যখন_তুমি_এলে পর্ব: ৪১

0
648

#যখন_তুমি_এলে
লেখা: জাহান লিমু।
পর্ব: ৪১

বিয়ের দিন যত ঘনিয়ে আসছে,সাচীর ব্যস্ততা ততই বেড়ে চলেছে। ওদের সাধ্যমত ঘরোয়াভাবেই আয়োজন করে চলেছে। কয়েকজন নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত করলো কেবল। আর সাচীর কয়েকজন ফ্রেন্ডকে। সায়াহ্নর তেমন কোন ফ্রেন্ড নেই। তবুও যে এক দুইজনের সাথে সখ্যতা আছে,তাদের দাওয়াত করলো। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ছাদেই হবে। ছাদে বড় করে আল্পনা আঁকলো সে। তুহিন আর ওর বোনকেও দাওয়াত করা হলো। শফিকুর নিজেই দাওয়াত দিলেন। যদিও তুহিন বেশ লজ্জাবোধ করছিলো শফিকুরের সামনে দাঁড়াতে। তবে মানুষ মাত্রই ভুল। আর জীবনে সব ভুল ধরে বসে থাকলে,সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় না। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগুতে হয়। শফিকুর মেয়েকে শুধু একটা কথায় বলেছিলেন,

নিজের মন যেটা চাইবে,সবসময় সেটাই করবি। জোর করে কোনকিছু মনের উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই।
এতে আত্মতৃপ্তি পাবি না।

বাবার কথার জবাবে সাচী কেবল ম্লান হাসলো। সন্তানের সিদ্ধান্তের উপর সমর্থন দেয়,এমন পিতামাতা খুব কমই পাওয়া যাবে। হ্যাঁ,পিতামাতা সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ভালোটাই করতে চায়। কিন্তু কখনো কখনো ভালোর মধ্যেও, মন্দ ঘটে যায়। যেটা আমরা সহজে অনুধাবন করতে পারিনা। কিন্তু এর ফল ভুগতে হয় সবাইকে। মানুষ মাত্রই যদি ভুল হয়ে থাকে,তবে পিতামাতাও ভুল করতে পারে। তারাও মানুষ,এলিয়েন নয়। তাই আমাদের এই প্রচলিত ধারণা ভেঙে বেরোনো উচিত। সবসময় সন্তানেরই বাবা, মাকে খুশি করতে হবে, স্যাক্রিফাইস করতে হবে,এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। বরং সন্তানের খুশিতে, বাবা মায়েরও তৃপ্তি অনুভব করা উচিত। এবং সেটা অবশ্যই সন্তানের সিদ্ধান্ত যাচায়-বাছাই করার পর।
শফিকুর জানেন,তুহিন ছেলেটা খারাপ না। হয়তো ভুল বুঝাবুঝি হয়েছিলো দুজনের মধ্যে। কিন্তু এভাবে দূরত্ব তৈরি করাটা হয়তো ঠিক হয় নি। তাও নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে,সেই ঢের। আজকাল তো ব্রেকআপ মানে,ব্রেকআপ। সম্পর্কের প্রতি কোন যত্নই নেই,এই জেনারেশনের। অথচ ভালোবাসায়, ভালোবাসার চেয়েও বেশি জরুরী সম্পর্কের প্রতি যত্নশীল হওয়া ।

যেহেতু একই বাসায় বিয়ে,তাই দুজনের একই সাথে গায়ে হলুদ হবে। বড় করে একটা স্টেজ বাঁধা হয়েছে। স্টেজে পার্পল আর হোয়াইট কালারের পাতলা শিফন কাপড়,আর ফেয়ারীলাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে। লাইটের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন রংয়ের প্রজাপতি লাইটও রয়েছে। পুরো ছাদে বিভিন্ন রংয়ের লন্ঠনও জ্বালানো হয়েছে। ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে অন্যরকম আবহ তৈরি করবে এগুলো। অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকালে,চলবে রাত অবধি।
এতসব ব্যস্ততার মাঝে,সাচীর ফোনটা তখন থেকে বেজে যাচ্ছে। কিন্তু সাচীর ফোন ধরার ফুরসত টুকু নেই। তুহিন হয়তো বেশ ক্ষেপে যাচ্ছে। সাচী মনে মনে ভাবছে,তুহিনের তো একটু বুঝা উচিত। বিয়ে বাড়ি মানে কতটা ঝামেলা থাকতে পারে। সাচীর এক ফ্রেন্ড ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্টে কাজ করে। সাচী তার সাথে থেকে সব কিছুর তত্বাবধান করছে।
তুহিন আবার ফোন দিলে,একসময় সাচী রিসিভ করলো।
তুহিন যে রেগে আছে,সেটা ওর কন্ঠতে স্পষ্ট প্রতীয়মান। সাচী স্বাভাবিক ভাবে বললো,সে বিজি ছিলো।
তুহিন নিজের ক্রোধটাকে সংবরণ করে নিলো বহু কষ্ট। এমন সুন্দর মুহুর্তে সে রাগ দেখাতে চায় না। কিন্তু সাচী এমন সব কাজ কারবার করে যে,তুহিনের রাগ উঠতে বাধ্য হয়ে যায়। যেহেতু তুহিন বারবার ফোন দিচ্ছে,তার মানে কোন প্রয়োজন আছে। ঐদিকে সাচীও ফোন রুমে রেখে,ছাদে কাজ করছিলো। বাবা এসে ফোন দিয়ে গেছে। বেশ কয়েকবার বাজার পর সে রিসিভ করলো।
তুহিনের ফোন দেয়ার কারন হলো,তুহিন সাচীর জন্য শাড়ী কিনতে চাইছে। আর তার সাথে সে ম্যাচিং পাঞ্জাবি পরবে। এখন কি রংয়ের কিনবে,সে বুঝতে পারছেনা। সাচী বলে দিলো, তোমার যেটা ভালো লাগে। অগত্যা তুহিন ওর পছন্দমতোই কিনলো। কথা বাড়ালো না আর।

গায়ে হলুদের দিন সকাল থেকেই আরাদ বিরুনিকাদের বাসায়। দাদীও এসেছে। কোমল বেশ খুশি হয়েছেন। যদিও উনি আরাদের প্রতি একটু মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। কিন্তু আরাদ বিরুনিকাকে বোন বানিয়ে,নিজে বোনের বিয়ের সব দায়িত্ব নিলো। সব কেনাকাটা আরাদকে সাথে নিয়েই করেছেন কোমল। স্মরণিকা,ওর ভাই সাফুয়ান, আর আরাদ মিলে ওদের রুমগুলো সুন্দর করে সাজালো। ব্যালকুনিতেও ফেয়ারী লাইট লাগালো। যদিও প্রোগ্রাম ছাদে হবে। তবুও নিজেদের রুমগুলো না সাজালে, বিয়ে বিয়ে ফিলিংসটাই আসবে না। নিজেদের কাজ শেষ করে,স্মরণিকা আরাদকে টেনে ছাদে নিয়ে গেলো। সেখানের কাজ কতদূর হলো,সেটা দেখার জন্য। অবশ্য সাজানোর ব্যাপারে,সাচী একাই একশো।
কোমড়ে ওড়না গুঁজে কাজ করে চলেছে। অবশ্য যদি বৃষ্টি নামে,তবে সব ভুন্ডুল হয়ে যাবে। যদিও এখন শরৎকাল। তারপরও বলা যায় না। তবে কয়দিন ধরে আবহাওয়াটা বেশ রৌদ্রজ্জলই বটে।
বিকাল হয়ে আসছে। সাচী কাজ করতে করতে ঘেমে নেয়ে একাকার। আরাদ,স্মরনিকাকে সে খেয়াল করেনি। আরাদ আঁড়চোখে সাচীকে দেখছিলো অবশ্য। এবং সেটা স্মরণিকার চোখ এড়ালো না। তবে সে এতোটা মাথা ঘামালো না এটা নিয়ে। কারন সে তুহিনের কথা জানে।
কাজ প্রায় শেষ করে, ওদের দিকে তাকালো সাচী। ওরা ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। সাচীকে তাকাতে দেখে,স্মরণিকা ছুটে গেলো। জিজ্ঞেস করলো,

” অল সেট?”

সাচী কোমড় থেকে ওড়নাটা খুলে কপালের আর নাকের ঘাম মুঁছতে মুঁছতে বললো,

” হ্যাঁ,অল ওকে। চাইলে নাচতে পারিস। এটা বলে সাচী হাসলো। দূর থেকে সেই হাসি একজনের চোখ এড়ালো না।
সাচীর হাতে সময় নেই,তাই ওদের ঐখানে রেখেই চলে গেলো। আর তৈরি হওয়ার জন্য তাড়া দিলো। সবাই বিরুনিকাকে পার্লার থেকে সাজাতে চাইছিলো। কিন্তু বাঁধ সাধলো সায়াহ্ন। সে সবার সামনে বলে বসলো,

আমি আমার মায়াবী অভিমানী বউকেই দেখতে চায়। কোন কার্টুন নয়।
এটা শুনে সাচী ক্ষেপে গেলো। সে ভাইকে বুঝাতে লাগলো,সব মেয়েদেরই বিয়েতে সাজা নিয়ে একটা অন্যরকম ফ্যান্টাসি থাকে। কিন্তু সাচীকে অবাক করে দিয়ে,বিরুনিকা বলে উঠলো,

” উনি যেমন চায়,আমি তেমনটাই সাজবো।”

উপস্থিত সবাই বেশ অবাক হলো। আজকালের মেয়েরা যেখানে বরের ঘাড়ে ছুরি ধরে পার্লারে সাজতে যায়,সেখানে বিরুনিকা শ্যাম বর্ণের হয়েও এমন কথা বলতে পারে,সেটা হয়তো অবিশ্বাস্যই বটে। সায়াহ্ন একবার আঁড়চোখে তার কিউট ইডিয়টের দিকে তাকালো। বিরুনিকাও আঁড়চোখে তাকাতে গিয়ে,দুজনই ধরা পড়ে গেলো। ঐদিনের পর ওদের আর কথা হয়নি সরাসরিও না,ফোনেও না। তবে মেসেজে কথা হয়েছে। মেসেজেও সায়াহ্ন বিরুনিকাকে জ্বালিয়েছে প্রচুর,ঐদিনের কান্ডের জন্য। সায়াহ্নর কথা শুনে,বিরুনিকার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো, এটা তার কুনোব্যাঙ!
এতোদিন কি রূপ দেখে এসেছে সে,আর এখন কি রূপ দেখছে। এতো পুরো সাপের কোলস বদলানোর মতো, নিজের বিহেভিয়ার বদলে ফেলেছে। ভেজা বেড়াল কোথাকার!বিরুনিকা চোখ সরিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। সায়াহ্ন দুষ্টু হাসি হাসছিলো তখন।
সাচী বিরুনিকার কাছে গিয়ে বললো,

” ইথনা পেয়ার মাত কারো,ম্যারা ভাই ডুব যায়েগা!”

সাচী হাসতে লাগলো এটা বলে। বিরুনিকা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আর সায়াহ্ন দূর দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। সেটা দেখে বিরুনিকার গা জ্বালা করে গেলো। সায়াহ্নর অবশ্য সেদিকে কোন ভ্রক্ষেপ নেই। বিরুনিকার মনে হলো, কুনোব্যাঙ এখন বেহায়াব্যাঙ হয়ে গেছে। অসভ্য!

.

সবাই মোটামুটি রেডি হয়ে ছাদে উপস্থিত। বিরুনিকা,সায়াহ্ন দুজনকে সিঁড়ি দিয়ে পৃথক করে এনে,ছাদের দরজা থেকে দুজনের মাথায় ওড়না ধরে, একসাথে স্টেজে নিয়ে যাওয়া হলো। যদিও সাচী ফটোগ্রাফি করে,কিন্তু আলাদা ফটোগ্রাফার আনলো। নিজে ফটোগ্রাফি করলে,বিয়ের মজাটাই মিস করে যাবে। তুহিন এখনো আসেনি। সাচী ফোন দিচ্ছে,ফোন বন্ধ। এবার একটু চিন্তা হতে লাগলো। এদিকে ফাংশন শুরু হলো বলে। দূর থেকে সাচীর দিকে একজোড়া চোখ নিবদ্ধ ছিলো। সাচী গোল্ডেন চিকন পাড়ের, একটা লাল সিল্কের শাড়ি পরলো,সাথে গোল্ডেন ব্লাইজ। এই প্রথমবার সে চুল স্ট্রেইট করলো। সেজন্য ওর চেহারাটাই অন্যরকম দেখাচ্ছে। আরাদ প্রথমে চিনতেই পারেনি সাচীকে। বোকার মতন তাকিয়েছিলো। সাচী অবশ্য খেয়াল করেনি। আরেকজনের সাথে কথা বলছিলো এক নাগাড়ে। হয়তো কিছু বুঝাচ্ছিলো।
মাঝখানে সিঁথিতে চিকন ছোট্ট লাল পাথরের টিকলি,যেটার বিন্দুর মত পাথরটা কপালে পড়ে আছে। হাতে লাল,গোল্ডেনের মিশেলে চুড়ি। গলায় সিম্পল ডিজাইনের চোকারের নেকলেস,সাথে ম্যাচিং কানের দুল। চোখে গাঢ় কাজল,তবে ঠোঁটে লিপস্টিক নেই। এই জিনিসটা কেন জানি সাচীর বিশেষ পছন্দ নয়। অথচ তুহিন ওকে একবাক্স লিপস্টিক গিফট করেছে। সেগুলো ঐভাবেই পড়ে আছে। তুহিনের হয়তো খেয়াল নেই যে,সাচীর এটা খুব একটা পছন্দ না। হালকা সাজ,তবুও অন্যরকম লাগছে সাচীকে।
বিরুনিকাকে ব্লু আর হলুদের কম্বিনেশনের লেহেঙ্গা পরানো হয়েছে। আর সায়াহ্ন ব্লু পাঞ্জাবি। সায়াহ্নর ফর্সা শরীরে নীল রংটা যেন ফুটে পড়ছে। বিরুনিকা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বারবার সায়াহ্নকে দেখে চলেছে। তবে সবার চোখ ফাঁকি দিলেও,যাকে দেখছে, তার কাছে ধরা পড়ে গেলো ঠিকই। অথচ সায়াহ্ন বিরুনিকার ভাব বুঝতে পেরে,ইচ্ছে করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলো। আর বিরুনিকা ভাবছে,সায়াহ্ন ওর দিকে তাকাচ্ছেনা। একটু অভিমানও হলো বটে তার। বিরুনিকাকে দেখে একটা কথাও বলেনি সায়াহ্ন।

কুনোব্যাঙ কোথাকার!

আবার ভাব নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। বিরুনিকা যখন বিড়বিড় করছিলো,তখন সায়াহ্ন বিরুনিকার বাহুতে চিমটি কাটে। ঘটনার আকস্মিকতায় বিরুনিকা চিৎকার দিতে নিয়েও,নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরে। ভাগ্যিস এইমুহুর্তে আশেপাশে লোক নেই। সবাই প্রোগ্রাম শুরুর প্রিপারেশন নিয়ে ব্যস্ত।
চোখ কটমট করে সায়াহ্নর দিকে তাকায় বিরুনিকা। কিন্তু সায়াহ্ন তখন গভীর মনোযোগে মোবাইল ঘাটছে। বিরুনিকা একটু উঁকি দিয়ে দেখে,সায়াহ্ন একটা মেয়ের ছবি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে। মুহুর্তেই বিরুনিকার চোখ দুটো আগুনির ফুলকির মতো জ্বলে উঠলো। পারলে ফোনের মেয়েটাকে ভস্ম করে দেয়,নয়তো ফোনটায়। রাগে ক্ষোভে সে সায়াহ্নর থেকে একটু সরে বসলো। আর একবারের জন্য তাকালো না পর্যন্ত।
কিন্তু বিরুনিকা সরে যেতেই, সায়াহ্ন আরো গা ঘেষে বসলো। বিরুনিকার তখন স্টেজ ছেড়ে চলে যেতে মন চাইছিলো।
বিরুনিকা একটু উঠতে যাবে,তখনি সায়াহ্ন ওর লেহেঙ্গার ওড়না টেনে ধরলো। ওড়নাতে টান লাগায়, বিরুনিকা তড়িঘড়ি করে আবার বসে পড়লো। এই ছেলের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে সিউর। কোন ভরসা নেই। কারন তখন আবার লোকজন সব এসে যাচ্ছিলো। আর এসে যদি এই দৃশ্য দেখতো,তবে লজ্জায় মাথা কাটা যেতো ওর। ঐ কুনোব্যাঙ এর তো লজ্জা আছে বলে মনে হয় না। যেভাবে সবার সামনে নিজের ভালোবাসার কথা বলছিলো। মনে হচ্ছিলো, কোন বিশ্বপ্রেমিক যেন!
আর এতোদিন ভেজা ভেড়াল সেজে থাকা হয়েছিলো।
কিন্তু নিজের হবু বউয়ের পাশে বসে,ফোনে অন্য মেয়ের ছবি দেখছে,এতোবড় স্পর্ধা!
সায়াহ্নর ফোনটায় ভেঙে ফেলতে মন চাইছিলো ওর। কিন্তু দয়া দেখিয়ে সেটা করলোনা। তবে এর জবাব তো দিতেই হবে মিস্টার কুনোব্যাঙ কে। মনে মনে সেটারই উপায় ভাবছে সে।

বিরুনিকাকে গভীর ভাবনায় ডুবতে দেখে,সাচী চোখের সামনে তুবড়ি বাজালো। এতে বিরুনিকা চমকে গেলো বেশ। পাশে বসে কানের কাছে গিয়ে বলে উঠলো,

” থোরা অউর সবুর করো,ম্যারা সুইট ভাবী। আর মাত্র চব্বিশ ঘন্টা। তারপর বন্ধ ঘরে,যত খুশি তত গভীর ভাবনায় ডুবে থেকো। কেউ বিরক্ত করবেনা,আমিও না। তোমার কুনোব্যাঙ তো এমনিতেই ঘরকুনো। এতো ভালোবাসলে,এরপর তো ঘর থেকে টেনে বের করতে হবে। এটা বলে সাচী চোখ টিপলো।”

কিন্তু তৎক্ষনাৎ বিরুনিকা সাচীর কান চেপে ধরলো। বলতে লাগলো,

” খুব পাঁকা টমেটো হয়ে গেছো না,ননদী ?
এবার তবে দ্রুতই বিদায় করতে হবে। চব্বিশ ঘন্টা পরেই তোমার উপর খবরদারি শুরু করতে যাচ্ছি তবে। ঐ আরজের কানটাও, ঠিক এভাবেই ধরবো। যতই সিনিয়র হোক। সায়াহ্ন ওদের কথা শুনার চেষ্টা করলো,তবে ওরা ধীর সুরে বলায়, সে তেমন একটা বুঝতে পারলনা। বিরুনিকা সেটা ঠাহর করতে পেরে, এবার একটু জোরেই বলে উঠলো,

” তোমাদের উপর চব্বিশ ঘন্টা পরেই একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারী করা হবে। স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে আসছি আমি বিরুনিকা কবির। ওপপস…কাল থেকে তো বিরুনিকা রাহমান,মনে মনে এটা বললো সে। আর মুখে বললো,তৈরি থেকো।”

বিরুনিকার হঠাৎ জোরে এ কথাটা বলার কারন,সাচী বুঝতে না পারলেও,সায়াহ্ন বেশ বুঝতে পারলো। মুখ টিপে হাসছিলো সে। সায়াহ্নর হাসি দেখে,এবার সাচী বিষয়টা উদঘাটন করতে পারলো। বুঝতে পেরে সে নিজেও হাসলো। একটু দূরে গিয়ে ওদের দুজনের একটা মিষ্টি কাপল ছবি তুলে নিলো সে। যেখানে বিরুনিকা গাল ফুলিয়ে রেখেছে অভিমানে,আর সায়াহ্ন সেদিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।

ফাংশন শুরু হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর,তুহিন আসলো। ওর বোন আসতে পারেনি। ছোট মেয়েটার ভীষণ জ্বর হঠাৎ করেই। হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছে। তুহিনও আসতে চাইছিলোনা। ওর বোনই জোর করে পাঠিয়েছে। তুহিন না আসলে কেমন দেখায় বিষয়টা।

তুহিন ডার্ক মেরুন পাঞ্জাবি পরলো,সাথে হোয়াইট প্যান্ট। হাতে হোয়াইট ব্রেসলেট। সাচীর জন্য মেরুন আর সিলভার কম্বিনেশনের একটা শাড়ি কিনেছিলো।কিন্তু আসতে দেরী হয়ে যাওয়াতে,এখন আর পরা সম্ভব না। এতে তুহিনের অবশ্য একটু মন খারাপ হলো।
তুহিনকে দেখে সেখানে উপস্থিত বেশ কয়েকজন মেয়ে ফিদা হয়ে গেলো। সাথে সাচীর বান্ধবীরাও। কারন তুহিন যে সাচীর প্রেমিক,সেটা এরা জানেনা। সাচীর আত্মীয় স্বজনরা টুকটাক জানে,তবে দেখেনি কখনো। সাচীর বাবা সবার সাথে তুহিনের পরিচয় করিয়ে দিলেন এক এক করে। সবাই বেশ পছন্দ করলো তুহিনকে। অবশ্য পছন্দ করার মতই সে। সাচীকে তুহিনের পাশে দাঁড় করিয়েও দেখলো, মুরুব্বি কয়েকজন। দূর থেকে সেটা দেখছিলো কারো ঝাপসা দুটি নয়ন।
অকস্মাৎ সেখানে হানা দিলো স্মরণিকা। নিজের মতো করে বলতে লাগলো,
ভেবেছিলাম আপুকে বিয়ে দিয়ে,তোমার সাথে সারাজীবনের সম্পর্ক গড়ে নিবো। তা না, আপুটা ঐ সাদা ভ্যাড়াটাকে পছন্দ করে বসলো। স্মরণিকার কথা শুনে আরাদ হাসলো। স্মরণিকার মাথার চুল এলোমেলো দেয়ার ভান করে বললো,

” সাদা কালোতে কি আসে যায়? যে যাকে ভালোবাসে,তাকে পাওয়ার মধ্যেই পূর্ণতা,তৃপ্তি।”

স্মরণিকা সেসবে পাত্তা দিলো না। তার আরাদের প্রতি অভিমান হচ্ছে। যদিও সেটা বৃথা। কারন অদৃষ্টের উপর কারো হাত থাকেনা। এসব ভাবতে ভাবতে সে অন্যদিকে চলে গেলো।
সহসা সেখানে বিরুনিকার ছোট ভাই এসে উপস্থিত। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে ভীষণ রাগান্বিত। রাগে হাত কঁচলাচ্ছে। আরাদ সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো। একসময় কৌতূহল বশত সাফুয়ানকে প্রশ্ন করেই বসলো। কিন্তু যে উত্তর সে দিলো,সেটা শুনে আরাদের মুখ হা হয়ে গেলো পুরো। বলে কি এতটুকু ছেলে!
আরাদ হাসবে,না কাঁদবে বুঝতে পারলনা। সাফুয়ান কাঁদো কাঁদো হয়ে বলতে লাগলো,
তার ক্রাশ,আজ অন্য কারো হয়ে গেছে। সে আরো বললো,
আমি কালো দেখে কি,সে সুন্দর কাউকে বেঁছে নিলো? শুধু ছেলেরা নয়,মেয়েরাও সুন্দর ছেলে পছন্দ করে। আর সে যে দুইবছর ধরে আমার ক্রাশ,তার কোন দাম নেই?

সাফুয়ানের কথা শুনে আরাদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেলো। এই ছেলে কিসব বলছে?

কে তার ক্রাশ?
তাও এই বয়সেই!

আরাদ নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে, পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,

” কে তার ক্রাশ?”

তখন সাফুয়ান যেদিকে ইশারা করলো,সেটা দেখে আরাদের পিলে চমকে গেলো!

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here