চন্দ্রাণী ২৫

0
71

#চন্দ্রাণী (২৫)

খামের ভেতর অনেকগুলো ছবি। বিয়ের শাড়ি পরে চন্দ্র বসে আছে। মুখে আলপনা আঁকা।
লাল রঙের বেনারশী শাড়ি পরনে।পাশেই বর সেজে বসে আছে একজন মুখে রুমাল দেওয়া,পরনে শেরওয়ানি।
ছেলেটা কে?
চন্দ্র বুঝতে পারছে না। সবগুলো ছবিতে ছেলেটার মুখে রুমাল দেওয়া।
কি আশ্চর্য!
বর সেজেছে বলে কি মুখে রুমাল দিয়ে বসে থাকতে হবে?
খুব একটা মানুষ নেই ছবিতে। তবে যারা আছে তাদের দেখে চন্দ্রর আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে যেতে চাইছে।
একটা ছবিতে চন্দ্রর বাবা আছে ওর আর বরের পাশে।শাহজাহান তালুকদার, রেহানা বেগম, আরো একজন মহিলা।
সবচেয়ে হতভম্ব করার ব্যাপার হচ্ছে এই ছবিতে চন্দ্রর আর বরের পাশে একটা ছবিতে টগর ও আছে।
একটা ছবিতে চন্দ্র,পাশে বর বসে আছে, বাবা মা, টগর, এক মহিলা সহ সবাই মিলে একটা গ্রুপ ছবি তোলা।
চন্দ্র আর সহ্য করতে পারছে না। মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে চন্দ্রর।
কেউ তাকে কিছু জানায় নি কেনো?
এই ছেলেটা কে?কাকে প্রশ্ন করবে চন্দ্র?
কি লুকাচ্ছে বাবা মা তার থেকে?
চন্দ্র সবসময় ভাবতো বাবা মা তার কাছে সবচেয়ে বেশি ফ্রি।অথচ এখন মনে হচ্ছে বাবা মা’কে সে এখনো চিনতেই পারে নি। কিন্তু টগর কিভাবে এই ছবিতে এলো?

চন্দ্রর সব রাগ গিয়ে পড়লো টগরের উপর। টগর সব জানে।জেনেও কেনো সে চন্দ্রকে কিছু বলে নি?
সবাই চন্দ্রর সাথে মজা নিচ্ছে?

একটা ছবি নিজের কাছে রেখে চন্দ্র সব আগের মতো রেখে দিলো। মোবাইলটা ও পেলো ওখানেই।মোবাইলটা বের করে চন্দ্র ছবিটা নিয়ে বাড়ির দিকে গেলো।

শর্মীর রুমের দরজা বন্ধ।ভেতরে শর্মী বসে আছে রুম অন্ধকার করে। জানালায় মোটা পর্দা দেওয়া। মাথার উপর খুব স্পীডে ফ্যান ঘুরছে।
শর্মীর দুই চোখ যেনো বাঁধা মানছে না।এ কি যন্ত্রণা তার,কাউকে কিছু বলতে পারছে না সহ্য ও করতে পারছে না।
ভাগ্য কেনো তাকে নিয়ে এভাবে খেলছে?

নিয়াজ খুবই জঘন্য লোক, অথচ ওর মৃ//ত্যু সংবাদ শর্মীকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে।
কেনো এরকম লাগছে?মনে হচ্ছে তার দেহে প্রাণ নেই।ওই জঘন্য লোকটাকে কেনো এরকম পাগ//লের মতো ভালোবেসেছে শর্মী!
যে তাকে বিপদে ফেলতে চেয়েছিলো,সবার কাছে ছোট করতে চেয়েছিলো তার জন্য কেনো আজ শর্মী দুই চোখে বর্ষণ হচ্ছে?
মন এতো অবাধ্য হলো কেনো?
কেনো সহ্য হচ্ছে না শর্মীর এসব?
কেমন ডুকরে কাঁদছে শর্মী।

শর্মীর রুমের দরজার বাহিরে চন্দ্র নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। তার বোনটা যে মনের ক্ষত লুকিয়ে রাখতে চাইছে চন্দ্র বুঝতে পারলো। তাই নিজেও আর শর্মীকে ডাকলো না।

রুমে গিয়ে চন্দ্র টগরকে কল দিলো।টগরের ফোন সুইচ অফ।কয়েকবার ট্রাই করেও পাচ্ছে না চন্দ্র।
বাধ্য হয়ে বিকেলে তৈরি হয়ে নিলো টগরের বাড়িতে যাওয়ার জন্য।
কাচারি ঘরের সামনে যেতেই দেখলো বাবুল দাশ দাঁড়িয়ে আছে। গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে কিছু ভাবছে।চন্দ্র বাবুল দাশকে দেখে হেসে বললো, “কি হইছে কাকু?”

বাবুল দাশ কোমল গলায় বললো, “কি আর হবে গো মা জননী। গরীবের কিছুই হয় না।না মরণ হয় আর না বাঁইচা থাকন।”

চন্দ্র হেসে বললো, “আব্বার সাথে ঝগড়া হইছে বুঝি?”

বাবুল দাশ মাথা নিচু করে বললো, “ভগবান জানেন আমার মনে আপনেগো লাইগা কতো ভালোবাসা। মানুষরে আমি জানাইতে চাই না।আমার ভগবান জানলেই হইলো। অথচ স্যারে আমারে কয় আমি না-কি আপনেগো খেয়াল রাখি না।”

চন্দ্র মুচকি হেসে বললো, “আব্বার ওসব রাগের কথা। পাত্তা দিয়েন না তো কাকু।”

বাবুল দাশ বললো, “আপনে কি কোনোখানে যাইতেছেন?”

চন্দ্র বললো, “আমি একটু টগরের কাছে যাইতেছি কাকা।”

বাবুল দাশ বললো, “জননী, দুপুরে খাওয়া হয় নাই।একটু যদি খাওনের ব্যবস্থা কইরা দিতেন।”
চন্দ্র এক মুহূর্ত চিন্তা করে আবারও বাড়িতে এলো।

বাবুল দাশের জন্য চন্দ্র খাবারের ব্যবস্থা করে বের হতে যেতেই শাহজাহান তালুকদার এলো। চন্দ্রর ইচ্ছে করছে না বাবার সাথে কথা বলতে এই মুহূর্তে। কেনো বাবা তার কাছে কোনো কিছু এভাবে গোপন করতে চাইছে?
এই কি চন্দ্রর সেই বাবা যার কাছে সবকিছুর উর্ধ্বে তার চন্দ্র।
আজ কেনো মনে হচ্ছে সে এই বাবাকে চেনে না।আসলেই বাবাকে চেনে না চন্দ্র।নয়তো সারাজীবন জেনে এসেছে যেই কাদের খাঁন তাদের শত্রু অথচ আজ বাবার ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছিলো বাবা আর কাদের খানের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিলো।
তাহলে কেনো বাবার সাথে সম্পর্ক এতো খারাপ হলো, কেনো দুজনের যোগাযোগ নেই এখন?
কই কখনো তো জানতে পারে নি এসব কিছু!

চন্দ্র বের হতে গেলো,শাহজাহান তালুকদার মেয়েকে ডাকলেন।
বাহিরে তখন রোদ মরে এসেছে। কেমন সোনালি রঙা রোদ।সেই আলোয় চন্দ্রকে অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগছে।

শাহজাহান তালুকদার বললেন, “আমি একটু কাদের খাঁন এর বাড়িতে যাবো। তুই ও চল আমার সাথে। ”

চন্দ্র অন্যদিকে তাকিয়ে বললো, “আমি একটু বের হবো আব্বা।”

শাহজাহান তালুকদার জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় বের হবে এখন?”

চন্দ্র কিছু বললো না। মুহূর্তেই শাহজাহান তালুকদার চমকে উঠে বললেন,”তুই টগরের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিস না তো?”

চন্দ্র কিছু বললো না। আব্বার ব্যবহার তার কাছে ভীষণ খাপছাড়া লাগছে হঠাৎ করে।

শাহজাহান তালুকদার ঠান্ডা মাথায় বললেন,”চন্দ্র মা,আমি চাই না তুমি টগরের সাথে কথা বার্তা বলিস।ওই ছেলেটা একটা আস্ত মাতাল,অভদ্র,ড্রাগ এডিকটেড। এই ধরনের ছেলের সাথে আমার মেয়ে মিশবে এটা আমার পছন্দ না মা।”

চন্দ্র কিছু বললো না। তাকে যেতেই হবে,যেই ছবি বাবা লুকিয়ে রেখেছে সেই ছবির কাহিনি চন্দ্রকে জানতেই হবে।টগর ছাড়া অন্য কেউ পারবে না চন্দ্রকে এই সত্যি জানাতে।তাছাড়া টগরকে সাবধান করতে হবে।

চন্দ্র বললো, “কাকু কে নিয়ে যান আব্বা।আমি যেতে পারবো না। ”
শাহজাহান তালুকদার বললেন, “তুমি এবং শর্মী দুজনেই আমার সাথে যাবে,ব্যস।”

চন্দ্র অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালো। বাবার গলা শুনে শর্মী ও বের হয়ে এলো। বাবা কি বলছে চিৎকার করে!

বাহিরে আসতেই শাহজাহান তালুকদার বললো, “শর্মী,তৈরি হয়ে নাও।আমরা খাঁনদের বাড়িতে যাবো।নিয়াজের লাশ এসেছে। এটা সামাজিকতা পালন করা।গ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়িত্ব। তোমরা আসো আমার সাথে। ”

শর্মীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেমন একটা অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেলো।
বিনা বাক্য ব্যয়ে রাজি হয়ে গেলো। এটাই শেষ দেখা হবে নিয়াজের সাথে শর্মীর।এক সময় যার সাথে সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিলো এই দুই চোখে, আজ সেই দুই চোখে তাকে শেষ দেখা দেখতে যাচ্ছে। যার হাত ধরে ওই বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিলো আজ তার লাশ দেখতে যাবে!
এর থেকে নির্মম আর কি হতে পারে!
চন্দ্র নিয়াজদের বাড়িতে যাওয়ার সময় পথে বাবার আড়ালে টগরকে কল দিতে লাগলো। আশ্চর্য, ফোন সুইচ অফ!
চিন্তায় চন্দ্রর গলা শুকিয়ে আসছে।টগরের কিছু হয়ে যায় নি তো।

সন্ধ্যা নেমেছে কিছুক্ষণ আগে।টগর সবেমাত্র বাড়িতে এসেছে। নিয়াজের লাশ আনা হয়েছে বাড়িতে খানিকক্ষণ আগে। টগর তার আগেই চলে এসেছে ওই বাড়ি থেকে। মাথার ভেতর অনেকগুলো হিসেবনিকেশ ঘুরপাক খাচ্ছে বারেবারে। এক মগ ব্ল্যাক কফি নিয়ে টগর বসলো শান্ত হয়ে। নিজেকে শান্ত করতে হবে।
খেলা ঘুরে গেছে। এবার একে একে সবার মুখোশ খুলে দিতে হবে।

টগর ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে।অনেকগুলো কাজ জমেছে তার।দ্রুত হাতে কিছু ফাইল রেডি করলো,তারপর সব মেইল করে পাঠালো হেড অফিসে।কিছু ডকুমেন্টস প্রিন্ট করে ডুপ্লিকেট হিসেবে সরিয়ে রাখলো।
মাথার ভেতর অজস্র চিন্তা। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে তার।
টোপ দিয়ে এসেছে সে এবার মাছ বঁড়শিতে গাঁথার পালা।
টগর জানে মেইন কালপ্রিটকে আজকে হাতেনাতেই ধরতে পারবে সে।
যদিও তার হাতে অনেক প্রমাণ আছে তবুও সে চায় হাতেনাতে ধরতে।

কতো হিসেব বাকি আছে! গোঁজামিল দিয়ে মা যা বুঝিয়ে গেছে, সেই গোঁজামিলের ফাঁকফোকর দিয়ে অনেক সত্য বের হয়ে এসেছিলো। টগর কখনো মা’কে কিছু বলে নি।
মা কষ্ট পাবে,ভয় পাবে ভেবে সবসময় চুপ করে ছিলো।

আজ মা নেই,তার জন্য ভাবার কেউ নেই।কি অদ্ভুত!
এই পৃথিবীতে এতো কোটি কোটি মানুষ অথচ তাকে নিয়ে একটু ভাবার মতো কেউ নেই,কেউ থাকবে না কখনো!

বাবার ছবিটা বুকে টেনে নিলো টগর। নিজেকে নিজে বললো, “না আমি ভেঙে পড়বো না।কিছুতেই না।”

নিজের সিআইডি’র ব্যাজটা এক নজর দেখে মুচকি হাসলো টগর। এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে।শপথ নিয়েছিলো এই দেশের সেবা করবে বলে, সেই শপথ টগর রাখবেই।

নিজেকে ধাতস্থ করে টগর ফোন চেক করলো। চার্জ শেষ হয়ে সেই কখন ফোন অফ হয়ে গেছে টগরের জানা নেই।ফোন চার্জে বসিয়ে টগর রান্না করতে গেলো।
চাল আর ডাল মিশিয়ে খিচুড়ি বসিয়ে দিয়ে টগর আবারও ল্যাপটপের কাছে এলো।চন্দ্রর কথা মনে পড়ছে হঠাৎ করে। মেয়েটা ভীষণ ভালো রান্না করে। কেমন আদুরে একটা মেয়ে।কাছাকাছি এলেই টগরের ইচ্ছে করে বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখে।অথচ প্রথম প্রথম ওকে ও ওর বাবার মতো জঘন্য মনে হয়েছে। ভুল বুঝেছে না বুঝে।
মনে মনে হাসতে লাগলো টগর । ল্যাপটপে আবারও একটা ভিডিও প্লে করলো টগর। কেমন দ্রুত হাতে চন্দ্র তার রুমে ক্যামেরা ফিট করছে।আরো একবার টগর হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেলো।বোকা মেয়ে জানে না,টগরের পুরো বাড়ি সিসি ক্যামেরার আওতাধীন। যেই ক্যামেরা মেয়েটা সেট করেছে,সেই ক্যামেরা টগর বহু আগেই ব্যবহার করে এসেছে বিভিন্ন অপারেশনে।
সিংহের গুহায় এসেছে সে সিংহকে শিকার করতে!

চলবে……..
রাজিয়া রহমান।

(সবার লাইক কমেন্ট আশা করছি আজকে।আশা করছি নিরাশ করবেন না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here