তবু মনে রেখো পর্ব ৪

0
90

#তবু_মনে_রেখো
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব_৪

এক শহুরে বাউন্ডুলে ছেলে গ্রামের নিতান্তই সাধারণ মেয়ের মাঝে আবদ্ধ হয়ে গেল। কথায় আছে না! কিশোরী মনের আবেগ কোন বাঁধা মানে না। তাই তো সন্ধ্যাও একই পথে হেটেছে। হাজার শিকলের মধ্যে বাঁধা থেকেও সেও মনের অজান্তে কিশোরী মনটাকে প্রাধান্য দিয়েছে যেটা সে চাইনি। তবে হয়ত তাদের এই পথচলা লেখা ছিল তাইতো না চাইতেও দুজন মানব মানবী পার্শ্বকিছু চিন্তা না করেই নিজেদের মনকে এক অবৈধ বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলল।

সন্ধ্যা এপাশ ওপাশ পাশ ফিরলো। হারিকেনের হলদে মিটমিট আলোয় সন্ধ্যার ঠোঁটে হাসি লেগে আছে। মুহিবের কথা ভাবতে ভাবতেই চোখের পলকে মাঝরাত হয়ে গেল। কেন জানি, ছেলেটার কথা ভাবতে গেলেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠে। হয়ত কেউ একজন তাকে এতটা প্রাধান্য দেয় সেটা ভেবেই। সন্ধ্যা ঘুমন্ত কুসুমের দিকে একবার তাকালো। কী সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে! কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। সন্ধ্যা হারিকেনটা নিয়ে টেবিলের ধারে বসে পড়ল। টেবিলের সামনাসামনি জানালাটা খুলে দিল। খোলা জানালা দিয়ে ফুলের মিষ্টি ঘ্রান ভেসে আসছে। ঘরের পাশেই নিম গাছ আছে। এই নিম গাছের ফুলের স্নিগ্ধ মোহময়ী ঘ্রানটা সন্ধ্যার ভারী পছন্দ। আঁধারে চারদিক থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে। জোনাকিরা রাতের আঁধারে তাদের হলদে আলোয় অন্ধকারের মাঝে তাদের সৌন্দর্যের কিরণ ছড়াচ্ছে।সন্ধ্যা ব্যাগের কোন থেকে কুসুমের হাতে দেওয়া চিঠিখানা খুলল। মুহিবের হাতে দেওয়া এটাই তার প্রথম চিঠি। কথায় আছে না! প্রথম যেকোনো কিছুই সুন্দর! সন্ধ্যা হারিকেনের মিটমিট আলোতে চিঠিখানার উপর হাত বুলিয়ে দিল। এরপরেই চিঠিখানা খুলে পড়তে আরম্ভ করলো,

“কী সম্বোধন করবো! আমি এখনো তোমার নাম জানি না কিন্তু সেদিন পূর্ণিমার আলোতে মনে হয়েছে চাঁদের প্রতিচ্ছবি দেখলাম। শহুরে ছিলাম বিধায় শখের বশে অনেকবার চিঠি লেখা হয়েছে পরিবার আর বন্ধুদের কিন্তু আজকেরটা ভিন্ন। কেন জানি শব্দ গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। তবুও লিখতে বসলাম। যেটাই লিখছি না কেন মনে হচ্ছে আমি তাল হারিয়ে ফেলছি।
প্ৰিয়!
কোনো এক কালবৈশাখীর বিকালে, যখন চারদিকটা নিকষ কালো আঁধারে ঢেকে যাবে, রাস্তার সবাই খুব তাড়া নিয়ে বাড়ি ছুটবে, তখন তুমি আর আমি পাড়ার সালাম চাচার চায়ের দোকানে খুব আরাম করে বসে চা আনতে বলবো। সালাম চাচার চা খেয়েছো? স্বাদ অনেক। সেই একসাথে চা পান করার মুহূর্তের সঙ্গী কী হবে? যেমনটা করে মুহূর্তেই কালো আকাশের বুক ছিঁড়ে আলোর বিকিরিত হবে আর তোমার চেহারার মুচকি হাসিটা নিঃশব্দে বলবে,’আমি আছি।’ তখন আমিও হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিবো। বৃষ্টি ভেজা-সোদা মাটির ঘ্রানটা নাকে আসবে। তুমি আমাকে তোমার ওই সুন্দর চোখ দিয়ে আশ্বাস দিবে যেন তোমার চোখ দুটো বলে উঠবে,’এভাবেই সঙ্গিনী হয়ে রয়ে যাবো।’
কী পারবে? তোমাকে মুক্ত পাখির মতো রাখবো। কোনোদিন কী সেই সময়টাতে এভাবে স্বাধীনভাবে বৃষ্টি ভেজা সোদা মাটির গন্ধ নিয়েছো!
যখন পাহাড়ের অলিতে গলিতে সন্ধ্যা নামবে, টুপটাপ শিশিরেরা ঝরে পড়বে পাতার আগায় ঠিক তখনই কুয়াশার আড়াল ভেদ করে দেখা যাবে দুজন কপোত-কপোতী হাত ধরে হেঁটে আসছে। সেই দুজন কী আমরা হবো?
আমার সব সুখ তোমার কাছে এনে দিবো। তুমি কী আমার ভালো-মন্দের সবকিছুর সাথী হবে?
পারবে কী সঙ্গিনী হতে?
উত্তর পাওনা রইল। নয়তো ভোর বেলায় একটিবার বের হইয়ো।
নাম দিলাম না।”

চিঠিটা পড়েই সন্ধ্যার ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা দেখা দিল।যেন তার হাসিটা বলছে, হ্যাঁ, এভাবেই রয়ে যাবো। সন্ধ্যা চিঠিটা এই নিয়ে পাঁচবার পড়েছে কিন্তু তার মন ভরছে না। আশ্চর্য! প্রতিটা শব্দ তার কাছে এতো আপন মনে হচ্ছে কেন!
ভোর বেলায় সন্ধ্যা নামাজ পড়ে আজ আবারো অনেকদিন পরে সেই জায়গায় এসে দাঁড়ালো। আধারের মাঝে কুয়াশায় ঘেরা হওয়াতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না কিন্তু তবুও সন্ধ্যার এই সময়টা ভালো লাগে। শীত শীত অনুভূতি হয়। সে চোখ বন্ধ করে ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে লাগাতেই তার মনে হলো পাশে কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে। সে ভয়ে চোখ খুলতেই দেখল মুহিব দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা তাকালো। এই প্রথম লোকটিকে একদম কাছ থেকে দেখছে যে লোকটা তাকে এক পলক দেখার জন্য তীব্র শীতের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকে। এতটা গুরুত্ব তাকে কেউ কোনোদিন দেয়নি তাই হয়ত এতো মায়া অনুভব হয় তার প্রতি । সন্ধ্যা উড়না ভালোমতো চেপে সরে আসলো। সরেই আশেপাশে তাকালো।
মুহিব হাসলো। বলল,’ভয় নেই, এই সময়ে কেউ থাকে না তুমি জানোই।’
‘আপনি!’
‘উত্তর পেয়েছি তাই এসেছি।’
‘এই ঠান্ডার ভেতরে এভাবে এখানে দাঁড়ান কেন?’
‘তোমার দেখা পাওয়ার লোভে।’
‘ঠান্ডা লাগে না?’
‘তোমাকে দেখার তৃষ্ণাতে সবকিছু সয়ে যাই।’ মুহিবের শান্তস্বরে বলা কথাটায় সন্ধ্যা কী যেন খুঁজে পেল! এতটা গুরুত্ব সে!

সন্ধ্যা জবাবে কিছু বলল না। মুহিব তাকালো,
‘ জানো?তুমি পূর্ণিমার মতো সুন্দর!’
‘গল্পের ডায়লগ বলবেন না।’
‘তুমি গল্পের বইও পড়ো?’ মুহিবের কণ্ঠে অবাকের রেশ।
‘হ্যাঁ পড়ি।’
‘বাহ্!এই যুগে আমার গ্রামে এমন একটি মেয়ে আছে আমি ভাবতেও পারিনি।’
সন্ধ্যা চুপ রইল। মুহিব অদুরের কুয়াশায় ঘেরা ধান খেত গুলোর দিকে দৃষ্টি দিল।
‘সন্ধ্যা ! তোমাকে আমি ভালোবাসি।’
‘আপনার আর আমার স্থান আলাদা।’
‘ভালোবাসার মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই।’
‘সমাজ তো আছে।’
‘সমাজ থাকবেই। সেটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হোক, সমাজ বলবেই।’
‘কিন্তু আমি চাই না কোনোটার প্রভাব পড়ুক।’
‘ঠিকাছে তোমার কথায় হবে। অবশ্যই তোমার মতামতকে সম্মান জানাই।’

ইতিমধ্যে ভোর ফুটতে শুরু করেছে। চারদিক আস্তে আস্তে আলোকিত হচ্ছে।
সন্ধ্যা ঘরের দরজার দিকে তাকালো। মা উঠার সময় হয়ে এসেছে। সে চলে যেতে নিলে মুহিব পথ আটকায়। বলল,

‘ আমি খুব তাড়াতাড়ি পরীক্ষা শেষ করে তোমার কাছে আসবো। তোমাকে নিজের সাথে বাঁধিয়ে নিবো।’
সন্ধ্যা পা বাড়ায়। অর্ধেক পথ এসেই হেসে ফিরে তাকায় মুহিবের দিকে।
——-
মুহিব নিস্তব্ধতায় ঘেরা রাত উপভোগ করছে। এমন সময়
কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে মুহিব ফিরে তাকিয়ে আবারো সামনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
‘তুই?’

‘হ্যাঁ, মামা।’
মুহিব সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। হারুন বলল,
‘ইদানিং আমারে আর খুঁজোই না তুমি!কী ব্যাপার?’

মুহিব হাসলো।
‘তুই একা একা মুচকি হাসতেছস? ক্যান বল তো?’
‘কী মনে হচ্ছে?’ মুহিব হারুনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।

তার প্রশ্নের ধরণ বুঝতে পেরে হারুন চমকালো,
‘মামা প্রেমে পড়ছো তাই না? খেয়াল করতাছি সব।’
পরমুহূর্তেই হারুন আবারো বলে উঠল,
‘দেখাবা না?’
‘ প্রেমে ধরা যায় না। সে যে লজ্জাবতী!তবে হ্যাঁ,পেয়েছি তো অবশ্যই। আবার আসবো। তখন দেখাবো।’

হারুন খুশি হলো। তার ভাই সমান বন্ধু প্রেমে পড়েছে!
মুহিব তাকালো হারুনের দিকে। সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো,
‘তোকে এমন খুশি লাগছে কেন?’
হারুন মাথা চুলকালো। তা দেখে মুহিব আড়চোখে তাকালো
‘কী ব্যাপার?’

‘এই গ্রামে এক মাইয়া আছে, তারে আমার লাগবো।’

মুহিব বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। বলল,
‘তাহলে বলে দেয়।’

‘মাইয়ার তেজ আছে বহুত। যেমন তেজ তেমন সুন্দরী।’
‘এ এমন কী মেয়ে!’
‘তুই দেখলে তুইও প্রেমে পড়ে যেতিস মামা। এমনই সুন্দর সে।’
মুহিব হারুনের কথায় হাসলো। সে মনে মনে আওড়ালো,’আমি তো শুধু তার মাঝেই আবদ্ধ আর কারোর প্রতি না।’

হারুন আবারো বলল,
‘শা’লা বাপটা এমনভাবে পালতাছে বোঝাই যায়নি। সুন্দরীর লগে তেজি ভাবটাও আইনা দিছে।’

মুহিব হারুনের দিকে তাকালো। সে স্বাভাবিক কণ্ঠে শুধালো,
‘মেয়েমানুষের তেজ থাকবে স্বাভাবিক। তাই বলে উল্টাপাল্টা কিছু করবি না। রাজি না হলে নেই। সবার একটা মত থাকে।’

মুহিবের কথায় হারুন হাসলো।
‘রাজি নাহলে নেই এটাতো হইবো না। রাজি হইতেই হইবো। যেকরেই হোক। তুই দেখলে বুঝতি।’

‘আমার দেখার সময় নেই। পরেরবার আসলেই তোকে চাচাকে বলে বিয়ের ব্যবস্থা করবো। তারপরই তুই ঠিক হবি।’
মুহিবের কথায় হারুন হাসল। মুহিব যতটা সহজভাবে নিচ্ছে বিষয়টা তো ততটা সহজ না।

#চলবে ইন শা আল্লাহ।
(আসসালামু আলাইকুম। ভুল ভ্রান্তি ক্ষমার নজরে দেখার অনুরোধ। অগোছালো হওয়ার জন্য দুঃখিত।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here