টক ঝাল মিষ্টি পর্ব ১১

0
94

#টক_ঝাল_মিষ্টি
#তামান্না_আঁখি
#পর্ব-১১

শাহাদ একটা ৭ তলা বিল্ডিংয়ের ছাদের রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পড়নে সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা।পাঞ্জাবির হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা।হাতে মেটালের ঘড়ি আর চোখে সানগ্লাস। শান্ত মুখে সে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বিল্ডিং টা থেকে স্টেশন এরিয়াটা বেশ ভালোভাবে দেখা যায়। বিল্ডিংটার সামনের রাস্তা ধরে বেশ কিছুক্ষন হাঁটলেই স্টেশন। এরিয়াটা লোকসমাগমে পূর্ন, ছাদে দাঁড়িয়ে গাড়ি চলাচলের আওয়াজ পাওয়া যায়। শাহাদ ঘড়ি দেখলো।পাশে সরিয়ে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারটা টেনে এনে রেলিং বরাবর রাখলো।তারপর সেখানে বসে দুপা তুলে দিলো রেলিঙের উপর।চেয়ারে হেলান দিয়ে বুক বরাবর দুহাত ভাঁজ করে চোখ বন্ধ করে আধশোয়া হয়ে রইলো। তমাল শাহাদের জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসলো।সানগ্লাস চোখে থাকায় শাহাদ ঘুমাচ্ছে কিনা বুঝতে পারলো না।সে মৃদু স্বরে ডাকলো-
“ভাই,ভাই।”

শাহাদ চোখ খুলে তাকালো। হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিলো। ওভাবেই বসে থেকে চুমুক দিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ছাদের দিকে তাকালো। তার সাথে আসা ছেলেগুলো ক্রিকেট খেলছে। সময়টা দুপুর পেরিয়ে বিকাল হওয়ার কাছাকাছি। রোদের তেজ কমে এসেছে। এমন সময় ক্রিকেট খেলা মন্দ নয়। শাহাদ ছোট্ট করে চায়ের কাপে চুমুক দিলো। একটা ছেলে ব্যাটে বলে লাগিয়ে ছক্কা হাঁকালো। বল ছুটে এলো শাহাদ বরাবর। শাহাদ এক হাত উচিয়ে খপ করে বল ক্যাচ ধরলো। তারপর সোজা হয়ে বসে ছুঁড়ে দিলো খেলারত ছেলেগুলোর দিকে।তমাল হাঁক ছেড়ে বললো-
“ওই আস্তে খেল।”

মানুষের হট্টগোলের শব্দ শোনা গেলো। তমাল রেলিং ধরে স্টেশন চত্বরের দিকে তাকালো। শাহাদ চেয়ারে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মনোযোগ দিয়ে তাকালো। স্টেশন চত্বরে কতগুলো ছেলেকে আরো কতগুলো ছেলে মা*রতে মা*রতে স্টেশনের কাউন্টার থেকে বাইরে বের করলো। তারপর হঠাৎ করেই মাটিতে ফেলে বিনা নোটিশে এলোপাথাড়ি মা*রতে লাগলো। পাশে একটা লাকড়ি বোঝাই ভ্যান ছিলো।একটা ছেলে দৌড়ে কতগুলো লাকড়ি নিয়ে এসে মা*রতে থাকা কয়েকজনের হাতে তুলে দিলো। এবার শুরু হলো লাকড়ি দিয়ে পিটানো। সবাই ভীড় করে দাঁড়িয়ে মা*রামা*রি দেখছে কিন্তু কেউ থামাতে আসছে না ভয়ে। শাহাদ তমাল কে ইশারা করলো। তমাল ফোন বের করে পুলিশ স্টেশনে কল করলো। মিনিট পাঁচেকের মাঝেই পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেলো দূর থেকে। তমাল জিজ্ঞেস করলো-

“ভাই এখন সিগন্যাল দিব?”

শাহাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তার পিছনে থাকা রাস্তাটার দিকে তাকালো। পুলিশের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। সে গাড়িটাকে আরেকটু এগিয়ে আসার সুযোগ দিলো। তারপর বললো-
“এখন দে।”

তমাল ফোন করলো একটা নাম্বারে। ফোন ধরলো স্টেশনে ভীড়ের মাঝে থাকা একটা ছেলে। ফোনে কথা বলে কল কেটে ভীড় ঠেলে মা*র দিতে থাকা ছেলেগুলোর কাছে গেলো। একজনকে থামিয়ে কানে কানে কিছু বললো। ছেলেটা মা*র থামিয়ে গলা উঁচু করে রাস্তার দিকে তাকালো। পুলিশের গাড়ি দৃশ্যমান হয়েছে। সে তাড়াতাড়ি বাকি ছেলেগুলোকে বিষয়টা জানালো, মুহূর্তের মাঝে সবাই পালিয়ে গেলো। মাটিতে পড়ে থাকলো ৭-৮ টা ছেলে। সবাই র*ক্তাক্ত হয়ে আছে। পুলিশ এসে ভীড়ের মাঝে কিছুক্ষন এদিক ওদিক দৌড়ালো। সাধারণ মানুষ ভয়ে যে যার মতো চলে গেলো। শাহাদ ঘড়ি দেখলো। এখানকার কাজ শেষ করে চলে যাওয়া প্রয়োজন। আজ বিয়ের শপিং করার ডেট। তাকে কাজ শেষ করে শপিং মলে যেতে হবে। সে তমালকে জিজ্ঞেস করলো-
“ওদের আপডেট কি?”

তমাল আবারো কল দিলো। কথা শেষ করে বলল-
“ভাই সবাই -ই নিরাপদ দূরত্বে পালিয়ে গেছে।পুলিশ কাউকে ধরতে পারে নি।”

“গুড।”

শাহাদ উঠে দাঁড়িয়ে ছাদের দরজার দিকে হাঁটা দিলো। ছাদে ক্রিকেট খেলতে থাকা ছেলেগুলো খেলার ইতি টানলো। শাহাদ আর তমালের পিছু পিছু তারাও নেমে এলো বিল্ডিং থেকে।দূরে স্টেশন থেকে চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে।এতে তাদের তেমন আগ্রহী মনে হলো না,তারা হারহামেশাই এসব দেখে অভ্যস্ত।

_________

কুহু শহরের সবচেয়ে বড় শপিং মলটার সামনে এসে গাড়ি থেকে নামলো। তার সাথে নামলো যিয়াদ। বিয়ের শপিং করার জন্য কুহুকে ডেকে আনা হয়েছে। শপিং মলের সামনে দাঁড়ানো একটা ছেলে এগিয়ে এসে বললো-
“ভাবি আমার সাথে আসুন।আপ্পনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে।”

কুহু আর যিয়াদ দুজনেই ছেলেটার পিছু পিছু আসলো। ছেলেটা একটা শাড়ীর দোকানের সামনে এসে দোকানের দরজা খুলে দিয়ে বললো-
“ভিতরে যান।”

কুহু আর যিয়াদ দুজনেই ভিতরে ঢুকলো।রাফা কুহুকে দেখেই হাত নাড়িয়ে ডাকলো-
“ভাবিমনি এইদিকে।”

খান পরিবারের সবার দৃষ্টি ঘুরে গেলো কুহু আর যিয়াদের দিকে। কুহু বেশ বিব্র‍ত অনুভব করলো। লজ্জামিশ্রিত অস্বস্তি নিয়ে হেঁটে গেলো ওদের কাছে।একটা সুন্দরমতো মেয়ে উঠে এসে বললো-
“তুমি কুহু না? বাহ!বেশ দেখতে তো তুমি!! আমি শাহাদের বড় বোন।”

কুহু ব্যস্ত হয়ে সালাম দিলো আনিশাকে।দোকানে বসে থাকা রেজিয়া সুলতানা আর জয়া বেগমকেও বিনয়ের সাথে সালাম দিলো।রেজিয়া সুলতানা ছেলের বউকে দেখে মুগ্ধ হলেন। মেয়েটাকে বেশ লাগে উনার কাছে। বড়দের সামনে শান্তশিষ্ট হয়ে থাকার চেষ্টা করে কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে বেশ চঞ্চল তা বুঝাই যায়।আনিশা কুহুকে টেনে তার পাশে বসালো। যিয়াদ বড়দের সাথে কুশল বিনিময় করে একপাশে গিয়ে বসলো। চোখাচোখি হলো রাফার সাথে।রাফা একটা মুখ ভেংচি দিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।আচমকা এমন ব্যবহারে যিয়াদ হকচকিয়ে গেলো। সে অবাক চোখে রাফার দিকে তাকিয়ে রইলো।রাফা যিয়াদকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করলো। যে ইশারার অর্থ “দু চোখ উপড়ে ফেলব”। যিয়াদের অবাক হওয়া সীমা পেরিয়ে গেলো। সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সিদ্ধান্ত নিলো এমন অকালপক্ব মেয়ের দিকে আর তাকাবে না।

শাড়ি দেখার ফাঁকে কুহু এদিক ওদিক তাকালো। শাহাদকে খুঁজছে সে।কিন্তু পেলো না। শাড়ি সহ সব কেনা হয়ে গেলো তাও শাহাদের দেখা পাওয়া গেলো না। শেষে যখন গয়নার দোকানে কুহু গা ভর্তি গয়না পড়ে ট্রায়াল দিচ্ছে তখন কোথা থেকে শাহাদ এসে উদয় হলো। এসেই তার চোখ পড়লো গয়নার ভারে নুইয়ে পড়া কুহুর দিকে। আশেপাশে দেখলো তার মা চাচী বোন কুহুকে ঘিরে আছে।তাদের যার যেই গয়নাটা পছন্দ হচ্ছে তাই কুহুকে পড়িয়ে ট্রায়াল দিচ্ছে। শাহাদের বেশ মায়া হলো কুহুর কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে। সে এগিয়ে এসে গয়নার দোকানের একটা টুলে বসে পড়লো। দোকানের ম্যানেজার হাসিমুখে এসে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলো। কুহু শাহাদের দিকে একবার তাকালো।চোখাচোখি হলো। আনিশা শাহাদকে ডেকে বললো-
” দেখ তো তোর বউকে কেমন লাগছে। ”

শাহাদ স্থির দৃষ্টিতে কুহুর দিকে তাকিয়ে বলল-
“ভালো।

” শুধু ভালো।আরো কিছু বল।”

“এত গয়না পড়িয়েছো কেন? বিয়েতে এত গয়না পড়ে ও হাঁটবে কি করে?ওর তো এখনি কষ্ট হচ্ছে।এক্ষুনি সব খোলো।”

মহিলারা সবাই মুচকি হাসলো।রাফা গলা বাড়িয়ে বললো-
“তাহলে তুমি ভাবিমনিকে কোলে নিও, তাহলেই তো আর ভাবিমনির কষ্ট করে হাঁটতে হয় না।”

কুহুর গাল দুটো গরম হয়ে গেলো লজ্জায়।চোখ মুখ খিচে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।আনিশা হাসতে হাসতে বললো –
“আহা! আমার ভাইয়ের কত চিন্তা। সব গয়না তোর বউকে বিয়ের দিন ই পড়তে হবে না। এগুলো সব একসাথে কিনে দেয়া হচ্ছে,যখন যখন পড়তে ইচ্ছে করবে তখন পড়বে।বুঝেছিস বউ পাগল!”

শাহাদ হালকা গলা ঝাড়লো।সিদ্ধান্ত নিলো আর কোনো কথা বলবে না। এই মহিলা সমাজের সামনে আর কথা বলা তার উচিত হবে না।যিয়াদকে ইশারা দিয়ে এখানে এসে বসতে বললো।আপাতত সে তার শালার সাথে আড্ডা দিবে।

শপিং করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। তাও সব কেনা হলো না। শাহাদসহ পুরুষদের সবকিছুই বাকি রইলো। তার জন্য আবার আসতে হবে। রেজিয়া সুলতানা ক্লান্ত কন্ঠে বললেন-
“তোদের ছেলেদের কেনাকাটায় আমি আর আসতে পারব না।নিজেদেরটা নিজেরা এসে কিনে নিস।”

রাফা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো-
“আমার ম্যাচিং টিকলি তো কিনা হলো না।আর রিদি যদি ওর জিনিস পছন্দ না করে তাহলে তো আবার আসতে হবে।”

জয়া বেগম বলেন –
“পছন্দ না করলে চড়িয়ে পছন্দ করানো হবে। আর তোর যা লাগবে অনলাইনে অর্ডার দিবি।বিয়ে বাড়িতে হাজারটা কাজ আছে এসবের মধ্যে আর শপিং এ আসার ঝামেলা নিতে পারব না।”

রেজিয়া সুলতানা কুহুকে জিজ্ঞেস করলেন-
“কুহু গাড়ি নিয়ে এসেছো তো?”

“জী। যিয়াদের কোচিং এ ক্লাস আছে।ওখানে ওকে নামিয়ে দিয়ে তারপর আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসবে।”

“তাহলে যিয়াদ গাড়ি নিয়ে যাক, নয়ত ওর ক্লাসের দেরি হয়ে যাবে। তোমায় বরং আমার ছেলে পৌঁছে দিয়ে আসবে।এই শাহাদ এদিকে আয়।”

শাহাদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলো,রেজিয়া সুলতানার ডাকে ফোনে কানে নিয়েই এগিয়ে আসলো।ইশারায় জানতো চাইলো কেন ডেকেছে? রেজিয়া সুলতানা বললেন-

“কুহুকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবি।”

শাহাদ ফোনে হুম হাম করতে করতেই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আবার আগের জায়গায় ফিরে গেলো। যাওয়ার আগে কুহুর দিকে আঁড়চোখে তাকালো। ড্রাইভার সহ সাথে আসা গার্ড এসে শপিং ব্যাগগুলো নিয়ে গাড়িতে রাখলো।সবাই বেরিয়ে আসলো শপিং মল থেকে,গ্যারেজে এসে দাঁড়ালো। শাহাদের কানে এখনো ফোন। রেজিয়া সুলতানা কুহুকে বললেন –
“আমরা তাহলে যাই।শাহাদের সাথে চলে যেও কেমন?”

কুহু মাথা হেলিয়ে সায় দিলো। সবাই কুহুকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো। যিয়াদ এসে বললো-
“ভাইয়ার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকো।আমি গেলাম।আমার ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে।”

যিয়াদও চলে গেলো।পুরো আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজে সারি সারি গাড়ির মাঝখানে এখন শুধু কুহু আর শাহাদ৷ শাহাদ ঘাড় ঘুরিয়ে কুহুর দিকে তাকালো। ফোনে কথা বলতে বলতেই কুহুকে হাত দিয়ে ইশারা করলো ওর সাথে আসতে। কুহু পিছু পিছু গেলো। চকোলেট কালার একটা গাড়ির কাছে এসে গাড়ির ডোর খুলে দিলো শাহাদ।কুহু তাতে চড়ে বসলে ডোর লাগিয়ে দিলো।

কুহু জানালার কাচ ভেদ করে তাকিয়ে দেখলো শাহাদ এখনো ফোনেই কথা বলছে। সে তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে ছোট আয়নাটা বের করলো। মুখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখলো। তারপর লিপ্সটিক বের করে ঠোঁটে ঘষলো।তাড়াতাড়ি করে দিতে গিয়ে লিপ্সটিকের পরিমান বেশি হয়ে গেলো। গাড়ির সামনের টিস্যুবক্স থেকে দুটো টিস্যু নিয়ে ঘষে ঘষে লিপস্টিকটা মুছলো।উঁকি মেরে দেখলো শাহাদ আসছে কিনা। তারপর এইবার খুব সাবধানে সময় নিয়ে হালকা করে দিলো।লিপস্টিকটা ব্যাগে রেখে গাল দুটোতে হাত দিয়ে দুটো চড় দিলো। ব্যথা পেয়ে মৃদু “আহহ” করে উঠলো।একটু থেমে আবারো চড় দিলো। আয়না দিয়ে দেখলো মুখটা।হুম!! গাল দুটোতে একটু গোলাপি আভা এসেছে।ব্যথা পাওয়া স্বার্থক হয়েছে।শাহাদকে আসতে দেখে সব পরিপাটি করে নড়েচড়ে ভদ্র হয়ে বসলো। সিটবেল্টটা ইচ্ছে করে আটকালো না,শাহাদ এসে আটকে দিবে এই আশায়।

শাহাদ গাড়িতে উঠে বসলো। নিজের সিটবেল্ট বেঁধে কুহুকে বাঁধতে বললো। কুহু তার পুরো মুখটা শাহাদের দিকে ঘুরিয়ে বললো-
“সিটবেল্ট না বাঁধলে হবে না?”

শাহাদ না তাকিয়েই বললো -“না হবে না”।

কুহুর মুখটা ভোঁতা হয়ে গেলো। মুখের দিকে তাকালো না কেন? এত চড় দিলো মুখে, এইগুলা কি সব বৃথা যাবে? সে আবার বললো-
“আমি বাঁধতে পারিনা।”

এইবার শাহাদ তাকালো। কুহু ওর দিকে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে বুঝলো না শাহাদ।সে হাত বাড়িয়ে বেল্টটা টেনে বেঁধে দিলো। বেঁধে দেয়ার পর তার চোখ পড়লো কুহুর সিটের পাশের জায়গাটায়। টিস্যুতে লাল রঙ দেখে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো-
“এগুলো কি? র*ক্ত নাকি?”

একটা হাতে নিলো। ভালো করে দেখে বুঝলো রক্ত না কোনো রঙ হবে। কুহু ছোঁ মেরে শাহাদের হাত থেকে টিস্যুটা নিয়ে ব্যাগে ভরে ফেললো সাথে পড়ে থাকা টিস্যুটাও।শাহাদের চোখে মুখে বিস্ময় ছড়িয়ে গেলো। বিস্ময় কাটিয়ে বললো-

“লেবু চিপার জিনিস নিয়ে ঘুরেন ভালো কথা তাই বলে ইউসড টিস্যু ব্যাগে ঢুকাচ্ছেন কেন?”

কুহু ইতস্তত করর জবাব দিলো-
“এইগুলো আমার ইউস করা টিস্যু। ”

শাহাদ কিছু একটা বলতে নিয়েও বললো না। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বিরবির করে বলল-
“শী ইজ আনপ্রেডিক্টেবল।”

খুব ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগলো শাহাদ।রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বেলে দেয়া হয়েছে। শাহাদ বাজারের রাস্তা না ধরে বেছে বেছে নীরব রাস্তাগুলো দিয়েই যেতে লাগলো। গলাটা হালকা ঝেড়ে কুহুকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“এখানে একটা পার্ক আছে। পার্কের পাশেই নদী। সন্ধায় ভিউটা সুন্দর হয়। এর আগে এসেছেন কখনো?”

কুহু কি বলবে ভেবে পেলো না।এই পার্কে সে হাজারবার না লক্ষ বার এসেছে বান্ধবীদের সাথে। ক্লাস মিস দিয়ে এই পার্কের নদীর পাড়ে বসেই সবাই মিলে আড্ডা দেয়। কলেজে থাকতে কলেজ মিস দিয়ে পার্কে আসায় পুলিশের দৌড়ানিও খেয়েছে। সে সুন্দরমতো বললো –
“কয়েকবার এসেছি। এছাড়া তেমন আসা হয় নি। ”

“বাসা থেকে পারমিশন থাকলে নিয়ে যেতে পারি এখন।”

কুহুর চোখ দুটো চকচক করে উঠলো৷সে একবাক্যে বলে দিলো-
“বাসায় কিছু বলবে না।”

শাহাদ ডান পাশের রাস্তায় গাড়ি ঢুকিয়ে দিলো।স্পিড তুলে দশ মিনিটের ব্যবধানে পার্কের গেটের সামনে এসে গাড়ি পার্ক করলো। পার্কে মোটামুটি অনেক ভীড়।সন্ধায় সবাই ঘুরতে বেড়িয়েছে।পাবলিক পার্ক হওয়ায় টিকিট লাগেনা,সবার জন্য উন্মুক্ত।শাহাদ কুহুকে নিয়ে পার্কে ঢুকলো। পথিমধ্যে অনেক জনের সাথেই তাকে কুশল বিনিময় করতে হলো।কেউ কেউ এসে কোলাকুলি করলো, কেউ হ্যান্ডশেক করলো। শাহাদ কুহুকে পার্কের শেষ মাথায় একটা চায়ের দোকানে নিয়ে গেলো। চায়ের দোকানদার সালাম দিলো। দোকানের ভিতর কয়েকটা ছেলে বসা ছিলো তারা উঠে “ভাই” ডেকে সালাম দিলো। শাহাদ কিছুক্ষন তাদের সাথে কথা বলে দোকানের পিছনে এসে কুহুকে নিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসলো।কুহুকে উদ্দেশ্য করে বললো-
“সামনে তাকান।”

কুহু তাকালো কিন্তু কিছু দেখতে পেলো না।শাহাদ আঙুল তুলে তাক করলো একদিকে।এবারো কুহু দেখতে পেলো না।শাহাদ কুহুর কাছাকাছি এসে কুহুর একটা হাত নিজের হাতে নিলো। পুরুষালি হাতের গভীর স্পর্শ পেয়ে কুহু ঘাবড়ে গিয়ে শাহাদের দিকে তাকালো।শাহাদ কুহুর চোখে চোখে রেখে চমৎকার করে হাসলো। চোখ দিয়ে ইশারা করে বুঝালো সামনে তাকাতে।কুহু সামনে তাকালো। শাহাদ কুহুর হাতটা নিজের হাত দিয়ে ধরে একদিকে তাক করলো।ধীর স্বরে বলল-
“হাত বরাবর তাকান।”

কুহু তাকালো। কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে দেখতে পেলো জিনিসটা।নদীর ওপারে একটা রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টার সামনের জায়গাটায় নদীর পাড় ঘেষে লম্বা কয়েকটা স্ট্যান্ডে উলটো করে কতগুলো স্টিলের ইংরেজী অক্ষর বসানো। সেগুলো লাইটিং করা। সেই লাইটিং করা অক্ষরগুলোর প্রতিবিম্ব পড়েছে নদীর পানিতে। সেখানে উলটো অক্ষর গুলো একটা বাক্য তৈরি করেছে।সেটা হলো “I Love U”। লেখাটার পাশে একটা লাল রঙের লাভ।শাহাদ কুহুর হাত ছেড়ে দিলো৷ প্রশ্ন করলো-
” দেখেছেন?”

কুহু মাথা নাড়লো,সে দেখেছে।শাহাদ সেদিকে তাকিয়ে বলল-
“রেস্টুরেন্টের এই ব্যাপারটা খুব এক্সেপশনাল। ভাবলাম আপ্পনার ভালো লাগবে,তাই দেখাতে আনলাম।”

কুহু কিছু বললো না।শাহাদ হাত ধরায় তার অনুভূতিরা সব ওলট পালট হয়ে গেছে। এর মধ্যে চা নিয়ে এলো। শাহাদ দুটো কাপ নিজের হাতে নিলো।একটা কুহুর দিকে বাড়িয়ে বললো-
“এখানকার চা টা অনেক ভালো। খেয়ে দেখুন।”

_________

হিশাম বাড়িতে ঢুকে হাঁক ছেড়ে স্ত্রীকে ডাকলো।তৃপ্তি ছুটে এলো স্বামীর ডাকে। হিশাম এক গ্লাস পানি নিয়ে আসতে বলল।তৃপ্তি দৌড়ে গিয়ে পানি এনে হিশামকে দিলো।হিশাম সোফায় বসে সবটুকু পানি শেষ করলো।তৃপ্তি কিছু বলবে তার আগেই হিশামের কল এলো।হিশাম কলটা কানে ধরে কিছু শুনলো।তারপর হিং*স্র হয়ে চিৎকার করে উঠলো-
“তোরা কি করছিলি?? আমার ছেলেদের রাস্তায় ফেলে মা*রলো আর তোরা একটা টোকাও দিতে পারলি না?”

আবার ওপাশ থেকে কিছু বললো।হিশাম আবারো গর্জে উঠলো-
“সংখ্যায় বেশি থাকলে অন্তত একটাকে তো আটকে রাখতে পারতি।তাহলে পুলিশ ধরতে পারতো। কয়েকটা ঘা মা*রলেই এসবের পিছনের আসল লোক বেরিয়ে আসতো।বাস্ট*র্ড!! টাকা দিয়ে তোদেরকে পুষে লাভ কি আমার?কাজে তো আসিসই না উলটো আমার নাম খারাপ করছিস।”

হিশাম কলটা কেটে ফোনটা ছুড়ে দিলো সোফায়।হিশামের মা মঞ্জুরা বেগম বেরিয়ে এসেছেন চিৎকার শুনে।জিজ্ঞেস করলেন-
“আবার কি হয়েছে?”

“শাহাদ আমার লোককে মে*রেছে।”

মঞ্জুরা বেগম কিড়মিড় করে বললেন-
“তাহলে পুলিশে গিয়ে মামলা করছিস না কেন?”

“শাহাদের কোনো লোক ছিলো না।যারা মে*রেছে সবাই লোকাল বস্তির।কিন্তু আমি শিউর এতে ওই শাহাদেরই হাত আছে। আমি ওকে খু*ন করব।”

তৃপ্তি বললো –
“খু*নোখু*নি ছাড়া কি তোমার মাথায় আর কিছু আসে না?”

মঞ্জুরা বেগম খেকিয়ে উঠলেন-
“কেন? তোমার এত লাগছে কেন? ওই শাহাদ তোমার কি হয়?”

“আহ মা,থামো। তৃপ্তি তুমি যাও। রিশাম কোথায়? ঘুমিয়ে পড়েছে?”

স্বামীর প্রশ্নে তৃপ্তি উত্তর দিলো-
“হুমমম।অন্তত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে এসব বাদ দাও।ছেলেটাকে অন্তত এতিম করো না।”

“আর আমি যে পিতৃহারা হলাম তার বেলায়?”

“শাহাদ তোমার বাবাকে খু*ন করে নি।ছেলেটা বারবার এই কথা বলেছে।বাড়ি বয়ে এসে তোমাকে অনুরোধ করেছে ভুল না বুঝতে।শত্রুতা সৃষ্টি করতে কেউ ভুল বুঝাচ্ছে তোমায়।”

মঞ্জুরা বেগম বললেন-
“ওদের সাথে বন্ধুত্ব কবে ছিলো যে নতুন করে শত্রুতা হবে।আমার ছেলে নিজ চোখে শাহাদকে তার বাবাকে গু*লি করতে দেখেছে। এর চেয়ে বড় প্রমান আর কি,?”

মঞ্জুরা বেগম হিশামের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন-
“শোন বাবা, এই বদলা তোকে নিতে হবে।র*ক্তের বদলে র*ক্ত। আমি বিধবা হয়েছি।ওই খান বাড়ির অন্তত একটা মেয়ের গায়ে হলেও বিধবা তকমা লাগাতে হবে।তবেই আমার মন জুড়াবে।”

“হবে মা, সব হবে। শাহাদকে আমি ছাড়ব না।খান বাড়ির বংশ শাহাদ পর্যন্তই শেষ।এরপর আর কোনো বংশধর আসবে না।”

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here