মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং পর্ব ৬

0
997

#মিসআন্ডারস্ট্যাডিং
#লুৎফুন্নাহার_আজমীন(#কন্ঠ)
#পার্ট৬

(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ)

আগে শুভ্রের সাথে টুকটাক মেসেজে কথা হতো।ফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা করার দরুন মেঘ শুভ্রের কাছ থেকে প্রায়ই সাহায্য নিতো।কিন্তু এসএসসি দেওয়ার পর হুট করেই শুভ্রের সাথে মেঘের কথাবলার মাত্রাটা বেড়ে যায়।মেয়ে বড় হওয়ায় মেঘের বাবা মা ও মেঘকে যথেষ্ট প্রাইভেসি দেন। হঠাৎ করেই মেঘ বুঝতে পারে সেই তালগাছটা মেঘের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।আর সেই জায়গাটা খুবই স্পেশাল। শুভ্রও বুঝে নেয় সেও সেই ঝগড়ুটে পিচ্চিটাকে ভালোবেসে ফেলেছে।যদিও কেউ কাওকে কখনো ভালোবাসি কথাটা বলে নি।কিন্তু মেঘ শুভ্র দুইজনই বুঝতো তাদের জীবনের একে অপরের প্রয়োজনীয়তা।শুভ্রের সব বন্ধুরা জানতো মেঘকে শুভ্র কতটা ভালোবাসে। কিন্তু এশা আর শান্ত বাদে কেউ মেঘ আর শুভ্রের সম্পর্কের কথা জানতো না।মেঘের ফ্রেন্ড সার্কেল অত বড় ছিলো না।বেশিরভাগ মানুষই মেঘকে প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে।মিথ্যে বন্ধুত্বের অভিনয় করেছে মেঘের সাথে। সেই কারণে বন্ধু হিসাবে মানুষকে মানতে এই ব্যাপারটার ওপর থেকে মেঘের বিশ্বাস উঠে গিয়ে মেঘের। আবার শান্তর সাথে সব শেয়ার না করলেও মেঘ এশার সাথে সব শেয়ার করতো।শুভ্রের সাথে বলা প্রতিটা কথা মেঘ এশার সাথে শেয়ার করতো।সারাদিনের ক্লাস প্রাইভেটের ব্যস্ততায় শুভ্রের সাথে মেঘের দিনের বেলায় অতটা কথা বলা হয়ে উঠতো না।শুভ্রও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতো।সব ব্যস্ততাকে পেছনে রাত্রি বেলা শুভ্র মেঘ পাড় করতো সবচে স্মরণীয় মুহুর্ত গুলো।যদিও তাদের বেশির ভাগ রাত্রিই ঝগড়া করে কেটেছে।কিন্তু পরে দিনের শুরুতে ওরা আবার এক হয়ে যেত।বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুভ্রই সরি বলে মেঘের রাগ ভাঙাতো।এইসব কিছু যখন মেঘ এশাকে বলতো তখন সেগুলো শুনে এশা হাসতে হাসতে বলতো,,,

-তোরা যতই ঝগড়া করিস না কেন?দিন শেষে তোরা কেউ কাওকে ছাড়া থাকতে পারবি না।একে অপরের পূর্ণতা তোরা।

মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।এই মূহুর্তে এশার বলা কথাটা খুব কানে বাজছে।কে জানতো একদিন ঝগড়া করতে কর‍তে তারা চিরদিনের জন্য আলাদা হয়ে যাবে!বুশরা শুভ্রের সাথে মেঘের রিলেশনের কথা জানতো।ফেসবুকে এড ছিলো সে।প্রায় প্রতিদিনই নক দিতো সে মেঘকে।অন্য টপিক নিয়ে কথা শুরু হলেও শেষ হতো কথা শুভ্রকে নিয়ে।বিভিন্ন ভাবে আকারে ইঙ্গিতে সে মেঘকে বুঝিয়েছে সে শুভ্র একে অপরকে ভালোবাসে।মেঘ শুধু ওদের মাঝে একটা সামান্য দেয়াল মাত্র।বুশরার এমন বিহেভিয়ার গুলো মেঘকে খুব বাজে ভাবে আঘাত করছিলো।বারবার মনে হচ্ছিলো মানুষের গলার কাঁটা হয়ে সে নিজেও নিজের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাছাড়া রিলেশনশীপের শেষের দিকটায় শুভ্রও মেঘকে নানা ব্যস্ততা দেখাচ্ছিলো।যার কারণে মেঘ নিশ্চিত হয়ে যায় যে মেঘ শুভ্রের টাইম পাস ছাড়া কিছুনা।
বেশ অনেকটা দিনই কেটে গেছে।প্রায় দেড় মাস।তবুও শুভ্রের জন্য মেঘের অনুভূতি এক বিন্দুও কমেনি।হয়তো কোনো দিন কমবেও না।এই অনুভুতি, এই স্মৃতিগুলোই মেঘকে সারাজীবন কুড়ে কুড়ে খাবে।

দেড়টা মাসে শুভ্রও বেশ স্বাভাবিক হয়েছে।নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলেছে। যাতে মেঘের কথা মনে করার মতো সময়টুকু শুভ্র না পায়।মেঘ যদি শান্তকে নিয়ে ভালো থাকতে পারে তাহলে শুভ্র কেন পারবে না?কিন্তু দিন শেষে শুভ্র ঠিকই মেঘের শূন্যতা অনুভব করে।এখন আর কেউ আগের মতো মেসেজে বক বক করে না।শুভ্রকে কেউ রাগায় না।চুপচাপ শুভ্র মেঘকে হারানোর পর আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো।একাকিত্বে সিগারেটই তার সঙ্গী।


রেস্টুরেন্টে বসে শুভ্রের জন্য অপেক্ষা করছে বুশরা।আধঘন্টা হলো সে শুভ্রের জন্য এখানে বসে আছে। ইতিমধ্যে সে দু দু কাপ কফি শেষ করে ফেলেছে।কিন্তু শুভ্রের দেখা নেই।
অবশেষে বুশরার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুভ্র রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে।শার্টের হাতা ফোল্ডার কর‍তে কর‍তে সে বুশরার সামনে বসে।
শুভ্র আর বুশরা একে অপরের মুখোমুখি। আজ বুশরা শুভ্রকে নিজের মনের কথা বলতে যাচ্ছে।অবশেষে! মেঘকে সরিয়ে সে শুভ্রকে নিজের করে পেতে চলেছে।বুশরার দৃঢ় বিশ্বাস শুভ্রকে বুশরাকে ফিরিয়ে দেবে না।

-এই মোটু!বল কি বলবি?
-হ..হ..হ্যাঁ বলবো তো।তার আগে বল তুই কি খাবি?
-তুই ই খা!আমার অত খাওয়া আসে না তোর মতো।কি বলবি তাড়াতাড়ি বল।আমার কাজ আছে।

বুশরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।বুশরার এমন আচরণে শুভ্রর মেজাজ গরম হয়ে যায়।এম্নেতেই শুভ্র খুব রগচটা মানুষ।সময় নষ্ট করা শুভ্রর একটুও পছন্দ নয়!অনেকটা ধমকের সুরেই সে বুশরাকে বলে,,,

-কি হলো?কি বলবি বল!

বুশরা কেঁপে ওঠে।চোখ বন্ধ করে কাঁপা গলায় বলে,,,

-শুভ্র আমি তোকে ভালোবাসি।সেই ছোট বেলা থেকে।তুই মাঝখানে মেঘের সাথে রিলেশনে গিয়েছিলি তাই তোকে কিছু বলতে পারি নি।এখন তোর আমার বিয়ের বয়স হয়েছে।তাই ভাবলাম তোকে সব বলে দিই।

এক শ্বাসে কথা গুলো বলে দেয় বুশরা।শুভ্র উঠে দাঁড়ায়।শান্ত কন্ঠে বলে,,,

-হোয়াট ডু ইউ মিন?ইউ ওয়ান্ট টু মেরি মি?
-ইয়েস!
-ইম্পসিবল।আমি তোকে বিয়ে করতে পারবো না।
-কেন?আমি মোটা বলে?
-নাহ।অন্য একটা কারণ আছে।যার কারণে আমি শুধু তোকে কেন!কোনো মেয়ে কেই বিয়ে করতে পারবো না।

কথাটা বলে শুভ্র আর এক মূহুর্তও দাঁড়ায় না।চলে আসে সেখান থেকে।বুশরা সেখানেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে।দুটো বছরে কি শুভ্রের কোনো পরিবর্তন হয় নি?সে কি আজও মেঘকে ভালোবাসে?


-খালামুনি শান্ত ভাইয়া কই?
-দেখ গিয়ে ঘরে আছে।

মেঘের জবাবে বলেন মিসেস আরিফা।মেঘ শান্তর ঘরে যায়।গিয়ে দেখে শান্ত ঘরে নেই।বাথরুম থেকে পানির শব্দ আসছে।শান্ত হয়তো বাথরুমেই আছে।হঠাৎ করেই টেবিলে পড়ে থাকা ডায়েরিটার দিকে চোখ যায় মেঘের।নীল মলাটের ডায়েরী।ডায়েরীর মাঝখানের কলম রাখা।কিছু লেখছিলো হয়তো শান্ত!কৌতুহল নিয়ে মেঘ ডায়েরিটা খোলে।কিন্তু ডায়েরিতে যা লেখা তা দেখে মেঘ থতমত খেয়ে যায়।ডায়েরীটার পাতায় নীল কালিতে স্পষ্ট করে লেখা

“আজ ২২শে জুন।আমার অব্যক্ত ভালোবাসার আজকে ৮বছর পূর্ণ হলো।হ্যাঁ এই দিনেই আমি বুঝতে পারি যে মেঘকে আমি ভালোবাসি।কিন্তু আফসোস আমার এই ভালোবাসাটা কখনো পূর্ণতা পাবে না।মেঘ আমার অপূর্ণতাই রয়ে যাবে সারাজীবন”

বাথরুমে লক খোলার আওয়াজ পেয়ে মেঘ তাড়াহুড়ো করে ডায়েরীটা জায়গায় রেখে দেয়।শান্ত টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বের হয় বাথরুম থেকে।মেঘকে দেখে শান্ত অবাক হয়।এই সময়ে মেঘের তো এখানে আসার কথা নয়।চাঞ্চল্য কন্ঠে বলে,,

-তুই এখানে?
-ফুচকা খেতে মন চাচ্ছিলো।ভাবলাম তোকে নিয়ে যাই।
-একটু ওয়েট কর।রেডি হয়ে আসছি আমি।

মিনিট পাঁচেক পরে শান্ত রেডি হয়ে বের হয়।পাশেই একটা ফুচকার দোকান আছে।মেঘ শান্ত সেখানেই যায়। ফুচকা খাওয়ার এক পর্যায়ে শান্তকে মেঘ বলে,,,

-তুই আমায় ভালোবাসিস আমায় আগে বলিস নি কেন?

শান্ত মুখে ফুচকা তুলতে গিয়েও থেমে যায়।অবাক দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকায় সে।মেঘ আবার বলে,,,

-জবাব দে!
-না..মানে…

শান্ত থেমে যায়।মেঘ আবার বলে,,,

-তোতলাবি না।যা জিজ্ঞাস করেছি ক্লিয়ারলি তার উত্তর দিবি।
-তোর আর আমার মধ্যে একটা ফ্রেন্ডশিপ আছে না?আমার ফিলিংসের কথা বললে যদি তোর আমার মাঝে ফ্রেন্ডশীপটা নষ্ট হয়!তাই আর কি…
-খুব বোকামির কাজ করেছিস তুই।তুই যদি তোর ফিলিংসের কথা গুলো বলতি আমি কখনো শুভ্রের সাথে রিলেশনে যেতাম না।আসলে চান্সই পেতাম না।ফ্রেন্ডশীপ থেকে মানুষ রিলেশনে যায় না?কোথায় সে ডিরেক্টলি আমাকে তার ফিলিংসের কথা বলবে!তা না।সে দেওলিয়া হয়ে ডায়েরিতে লিখে রেখেছে।
-তুই ডায়েরিটা পড়েছিস?
-আজ্ঞে হ্যাঁ!না হলে জানলাম কিভাবে?
-তো এখন কি আমায় শুভ্রের জায়গাটা দেওয়া যায় না?

মেঘ চুপ হয়ে যায়।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,,,

-সত্যি বলতে শুভ্রের জায়গা কেউ কখনো নিতে পারবে না।বলেছিলাম না?ওর প্রতি আমার অনুভুতি গুলো কখনো শেষ হবে না?ওর জন্য আমার ফিলিং গুলা আজও কাজ করে।তুই যদি আগে বলতি তাহলে হয়তো তুই আমায় নিজের করে পেতে পারতি।কারণ তোর থেকে ভালো আমায় কেউ বুঝে না।যেহেতু তুই আমার ওয়ান & অনলি ছেলে বেস্টফ্রেন্ড।কিন্তু এখন সময় নেই।কিন্তু সত্যি বলতে তোর সাথে রিলেশনে যেতে পারলে, তোকে বিয়ে করতে পারলে আমি নিজেকে পৃথিবীর সবচে লাকি মেয়ে মনে করতাম।
-তো সারাজীবন এইরকম দেবদাস হয়েই থাকবি?
-দেখা যাক কপালে কি আছে!

কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলে মেঘ।ল্যাম্পপোস্টের আলোয় শান্ত মেঘের চোখে পানি স্পষ্ট দেখতে পারছে।শান্ত বলে,,,

-তুই কি শুভ্রকে এখনো পাওয়ার আশা করিস।
-জানি না।কিন্তু কেন যেন বারবার মন বলে আমাদের গল্প সেখানেই শেষ হয় নি।আরও বেশ অনেক ক্ষাণিই বাকি আছে আমাদের গল্প

চলবে,,ইনশাআল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here