রং তুলির ক্যানভাস ২য় খন্ড পর্ব ৪

0
66

#রং_তুলির_ক্যানভাস
#দ্বিতীয়_খন্ড
#পর্ব_৪
#লেখায়_নামিরা_নূর_নিদ্রা

“মৃত্তিকা একবার আমার কথাটা শোনো!”

“কিচ্ছু শুনতে চাই না।”

“কিন্তু আমি বলতে চাই।”

“কী বলবেন? আপনার কাছ থেকে আমি আর কি আশা করতে পারি? আপনার মতো স্বার্থপর একজনের থেকে আমি কিছুই শুনতে আগ্রহী নই।”

“আমি স্বার্থপর? আমি স্বার্থপর হলে নিজের কথা আগে ভাবতাম মৃত্তিকা।”

“নিজের কথায় তো ভেবেছেন। বন্ধুত্বকে বাঁচানোর জন্য আমার জীবনটা নিয়ে ছেলেখেলা করেছেন। তবুও পুরোনো সবকিছু ভুলে আমি স্বাভাবিক হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আজও আমাকেই দোষারোপ করে যাচ্ছেন। আরে ভাই, যে ছেলে নিজের চরিত্রহীন বন্ধুর জন্য আমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে তার কাছ থেকে কী-ই বা আশা করব আমি?”

মেজাজ খারাপ হয়ে যায় শানের। বিরক্তির সুরে সে বলে,

“ব্যাস মৃত্তিকা ব্যাস! রাফানের সম্পর্কে আমি তোমার মুখ থেকে আর কিছু শুনতে চাই না।”

“বিশ্বাস করুন, আমিও বলতে চাই না। আমাদের দুই বান্ধবীর জীবন আপনারা দুই বন্ধু মিলে স্বযত্নে শেষ করেছেন। আপনাদের মুখ দেখতেও এখন আমার বিরক্ত লাগে।”

একরাশ বিরক্তি নিয়ে ছাদ থেকে চলে যায় মৃত্তিকা। শান নিজের চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পাশে থাকা দেয়ালে লাত্থি দিয়ে নিজেও নিচে চলে যায়।

আজ আফসান আর জোহা জোহার বাবার বাড়িতে যাবে। তার জন্য তৈরি হচ্ছে সবাই। জোহা হিজাব সেট করার জন্য সেফটিপিন ব্যবহার করতে গিয়ে বাঁধে এক বিপত্তি। হিজাবের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সেফটিপিন বাজেভাবে আটকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও সে হিজাব আর সেফটিপিন আলাদা করতে পারে না।

“কোনো সমস্যা? তোমাকে এমন বিরক্ত দেখাচ্ছে কেন?”

“ওহ্ আফসান ঠিক সময়ে এসেছেন। একটু এদিকে আসুন না!”

আফসান এগিয়ে যায় জোহার দিকে। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে,

“বলো কী সমস্যা?”

“দেখুন না হিজাবের সাথে সেফটিপিন বাজেভাবে আটকে গিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও খুলতে পারছি না। আপনি খুলে দিবেন প্লিজ?”

“এই ব্যাপার, দাঁড়াও আমি ঠিক করে দিচ্ছি।”

সেফটিপিন খোলার জন্য জোহা আর আফসান অনেকটা কাছাকাছি চলে আসে। আফসানকে এত কাছে দেখে জোহা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে একইভাবে।

বাইরে থেকে জোহা আর আফসানের এমন দৃশ্য দেখে রাফানের চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায় নিমিষেই। রাগে তার চোখ লাল বর্ণ ধারণ করে। সারারাত না ঘুমানোর জন্য মা*থা ব্যথাও করছে বটে।

“কিরে রাফান তুই এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস?”

শানের কথায় রাফান কোনো প্রতুত্তর না করে চলে যায় বাইরের দিকে। এই জায়গাটা এখন তার কাছে বড্ড বি*ষাক্ত লাগছে। বন্ধুর এমন ব্যবহারের কোনো কারণ বোধগম্য হয় না শানের। সে আশেপাশে না তাকিয়ে নিজের ঘরে চলে যায় তৈরি হওয়ার জন্য। একটু পরেই বের হবে সবাই।

খানিকক্ষণ বাদে আফসান সফল হয় সেফটিপিন খুলতে। জোহা হালকা হেসে বলে,

“ধন্যবাদ।”

“একমাত্র বউয়ের কোনো কাজে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ আশা করি না আমি। তবে তুমি চাইলে ভালোবাসা দিতে পারো। তাতে আমি কিছু মনে করব না।”

“যান যান তৈরি হয়ে নিন। বিছানার উপর আপনার কাপড় রাখা আছে। জলদি তৈরি হয়ে নিন।”

“যাচ্ছি ম্যাডাম। ওহ্ ভালো কথা, তোমাকে কিন্তু আজ ভীষণ মিষ্টি লাগছে।”

“এমনি সময় লাগে না বুঝি?”

“তুমি একেক সময় একেক রকম। প্রতিটা রূপেই অসাধারণ।”

“হয়েছে থাক, আমার এত প্রশংসা করতে হবে না।”

“একমাত্র বউয়ের প্রশংসা করব না তো কার প্রশংসা করব?”

“আমাদেরও একটু প্রশংসা করুন ভাইয়া। শুধু বউয়ের প্রশংসা করলে হবে? শালিকাগুলোর দিকেও একটু তাকান।”

দরজার সামনে মৃত্তিকা, আনিতা আর নিজের বোনকে দেখে আফসান নিজের চুলে হাত বুলিয়ে বলে,

“আমার বোনগুলো যে অনেক সুন্দর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার বউটা একটু বেশিই সুন্দর।”

“এখন থেকেই আমার ভাই বউ পাগল হয়ে যাচ্ছে।”

“তাতে তো তোর খুশি হওয়ার কথা। জোহা বলতে তুই অজ্ঞান না বল? সে এত ভালোবাসা পাচ্ছে এটাতে তোরই বেশি আনন্দ হওয়ার কথা।”

ভাইয়ের কথায় নিধি খুশিমনে জোহার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে,

“আমি জানি আমার ভাইয়ের ভালোবাসা একদম খাঁটি। তাই তো আমি নিশ্চিন্ত।”

“আরে এসব রাখ। আগে ওর দিকে তাকিয়ে দেখ, কি সুন্দর লাগছে!”

আনিতার কথায় বাকিরা খেয়াল করে সত্যিই সবুজ রঙের লেহেঙ্গায় বেশ সুন্দর লাগছে জোহাকে। লাল রঙের দোপাট্টা দিয়ে শাড়ির মতো স্টাইল করেছে সে। তাই পারতপক্ষে এটাকে শাড়ি বললেও ভুল হবে না।

মৃত্তিকা নিজের চোখের কোণ থেকে সামান্য কাজল নিয়ে জোহার চোখের পাশে দিয়ে বলে,

“আহা আমার সুন্দরী বান্ধবীর দিকে কারোর যেন নজর না লাগে।”

পাশ থেকে নিধি বলে ওঠে,

“মাশাআল্লাহ তোকে অনেক সুন্দর লাগছে জোহা। তাই তো বলি আমার ভাই এত ফিদা হলো কেন!”

“আরে তোরা চুপ করবি? অনেক হয়েছে আমার প্রশংসা করা। আর করা লাগবে না।”

“বাব্বাহ মেয়ে আমাদের লজ্জা পেয়েছে।”

সবার কথা বলার মাঝে জোহার শাশুড়ি মা তাড়া দিয়ে বলেন,

“তোরা পরেও গল্প করতে পারবি। এখন দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি সবাই বাইরে আয়। বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছে তোদের জন্য।”

কথাটা বলে ছেলের দিকে তাকিয়ে তার ভ্রূদ্বয় সংকুচিত হয়ে আসে।

“এই আফসান তুই এখনো তৈরি হতে পারলি না? তোকে নিয়ে আমি কী করব বল তো?”

“আরে মা ওকে বলে লাভ নেই। এই ছেলে তো বরাবরই অলসের ডিব্বা।”

“তুলে আ*ছাড় মা*রব তোকে আমি। সারাক্ষণ বড়ো ভাইয়ের পেছনে লাগা তাই না?”

“আহ্ ভাইয়া আমার চুল ছেড়ে দে। লাগছে তো আমার।”

এসব দেখে জোহা আফসানের হাত ধরে এক প্রকার কড়া স্বরেই বলে,

“আপনি তৈরি যাবেন নাকি আপনাকে রেখেই আমরা চলে যাব?”

“যাচ্ছি যাচ্ছি। এত রাগ করতে হবে না।”

আফসান তৈরি হতে গেলে জোহার শাশুড়ি মা তার কাছে এসে কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলেন,

“মাশাআল্লাহ আমার বউমাকে ভারি সুন্দর লাগছে।”

“ধন্যবাদ আন্টি।”

জোহার লাজুক হেসে দেখে তিনি কিছুটা অভিমান মিশ্রিত কণ্ঠে বলেন,

“এখনো আন্টি বলবি? তাহলে মা বলে ডাকবি কবে?”

শাশুড়ি মায়ের এমন অভিমান দেখে জোহা গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে জবাব দেয়,

“আমার মামনির বুঝি আমার উপর অভিমান হয়েছে?”

“তা একটু হয়েছিল বটে। কিন্তু এখন এই ডাক শুনে মামনি খুশি হয়েছে।”

“আমার কিউট মামনিটা!”

তাদের কথা বলার মাঝেই আফসান তৈরি হয়ে আসে। সিমিও এসে তাড়া দিতে শুরু করে তাদের। সবাই মিলে গাড়িতে গিয়ে বসে। জোহা শশুর আর শাশুড়ি মা’কে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে ওঠে। একপাশে আফসান আর অন্যপাশে নিধি। পেছনে বাকি সবাই থাকলেও সামনে বসেছে রাফান। ইতোমধ্যে রাফান আর জোহার চোখাচোখি হয়েছে। তবে জোহার হাবভাব বেশ স্বাভাবিক। রাফানের যেন জোহার এই স্বাভাবিক চাহুনি মোটেই ভালো লাগে না। তবুও সে নিরবে বসে থাকে। আপাতত তার বলার বা করার মতো কিছুই নেই। তাই এখন চুপ করে থাকায় বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হচ্ছে তার।

চলবে??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here