তোর পরশে প্রেম শেষ পর্ব

0
69

#তোর_পরশে_প্রেম
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -২২

সময়ের স্রোতে কেটে গেছে পাঁচ বছর।

স্পর্শ বাবা এদিকে আসো তুমি না লক্ষী বাবা আম্মুর কথা শুনবে না?
‘আম্মু আমি আর খাবো না।
‘স্পর্শ খাবো না মানে কি? খেতে হবে তো বাবাই।
পলাশ সাহেব বললেন, আজ তো কেসের শুনানি রেডি হ। যেতে হবে তো?
‘কেস কিসের কেস বাবা?আর কিসের শুনানি কিসের আইন? যে আইন চার বছর ধরে আমার হ্যাসবেন্ডকে খুঁজে বের করতে পারলো না। যে আইন আজো এটা নিশ্চিত করতে পারলো না আমার হ্যাসবেন্ড জীবিত আছে নাকি মরে গেছে সেই আইনের কাছে আমি যাবো না। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে গুম করে ফেললো! আমার ছেলে যখন বড় হয়ে তার বাবার কথা জানতে চাইবে কি উত্তর দেবো? মানুষ মারা গেলে তাল লাশ তো থাকে। কবর দেখে নিজেকে শান্তনা দেয়া যায়। কিন্তু আমার কাছে কোন স্বান্তনা নেই। আমি বছরের পর বছর এই অপেক্ষায় কাটাচ্ছি একদিন আমার হ্যাসবেন্ড ফিরে আসবে।কি অদ্ভুত এই ভাবনা রাতে আমাকে ঘুমাতে দেয় না। রাতের বেলা একটা কুকুর ডাকলেও মনে হয় ও হয়তো আসছে এই রাতে কুকুর তো এমনি এমনি লাউড করবে না। কোথাও অজ্ঞাত লাশের খবর শুনলে ছুটে যাই এই আশায় শেষ বারের মত তার মুখটা হয়তো দেখবো।সারাদিন পত্রিকার পাতায় আর নিউজ চ্যানলে চোখ রাখি হয়তো তার কোন খোঁজ পাবো।আপনার আইন আমাকে পাঁচ বছরে সেই সংবাদটুকু এনে দিতে পারেনি। আমার ছেলে বড় হয়ে এই সমাজ আর রাষ্ট্রের মানুষের কাছে যখন প্রশ্ন তুলবে,আমার বাবাকে কেন গুম করা হল? সত্যের পথে লড়াই করাটাই কি ছিলো আমার বাবার ভুল! তখন কি উত্তর দেবে আপনার আইন।
সবার বাবা আছে আমার ছেলেটা সেই বাবা নামক মানুষটার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। আপনার আইন কি সেই ভালোবাসা পূরণ করতে পারবে? তাই আমি আর যাবো না কোন শুনানিতে। এই শহরের দেয়ালে দেয়ালে ছাপিয়ে দেবো… এই শহরে বিচার নেই৷ এই শহরে জলজ্যান্ত মানুষকে গায়েব করে ফেলা যায়। যেনো কখনো তার অস্তিত্ব ছিলোই না। স্বামীহারা স্ত্রী আর বাবাহারা সন্তানের আর্তনাদে কেঁপে উঠবে এই ইট পাথরের দেয়াল।

পলাশ সাহেব আর কিছু না বলে বের হয়ে গেলেন।

“দিন ফুরিয়ে রাতের আঁধারে ঢেকে গেছে শহর।
স্পর্শেকে নিলুফা বেগমের সাথে ঘুম পারিয়ে রেখে এসেছে পুতুল। রাতের নিরবতা আর ভেতরের যন্ত্রণা তা জেনে পাল্লা দিয়ে বাড়ে! অথচ রাতের আঁধার কেটেই সূর্য উঠবে,আর আমার জীবন সেই আলোতেও আঁধারে ঢেকে থাকবে।
ছাঁদে দাঁড়িয়ে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা চাঁদের দিকে আনমনে থাকিয়ে আছে পুতুল। মনে মনে বলছে..
“আমরা ভালোবাসি ভালো থাকতে, অবশেষে ভালোবাসা থাকলেও ভালো থাকা আর হয় না!!
চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠলো,অতীতের কিছু মূহুর্ত।

‘আমরা বাসে কেন যাচ্ছি?
‘এই যে নাইট কোর্স বেড সিস্টেম এটা ইন্জয় করতে। অনেক আগেই ইচ্ছে ছিলো কিন্তু তখন বউ ছিলো না।এখন বউ ইচ্ছে দুটোই আছে তাই ইচ্ছে পূরণ করে ফেললাম। কিয়া পাতা কাল হো না হো।
‘পুতুল পরশের মুখে হাত দিয়ে বলে,সুন্দর মূহুর্তে অসুন্দ কথা শুনতে চাইনা।
পরশ পুতুলের হাত সরিয়ে পুতুলের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে বলে,কখন থেকে তোর ঠোঁট জোড়া আমার ঠোঁটকে ডাকছে। পুতুলের মাথা পরশের বুকে পরশ পুতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পুতুল বলে,সব কিছু কেমন স্বপ্নের মত লাগছে!এতো কিছুর পরেও আমি তোমাকে পেলাম। আমরা এক হলাম। এসব স্বপ্ন নয়তো?
‘কাল রাতের এতো আদরের পরেও বলছো এসব স্বপ্ন নয়তো!একবার সিলেট চলো তোমাকে এতো ভালোবাসা দেবো যে, এই স্বপ্নের ঘোড়ে পরে যাবে।
‘ইশশ তোমার মুখে তুমি ডাক শুনলে হৃৎস্পন্দন থমকে যায়।
‘আমার তুমি একটাই তুমি,তুমি হীন আমি নিঃস্ব। জানো তুমি তখন ক্লাস এইটে পড়ো কোচিং থেকে ফিরছো, আমি মোড়ের দোকানে বসে আছি। তুমি হেসে, হেসে কথা বলছো আর সামনে এগিয়ে আসছো। ওই মূহুর্তে আমার হৃদয় বলেছে এই পুতুল শুধু তোর। তোমার সাথে একটু রাগারাগি করতাম শুধু দূরত্ব ধরে রাখার জন্য। কাছাকাছি আসলেই অসময়ে ভুল কিছু হয়ে যাবে এই ভয়ে।তোমার এলোমেলো চলাফেরা কতবার আমাকে এলোমেলো করেছে। হুটহাট আমার রুমে যখন আসতে আমি ওই মূহুর্তে নিজেকে সামলে তোমার উপর রাগ দেখাতাম।কারণ আমার পুতুলরানীকে আমি অসময়ে ছুঁয়ে দিতে চাইনি৷ কিন্তু আমার বেহায়া মন বারবার তোমাকে ছোঁয়ার বাহানা খুঁজতো। যখন মনের সাথে যুদ্ধ করে হেরে যেতাম তখন তোমার ঠোঁটে আর গালে ভালোবাসা এঁকে দিতাম।
পুতুল পরশকে আর একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,তোমার প্রতি ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করতে পেরেছি তোমার থেকে দূরে এসে।অসহ্য লাগতো সব কিছু। কলেজ ক্যাম্পাসে কোন কাপল দেখলে, সেখানে তোমাকে আর নিজেকে ইমাজিন করতাম। রাতের পর রাত কেঁদে কাটিয়ে দিতাম। মনে হতো তোমার জন্য আমি আমার সব হারিয়েছি।
‘পরশ পুতুলের কপালে চুমু দিয়ে বলে,আদরের পুতুল বৌ বাকি জীবন এই পরশের পরশ তোমায় আগলে রাখবে নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে।

‘সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলতেই পুতুল বলে, আমি রুমে আসলাম কি করে? আমি তো বাসে ছিলাম৷
“জানপাখি বাস স্টেশনে আসার পর ঘুমন্ত বৌকে কোলে করে নিয়ে আসছি।
‘আমাকে ডাকলেনা কেন?
‘আমার ঘুমন্ত পরিটাকে ডাকতে ইচ্ছে করেনি তাই। এবার আসো বলেই পুতুলকে কোলে তুলে বারান্দায় নিয়ে আসলো।
বাহিরে মনোরম দৃশ্য দেখে পুতুল মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে,মনে হচ্ছে আকাশ আর পাহাড় মিলেমিশে একাকার।
পরশ পুতুলকে দাঁড় করিয়া পেছনে এসে দাঁড়ালো। পুতুলকে বুকের মাঝে নিয়ে বলে আমরাও এভাবেই মিলে যাবো একে অপরের সাথে।
‘পুতুল সামনের দিকে ঘুরে পরশকে জড়িয়ে ধরলো পরশ আবার পুতুলকে কোলে তুলে নিয়ে,রুমে চলে আসলো।পুতুলকে বেডে শুয়ে দিয়ে আদরে ভরিয়ে দিতে লাগলো।
কি করছো এই সকাল বেলা?
বিয়ের পর বউকে আদর করতে সকাল বিকেল লাগে নাকি? বিয়ের পর যখন খুশি তখন আদর। আর এখন তো আমরা হানিমুনে মানে বুঝতে পারছো বৌজান,চব্বিশ ঘন্টার বাইশ ঘন্টাই আদর।
এই স্নিগ্ধ সকাল যেনো সাক্ষী রইলো তাদের মিলনের। ঘন্টা খানিক পর পুতুল ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে বলে,সারাদিন আমাকেই খাবে নাকি খাবারের ব্যবস্থাও করবে?
‘আমার তো তুই হলেই হয়,তবে যাচ্ছি তোর জন্য কোন খাবরের ব্যবস্থা করতে। আমি না ফেরা পর্যন্ত রুমের দরজা খুলবি না। পুতুলের কপালে চুমু দিয়ে বের হয়ে গেলো।
হঠাৎ জুলিয়া পুতুলের কাঁধে হাত রাখলো। পুতুল চিৎকার দিয়ে বলে, যেওনা প্লিজ।
‘পুতুল এতো রাতে ছাদে কেন?চল নিচে চল।
পুতুল জুলিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে,জানো ও আমাকে বলেছে আমার জন্য খাবার নিয়ে চলে আসবে। তাহলে আসলো না কেন? কেন কেউ পারছে না আমার পরশকে আমার কাছে ফেরত দিতে?আমি মানতে পারছি না।
‘দেখ এটা পলিটিক্স।আমরা জানিওনা আমাদের পরশ জীবিত নাকি।
‘এমন কেন বিচার ব্যবস্থা? আমার মানুষটাকে এভাবে গায়েব করে দিলো!এ কেমন আইন কেমন দেশ? ওতো কেসটা ছেড়েও দিয়েছিলো তারপরেও কেন ওর সাথে এমন হলো?
‘জুলিয়া বলে শান্ত হ বোন।
‘শান্ত হবো!তুমি জানো বিয়ের পর মেয়েদের সবচেয়ে বড় শান্তি স্বামী। মেয়েরা নিজের জন্য না ভেবে স্বামীর জন্য ভাবে। তোমাকেই দেখে ভাইয়ার কত কেয়ার কর তুমি।যত মান অভিমান, ঝগড়া যাহোক দিন শেষে ওই বক্ষে মাথা রাখলে নিমিষেই সব ভুলে যাও। আর আমার সারাদিন যেমন কাটুক রাত হলেই ওই শূন্যতা ঘিরে ধরে। তাকে আমি দু’দিন পেয়েছি ওই দু’দিনের স্পর্শ আজও আমার শরীরে লেপ্টে আছে। আমি মানতেই পারছি না আমার পরশ আর ফিরবে না! হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলেও আমার কলিজা কেঁপে উঠে। মনে হয় দরজার ওপাশে হয়তো আমার মানুষটা আছে।
“না পাওয়ার বেদনার থেকে, পেয়ে হারনোর যন্ত্রণা হয়তো বেশি পোড়ায়!!
” মানুষ মারা গেলে তো কবর থাকে,হঠাৎ মনে ঝড় বইলে কবর দেখে স্বান্তনা দেয়া যায় নিজেকে। কিন্তু আমি কিভাবে স্বান্তনা দেবো!!

🌿সুফিয়া বেগম পলাশ সাহেবকে বললেন, পরশকে খুঁজে বের করার কি কোন উপায় নেই?
‘নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও আমি পরশকে খুঁজে নিয়ে আসতাম,স্পর্শ আর পুতুলের জন্য। কিন্তু আমি কোন ক্লু পাচ্ছি না। শেষবার ওকে সাজেক থেকে পঁচাত্তুর কিলোমিটার দূরে দেখা গেছে। এরপর আর কোন ক্লু নেই। হয়তো,এতোদিনে ও আর জীবিত নেই। মেরে ফেললেও তো লাশটা দিবে?
নিজের হাতে এতো এতো কেস সলভ করে আজ নিজের মেয়ের জামাইয়ের জন্য কিছু করতে পারলাম না।
‘জীবন ভয়ংকর সুন্দর পুতুলের বাবা।আমার মেয়েটা সব পেয়েও নিঃস্ব। কখন কারো সাথে এমন না হোক। গুম,খুন যারা করে,তাদের কি পরিবার নেই?কখনো কি ভেবেছে তারা, এরপর ওই পরিবার কিভাবে বাঁচে?
মানুষ মারা গেলে আশা ছেড়ে দেয়া যায় ফিরে না আসার। আমার মেয়েটাকে তো সেই স্বান্তনাও দিতে পারছি না।

সমাপ্তি

আসসালামু আলাইকুম। সবাইকে অনেক ভালোবাসা এতোদিন ধৈর্য ধরে সাথে থাকার জন্য। আর হ্যা আমি এন্ডিং এভাবেই ভেবে রেখেছিলাম। সব পরিণয় সুখের হয় না।জীবন জুড়ে জড়িয়ে থাকে এমন কত শত ব্যথা।আমাদের আশেপাশে কতজন গুমড়ে কাঁদে অথচ আমরা টেরও পাইনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here