প্রস্থান — ৪৩তম পর্ব।

0
1014

প্রস্থান — ৪৩তম পর্ব।

রিফাত হোসেন।

চিত্রা ছুটে গেল বাড়ির সামনে; ওখানে কত লোকজনের ভীড়, যেন বিশেষ কোনো সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে! সে এগিয়ে গেল; ভীড় ঠেলতেই রক্তে রাঙানো, সুব্রতর বিভৎস মুখটা দেখতে পেলো। সঙ্গে সঙ্গে হু হু করে কেঁদে উঠল সে। বসে পড়ল মাটিতে। আপনজনকে হারানোর করুণ বেদনা তাঁর কান্না দিয়ে প্রকাশ পায়, ঝরে পড়ে।
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও বেরিয়ে আসে। বিধ্বস্ত সুব্রতকে দেখে সবাই-ই কাঁদতে শুরু করল। দীপালি বেগমও ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায় তাঁর। দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থামে অঝোর ধারার বৃষ্টি। কত অপমান, কত অবহেলা-ই না করেছিলেন। অচিরেই জানতে পারলেন, ছেলেটা তাঁর স্বামীরই আরেক সন্তান। তাঁর সৎ ছেলে। এতদিনের দুর্ব্যবহারের কথা কল্পনা করে, আজ-এই মুহূর্তে মৃত সুব্রতর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অপরাধবোধে বিদ্ধ হতে লাগলেন। কনা, ফিরোজ সবাই-ই কাঁদছে মৃতদেহকে সামনে রেখে। বাঁধ না মানা চোখের জলে গোটা শহর ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়!
এমন সময় কোত্থেকে যেন দৌড়ে এলো রশ্মি। সুব্রতর থেতলানো মুখশ্রী দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল সে-ও। মাথার কাছে বসে, সুব্রতর শরীর ঝাঁকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, “আপনি এটা করতে পারেন না, সুব্রত ভাই। আমাকে সম্পূর্ণ একা করে চলে যেতে পারেন না আপনি। আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি, সব্রত ভাই। খুব ভালোবাসি। যদি আপনাকে চলেই যেতেই হতো, তবে কেন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন? কেন হাত ধরে বলেছিলেন, আপনি সারাজীবন আমার সাথে থাকবেন? এখন আমি আপনাকে ছাড়া একা কীভাবে দিন কাটাব? আমি যে শুধুমাত্র আপনার উপরই নির্ভরশীল হতে চেয়েছিলাম। আপনি আমার ভালোবাসা একটুও বুঝতে পারেননি? নাকি অভিনয় করে গেছেন?”
রশ্মি কাঁদতে কাঁদতে বলে কথাগুলো। কে জানে, এই আর্তচিৎকার সুব্রত অব্দি পৌঁছায় কী-না! সে তো চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন! তাঁর রক্তাক্ত দেহ, থেতলে যাওয়া মাথা, বিকৃতবর্ণ মুখ; সবই তো বলে দেয়, সে বিদায় নিয়েছে।

৬০.
মানুষ ইন্তেকাল করলে তাঁর প্রতি লোকের সহানুভূতি হয়। দরদ হয়। গুরুত্ব বুঝতে পারে। একজন আত্মঘাতী ব্যক্তি যদি মৃত্যুর আগেই, মৃত্যুর পরবর্তী সময়টা দেখতে পেতো, তবে সে কখনোই আত্মহত্যা করতো না। প্রত্যেক আত্মঘাতী ব্যক্তি মৃত্যুর আগে নিজেকে অবহেলিত ভাবে, গুরুত্বহীন ভাবে; অথচ সে জানে না, মরার সাথে সাথেই পৃথিবীর মানুষের কাছে সে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে! যাদের সে পর ভাবতো, তাঁর মৃত্যুতে তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি কাঁদতে দেখা যায়। শোকে কাতর হয়। যদি একবার সে বুঝতো, মৃত্যুর পরপরই সে সবার দুঃখের কারণ হয়ে উঠবে, সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তবে সে নিশ্চিত ভাবে আত্মঘাতীর পথে থেকে বহুদূরে চলে যেতো। কিন্তু আফসোসের কথা এটাই যে, এমন সৌভাগ্য নিয়ে খুব কম লোকই জন্মায়। সেজন্য ডিপ্রেশনে পড়ে আত্মহত্যা করে অগণিত সংখ্যক মানব-মানবী।

ধীরে চোখ দুটো মেলে তাকাল সুব্রত। মাথার উপর কালো আকাশ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা। ভেজা স্যাঁতসেঁতে তাঁর শরীর। এইসবের মধ্যেও যেটা বেশি লক্ষ্যনীয় বা যন্ত্রণার, সেটা হলো মাথার পিছনের চিনচিন ব্যথা! ওঠে বসার চেষ্টা করল সে। এক হাত কাঁধে রেখে, মাথাটা ডানে-বামে ঘুরাল। সাথে সাথে তাঁর মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে একটা শব্দ বেরোলো; যা আকুতির প্রকাশ। এরপর ঝিম মেরে বসে, গত কয়েক ঘণ্টায় ঘটে যাওয়া ঘটনা ভাবতে লাগল সে। মস্তিষ্ক আওড়াতে শুরু করল।

আসলে, সন্ধ্যার পর, ড্রয়িংরুমে সবার উপস্থিতিতে খালেদ সাহেব যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলোর সবটাই স্পষ্ট শুনেছিল সুব্রত। ওই মুহূর্তে তাঁর বোধগম্য হয়েছিল, এই পৃথিবীতে সে বড্ড অপ্রয়োজনীয়। যে কারণে গত ৪০ বছর ধরে একটা মিথ্যে পরিচয়ে জীবনযাপন করতে হয়েছে তাকে। তাঁর জন্মদাতা পিতা তাকে অস্বীকার করেছে৷ পৃথিবীতে দীর্ঘ ৪০টা বছর কাটানোর পর এই চরম সত্যি জানতে পারল সে; তাও অপ্রত্যাশিত ভাবে। এর থেকে বেদনার আর কী হতে পারে? সে ভাবছিল, প্রথমে জন্মদাতা পিতা, এরপর সস্ত্রী; কারোর কাছেই গুরুত্ব পায়নি সে। পরিবারের সান্নিধ্য পায়নি সেভাবে। নিজের এবং পৃথিবীর প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশের জন্যই ছাদে এসেছিল সে। জীবন ত্যাগ করাই ছিল মূখ্য উদ্দেশ্য। যখন সফলতায় চূড়ায়, তখনই ওই এক ঝটকা বাতাস তাকে থামিয়ে দিলো; পিচ্ছিল খেয়ে ছাদের উপরেই পড়ল সে; নয়তো পরবর্তী কয়েক সেকেন্ডে সে লাফিয়ে পড়ল মাটিতে। ছাদের ঘর্ষণে মাথায় তীব্র আঘাত সংঘটিত হওয়াতেই জ্ঞান হারায়। তাঁর মস্তিষ্ক তখন ভাবছিল, সে মৃত। সেই অসাড় মস্তিষ্ক কল্পনা করছিল; তাকে ঘিরে লোকজনের ভীড়, মানুষগুলোর কান্নার আওয়াজ আর
রশ্মির অশ্রুসিক্ত স্বীকারোক্তি! এরপরই হঠাৎ চেতনা শক্তি ফিরে পায় সে।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর ওঠে দাঁড়াল সুব্রত। মাথাটা যেন ভনভন করে ঘুরছে। সাথে অসহ্যকর যন্ত্রণা। রেলিং-এ একটা হাত রাখল সে। একবার তাকালো রশ্মিদের বাড়ির দিকে। অন্ধকারে হারিয়ে গেছে সম্পূর্ণ বাড়ি। কোথাও কোনো আলো নেই। আকাশে মেঘের গর্জন এখনো চলছে। বৃষ্টি ছোট ছোট ফোটা পড়ছে একাধারে। সুব্রত হঠাৎ রশ্মির ঘরের জানালা খুঁজতে লাগল। মনেমনে বলল, “আচ্ছা, রশ্মি কী এখনো জেগে আছে? জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, বৃষ্টিতে হাত ভেজাচ্ছে? আমার কথা ভাবছে?”
খুব চেষ্টা করল সুব্রত। অন্ধকার এতই তীব্র যে, কোনো কিছু তাঁর নজরে এলো না।

৬১.
মেঘের শব্দের সাথে কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। চিত্রার ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। ছোট ছোট চোখ করে, নাক-মুখ কুঁচকে তাকাল সে। সারা ঘর আঁধারে জড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই হঠাৎ পায়ের কাছে কিছুর উপস্থিতি টের পেলো। কান্নার আওয়াজ খুব দূর থেকে আসছে না। ভড়কাল সে। দ্রুত পা গুটিয়ে নিয়ে, তড়িঘড়ি করে বেডসাইড লাইটটা জ্বালাল। কিন্তু পায়ের নিচে তাকাতেই আকাশ থেকে পড়ল! ফিরোজ বসে বসে কাঁদছে ওখানে। ওর চোখের পানি নিজের পায়ে-ও লক্ষ্য করল সে। তাঁর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। এর আগে কখনো ফিরোজকে কাঁদতে দেখেনি সে। ওর ডিকশিনারিতে ‘কান্না’ শব্দটা নেই বলেই জানতো।
কয়েক সেকেন্ড বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার পর ফিরোজের দিকে এগিয়ে গেল চিত্রা। ওর দুই গালে হাত রেখে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ফিরোজ, কী হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন?”
ফিরোজ কোনো কথা বলছে না। হু হু করে কেঁদেই চলেছে।
চিত্রা উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরোজের মাথাটা বুকে জড়িয়ে ধরল এবার। অস্থির ভঙ্গিতে বলতে লাগল, “কাঁদছো কেন ফিরোজ? বলো আমাকে। তুমি কষ্ট পেয়েছ আমার কথায়? আচ্ছা, আমি যাব তোমার সাথে। দয়া করে তুমি কান্না থামাও।”
কথা বলতে বলতে চিত্রার চোখেও পানি চলে এলো। ফিরোজের প্রতি সমস্ত মান-অভিমান দমে গিয়ে তা অপরাধবোধে জন্ম নিলো। সে মনেমনে ভাবল, “আহা! তখন ওভাবে কথাটা বলে খুব অন্যায় করেছি। ছেলেটা বড় আঘাত পেয়েছে!”
চিত্রার বাহুর উষ্ণতায় কিছুটা শান্ত হলেও ফিরোজের অশ্রুপাত কমল না। সে মাথাটা তুলে চিত্রার দুই হাত মুঠোয় নিয়ে কান্নারত ভাবে বলল, “আমি খুব বড় পাপী, চিত্রা। অনেক অন্যায় করেছি আমি। আল্লাহ আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না। আমার মতো অপরাধীর ক্ষমা হয় না।”
চিত্রা ব্যথিত হয়ে বলল, “এভাবে বলো না, ফিরোজ। এই দেখো, আমি ঠিক আছি। আমি একটুও কষ্ট পাইনি। তুমিই তো আমার সবকিছু। তুমি আমাকে যেখানে নিয়ে যাবে, আমি সেখানেই যাব। কথা দিচ্ছি।”
“আমি শুধু তোমার সাথে অন্যায় করিনি। সুব্রত ভাইয়ের সাথেও করেছি। ও আমাকে কক্ষনো ক্ষমা করবে না।”
চিত্রা বিস্মিত হলো ফিরোজের মুখে এইরকম কথা শুনে। অবাক দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, “সুব্রত ভাইয়ের সাথে অন্যায় করেছ মানে? কী বলতে চাচ্ছ তুমি?”
ফিরোজ মাথা নুইয়ে বলল, “হ্যাঁ, চিত্রা। আমাদের সবার দ্বারা একটা বিরাট ভুল হয়ে গেছে। খুব অন্যায় হয়েছে সুব্রত ভাইয়ের সাথে।”
চিত্রা চোখ বড় বড় করে বলল, “তুমি কীভাবে জানলে?”
ফিরোজ মাথা তুলে বলল, “আজকেই জেনেছি। সুব্রত ভাই নিজে আমাকে ডায়েরি দুটো দিয়েছে।”
চিত্রা চমকে গেল ফিরোজের কথা শুনে। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে কল্পনাও করেনি, সুব্রত ভাই অত গোপনীয় ব্যাপার ফিরোজকে জানতে দিবে।
চিত্রাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফিরোজ আবার বলল, “আমি সবটা পড়েছি। সবটা পড়েই বুঝতে পারলাম, আমরা কতটা ভুল ছিলাম। তোমাকেও দিনের পর দিন সন্দেহ করেছি আমি। অথচ তুমি শুধু সত্যিটা জানার চেষ্টা করেছিলে।” এরপর ফিরোজ সোজা হয়ে বসে বলল, “তুমি আমাকে একবার অন্তত বলতে পারতে।”
চিত্রা মুখ শক্ত করে বলল, “খুব সুযোগ দিয়েছিলে বুঝি? সুব্রত ভাইয়ের কথা তুললেই তো তোমার গায়ে ফোসকা পড়তো!”
ফিরোজ আবার চিত্রার হাত দুটো আলতো করে ধরল। বলল, “আর ফোসকা পড়বে না। দেখো নিও।”
চিত্রা মজা করে বলল, “যদি সত্যি সত্যিই একটা প্রেম করে বসি?”
ফিরোজ বলল, “তবুও তোমাকে কিছু বলব না। যা বলার ওকে বলব।”
কথা চলতে থাকল দুজনের। কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ায় পর হঠাৎ ফিরোজ গম্ভীর হয়ে বলল, “কিন্তুবুঝতে পারছি না সুব্রত ভাইয়ের কাছে কীভাবে ক্ষমা চাইবো? খুব অস্বস্তি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। অমন আনুষ্ঠানিক ব্যাপার কীভাবে ক্রিয়েট করব?”
চিত্রা বলল, “আমিও ভুল করেছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিবে। সুব্রত ভাই চমৎকার লোক! তোমাকেও ক্ষমা করে দিবে। অত ভেবো না। তোমার বড় ভাই। ভাই বলে ডাকবে একবার। দেখবে চট করে বুঝে ফেলবেন তোমার মনের কথা। লোকটা খুব ইন্টেলিজেন্ট।”
“আমার কি এখনই যাওয়া উচিত? ও নিশ্চয়ই এখনো জেগে আছে। সকালে যদি সবার সামনে ক্ষমা চাইতে না পারি?”
চিত্রা বলল, “যাও। এক্ষুণি যাও।”
চিত্রার হাত ছেড়ে দিয়ে ফিরোজ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। কিন্তু দরজার বাইরে আসার পর আর সামনে এগোতে পারল না। কারণ সে চোখের সামনে দেখল, সুব্রত ভাই ঢুলতে ঢুলতে ছাঁদ থেকে আসছে। সিঁড়িগুলো পেরিয়ে কাছে আসতেই ও চক্কর খেলো হঠাৎ; পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু ফিরোজ দ্রুত ধরে ফেলল ওকে।
সুব্রত, চোখের পাতা সামান্য ফাঁকা করে দেখল, তাকে যে মানুষটি ধরে রেখেছে, সে ফিরোজ। কিন্তু বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না সে৷ জ্ঞান হারাল তৎক্ষনাৎ। মাথাটা এলিয়ে পড়ল ফিরোজের কাঁধে।
সুব্রত অচেতন হতেই ওর মাথাটা ভালো করে ধরল ফিরোজ। মাথার পিছনে হাত রাখতেই উষ্ণ কিছুর ছোঁয়া পেলো। বিস্মিত হয়ে হাতটা আবার সামনে এনে দেখল, পুরো হাত রক্তে লাল হয়ে আছে। মাথার পেছনটা একনজর দেখে সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল সে; স্ত্রীর নাম ধরে, “চিত্রা, এদিকে আসো। সুব্রত ভাইয়ের মাথা থেকে রক্ত পড়ছে।”
স্বামীর চিৎকার শুনে ঘর থেকে ছুটে এলো চিত্রা। সুব্রত ভাইকে দেখে অমন অসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে শঙ্কিত গলায় বলল, “একি! কী হয়েছে সুব্রত ভাইয়ের?”
ফিরোজ বলল, “বুঝতে পারছি না। ছাঁদ থেকে নামল। মাথা ফেটে গেছে। এখন জ্ঞান নেই। আমি ওকে নিয়ে ঘরে যাচ্ছি, তুমি ফাস্টএইড বক্স নিয়ে এসো।”
নির্দেশ মতো চিত্রা ঘরে গিয়ে ফাস্টএইড নিয়ে এলো। ফিরোজ আস্তে আস্তে সুব্রতকে নিয়ে গেল ওর ঘরে।

তখন দুপুররাত। সুব্রতর গায়ে খুব জ্বর। বাড়ির সকলেই ততক্ষণে জেগে গেছে। শেষ রাতে সুব্রতর জ্বর কমে এলো কিছুটা। তখনও গোটা বাড়ি সজাগ। কারোর চোখে ঘুম নেই। এমনকি দীপালি বেগমও চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে ছিলেন ড্রয়িংরুমে। এই প্রথম সুব্রতর প্রতি তাঁর করুণা বোধ হলো।

৬১.
ভোরবেলা রশ্মির বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সুব্রত। কোনো বিশেষ কারণ নেই অবশ্য। গতকাল রাতের ওই ঘটনাটার পর থেকেই রশ্মিকে দেখার জন্য ব্যাকুলতা বোধ করছিল সে। এমন আগে কখনো হয়নি। তাই সকালে ঘুম ভাঙার পরপরই এখানে চলে এলো।
কয়েক মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর কলিংবেল চাপল সুব্রত। পরপর দু’বার চাপ দিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগল। এরপর কেটে গেল মিনিট তিনেক। ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় আরও দুবার চাপল কলিংবেল। এরপর আবার, এবং আবার। কিন্তু ভেতর থেকে রশ্মির কোনোরকম প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। সে ভুরু কুঁচকে এবার পিছিয়ে এলো কিছুটা। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর নিরাশ হয়ে ফিরে এলো; এই ভেবে, ‘রশ্মি এখনো ঘুমোচ্ছে৷’ অবশ্য সেদিন রাতের ওই ঘটনার পর রশ্মির সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি তাঁর।
বাড়ির আশপাশ দিয়ে হাঁটছে সুব্রত। ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে ৯টা বেজে গেল। সূর্য এখন বেশ জলন্ত। মাথা চিনচিন করছে তাঁর। এমনসময় হঠাৎ দেখল, চিত্রা বাড়ি থেকে বেরিয়ে, তাঁর দিকেই হেঁটে আসছে। সে রশ্মিদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে।
চিত্রা কাছে এসে বলল, “এই অসুস্থ শরীরে আপনি একা একা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন কেন, সুব্রত ভাই?”
সুব্রত দূরে কোথাও অকারণে চোখ রেখে চিত্রার উদ্দেশ্যে বলল, “আমি এখন ঠিক আছি। আর আমাকে নিয়ে তোমাদের এত মাথা ঘামাতে হবে না।”
চিত্রা হাসল সুব্রতর কথা শুনে। বলল, “আমরা ছাড়া আর কে ভাববে, সুব্রত ভাই? বিয়েসাদী করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন। নতুন করে কেউ ভাবার সম্ভাবনা নেই।”
সুব্রত কিছু বলল না। একবার বিরক্ত চোখে চিত্রার দিকে তাকাল শুধু।
চিত্রা আবার বলল, “ভেতরে চলুন, সুব্রত ভাই। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী করবেন?”
হঠাৎ সুব্রত বলে উঠল, “আচ্ছা, রশ্মি কি খুব বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে?”
চিত্রা বিস্মিত হয়ে বলল, “না তো। কেন?”
সুব্রত এবার বাড়িটার দিকে ঘুরে বলল, “অনেকক্ষণ কলিংবেল বাজালাম। কোনো সাড়া দিলো না।”
চিত্রা বলল, “জানি না কী হয়েছে মেয়েটার! দু’দিন ধরে আমার সাথেও দেখা করছে না। কিছু জিজ্ঞেস করলে দরজা না খুলেই জবাব দেয়। নিজেই নাকি রান্না করে খায়। সেদিন রাতে ওকে খুব আপসেট দেখাচ্ছিল। বারবার বলছিল, ‘যদি মা-কে একটু বুঝতাম, তাহলে মা এত কষ্ট পেয়ে চলে যেতো না।’ ওর ওইরকম অবস্থা দেখেই আমি রেগেমেগে আপনার কাছে গিয়েছিলাম। এরপর থেকেই ওর বাড়ির দরজা বন্ধ।”
সুব্রত আগের থেকেও গুমোট হয়ে বলল, “কিন্তু আজ কোনো জবাব নেই।”
“চলুন তো দেখি।”
চিত্রা আগে আগে গেল; সুব্রত পিছনে। দরজার কাছে গিয়ে কলিংবেল বাজাতে লাগল চিত্রা। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো জবাব নেই। এরপর দরজা ধাক্কাতে শুরু করল সে। ডাকতে লাগল জোরে জোরে। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। বেশ কিছুক্ষপর হাল ছেড়ে, ক্লান্তমুখে সুব্রতর দিকে তাকাল।
সুব্রত বলল, “আর কোনো উপায় নেই ভিতরে যাওয়ায়?”
চিত্রা ভেবে বলল, “ওদের ছাদের দরজাটা ভাঙা। পুরোনো, কাঠের দরজা। ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে। কিন্তু কেন?”
সুব্রত বলল, “জানি না। যেহেতু ও দরজা খুলছে না, তাই আমাদেরই একটা ব্যবস্থা করতে হবে।”
“হয়তো অনেক রাত করে ঘুমিয়েছিল, তাই।” চিত্রার শুকনো গলায় বলল কথাটা। তাঁর কপালেও বেশ ক’টা বাজ পড়ল।
সুব্রত চিত্রার কথাটা কানে না নিয়ে ছাদে উঠার উপায় খুঁজতে লাগল। পেয়েও গেল সহজেই৷ ব্যালকনির গ্রিলে পা রেখে রেখে উপরে উঠলেই ছাদের নাগাল পাওয়া যাবে৷ এরপর ঝুলে পড়ে উঠতে হবে।
চিত্রা অবাক হয়ে দেখল, সুব্রত ভাই গ্রিলের উপর পা রেখে রেখে ছাদের কুর্ণিশ ধরে ফেলল। এর ঝুলে পড়ল ওটা শক্ত করে ধরে। হাত ফসকালেই নিচে। সে গোল গোল চোখ করে দৃশ্যটা দেখতে লাগল।
ছাদে উঠতে বেশ বেগ পোহাতে হলো সুব্রতকে। শরীরের বাজে অবস্থার জন্যই হয়তো। ছাদে উঠে সে দরজাটা খুলল প্রথমে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো এক তলায়। চারিদিক খুব অন্ধকার। তবুও রশ্মির ঘরটা খুঁজে পেতে অসুবিধা হলো না। দরজাটাও খোলা পেলো সে। অন্ধকার হাতরে ঘরে গিয়ে কাঁপা গলায় ডাকল ‘রশ্মি’ বলে। কোনো সাড়া নেই রশ্মির। চারিদিকে এত নীরবতা যে, বুঝার উপায় নেই বাড়িতে কেউ আছে কী-না! সুইচবোর্ড অনুসন্ধান করে আলো জ্বালিয়ে যখনই পিছন ঘুরলো, দৃশ্যটা দেখে তাঁর পিলে চমকে উঠল! মুখ রক্তশূণ্য হয়ে এলো! কারণ তাঁর সামনে রশ্মির রূগ্ন দেহটা ফ্যানের সাথে ঝুলছে। ওর চোখ দুটো খোলা; অস্বাভাবিক বড়! মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, কেউ কালো রঙ লাগিয়ে দিয়েছে। এত ভয়ংকর দৃশ্য!
বাইরে থেকে চিত্রা ডেকে যাচ্ছে সুব্রতকে। কিন্তু সুব্রতর সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তাকিয়ে আছে রশ্মির দিকে; ছলছল চোখ, অপলক চাহনি! হয়তো সে মনেমনে ভাবছে, ‘যদি ওর স্বপ্নে আমি একবার আসতাম, তবে ওকে আত্মঘাতী করতো হতো না।’

৪৩তম পর্ব এখানেই সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসছে।

গত পর্বের লিংক –

বি:দ্র: ঠিক করেছিলাম, সুব্রতর ঘটনা আর রশ্মির ঘটনাটা একটা পর্বে দিবো। যেন আমার উপর দিয়ে যেটুকু ঝড় আসার, তা একদিনেই আসে। কিন্তু ৪২পর্ব লেখার পর দেখলাম, এখানে রশ্মির অংশটা আনলে পর্ব বেশ বড় হয়ে যাবে। তাই আলাদা দিতে হতো।
আর হ্যাঁ, কেউ কেউ ভাবতে পারেন, আপনাদের কমেন্ট দেখে আমি সুব্রতকে বাঁচিয়ে রেখেছি; কিন্তু এটা সত্যি না। এই উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ, পুরোটা সংক্ষিপ্ত করে লিখে রেখেছিলাম আমি। গতকালকেও দুই একজনের কমেন্ট বক্সে আমি বলেছিলাম, ‘দেখা যাক সামনে কী হয়’। এই কথাটার অর্থ হলো, উপন্যাস এখনো শেষ হয়নি। এবং আজকেও এটা বলব না। অধৈর্য হবেন না কেউ। এটা গল্প। আমি জানি আপনারা গতকাল দুঃখ পেয়েছেন। আজকেও হয়তো খানিক পাবেন। কিন্তু আমি নিরুপায়। যা হওয়ার ছিল, তাই হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here