টক ঝাল মিষ্টি পর্ব ১৩

0
102

#টক_ঝাল_মিষ্টি
#তামান্না_আঁখি
#পর্ব-১৩

শাহাদ তার সামনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে। লোকটার মুখ সাদা একটা কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো শুধু চোখ দুটো দৃশ্যমান।শাহাদ লোকটার চোখের দিকে তাকালো। এই দৃষ্টি তার অবচেতন মনকে সচেতন হওয়ার ইংগিত দিচ্ছে। হঠাৎ লোকটা তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে রি*ভলবার বের করে শাহাদের দিকে তাক করলো।শাহাদ চমকে গেলো। তাকে আরো চমকে দিয়ে লোকটা ট্রিগার টিপে দিলো। ট্রিগারে আঙুল দেয়া মাত্রই শাহাদ লোকটার কবজি ধরে হাতটা উপরে তুলে ফেললো।যার ফলে গু*লিটা হলো আকাশের দিকে। গু*লির শব্দে চারপাশের সব থেমে গেলো। লোকটা গু*লি মিস হতেই অপর হাত দিয়ে ঘুষি দিলো শাহাদকে।শাহাদ কিছুটা টলে গেলো, রিভলবার ধরে রাখা হাত টা আরো চেপে ধরে পা দিয়ে প্রবল গতিতে লোকটার হাঁটু বরাবর আঘাত করলো। পায়ে আঘাত পেয়ে লোকটা হাঁটু ভেঙে কিছুটা নিচু হয়ে গেলো।নিচু হয়ে প্রবল আক্রোশে সে আবারো শাহাদকে গু*লি করতে চাইলো তবে রি*ভলবার ধরে রাখা হাতটা শাহাদের আয়ত্ত্বে থাকায় এবারের গু*লিও মিস হলো। শাহাদ এইবার ঘুষি দিলো লোকটার মুখে। পায়ের আ*ঘাতে আগে থেকেই ধরাশায়ী ছিলো এইবার মুখে আ*ঘাত পেয়ে মাটিতে ছিটকে পড়লো।হাত থেকে রি*ভলবার টা ফসকে গেল।
পুরো এরিয়াতে গন্ডগোল লেগে গেছে।ছেলেরা সব চিৎকার করছে, কোথা থেকে গু*লিটা এসেছে সবাই তা নির্ধারন করে সেদিকে ছুটতে ব্যস্ত।গার্ডরা কয়েকদফা ব্রাশ ফা*য়ার করলো। সব গেস্টরা যেন ঘটনাস্থলে না যেতে পারে তাই তাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে আটকে রাখা হলো।

মাটিতে পড়ে গিয়ে লোকটা আরো ক্ষেপে গেলো।শাহাদ লোকটার দিকে হাটু ভেংগে বসলো।হাত দিয়ে মুখের কাপড়টা সরাতে নিলে পাশে পড়ে থাকা একটা ভাঙা ইট তুলে শাহাদকে আঘাত করলো। শাহাদ “আহ” শব্দ করে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লো। গার্ডগুলো ততক্ষনে চলে এসেছে। দূর থেকে শাহাদকে আঘাত করতে দেখে লোকটার আশেপাশে গু*লি করলো তারা। আগন্তুক লোকটা পালানোর জন্য উঠার চেষ্টা করে দাঁড়ালো কিন্তু হাঁটুতে শাহাদের করা আঘাতের জন্য তার পক্ষে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে গেছে দৌড়ানো তো অনেক পরের ব্যাপার।গার্ডগুলো এসে লোকটাকে ঘিরে ব*ন্দুক তাক করে চারপাশে দাঁড়ালো। কয়েকজন গিয়ে শাহাদকে তুললো।জিজ্ঞেস করলো-
“স্যার,আর ইউ ওকে?”

শাহাদ এক হাত কপালে চেপে অন্য হাত উঠিয়ে যন্ত্রনাজড়িত কন্ঠে বললো-
“ইয়াহ আ’ম ওকে।”

তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল-
“এর মুখের কাপড় সরাও।”

একটা গার্ড কাপড় সরালো। বাইশ -তেইশ বছরের একটা ছেলে, তার চোখেমুখে হতাশার ছাপ।হয়তো শাহাদকে খু*ন করতে পারেনি বলদ হতাশ।শাহাদ ছেলেটির চোখের দিকে তাকালো। চোখে পানি টলমল করছে। মুখে আক্রোশ থাকলেও চোখ দুটোতে গভীর বিষাদ লুকিয়ে আছে।তমালসহ অন্য সব ছেলেরা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলো।তারা একদম বাড়ির কোনার দিকের বাগানে বসে মজামাস্তি করছিলো তাই আসতে সময় লেগেছে।তমাল দৌড়ে এসে চোখ বড় বড় করে বলল-

“ভাই তোমার কপাল থেকে র*ক্ত পড়ছে।”

তারপর ছেলেটির দিকে তেড়ে গিয়ে ছেলেটির কলার চেপে বললো-
“কু**ত্তার বাচ্চা তোরে কে পাঠাইছে বল?”

একটা ছেলে এসে শাহাদকে রুমাল দিলো।শাহাদ রুমাল কপালে চেপে ধরে বললো-
“তমাল ছাড় ওকে।”

তমাল ছেড়ে দিলো লোকটাকে।ছেড়ে দিয়ে শাহাদের কাছে এলো। শাহাদ গার্ডগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“ওর মুখটা ঢেকে নিয়ে যাও, আউটহাউজে আটকে রাখো। কেউ যেন ওর খবর না জানে।”

রেজিয়া সুলতানার কন্ঠ শোনা যাচ্ছে, উনি শাহাদের নাম ধরে ডেকে ডেকে এদিকেই আসছেন।শাহাদ গার্ডগুলোকে ইশারা দিয়ে চলে যেতে বললো। গার্ডগুলো লোকটার মুখ ঢেকে নিয়ে চলে গেলো আউটহাউজের দিকে। রেজিয়া সুলতানার সাথে আশফাক খান আর আব্দুল গাফফার খানকেও দেখা গেলো। সবাই চিন্তিত ভঙ্গিতে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছে।বাড়ির এই দিকে হলুদের স্টেজ হওয়ায় দূর থেকে এই দিকটা দেখা যায় না।হলুদের স্টেজটার পিছন দিক দিয়ে এদিকে আসতে হয়। রেজিয়া সুলতানা শাহাদকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে আসলেন। ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন-

“কি করেছে তোকে? র*ক্ত কেন? কোথায় গু*লি লেগেছে?”

শাহাদ কপাল থেকে রুমালটা সরিয়ে দেখিয়ে হাসিমুখে বললো-
“কপালটা একটু কেটেছে মা।গু*লি লাগেনি।”

রেজিয়া সুলতানার চোখ টলমল করছে।গু*লাগু*লির শব্দ শুনে এখানে আসার পথে শাহাদের ক্ষতি হয়েছে এমন কুচিন্তাই মাথায় এসেছে শুধু।এখন নিজ চোখে শাহাদকে ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি দম ফেললেন। শাহাদের হাসি দেখে শাহাদের গালে একটা আস্তে করে চড় মেরে বললেন-
“হাসছিস কেন? এইভাবে এই নীরব জায়গায় আসতে কে বলেছে? এদিকটাই মানুষ কম দেখিস নি?”

মায়ের চড় আর বকুনি খেয়ে শাহাদের হাসি আরো বিস্তৃত হলো।আশফাক খান ধমকে বললেন-
“হাসি বন্ধ করো।তোমাকে আমি অনেকবার বলেছি সাবধানে থাকতে। এখন থেকে তুমি গার্ড ছাড়া কোথাও যাবে না।”

আব্দুল গাফফার বিরক্ত হয়ে বললেন-
“তোরা দুজন বাবা মা মিলে আ*হত ছেলেটাকে বকছিস কেন?”

আশফাক খান বাবার কথায় থেমে গেলেন। প্রশ্ন করলেন-
“হামলাকারী কোথায়?”
“ওকে আউটহাউজে আটকে রাখা হয়েছে বাবা।”
“চিনতে পেরেছিস?”
“না”।

রেজিয়া সুলতানা ভালো করে শাহাদের ক্ষত পরিক্ষা করে বললেন-
” ঘরে চল,তোর ট্রিটমেন্ট নিতে হবে।”
” গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ করে যাই।”

রেজিয়া সুলতানা চোখ কপালে তুলে বললেন-
“এই অবস্থায় তুই গায়ে হলুদ করবি?”
“অনেকেই আমাকে হলুদ দেয় নি মা। একবারই যেহেতু বিয়ে করছি, তাদেরকে হলুদ দেয়া থেকে বঞ্চিত করা উচিত হবে না।”

রেজিয়া সুলতানা বিস্ফোরিত চোখে তাকালেন ছেলের দিকে। আশফাক খান ছেলের এমন খাম খেয়ালিপনায় বেশ বিরক্ত হলেন।খুশি হলেন আব্দুল গাফফার খান।নাতির কাঁধ চাপড়ে নাতিকে এই বিষয়ে পূর্ন সাপোর্ট দিলেন তিনি।দাদার সাপোর্ট শাহাদ তার হতভম্ব বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে চমৎকার করে হাসলো।

———–

কুহুদের বাড়িতে বেশ জমজমাট ভাব। রাতের অন্ধকারে কুহুদের বাড়িটা লাল নীল লাইটের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। বাড়ির ভিতর মেহমান দের আনাগোনায় মুখরিত। মোয়াজ্জেম হোসেন তার ঘরে সোফায় বসে চিন্তিত মুখে ফোন কানে ধরে কথা বলছেন, তার সামনে বসে আছেন শিরিনা বেগম। কিছুক্ষন পর ফোন কান থেকে নামিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন বললেন-
” আশফাক বললো তেমন কিছু হয় নি। শাহাদ আ*হত হয়েছে শুধু।”

“গু*লি লেগেছে শাহাদের?”

“নাহ, গু*লি লাগেনি।”

শিরিনা বেগম চিন্তিত মুখে তাকালেন স্বামীর দিকে।প্রশ্ন করলেন-
“মেয়েটাকে এসবের মাঝে না জড়ালে হতো না? ও তো এমনিতেও রাজনীতি পছন্দ করে না।তোমার কথায় বিয়ে করতে রাজি হয়েছে।”

“আশফাক আমার বন্ধু।ওর ছেলে আমার দেখা অন্য সব ছেলের থেকে দায়িত্বশীল। নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও আমার মেয়েকে রক্ষা করবে। অন্য পরিবারে বিয়ে দিলে যে মেয়ের ওখানে অযত্ন হবে না তা কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছ? এখানে আমার মেয়ের অযত্ন হবে না।এক মাত্র মেয়েকে আমি জেনে বুঝেই বিয়ে দিচ্ছি।”

“মেয়েটা এসব সহ্য করতে পারবে তো? জীবনে এসব দেখেনি। বিয়ের আগের দিন হবু স্বামীর এমন খবর সহ্য কর‍তে পারবে?”

“ওকে জানাবে না এসব।বিয়ে বাড়ির কোনো লোকই যেন না জানে।যদি লোকমুখে জেনেও যায় তবে গুজব বলে উড়িয়ে দেবে।”

শিরিনা বেগম চিন্তিত মুখে মাথা নাড়লেন। এই ঘরের বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে কুহু সব শুনলো
সব কিছু পেরিয়ে সিড়ি দিয়ে নিজের ঘরে যেতে লাগলো।মাঝ সিড়িতে আসতেই তার মেঝ খালার সাথে দেখা হলো।তিনি পায়েস বানানোর জন্য চাল ডালায় করে নিয়ে নিচে যাচ্ছিলেন। কুহুকে আটকে বললো-
“কিরে মুখটা শুকিয়ে আছে কেন?খাস নি?”

কুহু উত্তর দিলো না। মেঝ খালা আবার বললেন-
“ঘরে যা, আমি তোর জন্য পরোটা মাংস পাঠাচ্ছি।”

কুহু ঘরে আসলো।তার ঘরের বিছানায় তনয়া সহ তার সব কাজিনরা শুয়ে বসে যে যার মতো আড্ডা দিচ্ছে। ঘরের এদিক ওদিক ফুলসহ শাড়ি গয়না ছড়ানো ছিটানো।কুহু চার্জ থেকে মোবাইলটা নিয়ে বারান্দায় চলে এলো। বারানদার দরজা লক করে দিয়ে কল করলো শাহাদকে। দুবার রিং হতেই রিসিভ হলো।ওপাশ থেকে ভেসে আসলো ভারী পুরুষালি কন্ঠ-
“কুহু।”

গম্ভীর রসকষহীন কন্ঠ অথচ কত দরদ দিয়ে ” কুহু” নামটা উচ্চারন করলো।এমন ডাকে কুহুর সারা অঙ্গ হালকা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো।সে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো-
“আপনাকে নাকি গু*লি করা হয়েছে?”

ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ এলো না।কিছুক্ষন পর হালকা হাসি ভেসে আসলো।জিজ্ঞেস করলো-
“কে বলেছে?”

“আমি শুনেছি।”

“মানুষ গুজব ছড়াচ্ছে।”

“আমি শুনেছি আপনি আ*হত হয়েছেন।এটাও গুজব?”

“নাহ এটা গুজব না। ডেকোরেশনের একটা পিলারে লোহার সাথে লেগে কপাল লেগে কেটে গেছে। এই আর কি।”

“মিথ্যে বলছেন?”

পুরুষালি কন্ঠের হাসি ভেসে আসলো। হো হো করে হাসছে যেন কুহু খুব মজার কিছু বলেছে। চাপা অভিমানে কুহুর চোখে পানি এলো এলো ভাব। হাসি থামিয়ে ওপাশ থেকে বললো-
“আপনার কি চিন্তা হচ্ছে কুহু? চিন্তা করবেন না।সত্যি বলছি আমাকে কেউ গু*লি করেনি।”

শাহাদের সরল কন্ঠে বলা কথাটা কুহুর বিশ্বাস হলো। তার চিন্তা দূর হয়ে মুখটা উজ্জ্বল হলো। জিজ্ঞেস করলো-
“এখন কেমন আছেন?”

“ভালো।তবে বিয়ের দিন ভালো থাকব কিনা বলা যাচ্ছে না।শরীর খারাপ থাকলে বিয়ে করতে আসব না,আমার বদলে অন্য কাউকে পাঠাব,প্রক্সি হিসেবে।”

কুহু চিৎকার করে বলল-
“কিহ?”

আবার হাসির শব্দ শোনা গেলো। হাসি থামিয়ে বললো-
“আই ওয়াজ কিডিং কুহু। আমি আসব। এখন তাহলে রাখি কাল দেখা হচ্ছে।গুড নাইট।”

কলটা কেটে গেলো। কুহুর মুখ জুড়ে এক অভিমান মিশ্রিত হাসি ছড়িয়ে পড়লো। শাহাদের উপর রাগও হচ্ছে আবার অন্যরকম এক অনুভূতিতে শরীর মন আন্দোলিতও হচ্ছে।

————-

শাহাদ কল কেটে জানালার কাছ থেকে সরে এলো। ফোনটা পকেটে রেখে ঘরের মাঝখানে রাখা চেয়ারটায় বসলো। তার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে আসিফকে, তার হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা।শাহাদ আর আসিফকে ঘিরে কয়েকজন গার্ড আর দলের ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে। আসিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলো শাহাদ, কুহুর কল আসায় তাকে বিরতি দিতে হয়েছে। শাহাদ চেয়ারে আরাম করে বসলো।তার কপালে সাদা ব্যান্ডেজ প্যাচানো, ক্ষতের জায়গাটায় ব্যান্ডেজটা কিছুটা লাল হয়ে আছে। শাহাদ আসিফকে প্রশ্ন করলো-

“তো নাইমুর তোমাকে পাঠিয়েছে আমাকে মা*রতে?”

আসিফ মাথা নাড়লো। শাহাদ প্রশ্ন করলো-
“নাইমুরকে এই কাজের আদেশ কে দিয়েছে?”

“আমি জানি না।”

আসিফের উত্তরে তমাল গর্জে উঠলো।তেড়ে এসে বললো-
“এই কু*র বাচ্চা, সত্যি করে বল।নয়ত তোকে পুঁতে দেব।”

শাহাদ তমালকে থামিয়ে বললো-
“তমাল থাম, ওকে আঘাত করবি না।তুমি আমাকে সব বল আমি তোমাকে ছেড়ে দিব।”

আসিফ ধরা গলায় বলল-
“আমি ছাড়া পেতে চাই না,আমায় মে*রে ফেলুন।”

উপস্থিত সবাই বিস্মিত হলো।শাহাদের ভ্রু কুচকে গেলো। প্রশ্ন করলো-
“কেন?”

“এখান থেকে বেঁচে ফিরলে নাইমুর আমাকে সহ আমার বউ বাচ্চাকেও মে*রে ফেলবে।এর চেয়ে ভালো শুধু আমাকে মে*রে ফেলুন।”

শাহাদ কিছুক্ষন আসিফের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর আসিফের দিকে ঝুঁকে আসিফের কাঁধে হাত রেখে বলল-
“আমাকে সব খুলে বল আমি তোমাকে সাহায্য করব।”

আসিফ হঠাৎ ভেঙে পড়লো। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ভেজা গলায় বলল-
“আমাকে কেউ সাহায্য করতে পারবে না, আপনিও না।আমি চাঁদা বাজি, ছিনতাই করি। ইলেকশনের সময় টাকা খেয়ে দুই দলের মধ্যে ক্যাচাল লাগাই,মাঝে মাঝে দুই একজনকে গু*লি করে দা*ঙ্গা সৃষ্টি করি।নাইমুরের সাথেও কয়েকটা কাজ করেছি।একসময় ভালোবেসে বিয়ে করলাম।সন্তানের বাবা হলাম। তখন বউ বাচ্চার কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম এই রাস্তা থেকে সরে আসব। আস্তে আস্তে নাইমুরের সাথে দূরত্ব বাড়ালাম। কিন্তু নাইমুর আমাকে শেষ একটা কাজ করার কথা বলে ডাকলো। অনেক টাকার কাজ।বউ বাচ্চাকে ভালো রাখার জন্য লোভে পড়ে গেলাম। যখন শুনলাম এই কাজ তখনি আমি বুঝে গেছিলাম এখান থেকে বেচে ফিরা সম্ভব না, আর বেচে ফিরলেও নাইমুর আমাকে বাচতে দিবে না।”

“তাহলে তুমি নাইমুরকে না করে দিতে পারতে যে তুমি কাজ করবে না।”

“না করার সুযোগ নেই।নাইমুর কাউকে কাজ অফার করেছে মানে হয় তা গ্রহন করো নয়ত আজ নাহয় কাল লা*শ হও।কাজ পাওয়ার পর থেকে আমি আমার বউ বাচ্চার সাথেও যোগাযোগ করি নি, যাতে নাইমুর আমার বউ বাচ্চাকে ছাড় দেয়। যেহেতু আমি এই রাস্তা ছেড়ে দিতে চাই তাই সে প্রমান রাখবে না। প্রমান না রাখার জন্য আমাকে সহ আমার বউ বাচ্চাকেও মেরে ফেলবে। ”

আসিফ কান্নায় ভেঙে পড়লো। শাহাদ চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসলো।নাকের ডগা তর্জনি দিয়ে ঘষতে ঘষতে আসিফের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো।তমাল একবার শাহাদের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। শাহাদের এইভাবে শান্ত হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা তার অস্বস্তিকর লাগে। মনে হয় শাহাদ যেন ভিতরের সব পড়ে ফেলছে। তবে অপর ব্যক্তি অস্বস্তিতে ম*রে গেলেও শাহাদের কিছু যায় আসে না,সে তাকিয়েই থাকবে।এভাবে তাকিয়ে থাকার দায়িত্ব নিয়েই যেন সে জন্মেছে।

শাহাদ উঠে দাঁড়ালো চেয়ার থেকে।একজনকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“ওর হাত খুলে দে।”

তারপর আসিফকে বললো-
“আমার কয়েকটা লোককে দিচ্ছি তোমার সাথে।গিয়ে বউ বাচ্চা নিয়ে এসো। কাল। আমার বিয়ে।এঞ্জয় করো পরিবার নিয়ে।”

আসিফ বললো-
“আমাকে সাহায্য করার কারন কি?”

“দুনিয়ায় কোনো কিছুই ফ্রি না।আমি তোমাকে সাহায্য করছি বিনিময়ে তুমি আমাকে সাহায্য করবে। দ্যাটস ইট।”

তমাল এগিয়ে এসে বললো-
“ভাই ওকে ছেড়ে দিলে যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে।”

“করবে না।ও এতদিন নাইমুরের দলে থেকেছে। বিশ্বাসঘাতকদের নাইমুর কি শাস্তি দেয় তা তুমি জানো আসিফ, তাই না?এরকম শাস্তি আমিও দিতে পারব।”

আসিফ কিছু বললো না।সে তাকিয়ে রইলো।শাহাদ আউটহাউজ থেকে বের হয়ে গেলো। বাড়িতে ঢুকে ড্রয়িং রুমে দেখা হলো রাহাতের সাথে।সে ফোনে কথা বলছিলো।শাহাদকে ইশারায় থামতে বলে ফোনে কথা বলা শেষ করলো। ফোন পকেটে রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কিছু বের করতে পারলে।”
“পেরেছি।”
“গুড।বাবা কল দিয়েছিলো। বাবারও একই মত,বিরোধী দলের কেউই তোমার উপর হামলা করিয়েছে।”

শাহাদ সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়লো।জিজ্ঞেস করলো-
“আংকেল আন্টি কখন আসবেন।”

“আর আধা ঘন্টার মাঝেই চলে আসবেন।বাবার একটা সেমিনারে যোগ দেয়ায় দেরি হয়ে গেছে।চল যাই,শ্বশুর আব্বা আমাদের ডেকেছেন।”

রাহাত আর শাহাদ আশফাক খানের স্টাডিতে ঢুকলো।সেখানে দলীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত।সবাই সোফায় বসে আলোচনায় ব্যস্ত।শাহাদ আর রাহাত এক পাশে হাত সামনে এনে বিনয়ের সাথে দাঁড়ালো। একজন বয়স্ক নেতা শাহাদকে জিজ্ঞেস করলো-
“ওই ছেলেটাকে পুলিশে দিচ্ছ না কেন?”

শাহাদের উত্তর-
“ছোটখাটো ব্যাপারে পুলিশ জড়াতে চাই না।”

আশফাক খান খেঁকিয়ে উঠলেন-
“এইটা ছোটখাটো ব্যাপার? এমপির বাড়িতে ঢুকে তার ছেলের উপর গু*লি চালানো হয়েছে, এটা ছোটখাটো ব্যাপার?”

“বাবা শান্ত হোন।থানা পুলিশ করলে ব্যাপারটা আরো ছড়াবে,ঝামেলা বাড়বে।সামনে নির্বাচন।এখন থানা পুলিশে না জড়ানোই ভালো। ঘটনাস্থলে কেউ ছিলো না,কেউ ছবি বা ভিডিও ও করেনি তাই আমরা এটাকে গুজব বলে চালিয়ে দেব।তারপরেও যদি মানুষ বিশ্বাস করে তাহলে ভালো, আমরা তাদের সহানুভূতি পাব।”

কয়েকজন সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন।একজন মধ্যবয়স্ক নেতা জিজ্ঞেস করলেন –
“তাহলে ওই হামলাকারীর কি করবে?”

“ওকে আমার উপর ছেড়ে দিন। আমি সামলাব।”

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here