঝাবো আমি?

১২

পুষ্প ভাবি বাড়িতে আসার পর সপ্তাহখানেক কেটে গিয়েছে। বাড়িতে ওকে সঙ্গ দেয়ার মতো ওর সমবয়সী শুধু আমিই আছি। আমার সঙ্গ ওর ভীষণ কাম্য। ওর আবদার মেটাতেই ওকে সঙ্গ দেয়ার জন্য সময় পেলেই দৌড়ে চলে যাই ভাবির ঘরে। ওদিকে ভাবিও পারে তো সারাদিনই আমার কাছে এসে বসে থাকে। সাতদিনেই ভাবি বেশ ভাব জমিয়ে ফেলছে আমার সাথে।

প্রথম দিকে অবশ্য ওকে কোনো এক বিচিত্র কারণে এড়িয়ে যেতে চাইতাম। কেন যেন ওকে দেখলেই ঘৃণায় ভেতরটা ভরে যেত। মাঝেমধ্যে আবার করুণাও হতো ওর জন্য। সেই সাথে তীব্র আফসোস! ওর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবতাম, “কোন সুখ খাওয়ার জন্য এই মেয়ে ওমন ঘর-সংসার ছেড়ে এই বাড়িতে আসলো?”

প্রথম দুই-তিনদিন ওকে একদিকে আমি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় মত্ত ছিলাম, আর অন্যদিকে ও আমার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টায় মত্ত ছিল। একদম প্রথম দিন থেকেই ও আমাকে ‘নন্দি’ বলে ডাকত। প্রথমবার ওর মুখে এই ডাক শুনে আমি বিস্মিত স্বরে বলেছিলাম, “তুমি আমার নাম জানো না ভাবি? আমার নাম তো নন্দি না।”

ভাবি একগাল হেসে বলেছিল, “তোমার নাম যেইটাই হইক, আমি নন্দিই বলমু। ননদির শর্ট ভার্সন হইছে গিয়া নন্দি। বুঝছ?” কথাটুকু বলেই দাঁত কেলানো হাসি দিয়েছিল। যেন না জানি কতো মজার কথা বলে ফেলেছে।

ওর দাঁত কেলানো দেখে আমিও জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করেছিলাম। যদিও হাসি পাচ্ছিল না। বরং কেন যেন মিছামিছিই রাগ লাগছিল।

ভাবি বাড়ি আসার তৃতীয় দিনের দিন বিকেলের দিকে যখন আমি বিছানায় আধ-শোয়া অবস্থায় সাইমুম সিরিজের ‘রক্তাক্ত পামির’ বইটি খুব মন দিয়ে পড়তে ব্যস্ত তখন ভাবি ঝড়ের গতিতে কোত্থেতে যেন এসে আমার হাতে ছোট্ট একটা চিরকুট গুজে দিয়ে আগের মতো ঝড়ের গতিতেই চলে গেল। আমি বেশ অবাক হলাম ওর এহেন কাণ্ডে। খুব উৎসাহের সাথে চিরকুটটি খুললাম। সেটা খুলতেই গুটি গুটি অভিমানী হরফের একটামাত্র লাইন দেখতে পেলাম।

“আমাকে তোমার খুব খারাপ মেয়ে মনে হয়, তাই না নন্দি?”

এই ছোট্ট একটা লাইনে কী ছিল কেন জানে! তবে সেটা দেখার পর আমার মনে হচ্ছিল প্রতিটি হরফ যেন আমার দিকে তাকিয়ে কান্না করছে। এই কান্না ভীষণ হৃদয় বিদারক! ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক! আমার প্রচণ্ড খারাপ লাগতে শুরু করল। এত বেশি খারাপ লাগতে শুরু করলো যে, আমি ‘রক্তাক্ত পামির’-এ আর মনই বসাতে পারলাম না। বারবার মনে হচ্ছিল যে, ওকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যেন এক মস্ত বড় এক অন্যায় করে ফেলছি। এই অন্যায়ের শাস্তি নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কিছু হতেই পারে না! অতঃপর নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড থেকে নিজেকে রক্ষা করতে বই ফেলে দৌড়ে চলে গেলাম ওর কাছে। উদ্দেশ্য, অভিমানী এই পুতুল পুতুল পিচ্চি ভাবিটার সমস্ত অভিমান ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া।

এই সময়টাতেই কেন যেন আমার উপলব্ধি হয়েছিল যে, এই মেয়েটাকে এড়িয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। কখনোই সম্ভব না। এই মেয়েকে আমি ভালোবাসতে না চাইলেও মেয়েটি জোর করে হলেও আমার ভালোবাসা আদায় করেই ছাড়বে। মানুষের ভালোবাসা আদায় করে নেয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা দেখতে পাচ্ছিলাম ওর মাঝে। তাই ওইদিনের পর ভাবিকে আর এড়িয়ে যাওয়ার সাহস কিংবা ইচ্ছে; কোনোটাই হয়নি আমার৷

আস্তে আস্তে আমাদের অন্তরঙ্গতা বাড়তে থাকে। তার নমুনাস্বরূপ কখন যে দুজন দুজনকে তুমি থেকে তুই বলা শুরু করলাম সেটা টেরই পাইনি! ওর সাথে মেলামেশার এক পর্যায়ে বুঝতে পারলাম, মেয়েটার মনটা আসলে একটু বেশিই কোমল। অনেক সহজ সরল, কিন্তু বড্ড বোকা স্বভাবের অধিকারিনী!

সবাইকে অবাক করে দিয়ে এই বাড়িতে এসেই আমার আনাড়ি ভাবিটা একটু একটু করে কাজকর্মে হাত লাগাতে শুরু করল। সকালে উঠে কাকি কিছু বলার আগেই ঘর, উঠান ঝাড়ু দেয়, থালাবাসনগুলো মাজতে নিয়ে যায়, ঘরের এলোমেলো কাপড় বা জিনিসপত্রগুলো টিপটাপ করে গুছিয়ে রাখে। ভাবি আসার পর দেখা গেল বড় কাকির আধ-ভাঙা ঘরটাও আয়নার মতো ঝকঝক করতে শুরু করেছে। কোনো এক দুর্লভ জাদুর কাঠির স্পর্শে ঘরের চেহারাটাই যেন পাল্টে গেল।

ওদিকে ভাবি এখানেই ক্ষান্ত হলো না। সপ্তাহখানেকের মাথায় রান্না করার মতো দুঃসাহসিক কাজেও হাত দিয়ে ফেলল সে! কাকি ওকে বাঁধা দেয়ার ভান করলে ও কাকিকে কপট ঝাড়ি মেরে বলত, “পারমু আমি আম্মু। রান্না করতে কেমনে কী করা লাগে আমারে দেখাইয়া দেখাইয়া দেন আপনে। একটু দেখাইয়া দিলেই আমি পারমু।”

ভাবির এরকম কথা শুনে কাকি অবাক হবে নাকি খুশি হবে সেটা যেন বুঝে উঠতে পারত না। এই মেয়ের কাছ থেকে এরকম ব্যবহার কাকি কেন; আমরা কেউই আশা করিনি। কাকির জন্য ভাবির এই ব্যবহারগুলো যেন একপ্রকার মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পাওয়ার মতোই ব্যাপার। যদিও কাকি ভাবির সামনে এত খুশি খুব একটা প্রকাশ করতেন না।

বাড়ির এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত মুক্ত বিহঙ্গীর মতো উড়ে বেড়াত সে। সে যে এই বাড়ির বউ সেটার দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই যেন ওর ছিল না। প্রচণ্ড পরিমাণের মিশুক ছিল ও। বাড়িতে যদি ওর অচেনা কেউও আসত তবুও সেই অচেনা ব্যক্তির সাথে খাতির জমাতে ওর দুইমিনিটের বেশি সময় লাগত না।

বাড়ির বউ হিসেবে মাথায় কাপড় দিয়ে রাখার কোনো বালাই ছিল না ওর মধ্যে। মাথার চুল একদম উপরে বেঁধে রাখত। মেজো কাকিসহ অন্যান্য মানুষজন এটার জন্য কত কথাই যে শুনিয়েছে ওকে! মেজো কাকি তো এমনিই ওকে সহ্য করতে পারত না। তার উপর যদি কোনো ক্রুটি পায় তাহলে কি আর ছেড়ে কথা বলবে? মাথায় উঁচু করে চুল বাঁধা নিয়ে খোঁচা মেরে মেজো কাকি মুখ বাঁকা করে ওকে বলতো, “বৌইদ্দ বেডিগো নাগালা ওমনে মাতার উফ্রে চুল বান্দস ক্যা লো? ভালা দেহা যায় মনে করছস? এডুও তো ভালা দেখা যায় না।”

আবার ভাবি কিংবা বোন সম্পর্কিয় মহিলাদের কেউ কেউ এটা নিয়ে বলত যে, “পাড়ার নডিগো নাগালা দেহা যায় তোরে পুষ্প। চুলডি কি কাইচ্ছা কুইচ্ছা নিচে বানবার পারোস না?”

ও সবার কথা প্রত্যুত্তরে নীরব থেকে ঠোঁটে শুধুমাত্র ম্লান হাসির একটা রেখা ফুটিয়ে তুলত। ভালো-মন্দ কিছুই বলত না। একদিন এটা নিয়ে আমিও মুখ খুললাম। ওকে বললাম যে, “এভাবে চুল বাঁধা যে হারাম, সেইটা কি তুই জানিস ভাবি?”

ভাবি বোধহয় এরকম কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্যর সুরে বলল, “হারাম!”

আমি ম্লান হেসে ওকে আবু হুরায়রা রা. ‘আনহু থেকে বর্ণিত মুসলিম শরীফের ২১২৮ নং হাদিসটি শুনিয়ে দিলাম, যে হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জাহান্নাম বাসী দুটি দল রয়েছে- যাদেরকে আমি এখনো দেখিনি। একদল এমন লোক যাদের হাতে গরুর লেজের মত লাঠি থাকবে যা দিয়ে তারা লোকদেরকে প্রহার করবে। আর অন্য দল এমন নারী যারা পোশাক পরেও উলঙ্গ থাকে। তারা অন্যদের তাদের প্রতি আকৃষ্ট করবে নিজেরাও অন্যদের প্রতি ঝুঁকবে। তাদের মস্তক উটের পিঠের কুজের মত হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এমনকি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না, অথচ এর ঘ্রাণ এত এত দূর থেকেও পাওয়া যায়।”

এরপর হাদিসটার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাও করলাম। সবটা শুনে সে কয়েকদিনের জন্য মাথায় উঁচু করে চুল বাঁধা বন্ধ করেছিল। পরে দেখি আবারও সেই একই স্টাইলে বাঁধা শুরু করেছে। আমি আর কী করি! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম…

ওকে কখনো নামাজের অভ্যাস করাতে পারিনি আমি। আর না পেরেছি ফ্রি-মিক্সিং থেকে দূরে রাখতে। দেবর-ভাসুর কিছুই মানত না সে। সবার সাথে মাখামাখি সম্পর্ক ছিল ওর। আর একটু বেশিই মিশুক টাইপের ছিল বলেই হয়তো মাখামাখিটাও ওর ক্ষেত্রে একটু বেশিই ছিল। আকিব ভাইও কিছুই বলত না। বরং আরো উৎসাহ দিত ওকে। হাসতে হাসতে দেবরের গায়ের উপর পড়ে যাওয়া, দেবর-ভাসুরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন স্টাইলে ছবি তোলা; ওদের চোখে এসব একদমই সাধারণ ব্যাপার ছিল।

এগুলো আবার আমার আম্মার সহ্য হতো না। এমনিতেই পুষ্প ভাবির গায়ে ‘খারাপ মেয়ে’ সিলমোহরটা আম্মা আগেই লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে ভাবির এরকম কর্মকাণ্ড ভাবির সম্পর্কে আম্মার মনে যে নেতিবাচক ধারণা ইতোমধ্যে জন্মানো ছিল, তাকে আরো পাকাপোক্ত করে দিয়ে যায়।

এরমধ্যে ওইদিন আম্মা বড় কাকি, আকিব ভাই, পুষ্প ভাবি; সবাইকে আলাদা আলাদাভাবে বুঝিয়ে বলেছে যে, “ওদের বিয়ে শরীয়ত মোতাবেক শুদ্ধ হয়নি। নতুন করে ইসলামিক ওদের শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে করতে হবে।”

কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি আম্মার কথার। আম্মা ওদেরকে বুঝাতেই পারেননি যে, ইসলামি শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। তালাকের খুব বেশি প্রয়োজন অনুভব করলে বড়জোর স্ত্রী স্বামীর কাছে তালাকের আবেদন জানাতে পারে। কিন্তু নিজে থেকে তালাক দেয়ার হুকুম নেই স্ত্রীর জন্য। আর তাকবির তখনও ওকে তালাক দেয়নি। তখনও সে তার বাবা-মায়ের কাছে আকুতি-মিনতি করে যাচ্ছে পুষ্পকে ফেরত আনার জন্য। তাকবিরের বাবা-মা ওর জন্য অন্যত্র মেয়ে দেখতে চাইলেও সে দেখতে দিচ্ছে না। তার এখনো পুষ্পকেই চাই। তাকে সে ভুলতে পারছে না। তাহলে পুষ্পর এই বিয়ে শুদ্ধ হয় কিভাবে?

আর তাছাড়াও, তাকবির যদি তালাক দেয়ও; তাও তো পুষ্পকে তিনমাস ইদ্দত পালন করে তারপর আরেক বিয়ে করতে হবে। কিন্তু তিনমাস ইদ্দত পালন তো দূরে থাকুক; পুষ্প তো তিনদিনও অপেক্ষা করেনি।

সব মিলিয়ে আকিব-পুষ্পর এই বিয়ে কোনোভাবেই বৈধ হয়নি। এটা নিয়ে আর কারো সমস্যা না থাকলেও আমার আম্মার ঢের সমস্যা ছিল। অবশ্য সমস্যা যে আমার ছিল না তেমনটাও না। আমারও কেমন একটা অস্বস্তি লাগত এসব ভাবলে। ভাবিকে আমিও অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি ব্যাপারটা। কিন্তু ভাবি আমার কথাতেও গুরুত্ব দেয়নি।

ভাবির এভাবে একজনের মন ভেঙ্গে, ঘর ভেঙ্গে আরেকজনের হাত ধরে পালিয়ে আসা, এরকম ধর্মীয় কার্যকলাপ, রীতিনীতির প্রতি এমন উদাসীনতা; সবকিছু মিলিয়ে আম্মার যে নিগূঢ় ক্ষোভ ছিল ভাবির প্রতি, পরবর্তীতে সেটার প্রভাব পড়ল আমার উপর। আম্মার মনে ধারণা সৃষ্টি হলো যে, পুষ্পর মতো খারাপ মেয়ের সাথে এত বেশি অন্তরঙ্গতা থাকলে তাঁর একমাত্র মেয়েটাও একসময় পুষ্পর পথেই হাঁটতে শুরু করবে। তাই এই পর্যায়ে এসে আগাম সতর্কতা অবলম্বন স্বরূপ ১৪৪ ধারা জারি করে পুষ্পর সাথে আমার মেলামেশা পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা দিলেন আম্মা। আর এদিকে আম্মার এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা শোনার সাথে সাথে আমার ভেতরে অক্ষমতার তুফান বইতে শুরু করল। আম্মাকে আমি কিভাবে বোঝাব যে, আম্মার এই আদেশ পালনে আমি আজন্মেও সফল হবো না! হাজার চেষ্টা করলেও না!

চলবে ইন-শা-আল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here