তবু মনে রেখো পর্ব ৩

0
64

#তবু_মনে_রেখো
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব_৩

মুহিবের খুশি যেন উপচে পড়ছে। সে এগিয়ে যেতে নিতেই মেয়েটি খেয়াল করলো। হুড়মুড়িয়ে মাথাটা চাঁদর দিয়ে ঢেকে ফেলল। এরপরে তড়িঘড়ি করে বিস্তীর্ণ উঠানটা ডিঙিয়ে দোচালা ঘরটাতে ঢুকে গেল।
মুহিব অদূরে থাকাতে টেক্কা দিয়ে উঠতে পারলো না কিন্তু খুশি হলো। যাক, মেয়েটির ঘর তো তাদেরই পাশে।
সে আর এগিয়ে গেল না। অদূর থেকেই ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে বুলি আওড়ালো,’পেয়ে গিয়েছি, এইবার তো আর ছাড়বো না।’
মুহিব যেখানে দাঁড়িয়েছে সেখানের দূর থেকে দোচালা ঘরটি একদম চুনোপুটির মতো মনে হচ্ছে। সে হাসলো। পেল তো সান্নিধ্য!

সন্ধ্যা দ্রুত ঘরে ঢুকেই স্বস্তির শ্বাস ফেলল। আজ তো সব ভুলে একদম বিলের কাছেই নেমে পড়েছিল। বাবা দেখলে বোধহয় একেবারের জন্য বন্দী হয়ে যেত। সে দক্ষিণের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতেই আঁতকে উঠলো। ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কেন! ছেলেটিকে দেখেই বোঝা যায় শহুরে আর বড়ো ঘরের। তা ভাবতেই মনে পড়লো চেয়ারম্যানের ঘরের উঠানেই তো দেখেছিল কাল। তাহলে কী সে চেয়ারম্যানের কেউ! কিন্তু এতো ঠান্ডা শীতের মাঝে উনি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন কেন! সন্ধ্যার খারাপ লাগলো, এতো বড়ো ঘরের হয়ে এতো শীতের মাঝে উনি এভাবে বিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন! সন্ধ্যার মনে খারাপ লাগা কাজ করলেও একদিকে কেন জানি ভালোই লাগে।
মুহিবের এমন কর্মকান্ডের সূত্র কিছুটা আন্ডাজ করতে পেরে সন্ধ্যার কিশোরী মনে ব্যাপকভাবে আনন্দের দোলা লাগলো।

——-
এভাবে বেশ কয়েকদিন কেটে গিয়েছে। মুহিব এখন প্রতিদিন নিয়ম করে ভোরে বিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। মুহিবের মা বেজায় রাগ করেন, তিনি বারবার বলেন ঠান্ডার ভেতরে এভাবে প্রকৃতি দেখতে না যেতে কিন্তু মুহিব মানে না। এটা এখন তার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনকার মতো মুহিব আজ আর বিলের ধারে দাঁড়ায়নি। মেয়েটা ইদানিং বের হয় না তেমন। মুহিব বুঝতে পারে না। মেয়েটার বের না হওয়ার কারণ কী সে নিজে! মুহিব কিছু একটা ভেবে আজ একটু আড়াল জায়গায় দাঁড়িয়েছে।
মুহিবের ধারণা অনুযায়ী সন্ধ্যা আজ উঠানে এসেছে। সে উঠান পেরিয়ে বিলের ধারে এসে দাঁড়ালো। একটু উঁকি দিয়ে দেখল। না, আজ আসেনি। সন্ধ্যার মন খারাপ হলো কিন্তু তার তো খুশি হওয়ার কথা!
মুহিব ধান ক্ষেতের মাঝখানে থেকে বেরিয়ে আগের জায়গা হিসেবে সরু রাস্তাটিতে উঠে এলো।
তা দেখেই সন্ধ্যা আঁতকে উঠল। সন্ধ্যার এমন ধরা পড়ার মুখভঙ্গিমা দেখে মুহিব হাসলো। আজও মেয়েটি ফুল হাতা জামার সাথে উড়না দিয়ে মুখ ঢেকে আছে। কে জানে! এই উড়নার আড়ালে এতসুন্দর একটি চেহারা লুকায়িত কিন্তু সেই সৌভাগ্যবান যে কেউ হতে পারে না। তা হয়েছে মুহিব। সে খুশিই হলো, যাক তার অর্ধাঙ্গিনীকে আর কেউ দেখেনি।
সন্ধ্যা ধরা পড়ে দ্রুতগতিতে উঠান ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। তা দেখে মুহিব হেসে দিল।

——
আনিস মিয়া আজ শহুরে কাজে যাবে। তিনি মূলত মালামালের জন্যই যান। কয়েকদিন ওখানে অবস্থান করেন। বাবা গেলে সন্ধ্যার নিজেকে মুক্ত পাখির মতো স্বাধীন মনে হয়।
সন্ধ্যার মা জোহরা স্বামীকে বিদায় দিতে দরজার কাছে আসতেই আনিস মিয়া তাকালো। তিনি তার স্ত্রী জোহরাকে বিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে ইঙ্গিত দিল,
‘এই পোলাটারে দেখতাছো?’
জোহরা স্বামীর ইঙ্গিত অনুসারে তাকিয়ে সম্মতি দিল।
‘পোলাটা কয়েকদিন ধইরা এই জায়গায় এই সময়ে এই ভোরে শীতের ভেতর দাঁড়ায় থাকে।’

‘থাকতেই পারে। দেখতে তো মনে হচ্ছে শহুরে। হয়ত প্রকৃতি দেখে।’
স্ত্রীর জবাবে আনিস মিয়া অসন্তুষ্ট প্রকাশ করে বলল,
‘সবসময় তোমার তেড়া তেড়া জবাব দিবা না তো। তুমি চিনবার পারতেছো না?’

জোহরা ভালোভাবে তাকানোর চেষ্টা করলো। হ্যাঁ, সে আগে অনেকবার দেখেছে কিন্তু তার স্বামী কী বলতে চাচ্ছে সেটা ঠিক ধরতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো।
‘এটা চেয়ারম্যানের পোলা। শহরে পড়ালেখা করে তাই ওখানেই থাকে। মতিগতি ভালা ঠেকছে না। তুমি সন্ধ্যাকে দেইখা দেইখা রাখবা জোহরা।’
‘ঠিকাছে, আপনি যান।’
সন্ধ্যা দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে বাবার সামনে এলো। তা দেখে আনিস মিয়া বলে উঠলেন,’মাইয়া মাইনষের এরকম দৌড় ঝাঁপ করা ভালা লক্ষণ না।’ সন্ধ্যা তাকালো। আনিস মিয়া যাওয়ার আগে আরেকটিবার ফিরে কুসুমকে আদর করে দিল। এরপর পরেই বিস্তীর্ণ উঠান ডিঙিয়ে চলে গেল। তা দেখে সন্ধ্যার খারাপ লাগলো কিন্তু তাতে পাত্তা দিল না। কেউ বের হওয়ার সময় মুখ ভার করে থাকতে নেই।

—–

তপ্ত দুপুর। যদিও রোদ অনেকটা বেশি কিন্তু শীতের রোদগুলো গায়ে মাখলে ভালোই লাগে। হাল্কা বাতাস বইছে। সন্ধ্যার ইচ্ছে করলো এই পরিবেশটা সে নিজের দুচোখ ভরে দেখুক। সন্ধ্যা কুসুম থেকে জিজ্ঞেস করলো। কেউ আছে কিনা! কুসুম চারপাশে তাকিয়ে না বললো। কেননা এই দিন দুপুরে গ্রামের সবাই ভাত ঘুম দেয়।
সন্ধ্যা মাথার উড়না চেহারা থেকে সরিয়ে দিল । চারদিকের হাল্কা বাতাস গায়ে লাগতেই এক সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে। সে চোখ বন্ধ করে বিলের মাঝে দাঁড়িয়ে রইল। হুট্ করে কুসুমের ডাকে সে চোখ তুলে বোনের দিকে তাকালো। কুসুম ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘ আপা, ওই বি’য়াদ’ব পোলাটা।’

‘কোন পোলা?’
‘মেয়ে মাইনষেরে খারাপ কথা বলে সে।’
কুসুম হাতের ইশারা দিয়ে দেখাতেই সন্ধ্যা সেদিকে অনুসরণ করলো। বিলের অদূরে রাস্তার এখানে দলটা বসে আছে। দলের প্রধান হচ্ছে হারুন। এই লম্পট হারুনের চোখ থেকে গ্রামের সব মহিলারা তাদের মেয়েদের সাবধানে রাখেন। তার চোখ শ’কু’নের। একবার চোখে পড়লেই শেষ। সন্ধ্যা তড়িঘড়ি করে উড়না মাথায় চাপালো। সে কী ভুল কিছু করে ফেলেছে!
সে কুসুমের হাত ধরে বিলের সরু আইল দিয়ে এসে রাস্তায় উঠে গেল। রাস্তার ধারেই বটতলায় এই দলটা থাকে সবসময়। লোকেরা ল’ম্প’ট হারুনই বলে। তাদের দলটা ব’খা’টের দল।
সন্ধ্যা দ্রুতপদে বোনকে নিয়ে ওদের ডিঙিয়ে আসতেই স্বস্তির শ্বাস ফেলল। যাক, তাহলে চেহারা দেখেনি। তার বাবা একটু রাগী বলে সবাই তাদের তেমন একটা খারাপ নজরে দেখতে পারে না। এদিক দিয়ে সে বাবাকে কৃতজ্ঞতার চোখে দেখে।
সন্ধ্যা স্বস্তির শ্বাস ফেলে পা বাড়াতে নিতেই কিছু একটা শ্রবণ করে পা থেমে গেল।

‘সুন্দরী! ঘোমটার আড়ালে এতটা সুন্দরী হবা তাতো ভাবিনি কোনোদিন। ভাবছিলাম ছোটটা আর বাপের মতো কাইল্লা হবে কিন্তু এতো দেখি হুরপরি। এভাবে জীবনের কী বুঝতে পারতাছো? আমার সাথে চলে আইসো। সুখে রাখবনি।’

হারুন কথাগুলো বলেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সন্ধ্যা আড়াল থেকেও বুঝতে পারলো হারুনের দৃষ্টি লোভনীয়। তার গায়ে জ্বা’লা ধরে গেল।
হারুন হাত দুটো সোজা করে আরমোড়া ভেঙে সন্ধ্যার পিছে এসে দাঁড়াল। সন্ধ্যা দ্রুত পা চালাতে নিতেই হারুন তার দলের বাকিদের ইশারা করে বলল,

‘দেখছোস? আনিস মিয়া কী পালতাছে! শা’লা, এমনভাবে চলায় যে এমন সুন্দরীরে এতবছর চোখেই পড়েনি। চোখের সামনে এমন সুন্দরী থাইকাও আমরা বুঝবার পারিনি।’

সন্ধ্যার রাগে দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। তা দেখে হারুন চেঁচিয়ে হাঁক ছাড়লো,
‘কী সুন্দরী! ভয় পাইতাছো? ভয় নেই। হারুন আছে তোমার লগে। এহন থাইকা তুমি শুধু হারুনের।’
তা বলতেই পাশ থেকে কয়েকজন ছেলে হারুনকে ইঙ্গিত দিতেই হারুন হেসে উঠল,’আচ্ছা, এমন সুন্দরীরে নাকি আমার পোলাপানরাও চায় তাই তুমি সবার। প্রথমেই হারুনের তারপর বাকী সবার।’ বলেই সবাই হোহো করে বিশ্রীভাবে হেসে উঠতেই সন্ধ্যা বোনের হাত ধরে দ্রুত পা চালালো।
কুসুম কিছু বলতে যাবে তার আগেই সন্ধ্যা হাত চেপে ধরলো। এসব লম্পট মানুষের সাথে ফেঁসে গেলে শেষ। আর তার উপর হারুন চেয়ারম্যানের ভাই পো।

#চলবে ইন শা আল্লাহ।
(আসসালামু আলাইকুম। ভুল ভ্রান্তি ক্ষমার নজরে দেখার অনুরোধ। অগোছালো হওয়ার জন্য দুঃখিত।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here