অপরিচিত লেখিকাঃ তাহমিনা তমা অন্তিম পর্ব

0
2274

#অপরিচিত
লেখিকাঃ তাহমিনা তমা
অন্তিম পর্ব

আরফা কেনাকাটা করছে আর মেহরাব চুপচাপ দেখছে। আরফা পছন্দ করতে না পারলে সে নিজে পছন্দ করে দিচ্ছে। মেহরাব খেয়াল করলো একটা ছেলে অনেক সময় ধরে আরফাকে দেখে যাচ্ছে। তবে তার দৃষ্টিতে মেহরাবের খারাপ কিছু নজরে আসছে না। কেমন যেনো উদাসীন সেই দৃষ্টি। ছেলেটা ওদের থেকে একটু দূরেই আছে হয়তো ওদের সব কথা শুনতেও পারছে।

আরফা কয়েকবার ডেকে মেহরাবের সাড়া না পেয়ে ধাক্কা দিয়ে বললো, কী দেখছেন ?

মেহরাবের দৃষ্টি অনুসরণ করে আরফা তাকাতেই চমকে গেলো৷ অতীত পেছনে ফেলে আসতে চাইলে কী হবে ? অতীত সহজে আমাদের পিছু ছাড়ে না।

আরফাকে চমকে উঠতে দেখে বললো, কে ছেলেটা চেনো নাকি ? আমার তো মনে হচ্ছে তোমাকে চেনে।

আরফা কিছু বললো না। রুমানের চোখে আজ সেই অাফসোস দেখতে পাচ্ছে যা দেখার জন্য এতো কষ্টে নিজেকে গড়ে তুলেছে আরফা। তবু কেনো জানি রুমানের এই দৃষ্টি আরফাকে শান্তি দিচ্ছে না বরং চিনচিনে ব্যাথা দিচ্ছে বুকে।

মেহরাব আবার বললো, তোমার পরিচিত নাকি ?

আরফা শক্ত মুখে বললো, না #অপরিচিত।

রুমান ওদের সব কথাই শুনতে পেলো। আরফা মেহরাবের হাত ধরে সেখান থেকে চলে গেলো। আর রুমান এক দৃষ্টিতে মেহরাবের ধরা হাতটার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ এক বিন্দু পানি গড়িয়ে গেলো রুমানের চোখ থেকে।

বিড়বিড় করে বলে উঠলো, আজ আমার আফসোস ছাড়া কিছু করার নেই আরু। সেই অধিকার আমি নিজেই নষ্ট করেছি।

২০
মেহরাবের হাত শক্ত করে ধরে চোখ বন্ধ করে বসে আছে আরফা আর বিড়বিড় করে কিছু বলছে৷ আরফার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাঁসছে মেহরাব। উচ্চতায় প্রচন্ড ভয় পায় আরফা৷ তাই প্লেনে বসেই ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে।

মেহরাব বললো, আমরা এখনো মাটিতেই আছি আরফা প্লেন টেক অফ করেনি।

আরফা মেহরাবের দিকে তাকিয়ে ভীত গলায় বললো, আমার খুব ভয় করছে চলুন গাড়িতে করে যাই।

মেহরাব অবাক হয়ে বললো, আরফা প্লেন এখনই টেক অফ করবে আর তুমি এখন বলছো গাড়িতে যাবে ? আগে বলোনি কেনো ?

আরফার মুখ কাচুমাচু হয়ে গেলো মেহরাবের কথা শুনে। কেনো যে আগে মেহরাবকে গাড়িতে যেতে বললো না সেটা ভেবে আফসোস করছে। আরফা এসব চিন্তা করছিলো তখনই এনাউন্সমেন্ট করা হলো প্লেন টেক অফ করার জন্য প্রস্তুত সবাই যেনো নিজেদের সিটবেল লাগিয়ে নেয়। আরফা এটা শুনে কাঁপতে লাগলো। মেহরাব এতোক্ষণ আরফার অবস্থা দেখে হাসলেও এখন টেনশন হচ্ছে। ভয়ের কারণ যদি অসুস্থ হয়ে যায় আবার।
মেহরাব আরফার সিট বেল লাগিয়ে দিয়ে হাতটা শক্ত করে ধরলো।

কিছু একটা ভেবে বললো, আরফা তোমার মনে তো অনেক প্রশ্ন আছে আমাকে নিয়ে তাই না ?

এই অবস্থায় মেহরাব হঠাৎ এ কথা বললে আরফা অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে। সে কী বলতে চাইছে বুঝতে না পেরে বলে, আপনি কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি না।

মেহরাব বললো, তোমার মনে আমাকে নিয়ে যতো প্রশ্ন আছে সব প্রশ্নের উত্তর দিবো আজ আমি। বলো কী জানতে চাও ?

আরফা বললো, কিছু না।

মেহরাব মুচকি হেঁসে বললো, সিনথিয়ার কথা কীভাবে জানলাম তাও না ?

আরফা এবার অবাক হয়ে তাকালো মেহরাবের দিকে আর তা দেখে মেহরাব মুচকি হাঁসলো।

আরফার উত্তরের অপেক্ষা না করে বলতো লাগলো, আমি প্রথম থেকেই বুঝতে পারতাম সিনথিয়া আমাকে ভালোবাসে কিন্তু আমার কাউকে ভালোবাসতে খুব ভয় করতো কারণ ছোটবেলা থেকে ভালোবাসার মানুষগুলো বারবার হারিয়েছি যে। কিন্তু সিনথিয়ার পাগলামি দেখে একসময় বাধ্য হই তাকে ভালোবাসতে। হারানোর ভয় হলো তাই ইন্ডিয়া যেতে চাইলে শর্ত দেই এনগেজমেন্টের। শর্ত পালন করেই ইন্ডিয়া আসে কিন্তু ফেরত যায় তার মৃত্যুর খবর। ভালোবাসার মানুষের মৃত্যুর খবর কতটা যন্ত্রণাদায়ক, যে এই মুহুর্ত পার করেছে শুধু সেই বলতে পারবে।

আরফার আর কোনো দিকে হুঁশ নেই সে মনোযোগ দিয়ে মেহরাবের কথা শুনছে। কথাগুলো বলতে বলতে মেহরাবের চোখের কোণে কখন পানি জমে গেছে সে নিজেও জানে না।

সিনথিয়ার মৃত্যুর খবর আমাকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিলো। প্রতিটা মুহূর্ত তার যন্ত্রণায় ছটফট করতাম। যেদিকে তাকাতাম শুধু তার স্মৃতি। এসব থেকে মুক্তি পেতে একসময় শুরু করলাম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্যুরে যাওয়া। বিশ্বের অনেক দেশে ভ্রমণ করেছি। এভাবে কেটে যায় কয়েক বছর। পড়া শেষ করে ডাক্তারি আর গবেষণা শুরু করেছি। আমি যাদের সাথে ট্যুরে যেতাম বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিলো তাদের সাথে। একদিন ফোন দিয়ে জানালো আবার ট্যুরে যাচ্ছে আমি যাবো কিনা। মাত্র দুদিন আগে একটা গবেষণা শেষ করেছি মাইন্ড ফ্রেশ করা প্রয়োজন ছিলো তাই কোথায় যাচ্ছি কিছু না জেনেই হ্যাঁ বলে দেই। সব কমপ্লিট করে যখন আমাকে জানায় দেশের নাম দেখে বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠে।

আরফা বললো, ইন্ডিয়া ছিলো ?

মেহরাব আরফা দিকে তাকিয়ে দেখে পলকহীন চোখে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে সব শুনছে।

মেহরাব মুচকি হেঁসে বললো, হুম ইন্ডিয়া ছিলো। তাদের জিজ্ঞেস করি ইন্ডিয়া কেনো তারা বলে একসাথে অনেকগুলো জায়গা দেখা যাবে ইন্ডিয়াতে আর তাদের মেইন আকর্ষণ ছিলো তাজমহল। যেখানে সিনথিয়ার হাত ধরে যাওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলাম একসময়।

এই কথাটা কেনো জানি আরফার ভালো লাগলো না। বুকের ভিতর কোথাও একটা আঘাত করলো আর রক্তক্ষরণ হতে লাগলো।

মেহরাব বললো, আমিও আর কথা বাড়ালাম না ভাবলাম সিনথিয়াকে তো শেষবার দেখতে পারিনি তার কবরটা নাহয় একবার ছুঁয়ে দেখবো। চলে এলাম ইন্ডিয়া সবাই বললো প্রথম দিনটা রেস্ট নিবে আর পরদিন থেকে ঘুরাঘুরি শুরু করবে। সবাই রেস্ট নিতে গেলেও আমি বেড়িয়ে পড়লাম সিনথিয়ার ঠিকানা খুঁজতে। সিনথিয়ার বাড়ি ছিলো কোলকাতায় কিন্তু তারা মুম্বাইয়ে থাকতো। ঠিকানাও ছিলো আমার কাছে। তাই দেরি না করে চলে গেলাম সিনথিয়ার বাসায়। খোঁজে বের করতে অনেকটা সময় লাগলো অনেকটা রাতই হয়ে গেলো। কলিংবেল বাজালে ওর মা দরজা খোলে দেয়। তাকে চিনতে পারি কারণ সিনথিয়া সবার ছবি দেখিয়েছিলো আমাকে।

ফ্ল্যাশব্যাক

সিনথিয়ার মা মেহরাবকে দেখে বললো, কাকে চাই, আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।

মেহরাব ধরা গলায় বললো, আসলে আন্টি আমি সিনথিয়ার ফ্রেন্ড,,,,

ওহ্ কিন্তু বাবা সিমথিয়া তো এখনো আসেনি। আজ আসবে বলে তোমাকে দেখা করতে আসতে বলেছে বুঝি ? দেখেছো তুমি চলে এসেছো এখনো মেয়ের খবর নেই। মনে হয় জামাইয়ের অফিস থেকে আসতে লেইট হয়েছে।

মেহরাব চমকে উঠলো সিনথিয়ার মার কথা শুনে কী বলছে এসব উনি ? মেয়ে হারানোর শোকে পাগল হয়ে গেছে নাকি ?

মেহরাব কিছু বলবে তার আগেই সিনথিয়ার মা বললো, তুমি ড্রয়িংরুমে একটু বসো ওরা এখনই চলে আসবে।

এটুকু বলে সে ভিতরে চলে গেলো৷ মেহরাব কিছু বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। তাই চুপচাপ ভেতরে গেলো। সোফায় বসতে বললে বসে পড়লো। সামনে তাকাতেই মেহরাবের পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো। দেয়ালে বড় একটা ছবি টানানো। সিনথিয়ার কোলে পাঁচ ছয় মাসের একটা বাচ্চা আর পাশে দাঁড়িয়ে সাথে সুদর্শন এক পুরুষ। ছবিটা দেখে বুঝা যাচ্ছে বেশি দিন আগের নয়। সিনথিয়াকে একদম অন্যরকম লাগছে ছবিতে।

কাঁপা হাতে ছবিটা দেখিয়ে বললো, আন্টি এই ছবিটা ?

সিনথিয়ার মা ছবির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বললো, আমার নাতনীর মুখে ভাতের অনুষ্ঠানের ছবিটা। এই কিছুদিন আগের। এটাই সিমথিয়ার মেয়ে আর এটা(সিহাবকে দেখিয়ে) আমাদের জামাই সিহাব।

মেহরাবের মাথা ভনভন করে ঘুরছে। কী দেখছে এসব বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হচ্ছে সে শূন্যে ভাসছে। বুঝতে পারছে না সিনথিয়া বেঁচে আছে ভেবে খুশি হবে নাকি এসব জেনে কষ্ট পাবে।

মেহরাব কোনমতে বললো, আন্টি আমার একটা কাজ পরে গেছে আমি অন্য একদিন ওর সাথে দেখা করে নিবো আজ আসছি।

কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে বের হয়ে গেলো। পেছনে থেকে সিনথিয়ার মা অনেকবার ডাকলো কিন্তু মেহরাব ঘুরে তাকালো না৷ এলোমেলো পায়ে বাসা থেকে বের হয়ে একটু সামনে যেতেই দেখতে পেলো গেইটের সামনে একটা গাড়ি এসে থামলো। একটু পর সেটা থেকে বের হয়ে এলো সিনথিয়া আর তার কোলে ফুটফুটে একটা ছোট্ট পরী। মেহরাবের চোখ থেকে শ্রাবণ ধারা গড়িয়ে পড়ছে। সিনথিয়া নেমে দাঁড়ানোর পরই সেই ছেলেটাও নেমে পাশে দাঁড়ালো, হ্যাঁ সেটা সিহাব। মেহরাবকে দেখার আগেই মেহরাব সরে গেলো আর তারা ভেতরে ঢুকে গেলো। মেহরাব গেইট পেরিয়ে বের হয়ে মেইন রাস্তা দিয়ে একটু সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। একটা চিৎকার করে উঠলো এরপর হুহু করে কাঁদতে লাগলো।

কাঁদতে কাঁদতে বললো, এতো বড় মিথ্যা কেনো সিনথিয়া কেনো ?

এদিকে সিনথিয়া বাসায় আসলে তার মা তাকে জানায় তার সাথে কোনো বন্ধু এসেছিলো দেখা করতে। নাম জানতে চাইলে বলে নাম জিজ্ঞেস করতে মনে নেই তার। সিনথিয়া আর সেটা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

বর্তমান

মেহরাবের চোখ থেকে আজও অবিরাম পানি পরছে, আরফার চোখেও পানি। অন্যের কষ্টের কথা শুনলে নিজের কষ্ট কম মনে হয় আজ আরফারও তাই হচ্ছে। দুটো ভাঙা মন আজ একসাথে আর কেউ তাদের ভাঙতে পারবে না। আরফা মেহরাবের চোখের পানি মুছে দিলে মেহরাবের হুঁশ ফিরে। বেড়িয়ে আসে অতীত থেকে আর মায়াভরা চোখে তাকায় আরফার দিকে।

বিনিময়ে আরফা মুচকি হেঁসে বলে, আপনি তো বলেন অতীত ভেবে বর্তমান নষ্ট করার মানে হয় না।

মেহরাব ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে আরফার চোখের পানি মুছে বলে, হুম আমার দফারফা।

এটা শুনে আরফা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মেহরাব মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে আরফাকে আমার দফারফা বলে ডাকে। যেটা আরফার একদমই পছন্দ নয়।

আরফার ভ্রু কুঁচকানো দেখে মেহরাব বলে, চলো আর ভ্রু কুচকাতে হবে না।

আরফা খুশি বলে, গাড়িতে যাবেন ?

মেহরাব বললো, এখান থেকে হোটেল পর্যন্ত গাড়িতেই যেতে হবে আর তুমি যদি চাও তাহলে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে পারি।

আরফা বললো, হোটেল পর্যন্ত মানে আগে তো কক্সবাজার যেতে হবে তারপর না হোটেল।

মেহরাব বললো, তুমি এখন কক্সবাজারেই আছো।

আরফা চমকে বলে , কীহ ?

মেহরাব হেঁসে বলে, জী এবার নামুন নাহলে আবার এটাতেই ঢাকা চলে যান।

কখন কক্সবাজারে চলে এসেছে আরফা টেরই পায়নি। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই দেখতে পেলো তাদের জন্য গাড়ি ওয়েট করছে। হোটেলে গিয়ে মেহরাব আরফাকে ফ্রেশ হয়ে নিতে বললো। দু’জনেই ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে এক ঘুম দিলো। সকালে আসতে চাইলেও দুপুরে এসেছে ওরা। বিকেলে বিচে যাবে তাই এখন রেস্ট নিয়ে নিচ্ছে। বিকেলে মেহরাবের ঘুম আগে ভেঙে গেলে আরফার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে অনেকটা সময় পার করলো৷ তারপর মুচকি হেঁসে আরফাকে ডাকলো আর দুজনে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে বিচে গেলো ঘুরতে।

হাঁটতে হাঁটতে মেহরাব বললো, আরফা এর আগে কখনো কক্সবাজার এসেছো তুমি ?

আরফা মন খারাপ করে বললো, আমি তো কখনো ঢাকার বাইরেই যেতে পারিনি।

আরফাকে মন খারাপ করতে দেখে মেহরাব বললো, আরে মন খারাপ করছো কেনো ? আমি তোমাকে পুরো পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাবো।

আরফা খুশি হয়ে বললো, সত্যি ?

মেহরাব মুচকি হেঁসে বললো, হুম।

এই মেয়ে দাঁড়া বলছি। সারাদিন এতো কেমনে দৌড়াস তুই পা ব্যাথা করে না তোর ?

এক চিরচেনা গলা শুনে মেহরাবের হাসি মিলিয়ে গেলো মুখ থেকে। মেহরাব দেখলো একটা বাচ্চা মেয়ে দৌড়ে তাদেরকে ক্রস করে সামনে চলে গেলো আর একটু পরই শাড়ী পরিহিতা এক রমণী তাকে দৌড়ে এসে ধরে ফেললো। মেহরাবের পা থেমে গেলো সেই রমণী পেছনে ঘুরে দাঁড়াতেই।

মেহরাব বিড়বিড় করে বলে উঠলো, সিনথিয়া,,,

মেয়েকে বকতে বকতে সিনথিয়া যাওয়ার জন্য সামনে পা বাড়াতেই দেখতে পেলো মেহরাবকে। সিনথিয়ার হাত আলগা হয়ে গেলো। মেয়ে হাত আলগা পেতেই সিনথিয়ার হাত সরিয়ে আবার দৌড় লাগালো। সিনথিয়ার পা জমে গেলো নড়তে পারছে না সে। আরফা মেহরাবকে এভাবে থেমে যেতে দেখে তার দিকে তাকালো। মেহরাবের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই সিনথিয়াকে দেখতে পেলো। আরফা সিমথিয়াকে চেনে না তাই মেহরাবের এভাবে থেমে যাওয়ার কারণও বুঝতে পারলো না।

তখনই সিহাব কোথা থেকে সিনথিয়ার পাশে এসে বললো, এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? চলো আমার প্রিন্সেস নাকি ডাবের পানি খাবে।

সিনথিয়ার কোনো হেলদোল নেই আগের মতোই দাড়িয়ে আছে। তা দেখে সিহাবও সিনথিয়ার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকিয়ে মেহরাব আর আরফাকে দেখতে পেলো।

সিহাবও মেহরাবকে চেনে না তাই বললো, চেনো উনাদের, তোমার পরিচিত কেউ ?

আরফাও বললো, চেনেন আপনি, পরিচিত আপনার ?

সিনথিয়া আর মেহরাব দুজনের চোখেই পানি টলমল করছে। এতোগুলা বছর পর আবার দুজন মুখোমুখি কিন্তু সময় আর পরিস্থিতি দুটোই পাল্টে গেছে। তুমি আমি হয়তো আবার মুখোমুখি হবো কিন্তু তুমি আর আমি মিলে তখন আমরা থাকবো না। অন্যকারো গল্পে অন্যকারো তুমি হয়ে থাকবো আর একে অপরের হবো #অপরিচিত।

আরফা আবার বললো, আপনার পরিচিত কেউ ?

মেহরাব থমথমে গলায় বললো, না #অপরিচিত।

সিনথিয়াও সিহাবকে একই উত্তর দিলো, #অপরিচিত।

মেহরাব আরফাকে নিয়ে চলে গেলো পাশ কাটিয়ে আর সিহাব নিয়ে গেলো সিনথিয়াকে। দুজনেই একবার পিছু ফিরে তাকালো আর তাতে চোখাচোখি হয়ে গেলো দুজনের। মেহরাব সাথে সাথে সামনে ঘুরে আরফার কোমর জড়িয়ে হাঁটতে লাগলো। আরফা চমকে উঠলো আর সিনথিয়া মুচকি হেঁসে উঠলো। এই হাসিতে লুকিয়ে আছে হাজার না বলা কথা, না পাওয়ার কষ্ট আর অনেকটা আফসোস। সিনথিয়াও সামনে ফিরে সিহাবের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো। আরফার মনে সন্দেহ হলো মেহরাব মেয়েটাকে চেনে কিন্তু কিছু বললো না। কারণ আরফা এতোদিনে এটুকু বুঝেছে মেহরাব নিজে থেকে কিছু না বললে তাকে দিয়ে সেটা বলানো অসম্ভব। আরফাও আর সেটা নিয়ে মাথা ঘামালো না।

মেহরাব মনে মনে বললো, কিছু জিনিস না জানাই আমাদের সামনের পথচলার জন্য ভালো। আমি চাই না আরফা তুমি সিনথিয়াকে চেনো। যাকে আমি নিজেই ভুলে যেতে চাই তার ছবি তোমার মনে একে কী লাভ ?

মেহরাব আর আরফা অনেকটা দূরে চলে গেলো আর তার উল্টোদিকে চলে গেলো সিনথিয়া আর সিহাব। জীবন সত্যি অদ্ভুত স্বপ্ন যাকে নিয়েই সাজাও না কেনো। ভাগ্য যার সাথে জোরে আছে সেই আসবে তোমার জীবনে। তাই তো ভাগ্য আজ দুজনকে দুদিকে যেতে বাধ্য করছে। একসময়ের সবচেয়ে আপন মানুষটা আজ #অপরিচিত। যত তারা নিজের জীবনে সামনের দিকে আগাচ্ছে তত তাদের মাঝে বাড়ছে দূরত্ব, যা সময়ের সাথে সাথে শুধু বাড়তেই থাকবে।

————————– সমাপ্ত —————————

এতোদিন পাশে থাকার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। সম্পূর্ণ গল্প কেমন হয়েছে জানাবে কিন্তু। গল্পের নামের সাথে শেষটা মিলিয়ে দিলাম। খুব তাড়াতাড়ি নতুন গল্প নিয়ে আসবো ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ হাফেজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here