প্রণয় রেখা পর্ব ২৬

0
500

#প্রণয়_রেখা
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
২৬.

সবকিছু শুনে মাহবুব সাহেব তিক্ত সুরে মেয়েকে বললেন,

‘তোমার কাছ থেকে আমি এসব আশা করিনি, মোহনা। তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু, তুমি আমার সেই বিশ্বাসের মর্ম দাওনি।’

বাবার কথায় প্রচন্ড খারাপ লাগে মোহনার। তার শুকনো চোখে সঙ্গে সঙ্গেই জল জমে। নাক লাল হয়ে উঠে। বাবার দিকে যে একবার চোখ তুলে তাকাবে তার সেই সাহসটুকুও নেই।

মাহবুব সাহেব শান্ত হয়ে বসে আছেন। লরিনও এই মুহুর্তে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। লায়লা বেগম স্বামীর নিরবতা দেখে প্রথমে অবাক হলেও এখন তিনিও স্বাভাবিক। মানুষটা হয়তো একটু বেশিই কষ্ট পেয়েছেন। তার শিক্ষায় তার মেয়ে আঘাত করেছে, তাই হয়তো এতটা দমে গিয়েছেন। নয়তো ছোট খাটো ব্যাপারেই উনি যে পরিমাণ ক্ষেপে যান এই ব্যাপারটা নিয়ে তো উনার তুলকালাম কান্ড বাঁধানোর কথা ছিল। কিন্তু, উনি এখন নিশ্চুপ…

কেউ কিছু বলছে না দেখে লায়লা বেগম এবার সাহস করলেন। তিনি নরম সুরে মাহবুব সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

‘সন্তান তো ভুল করেই, তাই বলে কি মা বাবা সন্তানের সাথে অভিমান করে বসে থাকে? মা বাবা তো আর সন্তানদের সাথে কথা না বলে থাকতে পারে না, হাজার ভুল করলেও তো সন্তান তো নিজের, তাকে ক্ষমা করে দিতেই হয়। আর তোমার মেয়ে তো তোমার প্রাণ। সে না হয় ছোট্ট একটা ভুল করেই ফেলেছে তার জন্য তুমি কি তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিবে? তাতে তো তুমিও কষ্ট পাবে তাই না? থাক না, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এবার ওদের মাফ করে দাও।’

লায়লা বেগম কথাটা শেষ করতেই মাহবুব সাহেব তার দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকালেন। ভীষণ শান্ত, কঠিন সেই দৃষ্টি। লায়লা বেগম কিঞ্চিত ঘাবড়ালেন। তার কথা শুনে মানুষটা উল্টো আরো বেশি রেগে যাবেন না তো?

তার দুশ্চিন্তা অবসান ঘটল মাহবুব সাহেবের পরবর্তী উক্তি শুনে। মাহবুব সাহেব সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মোহনার দিকে চেয়ে শক্ত হয়ে বললেন,

‘মোহনা, তুমি কি লরিনকে বিয়ে করতে চাও?’

মোহনা ভয়ে ভয়ে বাবার দিকে তাকায়। বাবার চোখ মুখ রুক্ষ। সে চেয়ে থাকতে পারল না। চোখ নামিয়ে ফেলল। জবাব সাজাতে লাগল, কী বলবে। ভয় করছে, অস্বস্তি লাগছে। নিশ্বাস ক্রমে ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে। তার জন্য তার বাবা কষ্ট পাচ্ছে, সেটার জন্যও বুকে ব্যথা হচ্ছে তার। কিন্তু, এখন আর চুপ থাকলে চলবে না। এমন একটা দিন যে আসবে সেটা সে আগে থেকেই জানতো। তাই আর আফসোস করে লাভ নেই। এবার এই কঠিন প্রশ্নের জবাব তাকে দিতেই হবে। সে নিজেকে শক্ত করল। লরিনের দিকে এক পলক চাইল। ছেলেটা একরাশ আশা নিয়ে তার মুখপানে চেয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষা করছে। এই মানুষটাকেও আর কষ্ট দেওয়া যাচ্ছে না। অতঃপর সে ঠিক করল। বাবার দিকে চেয়ে বলল,

‘জ্বি বাবা, আমি লরিনকে বিয়ে করতে চাই।’

মেয়ের উত্তর মেয়ে মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইলেন। বুঝতে পারছেন না কী বলবেন। মাহিয়া এখনো ভীত সন্ত্রস্ত। বলে তো দিয়েছে কিন্তু বাবা ব্যাপারটা কেমন ভাবে নিবে কে জানে।

তবে তার এই কথাটা শুনে যার প্রাণ ফিরে এসেছে সে হলো লরিন। সে তো বিশ্বাসই করতে পারছে না। মোহনা সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চায়। আজ যেন জীবন স্বার্থক মনে হচ্ছে। এবার সবশেষে যেন তার শ্বশুরমশাই ও রাজি হয়ে যান এই কামনাই করছে সে।

মাহবুব সাহেব অনেক ভাবলেন। লরিনের সম্পর্কে সবই শুনেছেন, জেনেছেন। ছেলে ভালো, পরিবার ভালো। তার মেয়েও রাজি। ঐদিকে তো অরূপ ও তাকে কম ঘুরাচ্ছে না। সব চিন্তা ভাবনা করে তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। লরিনের দিকে ঘুরে বললেন,

‘কাল তোমার দাদা দাদুকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসবে। কালই বিয়ের ডেইট পাকা করব।’

মোহনা আর লরিন দুজনেই হতবিহ্বল। বাবা রাজি হয়ে গেল? এত সহজেই? মোহনা হা করে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। লরিন তো পারছে না নাচতে শুরু করে। সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলে,

‘ধন্যবাদ, আংকেল।’

মাহবুব সাহেবের গাম্ভীর্য ভাবে তেমন ফাটল এল না। তিনি গম্ভীর সুরে লায়লা বেগমকে বললেন,

‘চা নিয়ে এসো।’

লায়লা বেগমও খুশি মনে চা বানাতে গেলেন। মোহনাও মা’র পেছন পেছন রান্নাঘরে গেল। সে যেতেই মাহিয়া তাকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরল। লাফাতে লাফাতে বলল,

‘অবশেষে এই বিদেশিই আমার দুলাভাই হতে যাচ্ছে। আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে…’

মোহনা হেসে বলল,

‘হয়েছে ছাড়। এখনই এত নাচানাচি করিস না। বাবার মুড এখনো ঠিক হয়নি। বলা যায় না হুট করে যদি আবার মত পাল্টে ফেলে।’

মাহিয়া তাকে আশ্বাস দিয়ে বলল,

‘আরে আমাদের বাবা হলো এক কথার মানুষ, একবার যেটা বলে দিয়েছে মানে বলে দিয়েছে, আর সেই কথার খেলাপ হবে না। এত চিন্তা করো না তো। জানো, আমি তো শুধু লরিন ভাইয়ার মুখটা দেখছিলাম। বাবা রাজি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কী চমৎকার হাসিই না ফুটে উঠেছিল। উনারও বোধ হয় তখন আমার মতো নাচতে মনে চাচ্ছিল, যা উত্তেজনা উনার চোখে মুখে দেখেছি।’

মোহনা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,

‘তোরা দুইটা হয়েছিস একইরকম, বাদর কোথাকার।’

মোহনা রান্নাঘরে গিয়ে দেখে লায়লা বেগম চা বানাচ্ছেন। মোহনা ধীর পায়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। চুলায় ফুটন্ত পানি, লায়লা বেগম সেই পানিতে চা পাতা ঢালতে ব্যস্ত। মোহনা ঢোক গিলে গলা ভেজায়। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘আম্মু, বাবা কি কষ্ট পেয়ে এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন?’

লায়লা বেগম তার কাজের উপর মনোযোগ রেখেই বললেন,

‘মা বাবা সবসময়ই সবকিছু ভেবে চিন্তেই সিদ্ধান্ত নেন। তোর বাবা যা ভালো মনে করেছেন তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই নিয়ে তুই আর এখন কিছু ভাবিস না।’

‘কিন্তু আম্মু, বাবা যে বললেন কালই বিয়ের ডেইট ফাইনাল করবেন। কিন্তু, আমি তো অনার্সের পর বিয়ে করতে চাই, আমার তো আরো এক সেমিস্টার বাকি।’

‘তাহলে কাবিন হয়ে যাবে। অনুষ্ঠান না হয় পরে হবে। এমনিতেও সামনে রোজা আসছে। এখন অনুষ্ঠান করার মতো সময় হবে না।’

মোহনা খুশি হয়ে বলল,

‘আচ্ছা, তুমি তাহলে বাবাকে এটাই বলো।’

.

চা খেতে খেতে মাহবুব সাহেব লরিনের কাছ থেকে আরো কিছু ইনফরমেশন নেন। লরিনও বসে বসে বাধ্য ছেলের মতো উনার সমস্ত প্রশ্নের জবাব দেয়। লরিনকে ছেলে হিসেবে মাহবুব সাহেবের প্রথম থেকেই পছন্দ ছিল। বিদেশি হলেও বাবার রক্তের ছোঁয়া স্পষ্ট। আজ তার সাথে কথা বলে উনার সেই পছন্দটাই আরো একটু পাকাপোক্ত হয়েছে আরকি।

যাওয়ার সময় মোহনা একবারও লরিনের সামনে আসেনি। লরিনের তৃষ্ণার্ত দুই চোখ মোহনাকে বার কয়েকবার খুঁজেছে। কিন্তু মোহনা তার রুম থেকেই বের হয়নি। বাধ্য হয়ে লরিনকে সেই তৃষ্ণার্ত নয়নে বাইরে বেরুতে হলো। তবে রাস্তার কাছে গিয়ে একবার কী ভেবে সে উপরে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গেই চিরচেনা সেই প্রিয় মুখশ্রী দেখে তার ঠোঁটে হাসি ফুটে। বেলকনিতে মোহনা দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণেও মৃদু এক হাসির রেশ প্রতিয়মান। লরিনের চোখের তৃষ্ণা এবার মিটল। মন ভরে সে মোহনাকে দেখে তবেই সে সেই জায়গা প্রস্থান করল।

চলবে…

(ভেবেছিলাম শেষ করে দিব কিন্তু, যেহেতু তোমরা চাও তাই আরো কয়েকটা পর্ব দিয়ে তবেই শেষ করব)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here