শ্রাবন সন্ধ্যা অন্তিম পর্বের (১ম অধ্যায়)

0
2424

শ্রাবন সন্ধ্যা অন্তিম পর্বের (১ম অধ্যায়)
#আমিনা আফরোজ

অন্ধকার ঘর,সন্ধ্যা করুন চাহনিতে তাকিয়ে আছে ঘরে প্রবেশ করা পরিচিত মুখটির দিকে। ফোলা ফোলা চোখে ঘরটির চারিদিকে তাকায় সন্ধ্যা। ছোট একটি ঘর, ঘরের এক কোনায় রয়েছে ছোট্ট একটি জানালা।যার ফাঁক-ফোকর দিয়ে আসছে গোধুলির কিঞ্চিৎ আলো। হয়তো আর কিছু সময়ের মাঝে সূর্য অস্ত যাবে পশ্চিমাকাশে। ধরণীর বুকে নেমে আসবে নিকষ কালো অন্ধকার। ক্লান্ত – শ্রান্ত পাখিরা ফিরে যাবে তাদের নীড়ে। শুধু সন্ধ্যাই বন্দি রয়ে যাবে এই অন্ধকার ঘরটিতে। তবে কি আর কখনো শ্রাবণের সাথে দেখা হবে না সন্ধ্যার? কখনো কি ফেরা হবে না নিজের গোছানো সংসারটিতে? এভাবেই কি তবে হারিয়ে যাবে সন্ধ্যা?

সন্ধ্যা যখন এসব ভাবছিল ঠিক তখনই রিনরিনে কণ্ঠস্বর শুনতে পেল ও। সন্ধ্যার সামনে বসে থাকা ব্যক্তিটি হাসির ঝংকারে বলে উঠলো,

–“কেমন আছো সন্ধ্যা?”

সন্ধ্যা ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,

–“আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছো নেহা?”

সন্ধ্যা এমন বোকা প্রশ্ন শুনে আবারো হেসে উঠলো নারীটি। ফিশেল হেসে বলল,

–” যাক বাবা, অবশেষে অন্তত আমাকে চিনতে পারলে । আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে তুমি চিনতেই পারবে না।”

–” তোমাকে না চেনার কোন কারন আছে কি ?”

–“তা অবশ্য ঠিক বলেছো।”

–“এখানে কেন নিয়ে এসোছো আমায়? আমার যতটুকু মনে পড়ে আমি আমার ঘরে ছিলাম।”

–“ঠিক বলেছ তুমি। তুমি তোমার ঘরে বেশ আয়েশ করে বিছানায় শুয়েছিলে । আমি ভেবে দেখলাম তোমায় সেখানে খুব একটা শোভা পাচ্ছে না তাই এখানে নিয়ে আসলাম।”

–“এখানে নিয়ে আসার কারনটা কি জানতে পারি?”

–“তোমাকে এখানে নিয়ে আসার কারণ তুমি নিজে। যদি তুমি আমার আর শ্রাবনের মাঝে না আসতে তাহলে আমায় এতো কষ্ট করে তোমাকে এখানে নিয়ে আসতে হতো না।”

–“আমি তোমার আর শ্রাবনের মাঝে এসেছি মানে?”

–“মানেটা বুঝলে না তাই তো? আচ্ছা ঠিক আছে আমি তোমাকে পুরো বিষয়টা খুব ভালো করে বুঝিয়ে বলছি। আমার বাবা আর রশিদ আঙ্কেল ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার সুবাদে আমি আর শ্রাবণ ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি। যখন থেকে আমি ভালবাসার অর্থ বুঝতে শিখলাম তখন থেকেই আমি শ্রাবনকে ভালোবেসে এসেছি। শ্রাবনকে নিয়ে বুনেছি হাজারো স্বপ্ন। এসব কথা অবশ্য শ্রাবণকে অনেকবার বলেছি আমি কিন্তু শ্রাবণ বরাবরই আমাকে এড়িয়ে গেছে। তখন ভাবতাম কিছুদিন যাক, বিয়ে হয়ে গেলে তখন হয়তো শ্রাবণ আমাকে ভালবাসবে কিন্তু আমাদের বিয়ের কথাবার্তা বলার আগেই তুমি এসে পড়লে আমাদের মাঝে। তোমাকে যেদিন আমি প্রথম কফিশপে দেখতে পেয়েছিলাম সেদিনই আমার বোঝা উচিত ছিল তুমি একদিন না একদিন আমার আর শ্রাবণের মাঝে আসবে। কিন্তু কি বলতো, আমি তখন এত কিছু ভেবে দেখি নি তাই আজ এই দিনটা দেখতে হচ্ছে আমায়। জ্ঞানীরা ঠিকই বলে জানো তো, ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানীর কাজ । সে যাই হোক ভুল যখন করেছি সেই ভুলটাকে তো আমাকেই শুধরাতে হবে তাই না? এখন বলো, আমাদের মাঝে আসার জন্য তোমাকে কি শাস্তি দেওয়া যায়?”

–“প্রথমত তুমি এতদিন মিথ্যে মরীচিকার পিছনে দৌড়িয়েছো নেহা। ভালবাসা কখনো জোর করে হয় না । ভালোবাসা সম্পূর্ণটাই মনের ব্যাপার । তুমি যাকে ভালবাসবে সেই মানুষটাকেও যে তোমায় ভালবাসতে হবে এমন কোথাও লেখা নেই আর রইল আমার মাঝে আশার কথা, সে তো তুমি এসেছো আমার আর শ্রাবনের মাঝে। আমার আর শ্রাবণের বিয়েতো সেই ছোটবেলাতেই হয়ে গিয়েছে যখন আমরা বিয়ে সম্পর্কে কোন কিছুই বুঝতাম না। সেই ছোটবেলায় আমরা পবিত্র বন্ধনে আটকে গিয়েছিলাম। বড় হয়ে তো শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে শ্রাবণের ঘরে তুলে নিয়েছে। মানুষটা তো সেই কবেই আমার হয়ে গিয়েছিল,যখন তোমার কোন অস্তিত্বই ছিল না এই পৃথিবীতে। সে সব কথা থাক। আমি তোমাকে কিছু কথা বলি নেহা, মন দিয়ে শুনবে।”

–“আমি তোমার কথা শুনবো তুমি এটা ভাবলে কি করে আর তাছাড়া তোমাকে এত কথা বলার সুযোগই বা দিচ্ছি কেন আমি?”

–“শুনতে যে তোমায় হবেই। অনেক কথা জমে আছে যে। এ কথাগুলোর সাথে যে তোমার আর আমার সম্পর্ক জড়িয়ে আছে । আমি জানি না কথাগুলো শোনার পর তোমার সিদ্ধান্ত কি হবে? তবুও বলবো কথাগুলো শুনো?”

–“সরি তোমার কোন কথাই শুনতে চাচ্ছি না আমি। আপাতত আমার কথাগুলো মন দিয়ে শোন। আমি চাইনা তুমি শ্রাবণের কাছে আবারও ফিরে যাও। তোমাকে যদি এখন আমি ছেড়ে দিই তাহলে শ্রাবনকে পাওয়ার আশা আমাকে সারা জীবনের জন্য ছেড়ে দিতে হবে কিন্তু সে তো আমি হতে দেবো না তাই আজ তোমাকে এই পৃথিবী থেকে হয়তো চলে যেতে হবে।”

সন্ধ্যা কোন কিছু না বলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নেহার দিকে। কি বা বলবে ? নেহা তো ওর কোন কথাই শুনছে না।

সন্ধ্যাকে চুপ করে থাকতে দেখে নেহা অট্ট হাসি দিয়ে বলল,

–” থাক তোমাকে আর এ নিয়ে কোন কিছু ভাবতে হবে না , সবকিছু আমি ভেবে নিয়েছি। মাঝে মাঝে তোমাকে দেখে আমার খুব হিংসে হয় জানো তো। দেখো না তোমার পুরোনো প্রেমিককে বললাম আমার প্ল্যানের কথা কিন্তু সে তো রাজি হলোই না বরং আমাকে হুমকি দিল যেন তোমার আশে-পাশেও না যাই আমি। বেচারা নেহাল ও তো জানলোই না তার ভালোবাসার মানুষটা এখন আমার কব্জায়। সবাইকে কি দিয়ে এমন পাগল বানিয়েছো গো। থাক বলতে হবে না। এমনিতেও আজ তোমার শেষ দিন। এসব জেনে আর কি হবে।”

কথাগুলো বলেই নেহা হাসতে হাসতে হাতে করতালি দিতেই বাহির থেকে দুটো ছেলে এসে দাঁড়ালো নেহার পাশে। ছেলে দুটোকে দেখিয়ে নেহা মুচকি হেসে বলল,

–” তুমি শুনতে চেয়েছিলে না তোমাকে কি শাস্তি দিবো আমি? এই দুজন হলো তোমার শাস্তিদাতা।”

নেহার কথা শুনে সন্ধ্যা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলে দুটির দিকে। কি করতে চাচ্ছে কি নেহা তা বোঝার চেষ্টা করছে সন্ধ্যা।

–“থাক তোমাকে এতো কিছু বুঝতে হবে না। একটু পরেই বুঝতে পারবে কি হবে তোমার সাথে।”

কথাগুলো বলেই নেহা ছেলেদুটোকে ইশারা দিয়ে হাসতে হাসতে বাহিরে চলে গেল। আজ থেকে ওর আর শ্রাবণের মাঝে আর কোন দেয়াল রইল না। নেহা বেরিয়ে যেতেই ছেলে দুটি বাঁকা হেসে সন্ধ্যার দিকে এগোতে লাগলো।

এদিকে সারা বিকেল এখানে-সেখানে অনেক খুঁজেও সন্ধ্যার কোন খোঁজ পায় নি শ্রাবণ। সারাদিনের ক্লান্তিতে টলতে টলতে চৌধুরী বাড়ির দোরগোড়ায় এসে বসল শ্রাবণ। নিকট আত্মীয় ছাড়া বাকি সবাই চৌধুরী বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে ততক্ষনে। নিকট আত্মীয় বলতে নেহালদের পরিবার, ইমতিয়াজ খানই শুধু রয়ে গেছেন চৌধুরী বাড়িতে। চৌধুরী বাড়িতে আপাতত পিন-পতন নিরবতা চলছে। শ্রাবন ও নেহাল বাড়িতে ফিরতেই রোদ ওদের দিকে ছুটে এসে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,

–“ভাইয়া একা এলি কেন? ভাবি কোথায়? ভাবিকে খুঁজে পাস নি তোরা?”

শ্রাবণ ভাবলেশহীন ভাবে বলল,

–“অনেক খুঁজলাম রে কিন্তু পেলাম না। পুলিশের কাছেও গিয়েছিলাম কিন্তু ওরা বলল ২৪ ঘন্টা না যাওয়া অব্দি ওরা মিসিং ডাইরি লিখবে না। আমি ভাবছি অন্য কথা বিয়ে বাড়ির মতো এতো কোলাহল পূর্ণ জায়গা থেকে‌ কে কিডন্যাপ করে নিয়ে যেতে পারে সন্ধ্যাকে? আর সন্ধ্যাকেই বা কিডন্যাপ করল কে?”

শ্রাবণের এমন কথা শুনে মনোয়ারা বেগম মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলেন,

–” কেউ কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় নি তোর বউকে ।দেখ গিয়ে কোন ছেলের সাথে হাত ধরে পালিয়ে গেছে মাঝখান থেকে শুধু চৌধুরী বাড়ির মান-সম্মান চলে গেল । যেমন‌ মা , তেমন মেয়ে।”

মনোয়ারা বেগমের কথা শেষ হতে না হতেই রশিদ সাহেব থমকে বলে উঠলেন ,

–‘আজকাল খুব কথা শোনা যাচ্ছে তোর । সন্ধ্যা মা কেমন তা আমরা সকলেই জানি তাই তোর এক পাক্ষিক কোন কথা এখানে বলতে আসবিনা। আর রইল পরির কথা । আফসোস পরিকে তুই আজ অব্দি চিনতে পারলি না। এমনিতেই আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় আছি তাই দয়া করে তোর কথাগুলো শুনে আমাদের মনটা আরো তিক্ত করে তুলিস না।”

রশিদ সাহেবের কথা শেষ হতেই আশরাফ সাহেব ইমতিয়াজ সামনে এসে দাড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন,

–” আমার মেয়েকে কোথায় রেখেছিস বল? আমি জানি ওকে তুই কোথাও লুকিয়ে রেখেছিস । দেখেছিস তো অনেকে অনেক কটু কথা বলছে আমার মেয়ের নামে ভালই ভালই বলছি আমার মেয়ের ঠিকানা আমাকে দিয়ে দে।”

প্রাণ প্রিয় বন্ধুর মুখে এমন কথা শুনে ইমতিয়াজ খান বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে উঠলো,

–” আমি এতটাও খারাপ বাবা নই যে নিজের মেয়েকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাব। আমি তো জানতামই না সন্ধ্যা আমার মেয়ে। জানলে হয়তো অনেক আগেই ওকে আমার কাছে নিয়ে যেতাম তবে তা জোরজবস্তি করে নয়। তুই যেরকম কষ্ট পাচ্ছিছ ঠিক আমিও তেমনি আমার মেয়েকে হারিয়ে কষ্ট পাচ্ছি। বরং তোর থেকে আমার কষ্ট বেশি হচ্ছে। এতদিন পর মেয়েটাকে কাছে পেয়েছি অথচ মেয়েটাকে সামনে থেকে দেখতে পাচ্ছি না। তুই বুঝবি না আমার কষ্ট। এতোগুলো দিন আমি পাগলের মতো খুঁজে চলেছি ওদের কিন্তু আজ খুঁজে পেয়েও মেয়েটাকে দুচোখ ভরে দেখার সৌভাগ্য হলো না। আমি যে সত্যিই এক হতভাগ্য পিতা। তুই চিন্তা করিস না আমি আমার মেয়ের গায়ে একটা আঁচড় লাগতে দেব না। ”

রশিদ সাহেব নিজেই এবার বলে উঠলেন,

–“এখন নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি না করে বরং ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা ভাবতে হবে আমাদের।”

আলোচনার এক পর্যায়ে নেহাল বলে উঠলো,

–“আমার একজনকে সন্দেহ হচ্ছে এ বিষয়ে তবে শতভাগ নিশ্চিত দিতে পারছি না।”

–” কাকে সন্দেহ হচ্ছে আপনার?”

কাঁপা কাঁপা কন্ঠে রোদ কথাগুলো বলে ওর ফুপু মনোয়ারা বেগমের দিকে আড়চোখে তাকাল। মনে মনে ভাবতে লাগল ফুপির দ্বারা কি সত্যি এত নিকৃষ্টতম কাজ করা সম্ভব?

–” বেশ কিছুদিন আগে আমাকে মার্জিয়া খান নেহা নামের একজন ভদ্রমহিলা কল করেছিলেন। সন্ধ্যার বিষয়ে অনেক কথাই বলেছেন তিনি আমাকে। আপাত দৃষ্টিতে আবার তাকেই সন্দেহ হচ্ছে । জানিনা আমার ভাবনা চিন্তা কতটা যুক্তিযুক্ত।”

নেহালের কথা শুনে এবার সবাই মুখ তুলে তাকালো ইমতিয়াজ খানের দিকে। সবার মত ইমতিয়াজ খান নিজেও হতবাক হয়ে আছেন নিজের মেয়ের নামের কথাগুলো শুনে। ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না ওনার এতটা ঘৃণ কাজ করতে পারে? নেহা যে শ্রাবনকে পাবার আশায় এতো ঘৃন কাজ করবে তা তিনি বুঝতে পারেন নি। আগে থেকে জানতে পারলে হয়তো মেয়েটার কোন ক্ষতি হতে দিতেন না তিনি। এক মেয়ের সুখের জন্য হয়তো অন্য মেয়েকে নিয়ে পাড়ি জমাতেন ভীন দেশে। নেহা যদি সত্যি সন্ধাকে কিডন্যাপ করে থাকে তাহলে সন্ধ্যা এখন কোথায় আছে তা বেশ বুঝতে পারছেন ইমতিয়াজ সাহেব। তাই আর দেরি না করে চোখের পানি মুছে ছুটে চলে গেলেন মেয়েকে বাঁচাতে। ইমতিয়াজ খানকে এভাবে হঠাৎ চলে যেতে দেখেই শ্রাবন আর নেহাল সাথে সাথে ইমতিয়াজ খানের পিছুপিছু ছুটে চলে গেল ।

চলবে

( আসসালামু আলাইকুম। আজকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু এক পর্বে হয়তো অগোছালো হয়ে যেতো তাই অন্তিম পর্বের ২য় পর্ব আগামীকাল সন্ধ্যার পর দিব ইনশাআল্লাহ। আর যারা নেহালকে কিডন্যাপকারী ভেবেছিলেন তাদের জন্য রইল এক বালতি সমবেদনা। আর শুনুন আগামীকাল আরো একটা ঝটকা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। আজকের পর্ব কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু। আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থাকবেন সবাই।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here