প্রস্থান — ৪৪তম পর্ব/শেষ পর্ব।

0
2496

প্রস্থান — ৪৪তম পর্ব/শেষ পর্ব।

রিফাত হোসেন।

৬২.
প্রিয় চিত্রা,
আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার মতো একজন বন্ধুকে পাশে পেয়েও আমি আজ, এই মুহূর্তে জীবনের কাছে পরাজয় স্বীকার করলাম। আজ বেঁচে থাকার কোনো কারণ নেই আমার কাছে। সত্যিই নেই। বরং অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছি সারাক্ষণ। আমার মন, আমার শরীর, সবকিছুই আজ বড্ড ক্লান্ত। আর পারছি না আমি।
প্রথমে মনে হতো, মা সেদিন ইন্তেকাল করেছেন অসুস্থতার জন্য। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমার মা আরও অনেক আগেই ইন্তেকাল করেছেন। শুধু ওই দুঃসংবাদটি আমার অজানা ছিল। সেই দুঃসংবাদটি আমি পেলাম অবশেষে। দেহ ব্যতীত মা’র সম্পূর্ণ মৃত্যু হয়েছিল সেদিনই, যেদিন শুধুমাত্র আমার কথা ভেবে নিজের আত্মমর্যাদা, নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়েছিলেন। আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে দিনের পর দিন অসহ্যকর যন্ত্রণায় ভুগেছেন! তীব্র ব্যথায় একটা-টু শব্দোচ্চারণ করেননি। আমার মায়ের হত্যাকারীর একজনের শাস্তি হলেও দ্বিতীয়জন তো এখনো বেঁচে আছে। সেই দ্বিতীয়জন আমি। তিলে তিলে শেষ করেছিলাম মা-কে। নিংড়ে খেয়েছিলাম মায়ের মন, ভালোলাগা আর তাঁর ভেতরকার অনুভূতি! অথচ চিরকালই নির্লিপ্ত ছিলেন উনি। আজ ওই লোকটার মৃত্যু হয়েছে। শুধু বেঁচে আছি আমি। আমার আর বাঁচার ইচ্ছে নেই। শুধুমাত্র ‘ইচ্ছে’ না, বাঁচার অধিকারই নেই আমার। সেজন্যই আমার সুবিশাল পাপের বোঝা আরও ভারী করে দিয়ে আমি চলে যাচ্ছি।
আর কখনো দেখা হবে না আমাদের। তাই এই চিঠিতেই বলে যাচ্ছি সুব্রত ভাইয়ের কথা। মায়ের মৃত্যুর পর যখন উনি আমার হাত ধরলেন, তখন আমি সত্যিই চাচ্ছিলাম, উনি আমাকে একটু ভালোবাসুক। অন্তত মায়ের অভাবটুকু পূর্ণ করুক। কিন্তু যখনই আমি উনার চোখের দিকে তাকাই, আমার মনে হয় আমাকে নিয়ে উনার মধ্যে কোনো ভাবনা নেই। প্রয়োজন বলেই উনি শুধুমাত্র কর্তব্য পালন করতে চেয়েছেন। সেখানে করুণা ব্যতীত অন্য কিছুর ছাপ নেই। আমার হয়ে সুব্রত ভাইকে ধন্যবাদ জানিও তুমি। উনি যেটুকু করেছেন, তাতে আমি সত্যিই উনার কাছে কৃতজ্ঞ।
ভালো থেকো তোমরা। আমার এই প্রস্থান শুধুমাত্র মায়ের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ।

ইতি,
রশ্মি।

এতটুকুই লেখা আছে চিঠির একটা পাতায়। উল্টো পাতাটা ফাঁকা।
চিঠি থেকে দৃষ্টিতে সরিয়ে মাথার উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে তাকাল সুব্রত। কী নির্লিপ্ততা চারিদিকে। শুধু বুকের ভিতরে মৃদু যন্ত্রণা। ক্ষীণ ধুকপুকানি। শোনার কেউ নেই। ফ্যানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতে থাকে সে, “এই জীবনে আমার আর কতদিন আছে? আমিও যে বড্ড ক্লান্ত, আজ। এই দুপুর, এই নির্লিপ্ত পরিবেশ; এইসবের মধ্যে আমিও যে একটু নীরব হতে চাই!”
দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো হঠাৎ। সুব্রত দরজার দিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে জানতে চাইল, “কে?”
“ভাইয়া, আমি।” প্রশ্নের সাথে সাথে দরজার বাইরে থেকে জবাব এলো। আরও বলল, “আমি কনা। ভেতরে আসবো?”
“এসো।” বিস্মিত ভঙ্গিমায় অনুমতি দিলো সুব্রত। অনেকদিন পর কনার মুখে ‘ভাইয়া’ ডাক শুনলো সে। রশ্মির আত্মঘাতী আর তাঁর প্রচেষ্টার রাত্রির পর থেকেই সে খেয়াল করেছে, এই পরিবাবের সবাই-ই তাঁর প্রতি বড্ড আন্তরিকতা দেখাচ্ছে। সবাই-ই বিনয়ী আচরণ করছে। কারণটা সে বুঝতে পারছে না। তাই ব্যাপারটা তাকে খুবই চমকপ্রদ করল!
কনা ঘরে এসে দেখল, সুব্রত ভাই বিছানায় আধশোয়া ভাবে বসে আছে। পা দুটো মেলে দিয়েছে উত্তরে। সে ক্ষণকাল বিমর্ষচিত্তে দাঁড়িয়ে থাকার পর বলল, “থানা থেকে রশ্মির লাশ নিয়ে এসেছে। জানাযার সময় হয়েছে। সবাই ডাকছে তোমাকে।”
“সবাই? সবাই কে কে?”
“না মানে; ভাবী খুব কান্নাকাটি করছে। রশ্মির কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই। মা বলল তোমাকে খুব জলদি ডাকতে। নামাজ এক্ষুণি শুরু হবে। দু’দিন হয়ে গেল। এরপর থানায় নিয়ে কাঁটাছেড়া হলো। আর দেরি করা যাবে না।”
সুব্রত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “তুমি যাও, আমি আসছি।”
হঠাৎ কনার নজর পড়ল সুব্রতর হাতের কাগজটার উপর। সে কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, “ওটা কীসের কাগজ?”
সুব্রত ভুরু কুঁচকে কনার দিকে তাকালো একবার। আবার মাথা নুইয়ে কাগজটার দিকে তাকাল। বিষণ্ণ গলায় জবাব দিলো, “চিঠি। রশ্মি লিখেছিল।”
কনা ভড়কে গিয়ে বলল, “পুলিশ যখন সুইসাইড নোটের অনুসন্ধান করছিল, তখন এটা কোথায় ছিল? তোমার কাছে?”
“হ্যাঁ।”
“ওদের হাতে দাওনি কেন?”
সুব্রত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “জানি না। ইচ্ছে করছিল না ওদের হাতে দিতে। রশ্মিকে নিয়ে গেল। কিছু অন্তত আমাদের কাছে থাক।” এরপর সুব্রত বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। চিঠিটা ড্রয়ারে রাখতে রাখতে বলল, “তাছাড়া কেন জানি মনে হচ্ছিল, এই চিঠি পড়ার অধিকার ওদের কারোর নেই।”
“চিত্রা ভাবী জানে এই চিঠির কথা?” কনা বিমর্ষ মুখে জানতে চাইল।
‘না’ সূচক মাথা ঝাঁকাল সুব্রত। কেউ জানে না। ঘর থেকে বেরোনোর আগে সে বলল, “তুমিও কাউকে জানিও না।”

রশ্মির জানাযা হলো ওদের বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায়। আর কবর দেওয়া হলো রুমানা বেগমের কবরের ঠিক পাশে। মা আর মেয়ে পাশাপাশি শুয়ে আছে। দৃশ্যটা সবাই দেখে। সময় বয়ে যায়। আস্তে আস্তে কবরস্থানটা জনশূন্য হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে আশেপাশের বাড়ি থেকে কেউ কেউ জানালা দিয়ে তাকায় নতুন কবরে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। যে জানে না, তাকে জানায়। বলে, “দ্যাখ দ্যাখ, ওই যে ওটা, ওটা রশ্মির কবর। কিছুদিন আগে ওর মা মরল। এরপর দু’দিন আগে হঠাৎ করেই ও গলায় দড়ি দিলো। মায়ের মৃত্যুর শোকটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বোধহয়। পরিবারে আর কেউ নেই কী-না। সান্ত্বনা দিবে কে? বেচারি! কতই বা বয়স হবে!”

৬৩.
রশ্মির মৃত্যুর তিনদিন পর আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল!
সেদিন সকালে সুব্রতকে চা দেওয়ার জন্য তাঁর ঘরে গেল চিত্রা। ‘সুব্রত ভাই’ বলে ডেকে দরজাটা ধাক্কা দিতেই ওটা সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল। খানিক অবাক হলো সে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল, সুব্রত ভাই নেই। বাথরুমের দরজাটাও বাইরে দেখে লাগানো দেখল। ‘স্টাডি রুম’ তালা দেওয়া বাইরে থেকে। বারান্দাটাও শূন্য। যখন চিন্তিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা কাগজের একাংশ উড়তে দেখে থমকে গেল। এগিয়ে গিয়ে চায়ের কাপটা পাশে রেখে সে কাগজটা হাতে তুলে নিলো সঙ্গে সঙ্গে। ভুরু কুঁচকে তাকালো লেখাগুলোর দিকে।

চিত্রা, আমি জানি সকালবেলা সবার আগে তুমি আমার খোঁজে ঘরে আসবে। সেজন্য তোমার উদ্দেশ্যেই চিঠিটা লিখে যাচ্ছি। ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। দুটো স্যুটকেসে কিছু জামা-কাপড় আর বেশ কিছু বইপত্র গুছিয়ে নিয়েছি আমি। একটু পরই বেরোবো সুন্দর জীবনের খোঁজে। আমি জানি আমার চলে যাওয়াতে সবচেয়ে বেশি তুমিই কষ্ট পাবে। কিন্তু আফসোসের কথা এটাই যে, এই মুহূর্তে আমি শুধু নিজের কথাই ভাবছি। যতদিন বেঁচে থাকবো, একটু শান্তিপূর্ণ ভাবে থাকতে চাই। কিন্তু এই বাড়িতে তা কখনোই সম্ভব হবে না। ‘স্টাডি রুমে’ বসলে রুশার মুখটা চোখের সামমে ভেসে উঠে। আমার কষ্ট হয়। সেদিন যদি আমি মাথা গরম না করে ওকে একটু সাপোর্ট দিতাম, তাহলে ও কখনোই আত্মহত্যা করতো না। মানুষ সান্ত্বনা পেতে পছন্দ করে। যখন আমি বারান্দায় দাঁড়াই, তখন আমার রশ্মির কথা মনে পড়ে যায়। খুব অপরাধবোধ হয় আমার। বেশিকিছু তো চায়নি মেয়েটা! আমি স্বার্থপরের মতো নিজের কথাই ভেবে গেছে।
যখন খালেদ সাহেবের দিকে তাকাই, তখন আমার আবার লোকটার প্রতি ঘৃণা হয়। আমি নিজেকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার মন উনাকে গ্রহণ করতে পারে না কিছুতেই।
তোমার দিকে তাকালে মনে হয়, আমি তোমার সাথে বড্ড অমানবিক আচরণ করছি! আসলে তোমাদের এত এত চাওয়া আমার পক্ষে কখনোই পূরণ করা সম্ভব হয়নি। হবেও না হয়তো। তোমরা সবাই চাও, আমি যেন নিজের অতীত ভুলে যাই। আবার বিয়ে করি, কাউকে ভালোবাসি। অথচ আমারও চাওয়া থাকতে পারে। আমি কী চাই, সেটা তোমরা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু রশ্মির অকাল মৃত্যু আমার চোখ খুলে দিয়েছে। সত্যি এবার নিজের জীবনটা নিয়ে ভাবতে হবে আমাকে। কিন্তু এখানে থেকে সম্ভব হবে না। সেজন্যই আমি চলে যাচ্ছি, বহু দূর! আর হ্যাঁ, খালেদ সাহেবকে বোলো, আমি উনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এই বাড়ি থেকে বেরোনোর সাথে সাথে উনার প্রতি আমার সমস্ত রাগ ক্ষীণ হয়ে যাবে।
সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকো। পরিবারের সাথে সুখী হও। জীবনে কখনো কোনো বিপর্যয় নেমে আসলে ধৈর্যহারা হবে না। মনে রাখবে, কোথাও না কোথাও থেকে তোমার জন্য একজন ‘সুব্রত ভাই’ দোয়া করছে। সব ঠিক হয়ে যাবে এরপর।

ইতি,
সুব্রত।

চিঠি পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল চিত্রা। সে দৌড়ে গেল ফিরোজের কাছে। ওকে দেখাল চিঠিটা। এরপর বাড়ির সবাই-ই জেনে গেল, ভোররাতে সুব্রত বাড়ি ছেড়েছে। সংবাদটা শুনে সবার মুখ মেঘলা আকাশের মতো হয়ে গেল। সেদিন রাতে যখন সুব্রতর জ্বর হলো, তখনই ফিরোজ; রুশার আর সুব্রতর ব্যাপারটা জানিয়েছিল বাড়ির অন্যান্য সদস্যদেরকে। যার কারণে সুব্রতর প্রতি তাঁদের আন্তরিকতা তৈরি হয়েছিল। সবাই ঠিক করেছিল, সুব্রতর কাছে ক্ষমা চাইবে। মাঝখানে রশ্মির মৃত্যু সব এলোমেলো করে দিলো। আর আজ সুব্রতর বাড়ি ত্যাগ। ঘটনার আকস্মিকতায় ভেঙে পড়ল সবাই। হয়তো পরিস্থিতির সাথে সাথে একদিন সবাই-ই নিজেকে মানিয়ে নিবে। কিন্তু মন খারাপের দিনগুলোতে আচমকাই সুব্রতর মুখটা ভেসে উঠবে চোখের সামনে। চোখ বুজে, বিষণ্ণ হৃদয়ে অনুভব করবে মানুষটিকে।

৬৪.
রাঙামাটির কোনো এক স্থানে, প্রকৃতির আড়ালে একটা দু’কামরার আধাপাকা বাড়ি। সামনে বড় উঠোন। এরপর বেশ কিছুটা জায়গা ফাঁকা। বাঁশের বেড়ায় ভেতরের জায়গাটুকুতে ঘন সবুজ ঘাস। আশেপাশে আরও কয়েকটা বাড়ি আছে। জঙ্গলও আছে কিছুটা। তবে গভীরতা কম। জানালার পাশে বসলে দূরে পর্যটকদের দেখা যায়। এইসবের মধ্যেই বসবাস করছে সুব্রত। উনুন ব্যবহারে অনভিজ্ঞ সুব্রত, তাই সে গ্যাস আনিয়ে নিয়েছে। প্রয়োজনীয় যা যা দরকার, সেসবই আনিয়েছে বাড়িতে। মোটকথা, রক্তিমের এই বাড়িটাতে ছোটখাটো একটা সংসার স্থাপন করেছে সে। প্রায় ৬ বছর পর আসা হলো এখানে। অনেক পরিবর্তন হয়েছে জায়গাটা। তবে সবকিছু থাকলেও কেন যেন ভীষণ একাকীত্ব বোধ করছিল সুব্রত! মন টিকছিল না তাঁর। একইভাবে মাস কেটে যায় বিতৃষ্ণায়। অস্থির হয়ে উঠে তাঁর মন। কখনো বই পড়ে, কখনো ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে মেখে, সবুজ ঘাসের উপর পা রেখে হাঁটে। এমনই এক বিষণ্ণতার গভীর রাতে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। এরপর হঠাৎ দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হতে থাকল৷ সে ঘাবড়ে যায়। টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। ঝড়ো হাওয়া। এর মধ্যে বাড়তেই থাকে ছিটকিনির আওয়াজটা। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল সে। দরজার কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে বলল, “কে?”
সুব্রতর কথা শেষ হতেই বাইরে থেকে ঠকঠক আওয়াজ থেমে যায়। একটা মেয়েলি কণ্ঠে ভেসে আসে, “আপনার প্রতিবেশী। দরজাটা খুলুন।”
সুব্রত চমকে ওঠে দরজাটা খুলে দিলো সাথে সাথে। ঘর থেকে বেরিয়ে অকস্মাৎ বলে উঠল, “একি রশ্মি, তুমি এই বৃষ্টির রাতে এখানে কী করছ?”
“কাকে কী বলছেন আপনি?” সুব্রতর কথা শুনে মেয়েটা হতবাক হয়ে বল উঠল!
সুব্রত ভড়কে গেল এবার! আশ্চর্য! একটু আগেই সে রশ্মিকে দেখল। অথচ এখন দেখছে সামনের মেয়েটা অন্য কেউ। মেয়েটার পিছনে একজন বয়স্ক লোককেও ছাতা হাতে দেখল সে। হাতে টর্চলাইট। বোধহয় ওর বাবা। সে অবাক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল দুজনকে। কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এই মাঝরাতে এরা কেন এসেছে তাঁর কাছে!
“কী হলো? কী দেখছেন?”
মেয়েটার কথাতে সম্বিত ফিরল সুব্রতর। কিন্তু সে রাগান্বিত গলায় বলল, “আপনারা কে? এতরাতে আমাকে ডাকছেন কেন?”
সুব্রতর কথা শুনে মেয়েটা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ডাকাতি করতে আসিনি আপনার বাড়ি।”
সুব্রতও জবাব দিলো সাথে সাথে; রাগী গলায়, “এতরাতে নিশ্চয়ই চা খেতে আসেননি? বলুন কেন এসেছেন।”
সুব্রত কথা শুনে মেয়েটা মুখ ‘হা’ করে পিছনে তাকালো একবার। বৃদ্ধ লোকটা এগিয়ে এলো সঙ্গে সঙ্গে। মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দুর্বল কণ্ঠে সুব্রতকে বলল, “আসলে বাবা, তোমার গাড়িটা সরাতে হবে। জায়গাটা বড্ড নিচু। বৃষ্টির পানি ভরাট হলে গাড়ি তোলা মুশকিল হয়ে যাবে।”
সুব্রত তাজ্জব বনে গেল বৃদ্ধ লোকটার কথা শুনে! লজ্জাও পেলো বেশ। তাঁর উপকার করতেই এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে এসেছিল উনারা, অথচ কেমন দুর্ব্যবহার করা হলো! অনুতপ্ত হয়ে সে বলল, “মাফ করবেন, আঙ্কেল। আমি বুঝতে পারিনি।”
“অসুবিধা নেই, বাবা। তাড়াতাড়ি গাড়িটা সরাও।”
সুব্রত ঘর থেকে চাবি নিলো। একটা ছাতা হাতে গাড়িটার কাছে গেল। চাকাগুলো ইতোমধ্যে ডুবে গেছে। এরপর গাড়িতে ওঠে, খুব সাবধানে ওটাকে আরও কাছে, উঁচু স্থানে নিয়ে এলো। গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে এসে আবার বারান্দায় দাঁড়াল।
বৃদ্ধ লোকটি বললেন, “এখানে গাড়িটা রাখা নিরাপদ না। খুব ঝড় হয় এই মৌসুমে। পাশেই একটা গ্যারাজ আছে। পর্যটকেরা তিন-চার দিনের জন্য বেড়াতে আসলে ওখানে গাড়ি রাখে। তুমি বরং রাতেরবেলা ওখানেই গাড়ি রেখো। আমার মেয়ে ওই গ্যারাজের মালিকের মেয়েকে পড়ায়। ও বললেই কাজটা সহজ হয়ে যাবে।”
সুব্রত তাকালো মেয়েটার দিকে, হাসিমুখে। কিন্তু মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ কটমট করে বলল, “আমি কেন বলতে যাব? কী ঠেকা আমার?”
“আহা! বললে কী ক্ষতি হবে?” বৃদ্ধ লোকটি মেয়ের উদ্দেশ্যে নরম বলে উঠলেন।
মেয়েটা তখন সুব্রতর দিকে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল, “বলতে পারি। তবে ফ্রিতে না। একটা শর্ত আছে। কিছুক্ষণ আগের দুর্ব্যবহারের জন্য ‘সরি’ বলতে হবে।”
সুব্রত বিস্মিত হয়ে বলল, “তখন সরি বললাম তো!”
“ওটা তো বাবাকে বলেছেন। আমাকে রাগ দেখিয়েছেন। আমাকে বলুন। বলুন, ‘তামান্না, আই অ্যাম সরি।’ আর হ্যাঁ, আমার নাম তামান্না।”
সুব্রত এবার সশব্দে হেসে উঠল মেয়েটার কথা শুনে। ওর মতোই সুর টেনে বলল, “তামান্না, আই অ্যাম সরি।”
“গুড। ভেরি গুড!” হাস্যজ্বল ভঙ্গিতে বলল তামান্না। যাওয়ার আগে বলল, “ঠিক আছে। আপনার হয়ে রেকমেন্ড করব আমি। প্রতিবেশী বলে কথা!”
সুব্রত কৃতজ্ঞতা ভঙ্গিতে মাথাটা সামান্য ঝাঁকাল। আর কিছু বলল না ওরা। বাবা-মেয়ে এক ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে, বারান্দা থেকে নেমে দাঁড়াল। হাঁটতে থাকল এরপর। সুব্রত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল ওদের দিকে! মেয়েটার পরণে থ্রি-পিস। বয়স ৩০ এর কাছাকাছি হবে হয়তো। শ্যামলা, তবে প্রাণবন্ত। হাসলে অপূর্ব দেখায়!
বারান্দায় স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সুব্রত, হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ায় তাঁর মাথার উপরের চালের একটা টিন উড়ে গেল। হতচকিত হয়ে উপরের দিকে তাকাল সে। বৃষ্টির পানিতে ভিজতে লাগল তাঁর পুরো শরীর। হঠাৎই দূর থেকে ভেসে এলো হাসির আওয়াজ। সে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল, পাশের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে, তামান্না। কিছু বুঝতে না পেরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বারান্দার চালটা কোথায় গেল, তা দেখার জন্য নিচে নামতে যাচ্ছিল সুব্রত, তামান্না চেঁচিয়ে সাবধান করল তাকে; বলল, “এখন আর ওটা খুঁজতে যাবেন না। অন্ধকারে খুঁজতে গিয়ে নিজেই বিপদে পড়বেন। এখানে এইরকম হয়েই থাকে। সকালে ঠিক করে নিবেন। এখন ভেতরে চলে যান।”
মেয়েটার কথানুযায়ী ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল সুব্রত। দেয়ালগুলো পাকা, তাই রক্ষে! তবে ভয়টা হলো, ঘরের চাল নিয়ে। ওটা উড়ে গেলে আজ রাতে ঘুম হারাম হয়ে যাবে।

সে রাতে আর কিছু হলো না। সকালে ঘর থেকে বেরোলো সুব্রত। আকাশ পরিষ্কার। চারিদিকে ঝকঝকে আলো। সহসা পাশের বাড়িটার দিকে তাকাল সে। এতদিন ধরে এখানে আছে, অথচ তাঁর মনেই হয়নি আশেপাশে যারা বসবাস করে, তাঁরাও, তাঁরই মতো একেকজন মানুষ! আসলে অনেককেই চলেফেরা করতে দেখেছে সে, কিন্তু কথা বলা হয়নি। কাল রাতে অমন বৃষ্টি না হলে হয়তো ওই মানুষগুলোর সাথেও পরিচয় হতো না।
সূর্যটা উপরে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ওই বাড়ি থেকে তামান্না বেরিয়ে এলো। সুব্রতর কাছে এসে সকৌতুকে বলল, ” টিনটা খুঁজে পেলেন?”
সুব্রত বোকার মতো করে বলল, “কোনদিকে গেছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”
তামান্না আরও শব্দ করে হেসে উঠল সুব্রতর কথা শুনে। হাসতে হাসতে বলল, “ওটার আশা বরং ছেড়ে দিন। বাজার থেকে টিন কিনে আনুন। এরপর লাগিয়ে নিন।”
“আমি লাগাবো? মিস্ত্রি নেই?”
“এইটুকু কাজের জন্য এক্সট্রা টাকা খরচ করবেন?” মুখ টিপে হাসি থামাল তামান্না। আবার বলল, “আপনি টিন নিয়ে আসুন। আমি আমার ভাইকে বলব লাগিয়ে দিতো। এরপর শিখে নিবেন। মাঝেমধ্যেই এইরকম হবে।”
এভাবেই শুরুটা হলো। এরপর থেকে নানান সময়ে-প্রয়োজনে তামান্না এবং ওর পরিবারকে পাশে পেল সুব্রত। এমনকি মাঝেমধ্যে ওই বাড়ি থেকে তাঁর জন্য দাওয়াত আসতে থাকল। তামান্নার গোটা পরিবারের সাথে সুব্রতর বন্ধুত্ব হয়ে গেল অল্প ক’দিনেই। ওই পরিবারে পাঁচজন মানুষ। তামান্না এবং ওর বাবা-মা। পাশের বাড়িটাতেই আবার ওর ভাই সস্ত্রীক বসবাস করেন। বৃদ্ধ লোকটার থেকেই একদিন সুব্রত জানতে পারল, বছর পাঁচেক আগে তামান্নার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু অল্প ক’দিন পরই ওর স্বামীর অকাল মৃত্যু হওয়ায় ওকে আবার বাবার বাড়িতে ফিরতে হয়। এরপর আর বিয়ে করতে রাজি হয়নি মেয়েটা। পড়াশোনা জানা মেয়ে। এখানকার স্থানীয় কলেজের শিক্ষিকা। বেশ সম্মান আছে। মাথা উঁচু করে চলাফেরা করে।
ওই পরিবার সম্পর্কে এমন আরও অনেক কথাই জানতে পারল সুব্রত। সম্পর্কটা আরও গাঢ় হলো। তামান্নার অনুরোধেই একদিন স্থানীয় কলেজটিতে গেল সে। নিজের সিভি জমা দেওয়ার সাথে সাথে চাকরি হয়ে গেল। সে ওই কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হলো। এরপর থেকে তাঁর জীবনযাপন অত্যন্ত সহজবোধ্য হয়ে উঠল। দিনের অধিকাংশ সময় কলেজে থাকে। বাকি সময়েও কলেজের ছেলে-মেয়েরা আসে তাঁর কাছে। কেউ কেউ গল্পের বই পড়ে। কেউ কেউ গল্প করে। নতুন নতুন জিনিস শিখে তাঁর কাছে কাছে। পৃথিবীর আশ্চর্য সব আবিষ্কার সম্পর্কে জানতে শুরু করে। এভাবে অল্পদিনেই কলেজের সবার প্রিয় হয়ে ওঠে সে। এত মেধাবী, অথচ সাদামাটা জীবনযাপনের জন্য তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয়দের মধ্যে। পথে চলার সময় বড়-ছোট সবাই সালাম দেয়। অনেকে বাড়িতে আসে। যেকোনো অনুষ্ঠানেই নিমন্ত্রিত হয় সে। এভাবে সময় পেরোতে থাকে। মাস পেরিয়ে নতুন মাস আসে, বছর পেরিয়ে নতুন বছর আসে। এরমধ্যে পরিবারের কারোর সাথেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি সে। কিন্তু তাঁর ধারণা, চিত্রা একদিন তাকে ঠিক খুঁজে বের করবে। কোনো এক বিকেলে উঠোনে দাঁড়িয়ে বলবে, “সুব্রত ভাই, বাড়ি আছেন? আমি এসে গেছি।”

তবে সুব্রতর জীবনযাপন সাবলীল হলেও মাঝে মাঝে কিছু সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। এই যেমন, হ্যালুসিনেশন! রক্তিমের এই বাড়িটিতে রুশার সাথে ৫দিন থেকেছিল সে। এখন মাঝে মাঝে এমন হয়, সে বাড়িতে ঢুকে দেখল, জানালার পাশে রুশা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে কেউই থাকে না। প্রথম প্রথম চমকিত হলেও আস্তে আস্তে ব্যাপারটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। যে স্মৃতি সে ফেলে আসতে চেয়েছিল, তা পিছু ছাড়েনি তাঁর। মাঝেমধ্যে মনটা অস্থির হয়ে উঠলেই বিছানার উপর বসে, চোখ বুজে থাকে সে। কিন্তু এই ধ্যানমগ্নতায় আবার সে প্রায়ই চিত্রার কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। তখন সে চোখ বুজে বিড়বিড় করে বলে, “কেঁদো না চিত্রা; এ-জীবন প্রস্থানের।”

সুব্রতর এই ধ্যানের ব্যাপারটা স্টুডেন্টদের চোখেও ধরা পড়ে৷ এরপর থেকে তাঁদের আলোচনায় প্রায়ই ওঠে আসে স্যারের ধ্যানমগ্নের ব্যাপারটা। এমনকি তাঁরা স্যারকে বিড়বিড় করে কথা বলতেও শুনেছে। যেভাবে সুনাম ছড়িয়েছিল, সেভাবে এই ব্যাপারটাও ছড়িয়ে পড়ে। একসময় স্টুডেন্টদের কেউ কেউ গোপনে সুব্রতকে ‘পাগল’ বলে ডাকতে শুরু করে। যা আস্তে আস্তে সুব্রতর ‘ডাক নামে’ রূপ নেয়। কখনো ক্লাসের কোনো স্টুডেন্ট তাঁর সহপাঠীকে যদি জিজ্ঞেস করে, ‘এরপর কার ক্লাস রে?’ জবাবে সেই সহপাঠী বলে, ‘পাগলা স্যারের ক্লাস।’ সবার ধারণা, পড়তে পড়তে স্যারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
এইসব সুব্রত জানে। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ করে না। নিজের কাজ সে চালিয়ে যায়। প্রায়ই চোখ বুজে বলে উঠে, “কেঁদো না চিত্রা; এ-জীবন প্রস্থানের।”

৪৪তম পর্ব/শেষ পর্ব এখানেই সমাপ্ত।

গত পর্বের লিংক – https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=858173185127383&id=100028041274793

বি:দ্র: বেশি কিছু বলার নেই। শুধু বলব, ভালো লাগুক বা খারাপ লাগুক, পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাবেন। এছাড়া যদি মনে হয় এই উপন্যাসের দ্বারা কেউ উপকৃত হতে পারেন, তাহলে এটাকে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইল। ভালো লেখার প্রচারণার দায়িত্ব লেখকের সাথে সাথে পাঠকগণেরও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here