বামনের ঘরে চাঁদ পর্ব ৬

0
642

বামনের ঘরে চাঁদ

সাজিয়ানা মুনির

৬.

( কার্টেসি ছাড়া কপি নিষেধ)

নিকষ কালো আঁধারে চারিদিক ছেয়ে। চাঁদ বিহীন শূন্য আকাশ। বাড়ির পেছনে খোলা জায়গাটায় চেয়ার পেতে বসে আছে আষাঢ়। হাতে জলন্ত সিগারেট, আকাশ পানে দৃষ্টি তার। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে। আরশি সন্ধ্যায় বাড়ি এসেছে। দুইদিন মায়ের কাছে থাকবে। আসার পর থেকে ভাইকে দেখেনি একবার। যমজ হওয়ায় ছোট থেকে আষাঢ়ের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তার। দুজন দুজনের পেটের খবর জানে। আষাঢ় কখন কোথায় থাকতে পারে চট করে আন্দাজ করতে পারে। বাড়ির পিছন দিকে চলে গেল আরশি। পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো। আরশি এসেছে আঁচ পেয়ে হাতের জলন্ত সিগারেটটা মাটিতে ফেলল আষাঢ়। বেশ স্বাভাবিক স্বরে বলল,
‘ এত রাতে তুই এখানে! কিছু বলবি?’
ভাইয়ের গম্ভীর বিষন্নতা ঘেরা আওয়াজে কিছু একটা আন্দাজ করতে পারলো আরশি। বনিতা বিহীন সোজাসাপটা প্রশ্ন ছুঁড়ল,
‘ কি হয়েছে আষাঢ়? এত চিন্তিত কেন! কোন সমস্যা। মায়ের সিরিয়াস কিছু হয়েছে কি?’
নাকচ কন্ঠে বলল আষাঢ়,
‘ না, তেমন কিছুনা। ডক্টর কিছু টেস্ট দিয়েছে।’
‘ তাহলে! সমস্যা কি চাঁদকে নিয়ে?’
আষাঢ় নীরব। চাপা নিশ্বাস ছাড়লো। আশাহত দৃষ্টিতে আকাশ পানে আবারও তাকালো। যা বুঝার আরশি বুঝে গেল। বুঝানোর স্বরে বলল,
‘ চাঁদ ভালো মেয়ে। মেয়েটাকে নিয়ে সমস্যা কি তোর? শুধুমাত্র তোকে হারানোর ভয়ে, নিজের সব বিলাসিতা ঐশ্বর্য ত্যাগ করে এসেছে। এইটুকু বয়সে সংসার গোছানোর জেদ ধরেছে। ওই মেয়েটাকে কেন দূরে ঠেলে দিচ্ছিস। কেন মেনে নিচ্ছিস না তাকে।’
আষাঢ়ের উদাসীন আওয়াজ,
‘ ওর মাঝে কোন সমস্যা নেই, পরিপূর্ণ আমার চাঁদ। সব সমস্যা আমার। না তাকে মানতে পারছি, না দূরে ঠেলে দিতে পারছি। আজকাল ওকে হারানোর ভয় জন্মেছে আমার। ওর চলে যাওয়ার কথা মাথায় আসতে বুক কাঁপে। কিন্তু…’
‘ কিন্তু কি আষাঢ়? অতীত নিয়ে ভয় পাচ্ছিস?’
আষাঢ়ের কুঁচকে থাকা কপালটা শিথিল হয়ে গেল। চোখেমুখে চাপা ভয়। খানিক সংশয়। বিড়বিড় করে বলল আষাঢ়,
‘ অতীতকে ভয় হয়না আমার। ভয় হয় চাঁদের দৃষ্টিতে সম্মান হারানোর। ওই শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে, ঘৃ/ণা দেখে কি করে সইবো? ‘
‘ ও কিছু জানেনা। কোনদিন জানবেও না।’
‘ সত্যি কখনো চাপা থাকে না।’
‘ যখন সত্যিটা সামনে আসবে, ও বুঝবে! এতে তোর কোন দোষ ছিল না।’
‘ যদি না বুঝে? ঘৃণা করে, চলে যায়।’
আরশি ঠোঁট হাসলো। বুঝানোর স্বরে বলল,
‘ তুই চাঁদকে ভালোবেসে ফেলেছিস আষাঢ়। তাই তোর মনে এত ভয়!’
উত্তেজিত হয়ে উঠলো আষাঢ়। বিচলিত সে। অন্ধকারের মাঝেও দৃষ্টি লুকাতে চাইছে। অধৈর্য কন্ঠে বলল সে,
‘ আমি তাকে ভালোবাসি না। একটুও চাইনা। চাইনা এই সংসারে বেঁধে রাখতে।’
‘ তাহলে মুক্ত করে দে। চাঁদের মুখের উপর এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বল।’
আষাঢ় চুপ। রাগী ফোঁসফোঁস শ্বাস ফেলছে। ভাইকে শান্ত করতে চাইল আরশি। হাতের উপর আশ্বস্ত হাত রেখে বলল,
‘ তুই পারবিনা আষাঢ়। চাঁদ তোর মনে গেঁথে গেছে। এই জীবনে মুছবে না আর। অতীত, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চোখ মেলে চারিপাশে দেখ। জীবন সুন্দর। সবাই এক নয়। ভালোবাসা চারিদিকে ছড়িয়ে। শুধু হাত বাড়ানোর অপেক্ষায়।’
বোনের কথার উত্তর দিলো না আষাঢ়। হনহন করে উঠে গেল সে।

মাস দেড়েক পর চাঁদের রেজাল্ট এলো। আশানুরূপ না হলেও, খুব একটা খারাপ হয়নি। ৪.৯৭ এ গ্রেড এসেছে। চাঁদের প্রচন্ডরকম মন খারাপ। কোথাও একটা আফসোস, এ প্লাস না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েই গেল। কাঙ্ক্ষিত জিনিসের খুব কাছাকাছি যেয়ে তা না পাওয়ার আফসোস ভীষণ তীব্র হয়। সবাই বোঝাচ্ছে কারো কথা কানে তুলছে না। নাখোশ মেজাজে সে। মনে আরো বেশি জেদ চড়াও হলো। পড়াশোনা প্রতি মনোযোগ বাড়ল। আপাতত তার টার্গেট কোন পাবলিক ভার্সিটিতে সুযোগ পাওয়া। যার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে, সবরকম চেষ্টা করবে। কয়েক সাপ্তাহ কা/টল। আশেপাশে ভালো কোচিং সেন্টারের খোঁজ নিলো আষাঢ়। বাড়ির কাছাকাছি সন্ধান পেয়েও গেল। কিন্তু বি/পত্তি ঘটলো সেই এলাকার ব/খাটে ছেলেপুলেদের নিয়ে। প্রায়শই কোচিং সেন্টারের পাশের গলিতে জায়ঝা/মেলা লেগে থাকে। চাঁদকে একা ছাড়তে আস্বস্ত হতে পারছেনা কেউ। ব্যাপারটা বুঝল চাঁদ। অন্যান্য কোচিং সেন্টারে কোর্স ফি, অন্যসব খরচের দিক থেকে তুলনামূলক এটা ভালো ও কম। তাই চাঁদ আস্বস্ত করল সবাইকে। একপ্রকার জেদ ধরে ভর্তি হলো সেখানে। মালা বেগম শর্ত জুড়ে দিলো। তিনি বা আষাঢ় যেকোন একজন প্রতিদিন সাথে নিয়ে যাবে, নিয়ে আসবে চাঁদকে। নাকচ করল না চাঁদ।

রবিবার। চারিদিকে প্রচন্ডরকম গরমের উত্তাপ। বাড়ির উঠানে মালা বেগম বসে। বিদুৎ নেই লোডশেডিং হয়েছে। হাতপাখা চালিয়ে বাতাস করছে। ইদানীং লোডশেডিং-এর উৎপাত বেড়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় বিদুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে। লোহার দরজা ঠেলে বাড়িতে ঢুকল আষাঢ়। এসময় ছেলেকে বাড়িতে দেখে খানিক অবাক হলো মালা বেগম। দুপুরে সচরাচর বাড়িতে আসেনা আষাঢ়। লোক পাঠিয়ে খাবার নিয়ে যায় কারখানায়। খুব মাঝেসাঝে দুপুরে বাড়িতে খেতে আসে। বাহিরের ট্যাপ কল ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে নিলো। খাবার টেবিলে বসতে মালা বেগম ঘরে এসে। খাবার ভেড়ে দিলো।

আষাঢ় চারিদিকে চোখ বুলালো। চাঁদকে দেখছে না কোথাও। আষাঢ়ের ঘরের জানালা দিয়ে গেটের রাস্তাটা স্পষ্ট। বাড়িতে কেউ আসলে সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। আষাঢ় বাড়ি আসবে এই ভেবে, দুপুরের সময়টা চাঁদ সেই জানালার পাশে বসে থাকে। আষাঢ় যখন আসে, তার জন্য ঠান্ডা পানির লেবুর শরবত আর হাতপা মোছার গামছা নিয়ে ছুটে আসে। আজ চাঁদকে আশেপাশে না পেয়ে খানিক খটকা লাগলো। ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো। তবে কি মেয়েটি এখনো বাড়ি ফিরেনি! ঘড়ির দিকে তাকালো, ক্লাস শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। তাহলে চাঁদ কোথায় এখন। চোখেমুখে চিন্তার রেশ। সবকিছু গুছিয়ে ছেলের পাশে এসে বসলো মালা বেগল। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগল। আড়চোখে মায়ের মুখপানে তাকালো আষাঢ়। কেমন যেন গম্ভীর, চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। মুখে ভাতের লোকমা তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল আষাঢ়,
‘ কিছু হয়েছে মা? তোমাকে এমন চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?’
মালা বেগম বলল,
‘ বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছে আজ।’
কপাল কুঁচকে মায়ের মুখপানে তাকালো আষাঢ়। একটু চুপ থেকে মালা বেগম বলতে শুরু করল,
‘ আজ হ্ঠাৎ কিছু কাজ পড়ে যাওয়ায় বাড়িতে দেরিতে ফিরেছি। এসে দেখি বাহিরের দরজা খোলা। উঠান থেকে চাঁদের চেঁচামেচি শুনে তড়িঘড়ি পায়ে ঘরে আসতে চোখে পড়ে, পাশের এলাকার চেয়ারম্যানের ছেলে নেহাল চাঁদের হাত চেপে টানাটানি করছে। ভয়ে জড়সড় চাঁদ ছাড়াবার চেষ্টা করছে ছেলেটা ছাড়ছে না। নেশার ঘোরে টলোমলো করছে নেহাল। উল্টো সাথে নিয়ে যেতে চাইছে চাঁদকে। আমি কোনরকম টেনে ছিঁড়তে মেয়েটিকে ছাড়িয়েছি। ঠেলে বাড়ি থেকে বের করেছি। নেহাল যাওয়ার পর চাঁদ থেকে যা শুনলাম, অনেকদিন যাবৎ ছেলেটা বিরক্ত করছে চাঁদকে। পথেঘাটে যেখানে পাচ্ছে আটকাচ্ছে। ওর উপর নজর রাখছে। বাড়িতে কেউ নেই আজ। তাই সুযোগ বুঝে ঘরে এসে উঠেছে। আমি অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু মেয়েটা অনবরত কেঁদেই চলছে। হয়তো ভীষণ লজ্জা আর ভয় পেয়েছে।’
হাত মুঠিবদ্ধ করে রাগ চেপে বসে আছে আষাঢ়। মায়ের কথা শেষ হতে খাবার প্লেট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। হাত ধুয়ে ক্ষি/প্ত পায়ে ঘরের দিক পা বাড়ালো।

অনুজ্জ্বল ঘরটায় জানালা ভিড়িয়ে খাটে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে চাঁদ। চোখজোড়া বন্ধ তার। দরজা চাপিয়ে ঘরে এলো আষাঢ়। চাঁদের সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসলো সে। ব্যথাতুর দৃষ্টি মেলে নিমিষ চাহনিতে চেয়ে রইল চাঁদে। নিমজ্জিত মুখশ্রী মেয়েটার। চোখমুখে মলিনতা ছড়িয়ে তার। অশ্রুসিক্ত চোখের কোন। হাত জোড়ায় র/ক্তিম খা/মচির দাগ। ছ্যাঁ/ত করে উঠল বুকটা।মুহূর্তেই রা/গ চাপলো ঘাড়ে। চাঁদের হাত জোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। আলতো হাতে ছুঁয়ে। গহ্বর দৃষ্টিতে চোখ বুলাতে লাগলো হাতের ক্ষ/ততে। আচমকা কারো স্পর্শে ছিঁটকে উঠল চাঁদ। চোখ মেলে তাকালো। আষাঢ়কে সামনে দেখে ভেতর ভেঙেচুরে কান্না আসলো। নিজেকে শক্ত করতে, কান্না আটকানোর অনেক চেষ্টা করল। পারলো না। সব বাঁধা ভেঙে চোখের বাঁধ মাড়িয়ে অশ্রু বেরিয়ে এলো। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল চাঁদ। ভীতু মুখশ্রীতে লজ্জা, ভয়, আত্মসম্মানে আঘা/ত আনার দা/গ। আচমকা বিছানায় উঠে আলতো হাতে বুকে জড়িয়ে নিলো আষাঢ়। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে চেষ্টা করল চাঁদকে। চাঁদ যেন প্রশান্তির জায়গা পেল। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। অনেকক্ষণ এভাবে কাট/লো। আস্তে আস্তে চাঁদ শান্ত হলো। ঔষধের বাক্স থেকে এন্টিসেপটিক ক্রিম এনে চাঁদের হাতে লাগিয়ে দিচ্ছে। খানিক জ্ব/ললেও দাঁড় চেপে সহে নিচ্ছে সে। আষাঢ়ের নিগূঢ়, মনযোগি দৃষ্টি হাতে। ভীষণ স্বাভাবিক গম্ভীর কন্ঠে বলল সে,
‘ নেহাল তোমার সম্মানে দা/গ আনেনি চাঁদ। নিজের কপালে দুর্গ/তি টেনেছে। আমার বাড়িতে এসে আমার বউয়ের শরীরে হাত দেওয়ার কৈফিয়ত হাড়েহাড়ে দিতে হবে ওকে।’
আষাঢ়ের স্বাভাবিক কথায় অস্বাভাবিক ক্রোধের ঝাঁ/জ ছিল।সাধারণ মানুষ ঠিক ততক্ষণ শান্ত ,যতক্ষণ তার পরিবার সুর/ক্ষিত থাকে। যখন পরিবারের উপর আঁ/চ আসে, সাধারণ মানুষ ঠিক কতটা হিং/স্র হতে পারে তা প্রকৃতিও জানে। ফ্যালফ্যাল চেয়ে আছে চাঁদ। চোখ বেয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়ালো। এত যন্ত্র/ণার ভেতরও খানিক স্বস্তির মিলল তার। নিমিষ, আনমনা হয়ে ভাবলো, ‘ অবশেষে আষাঢ় তাকে বউ স্বীকার করল।’

সেদিন রাতে দেরিতে বাড়ি ফিরল আষাঢ়। শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার তার। পরেরদিন সকালে একটা উড়ো খবর এলো হ্ঠাৎ। চেয়ারম্যানের ছেলে নেহালকে ট্যানারিতে মা/তাল অবস্থায় রাতের অন্ধকারে কেউ বে/দম পিটি/য়েছে। মে/রে হাত পা ফা/টিয়ে দিয়েছে। কম হলেও দেড়-দুইমাস পঙ্গু হাসপাতালে পা,হাত প্লাস্টার করে ঝু/লিয়ে রাখতে হবে। কে করেছে জানা যায়নি। তবে রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্ত্য/ক্ত, বিরক্ত করার জন্য মে/রেছে।

চলবে…….

( ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। অনেক দিন পর গল্প দিচ্ছি পেজের রিচ কম। গল্প পৌঁছালে রেসপন্স করবেন)

টাইপোগ্রাফি করেছে Maksuda Ratna আপু❤️🌺

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here