রং তুলির ক্যানভাস ২য় খন্ড পর্ব ৫

0
56

#রং_তুলির_ক্যানভাস
#দ্বিতীয়_খন্ড
#পর্ব_৫
#লেখায়_নামিরা_নূর_নিদ্রা

পড়ন্ত বিকেলে শাড়ি পরিহিতা এক কন্যাকে দেখে রাফানের চোখ আটকে যায়। মেয়েটা বোধহয় গোধুলি লগ্নে নদীর পাড়ে আসতে পছন্দ করে। প্রায় সময় সে খেয়াল করে, মেয়েটা তার প্রোফাইলে বিভিন্ন ছবি শেয়ার করে। কিন্তু কখনো তার চেহারা দেখার সৌভাগ্য হয়নি রাফানের। শুধুমাত্র কাজল কালো দু’চোখ দেখেছে সে। আহা! কত মায়া সে চোখে!

“জোহা ম*রে গেছে!” এমন একটা অদ্ভুত নামের আইডি চোখে পড়ার পর সে অবাক হয়েছে খানিকটা। এমন আবার কারোর নাম হয় নাকি? সেই কৌতুহল থেকেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেওয়া। মেয়েটা গুণে গুণে সতেরো দিন পর তার রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেছে। এরপর থেকেই রাফান তার সাথে কথা বলার বাহানা খোঁজে। একদিন বাহানা পেয়েও যায়। স্টোরিতে রিপ্লাই দেওয়া থেকেই কথা শুরু। প্রথম প্রথম জোহা খুব একটা কথা বলতে চাইত না। রাফান নিজে থেকেই ম্যাসেজ পাঠাত তাকে। এভাবেই কেটে যায় প্রায় চার মাস। অল্পস্বল্প কথা থেকে কখন যে তারা দিন-রাত এক করে কথা বলা শুরু করল তা হয়তো নিজেরাও বুঝতে পারেনি। সাধারণ একটা সম্পর্ক ধীরে ধীরে রূপ নিল ভালোবাসায়। জোহার জীবনে প্রথম ভালোবাসা ছিল রাফান। ছেলেটার কথাবার্তা ভীষণভাবে আকর্ষিত করত তাকে। তাই তো শত বারণ সত্বেও মন দিয়েই বসল তাকে। এভাবেই কেটে গেল অনেকগুলো দিন। রাফান দেশে ফিরে এলো। মাঝেমধ্যে দেখা করত দু’জন। বেশ ভালো সময় কেটেছে তখন। নতুন প্রেমিকার সাথে সময় কাটানোর সময় রাফান ভুলেই গিয়েছিল ভীনদেশী একজন তার অপেক্ষায় আছে। সেই মেয়েটাও তাকে ভীষণ ভালোবাসে!

জোহার প্রেমে মত্ত হওয়া সেই প্রেমিক পুরুষ আরো যে কত-শত মেয়ের রাতের ঘুম কেঁড়ে নিয়েছে তা আগে জানলে হয়তো এমন ছেলের প্রেমে পড়ত না জোহা। এসব জানত না বলেই রাফানের শত-শত ভুল সে মাফ করে দিয়েছে। উঠতে-বসতে সন্দেহ করার স্বভাব ছিল রাফানের। ফলস্বরূপ জোহার জীবনটা বিভীষিকাময় হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি। তবুও সব মেনে নিয়েছে। ভালোবাসার জন্য তো এটুকু আত্মত্যাগ করায় যায়। তবে আজ এসব ভেবে জোহা আফসোস করে। শুরুতেই যদি এসব মেনে না নিয়ে সে সরে আসত তাহলে সবটা অন্যরকম হতো। আরো বেশি সুন্দর করে সেজে উঠত তার জীবন।

পুরোনো কথা ভেবে চোখের কোণে পানি জমে দু’জনের। হ্যা, দু’জনই নিজেদের অতীত ভাবছে আজ। রাফান কাঁদছে নিজের ভুল বুঝতে পেরে৷ আর জোহা? সে তো এখন ভীনদেশী মেয়ে জেসিয়ার কথা ভাবতে ব্যস্ত।

“ইশ্! মেয়েটা কতই না কষ্ট পেয়েছে। তার কষ্টের দায়ভার হয়তো কোথাও না কোথাও আমারও।”

“কাঁদছ কেন?”

“জেসিয়ার কথা ভেবে খারাপ লাগছে। আমিও মেয়ে তো। ওর অবস্থা ভেবেই কষ্ট হচ্ছে আমার। আচ্ছা, সে এখন কেমন আছে?”

“এখনকার খবর তো আমি জানি না। তবে দেশে ফেরার সময় দেখে এসেছিলাম জেসিয়া রাফানের জন্য অপেক্ষা করত তখনও। আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু সেই মেয়ে তো কোনোকিছু বুঝতেই চাইত না। রাফানকে অনেক ভালোবেসেছিল তো।”

“এখনো কি ভালোবাসে?”

“তা তো বলতে পারছি না।”

“আপনি ওর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করুন।”

“কেন?”

“সব বলব আপনাকে। আমাকে আর কিছুদিন সময় দিন। আমি জেসিয়ার সাথে কথা বলতে চাই। যেভাবেই হোক, আপনি ওর সাথে যোগাযোগ করুন।”

“আচ্ছা চেষ্টা করব। এখন ঘুমাতে চলো। অনেক রাত হলো।”

“হুম চলুন।”

নিজের বাড়িতে এক প্রকার তান্ডব চালাচ্ছে রাফান। পুরো ঘরটা তছনছ করে রেখেছে সে। প্রত্যেকটা জিনিসের করুণ অবস্থা। একের পর এক সিগারেট শেষ করছে সে। সিগারেটের ধোঁয়ায় পুরো ঘর ধোঁয়াটে হয়ে গিয়েছে। বাড়ির কেউই দরজা খোলাতে পারছে না। রাফানকে বহুবার ডেকেও লাভ হয়নি। অবশেষে সবাই ক্লান্ত হয়ে তাকে ডাকা বন্ধ করে দিয়েছে।

“তোমার জন্য তো আমি সবাইকে ছাড়তে রাজি ছিলাম জোহা। তবে তুমি কেন আমাকে ছেড়ে গেলে?”

“তোকে তোর জায়গাটা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য।”

“কে!”

পাশে তাকিয়ে নিজের মত আরেকজনকে দেখে চমকে ওঠে সে। তাকে জিজ্ঞেস করে,

“কে তুমি?”

সে উত্তর দেয়,

“আমি তো তোরই আরেকটা রূপ। চিনতে পারছিস না আমায়? তুই যখন ভুল করতিস তখন আমি তোকে বারবার মানা করতাম। আমার কোনো কথা শুনিসনি তুই। আজ দেখছিস তো কেমন অবস্থা হয়েছে তোর?”

কথাটা বলে এক বিদ্রুপের হাসি হাসে সে। এই হাসির শব্দ সহ্য হয় না রাফানের। দুই হাতে কান চেপে ধরে চিৎকার করে বলে,

“চুপ করো। আমি সহ্য করতে পারছি না এই হাসির শব্দ।”

“কেন? অন্যকে কাঁদিয়ে নিজের হাসতে তো খুব ভালো লাগে৷ তাহলে আজ আমার হাসিতে বিরক্ত হচ্ছিস কেন? মনে পড়ে না তোর? জোহার কান্না দেখে তাকে আরো বেশি করে কষ্ট দিয়েছিস। সারাক্ষণ ভুল বুঝেছিস ওই মেয়েকে। তখন তোর কষ্ট সব কোথায় ছিল? জেসিয়াকে কাঁদানোর সময়ও তুই ছিলি ভীষণ শান্ত। মনের মধ্যে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ কাজ করেনি। একের পর এক মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে তাদের কষ্ট দিয়ে সম্পর্ক শেষ করার সময় কোথায় ছিল তোর এই চেহারা? অন্যের বেলায় সব ঠিক। আর নিজের বেলায় এত বিরক্তবোধ!”

“আমি জেসিয়াকে কষ্ট দিতে চাইনি। ভেবেছিলাম আমার মত জেসিয়াও সিরিয়াস না এই সম্পর্ক নিয়ে। বিদেশের মাটিতে একসাথে থাকা তো স্বাভাবিক একটা বিষয় ছিল। তাই এসব গুরুত্ব দেইনি।”

“মানলাম জেসিয়ার বেলায় তোর দোষ কিছুটা কম ছিল। কিন্তু জোহার বেলায়? বারবার তাকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাসনি তুই?”

“না, আনন্দ পাইনি আমি। ওকে হারানোর ভয় কাজ করত আমার মধ্যে, তাই সন্দেহ করতাম।”

“ভালোবাসলে বিশ্বাস থাকতে হয়। তোর মধ্যে তো বিশ্বাসের ‘ব’ ছিল না।”

এবার চুপ করে যায় রাফান। সত্যিই তো! ভালোবাসলে বিশ্বাস থাকতে হয়। তার মধ্যে কি আদৌও কোনো বিশ্বাস ছিল?

“আমি এত কিছু জানি না। আমার শুধু জোহাকে লাগবে।”

“জোহা এখন অন্যের বউ।”

“তবুুও সে আমার। আমি তাকে ভালোবাসি। অনেক বেশিই ভালোবাসি।”

চলবে??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here