তবু মনে রেখো পর্ব ৭

0
76

#তবু_মনে_রেখো
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব_৭

ভোরের আজান পড়তেই সন্ধ্যার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমু ঘুমু চোখে সে নিজেকে খোলা জানালার ধারে আবিষ্কার করলো। মুহিবের কথা ভাবতে গিয়ে কোন সময় চোখ লেগে এসেছে সে সেটা টের পায়নি। সন্ধ্যা হারিকেনের দিকে তাকালো। হারিকেন একদম নিভু নিভু অবস্থায়। যেন সে দায়ে পড়ে আলো দিচ্ছে। সন্ধ্যা বুঝতে পারলো জ্বালানি ফুরিয়ে এসেছে। আসলেই তো সারারাত ধরে আলো দিচ্ছে। সে উঠে দাঁড়ালো। হারিকেনের নিভু নিভু আলোতে ঘরটা ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। সন্ধ্যা তাড়াতাড়ি জ্বালানি এনে হারিকেনে ভালোভাবে আলো জ্বালিয়ে দিল।
হারিকেনের আলোর দিকে এক মনস্ক ভাবে তাকিয়ে রইল সন্ধ্যা। তার কেন জানি মনটা ভালো লাগছে না।
মায়ের রুম থেকে পায়ের আওয়াজ পেতেই সন্ধ্যার কান খাড়া হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে পড়লো। মা আসছে। মা এলে বুঝে যাবে সে তেমন ঘুমায়নি।
সন্ধ্যা তার হাতে থাকা চিঠিটার দিকে তাকালো। হাতের মুঠোয় রেখে ঘুমিয়ে গিয়েছিল সে। তাই চিঠিটা একদম মুচড়ে গিয়েছে। তার খারাপ লাগলো। মুহিবের দেওয়া স্মৃতিটা সে মুচড়ে ফেলেছে নিজেরই অজান্তে! সন্ধ্যা নিজের ভাবনার উপরে হাসলো। কারো দেওয়া স্মৃতি কী মুচড়ে ফেলা যায় নাকি! কী অদ্ভুত ভাবনা আসছে মাথায়!
মায়ের পায়ের আওয়াজ পেয়ে সন্ধ্যা তড়িঘড়ি করে চিঠিটা তার ব্যাগের মাঝে ঢুকিয়ে ফেলল। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে মুখ ভালোমতো মুছে নিল।
জোহরা রুম থেকে বের হয়েই মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন।
‘সন্ধ্যা মা?’
‘হ্যাঁ মা।’
জোহরা জহুরি দৃষ্টি ফেললেন মেয়ের দিকে। তা দেখে সন্ধ্যা মাথা নিচু করে দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই জোহরা ডাক দিলেন। সন্ধ্যা পিছু ফিরলো না। সে ওই অবস্থায় মায়ের জবাব দিল,
‘জি মা বলো।’
জোহরা আচমকা সন্ধ্যার সামনে এসে হারিকেন উঁচু করে ধরলো। হারিকেনের একদম স্পষ্ট তির্যক আলো সন্ধ্যার চেহারায় এসে পড়েছে।
‘ঘুমিয়েছিস ভালো?’
‘হ্যাঁ মা।’ বলেই সন্ধ্যা তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে কলপাড়ে এগিয়ে গেল। জোহরা আঁধারের মাঝে মেয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলেন। এরপর সে নিজেও কলপাড়ের দিকে এগিয়ে গেলেন।
মা মেয়ে দুজনেই নামাজ আদায় করে জোহরা রুমে চলে গেলেন। ইদানিং তার শরীরটা ভালো লাগছে না। আজ রাতে কেন জানি ঘুম আসেনি। ভোরের আজানের আগে ঘুম এসেছিল একটু। নামাজের পরে আর কিছু সময় ঘুমালে ভালো লাগবে ভেবে জোহরা ঘুমাতে চলে গেলেন।

সন্ধ্যা নামাজ শেষে শীতের কুয়াশা ভেদ করে উঠানের শেষে বিলের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো। ঠান্ডাটা বেশ ভালো এসেছে। সে গায়ে থাকা চাঁদরটা ভালোমতো জড়িয়ে নিল। সে বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইল। তারই অজান্তে দৃষ্টি বারবার এদিক ওদিক ফেলছে। তার খারাপ লাগলো, নিজেরই অজান্তে সে মুহিবকে খুঁজে চলেছে। কোথায় জানি ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ভীষণ মনে পড়ছে। ভোর ফুটতে শুরু করেছে। দূর দুরান্তের কিছু চোখে দেখা যাচ্ছে না। তার ভালো লাগছে না। সে ঘরে চলে গেল। রুমে গিয়ে দক্ষিণের জানালা খুলে জানালার ধারে বসে পড়লো। মুহিবের প্রথম প্রথম বিলের সরু রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। তার স্মৃতিটুকু মনে পড়ে গেল। ছেলেটা তীব্র ঠান্ডার ভেতরে তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকত! মুহিবকে মনে পড়ছে ভীষণ। সন্ধ্যার চোখ টলমল করে উঠল। যেন পলক ফেললেই টুপ্ করে পানিটা ঝরে পড়বে!

সন্ধ্যা বাইরে তাকাতে তাকাতেই পরিপূর্ণ ভোর ফুটে গেল। চারদিকে সকালের আমেজ শুরু হয়ে গিয়েছে। কৃষকরা কুয়াশা ভেদ করে ঝোপ ঝোপ শব্দ তুলে ধানের বোঝা কাঁধে নিয়ে সরু রাস্তা দিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা হেমন্তকে পুরোপুরি বিদায় জানিয়ে শীতকে গ্রহণ করে নিচ্ছে। অন্য সময় সন্ধ্যার এসব ভালো লাগলেও আজ কেন জানি ভালো লাগছে না। কিছুসময় পরেই খোলা মাঠে ছেলেমেয়েরা ঘুরি নিয়ে বের হয়ে পড়েছে। এই প্রথম সন্ধ্যা এক বসাতে পুরোটা সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। আশ্চর্য তার এভাবে খালি খালি লাগছে কেন!
জোহরা হাত খোপা করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। আজ বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। তিনি মেয়েকে এভাবে জানালা দিয়ে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন।
কাঁধে কারোর হাত পড়তেই সন্ধ্যা তাকালো। মাকে দেখে সে উঠে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

আনিস মিয়া আজ কদিন যাবৎ নেই তাই আজও জোহরা মেয়েকে কলেজ যেতে তড়িঘড়ি করেন কিন্তু সন্ধ্যা রাজি হতে চায় না। এমনিতেও মুহিব চলে যাওয়াতে তার মন খারাপ। সন্ধ্যার রাজি না হওয়ার ব্যাপারটা কুসুম মাকে বলতে চাইলে সন্ধ্যা বারণ করে কারণ এতে মা চিন্তা করবে।
জোহরা এসে মেয়ের কাঁধে হাত রাখে,
‘কী হয়েছে মা?’
সন্ধ্যা কিছু না বলে চুপ থাকে। মাকে কী বলবে সে! তার যে হারুনের ব্যাপারে ভয় জেগেছে। জোহরা মেয়েকে আশস্ত করে বলেন,
‘বাবা আসলে তো আর কলেজ যেতে পারবি না। এই কদিন অন্তত যা। আর তুই তো পড়তে চাস তাহলে এমন করার কারণ! তোকে যে আমি যেটা করতে পারিনি সেটাই করতে চাই। আমার মতো করে গড়তে চাই। আর কালকের দিনও যাসনি ভাবলাম এমনিতে কিন্তু আজকেও! কী হয়েছে মা আমাকে বল।’
মায়ের এমন কথায় সন্ধ্যার মনে অনুশোচনাবোধ আসলো। মা তার জন্য এতো কিছু করে পড়াশোনা করাতে চাচ্ছে আর সে সেটার প্রতিদান এভাবে দিচ্ছে! তার এই পড়াশোনার জন্য মা বাবার মাঝে কতোটা ভাঙ্গন ধরেছিল সে সেটাতো জানে। হারুনের ভয়ে সে কেন ক্লাস করবে না! হারুন তার কী করতে পারবে! কিছুই না। না, সে মায়ের স্বপ্ন ভঙ্গ করতে পারবে না।
সন্ধ্যা তৈরী হয়ে বোনকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।
কলেজ শেষে ফেরার পথে যে ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই হলো। আজও ছুটির সময়ে একই সময়ে হারুনের দলটা আছে। সন্ধ্যা বিলের আইলে থাকাকালীন দূর থেকেই এদিক ওদিক তাকালো। না, আর কোনো দিকে পথ নেই যাওয়ার। এই মৌসুম হওয়াতে বিলগুলো ভেজা কাঁদা মাটিতে চুপচুপ করে। এখানে মাঝে মাঝে সাপও থাকে। এদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না। শুকনো বিল অর্থাৎ আর কয়েকদিন পরে হলে ঠিকই বিলের মাঝ দিয়ে হাঁটা যায় কিন্তু এখন হাঁটা যাবে না। সন্ধ্যা সাহস সঞ্চার করলো। না, সে তার মায়ের মেয়ে হয়ে এভাবে ভয় পাচ্ছে। ভয়কে জয় করতে হবে। মা বলেছিল, ভয়কে ভয় পেয়ে পিছু হটে গেলে সেটা কোনো সাহসের কাজ নয়।
‘আপা, কী করবো?’

সন্ধ্যা বোনের হাত শক্ত করে ধরে ভরসা দিল।
সে হাজার উপরে সাহসী দেখালেও তার ভেতরে অনেক ভয় লাগছে। কারণ সে জানে এতগুলো ছেলে তাকে কিছু বলবেই। তার উপর তাদের চোখে পড়েছে যে!
সন্ধ্যা এগিয়ে গেল। কুসুম আপার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
সন্ধ্যা বিলের আইল ডিঙিয়ে রাস্তায় রাস্তায় উঠতেই হারুনসহ সবাই হোহো করে উঠল।
‘আরে সুন্দরী যে!’
‘আমরা আছি জেনেও আসলে ?’
‘তার মানে তারও কথাগুলো ভাল্লাগতাছে। বাপের ডরে এমন ভাইবা ছিল। ‘

একেকজনের একেক বিশ্রী কথায় সন্ধ্যা অপমানে চোখমুখ কিচে ফেলল। সে চলে যেতে নিলে হারুন এসে পথ আটকালো। সে সন্ধ্যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। ঘোমটার আড়ালে হারুনের বিশ্রী লোভনীয় দৃষ্টি দেখে ঘৃনায় সন্ধ্যার গা রি রি করে উঠল।
হারুন আকস্মিক সন্ধ্যার ঘোমটা ধরে টান দিতেই সন্ধ্যা চমকে তাকালো। হারুনের আকস্মিক কান্ডতে সন্ধ্যা হিতায়িত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে ঘৃণায় অপমানে বর্ষিভূত হয়ে রাগিনী রূপ ধারণ করে আচমকা থা’প্প’ড় মেরে দিল।
আকস্মিক ঘটনায় সবাই হতবাক। হারুনের বন্ধুরা হাসা বন্ধ করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। হারুন গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট কেটে র’ক্ত পড়ছে। একটা মেয়ে মানুষের হাতে এতো শক্তি!

#চলবে ইন শা আল্লাহ।
(আসসালামু আলাইকুম। রিচেক দেওয়া হয়নি। অগোছালো হওয়ার জন্য দুঃখিত। একটা ছোট মন্তব্যের আশাবাদী। আর আমাকে পিছু করবেন না প্লিজ। আমি এই থিমটা অনেক আগেই এন্ডিংসহ ভেবে রেখেছি। ভুল ভ্রান্তি ক্ষমার নজরে দেখার অনুরোধ। )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here