#যখন_তুমি_এলে
লেখা: জাহান লিমু
পর্ব: ৪০
নাম কি তোমার?
সাচী। সাচী মেহতাজ। বিচলিতভাবে প্রশ্নের উত্তর দিলো সাচী। ড্রয়িংরুমে এসেই এই মহিলার সামনে পড়লো সাচী। মহিলা কে হতে পারে,সেটা কিছুটা অনুমান করতে পারছে সে। কিন্তু আরাদ কোথায়? না বলে এসে কি ভুল করে ফেলেছে?
বাসায় কে কে আছেন? আবার ঐ মহিলার প্রশ্নে সাচী আমতা আমতা করে বললো,বাবা,ভাই আর আমি।
মা নেই?
নাহ!
একশব্দে উত্তর দিয়ে, চুপ করে বসে রইলো সাচী।
আঞ্জুমান আরা আর কথা বাড়ালেন না। কাউকে অযথা প্রশ্ন করে বিরক্ত করার পাত্রী উনি নয়। যেটুকু জানার,কেবল সেটুকু জেনে নিলেন। আরাদের সাথে দেখা করতে এসেছে যেহেতু, বাকী কথা না হয় ওর সাথেই বলবে। উনি অযথা কথা বলে নার্ভাস করাতে চান না। যদিও উনার যথেষ্ট বয়স হয়েছে,কিংবা আগের কালের,তবুও উনার বিচক্ষণতা চোখে পড়ার মতো। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে আর এক মেয়েকে সামলে,নিজেই স্বামীর ব্যবসা সামলেছেন। ছেলেরা পড়াশোনা শেষ করার পর,সব তাদের বুঝিয়ে দেন। মেয়েটা ইতালি থাকে। হাসব্যান্ড ঐখানেই স্যাটেল্ড।
আঞ্জুমান বড় ছেলের কাছেই থাকেন। ছোট ছেলে তো নিরুদ্দেশ। নিরুদ্দেশ বলছেন এ কারনে যে,উনার সাথে দেখা হয়েছিলো চার বছর আগে। মন চাইলে ফোন দেয়,কিন্তু দেশে আসে না। ছেলের খোঁজখবর ইচ্ছে হলে নেই,না হলে নাই। ছোট ছেলেটা এতো উদাসীন!
অথচ আগে এমন ছিলো না। সারা বাড়ি সেই মাতিয়ে রাখতো। সারাক্ষণ ভাই,বোনের সাথে খুঁনসুটি লেগেই থাকতো। বিয়েও করলো নিজের পছন্দে। বছর ঘুরতেই ছেলে হলো।
তারপর যে কি হয়ে গেলো আচমকা। এক অজানা ঝড় এসে সব তছনছ করে দিলো। আঞ্জুমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সাতটা বছর কেটে গেছে,তবুও অভিমান ভাঙেনি ওদের। না ছেলে ঝুঁকে, না বউ। মাঝখানে নিজেদের সন্তানের জীবনটাই অনিশ্চয়তায় ফেলে দিলো।
আঞ্জুমান কে চুপ থাকতে দেখে সাচীও কোন কথা বললোনা আর। তখন আরাদ কোথা থেকে যেন এলো। আচমকা সাচীকে দেখে বেশ চমকে তাকালো। এখানে কেন হঠাৎ!
আর বাসায় বা চিনলো কি করে?
একদিন শুধু বাসার গলির ঠিকানাটা বলেছিলো আরাদ। তাতেই বাসা চিনে গেলো?
স্মার্ট আছে বেশ।
মাথা চুলকে দাদীর পাশে গিয়ে বসলো আরাদ। দাদীর ঔষধ আনতেই বাইরে গিয়েছিলো সে। দাদী গতকাল রাতে এসেছেন, অনেকদিন পর। কিন্তু ডায়াবেটিস এর ঔষধ আনতে ভুলে গেছেন। তাই আরাদ সকাল সকাল নিয়ে আসলো। ঔষধে গ্যাপ পড়লে সমস্যা। প্রেসক্রিপশনের ছবি কাজিনকে পাঠাতে বলেছিলো।
দাদীর সামনে সাচীর সাথে কথা বলতে কেমন আনইজি লাগছে আরাদের। কারন সে নিশ্চিত,সাচীকে নিয়ে দাদী এতোক্ষণে উল্টাপাল্টা কিছু ভেবে ফেলেছে হয়তো। দাদীর এই এক সমস্যা। মেয়ে দেখলেই তাকে নাতির বউ বানিয়ে ফেলে। প্রথম প্রথম রোহানীকে নিয়েও এমন করতো। পরে যখন আরাদ ধমকে বুঝালো,তখন আর বলেনি।
তবে সাচীর এভাবে কোনকিছু না বলে আগমনের হেতু খুঁজে পাচ্ছিলো না আরাদ। কয়েকদিন যাবত কোন যোগাযোগ ছিলো না। আরাদ ইচ্ছে করেই দূরত্ব বজায় রাখছিলো। কারন সে আর থার্ড পারসন হয়ে ঝামেলা বাঁধাতে চায় না। যেহেতু ইতিমধ্যে আবার একটা ঝামেলা হতে যাচ্ছিলো।
আর ঝামেলা এড়াতে আরাদ আরেকটা ডিশিসান নিয়ে নিয়েছিলো। কিন্তু সেটা সাচীকে কিভাবে বলবে বুঝতে পারছিলোনা। যেহেতু সাচীর হাতে সময় নেই। তাই সেটা বলাটা হয়তো অশোভনীয় হবে।
ঠিক তখন দাদী ওদের দুজনকে কথা বলতে দিয়ে,উনি নিজের রুমে চলে গেলেন। আরাদ অবশ্য নিজে দিয়ে আসতে চাইছিলো। তখন দাদী যা বললেন,সেটা শুনে আরাদের আক্কেল গুড়ুম অবস্থা!
দাদী বলে উঠলেন,
তোর বউয়ের সাথে ডিজে নাচ নাচবো আমি। বয়স হলেও, আমাকে অতোটাও দুর্বল মনে করিস না যেন। একটু অসুস্থ ছিলাম কয়দিন। তার মানে এই না যে,শরীরের জোর কমে গেছে। দাদীর কথা শুনে সাচী চোখ বড় বড় করে একবার আরাদের দিকে,একবার আঞ্জুমানের দিকে তাকাচ্ছে। সাচী বুঝতে পারলো, বয়স হলেও আঞ্জুমানের মনের জোর এখনো অনেক। যেখানে এ যুগের মেয়ে হয়েও,সাচী ডিজে নাচের কথা ভাবতে পারেনা। সেখানে আরাদের দাদী তো…!
আঞ্জুমান চলে যাওয়ার পর,আরাদ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
টেবিল থেকে গ্লাসে পানি নিয়ে পান করলো।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলে দুজন। কেমন যেন অদ্ভুত জড়তা গ্রাস করছে দুজনকেই। তবে তার সঠিক কারন তাদের কারে জানা নেই। কখনো কখনো এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় আমাদের। অথচ অসস্থি বোধ করার কারনটাই হয়তো আমাদের জানা থাকেনা।
একসময় সাচীই একটা কার্ড আরাদের সামনে রাখলো। আরাদ সাচীর দিকে একপলক তাকিয়ে, কার্ডটা হাতে নিলো।
উল্টেপাল্টে বুঝতে পারলো ওর ভাইয়ের বিয়ের কার্ড।
কার্ডটা দিতেই কি সাচী বাসায় আসলো?
নাকি অন্য কোন কারন!
আরাদ ঠিক ধরতে পারলনা বিষয়টা। তবে পরক্ষণেই সাচী যখন ওকে ধন্যবাদ জানালো,তখন বেশ চমকে গেলো সে। অদ্ভুত চাহনি নিয়ে সাচীর দিকে তাকালো। তবে সাচী তখন মাথা নিচু করে, ওড়নার কোণা পেঁচাচ্ছিলো। যদিও আরাদ বুঝতে পারলো সাচীর ধন্যবাদ দেয়ার কারন,তবুও সে জানতে চাইলো। কোন কিছু জেনেও, আবার জানতে চাওয়ার মধ্যে অন্যরকম মজা আছে। আর বক্তার নিজের মুখ থেকে কাহিনী শোনার ফিলিংসটাই অন্যরকম। আরাদ যখন ধন্যবাদ দেয়ার কারন জানতে চাইলো, তখন সাচী ভীষণ বিব্রত অনুভব করছিলো। আরাদ নিজেও সেটা টের পেয়েছিলো। তবে কিছু বলে নি।
একপর্যায়ে সাচী আরাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো। যে আরাদ কি করে বুঝতে পারলো যে ঝামেলা হয়েছে বা হতে পারে?
সাচীর প্রশ্ন শুনে আরাদ কেমন যেন একটা রহস্যময় হাসি হাসলো। যেটার কোন মানে খুঁজে পেলো না সাচী। একসময় আরাদ বিদ্রুপ করে বললো, ইটস ম্যাজিক! আমি জাদু জানি।
এ মুহুর্তে আরাদের জোকস শুনে,সাচী বোধহয় কিঞ্চিত বিরক্তিবোধই করলো। তবে মুখে সেটা প্রকাশ করলোনা। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললো,
” আচ্ছা, তো জাদুকরের জাদু রহস্য জানতে পারি কি?”
আরাদ এবার জোরে হেসে উঠলো। তবে এতে সাচী আরো বেশি বিরক্তিবোধ করলো। সেটা দেখে আরাদ এবার আর কথা পেঁচালো না। সবটা খুঁলে বললো সাচীকে। সবটা শুনে সাচীর মাথায় বাজ পড়ার অবস্থা। তার মানে ঐ বদ বাদল ওদের দুজনকে ফলো করছিলো এখনো?
আরাদ হাসতে হাসতে বললো,হ্যা। বেশ সেয়ানা মাল। কথাটা বলেই আরাদ চুপসে গেলো। ভীত চোখে সাচীর দিকে তাকিয়ে বললো,আমি আসলে এটা বলতে চাই নি। কিন্তু ব্যাটা এমন মাল যে,মাল না বলে থাকতে পারিনা। এটা বলে এবার আরাদ সাচীর দিকে আর তাকালোও না। কয়েক সেকেন্ড পর সাচীর অট্রহাসি শুনে, আরাদ বেশ ভড়কে গেলো।
মেয়েটার মাথায় প্রবলেম আছে নাকি?
সাচী হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পড়লো। আরাদ সাচীর অবস্থা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো পুরো। এভাবে সাচীকে হাসতে দেখেনি সে এই একবছরের পরিচয়ে। হাসলে কি সব মেয়েকেই অপূর্ব লাগে?
আরাদের জানা নেই। ফিল্মে যে কয়জন হিরোইনকে দেখেছে,তাদের সবার হাসি সুন্দর। কিংবা তারা হিরোইন বলেই,তাদের হাসি আমাদের সুন্দর লাগে। তাই হয়তো ওর এমন মনে হচ্ছে। তবে সামনা-সামনি কারো অপূর্ব হাসি দেখার সৌভাগ্য হয় নি। তাই সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখার একটু সুযোগও সে মিস করতে চাইছেনা। ময়ূরের পেখম মেলার দৃশ্য চোখের সামনে পড়লে সেটা যে মিস করবে,তার মত বোকা হয়তো দ্বিতীয়টি নেই। পরক্ষণেই আরাদ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো,
আমি এসব কি ভাবছি?
কেন ভাবছি!
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে, ফ্যান চালু থাকা স্বত্বেও আরাদ ঘামতে লাগলো। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে লাগলো সে। কিন্তু ওর মন যেন অন্য কোন ভাবনাতেই বুঁদ হয়ে আছে। যে ভাবনা যেকোন মুহুর্তে আরাদকে ডুবিয়ে দিতে পারে। বিশাল টাইটানিক যেভাবে ডুবে গিয়েছিলো,আরাদও কি তেমন ডুবে যাবে!
কিন্তু এ যে অন্যায়,অপরাধ!
তবে কি রোহানীর কথায় ঠিক?
এক অপরাধ চুকাতে গিয়ে,তার চেয়ে বড় অপরাধ করে বসছে সে?
না,না। এটা কখনোই হতে পারেনা। এটা রোহানীর ভুল ধারণা। ও তো সবসময় বেশি বেশি ভাবে। এমন কিছু আরাদ কখনোই করবেনা। ইমপসিবল! জাস্ট ইমপসিবল!
আরাদকে গম্ভীর দেখে সাচী হাসি থামালো। তারপর সোজা হয়ে বসে বললো,
” আই অ্যাম সরি। এক্সট্রিমলি সরি। আপনার কথা শুনে,আর তারপর আপনার ওমন অদ্ভুত মুখটা দেখে হাসি থামাতে পারলাম না। আর ঐ মালকে মাল বলবেন না তো কি বলবেন?
একেবারে পার্ফেক্ট নাম দিয়েছেন,মাল। মালটা সেই তখন থেকে আমাদের ফলো করে চলেছে। আর আমরা টেরই পেলাম না? কি অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার!
এ তো একেবারে হাই প্রবলেমেটিক মাল।
সাচীর মুখে বারবার মাল শুনে আরাদের চক্ষু চড়কগাছ অবস্থা। সে নিজে মুখ ফঁসকে বলে যেখানে আনইজি ফিল করছে,সেখানে সাচী অনায়াসে বলে চলেছে। মাথায় নির্ঘাত কোন প্রবলেম হয়েছে। তখন কেমন পাগলের মতো হাসছিলো। আরাদ অসহায় চোখে সাচীর দিকে তাকালো।
কাহিনী হলো আরাদ,সাচী ওদের দুজনের উপরই নজর রেখে চলেছিলো বাদল। ঐ দিন যখন আরাদ বিরুনিকার সাথে পার্কে দেখা করতে গেলো,সেখানে ঐ মাল উপস্থিত। আরাদ কোনক্রমে বুঝালো যে ওরা ভাইবোন। যদিও বাদল সন্দেহের চোখে আরাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। আরাদ কোনক্রমে ছাড় পেলো। কিন্তু ছাড় পেলো না সাচী। তুহিনের সাথে সাচীকে দেখে, মালটা সেখানেও হামলে পড়লো। ফলাফল ওদের দুজনের মধ্যে আবার সন্দেহ। আরাদ অবশ্য এসবের কিছুই জানতোনা। কারন সাচী জানায়নি। তবে সেদিন বাদল রোহানীর বাসায় উপস্থিত। রোহানীকে বললো, আরাদকে ফোন করে ইমার্জেন্সি আসতে বলার জন্য। আরাদ প্রথমে ভয় পেয় গিয়েছিলো। ভেবেছিলো আন্টির কিছু হলো কিনা। কিন্তু পরে সেখানে গিয়ে বাদলকে দেখে আরাদ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো।
এ মালটা এখানে এসেছে মানে,নিশ্চিত কোন বদ মতলব আছে। আর সেটাই হলো। তুহিন আর সাচীকে একসাথে দেখে,সে এটা আরাদকে জানাতে এসেছে। আরাদ এবার চরম বিরক্ত হলো।
তখন রোহানী বললো,
” ঐ লোকের দোষ কোথায়? তোরা দুজন বেচারাকে বলেছিস,তোরা একজন আরেকজনকে ভালোবাসিস। না পেলে মরে যাবি টাইপ ভালোবাসা। সেখানে তোদের দুজনকে পৃথক পৃথক মানুষের সাথে দেখলে তো, বেচারার টেনশন হবেই। আজো এরকম ভালো মানুষ আছে,সেটা ভেবেই তো ভালো লাগছে আমার।”
আরাদ রোহানীর লেগপুল করাটা স্পষ্ট বুঝতে পারলো। রোহানী বেশ মজা পাচ্ছে, আরাদকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেখে। আরাদ মনে মনে রোহানীকে হাজারটা বকা দিলো। সব দোষ ঐ মুটকির। রুই মাছ কোথাকার। নিজে আমাকে বিপদে ফেলে,এখন মজা লুটছে।
আরাদ তখন আর কোন উপায় না পেয়ে,বাদলকে নিয়ে সরাসরি তুহিনের বাসায় চলে গেলো। ঐখানে গিয়ে বুঝতে পারলো,ওদের মধ্যে অলরেডি ঝামেলা লেগে গেছে।
আরাদকে দেখে তুহিন বিরক্তিবোধ করলো বেশ। তবে সাথে বাদলকে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
আরাদ তখন ঠান্ডা মাথায় তুহিনকে পুরো ঘটনা বললো। যদিও তুহিন বিশ্বাস করতে চাইছিলোনা। তখন বাদল বললো যে,সে সাচীর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলো। আর সাচী ওর বয়ফ্রেন্ড আছে বলে বিয়ে ভেঙে দেয়। কিন্তু বয়ফ্রেন্ড যে আপনি,সেটা আমি জানবো কি করে? আজকাল বয়ফ্রেন্ডও বদলে যায়!
আমিতো জানি ওরা ( সাচী,আরাদ) দুজন দুজনকে ভালোবাসে। ওদের একজনের প্রতি আরেকজনের ভালোবাসা,কেয়ার দেখে আমি বিয়ে ভেঙে দেই।
কিন্তু এখনতো আমার মাথা ঘুরছে। আসল বয়ফ্রেন্ড ও তো, নকল বয়ফ্রেন্ডের কাছে ফেইল। আমিতো আপনাদের দুজনকে কথা কাটাকাটি অবস্থায় পেয়েছি। সেখানে ওদের নকল ভালোবাসা দেখে তো,আমার মাথায় হ্যাং হয়ে গেছিলো!
তুহিনের সামনে বাদল উল্টাপাল্টা বকছিলো। তাই আরাদ তুহিনকে পুরো ঘটনা খুলে বললো। যে সাচীর ভালোর জন্যই আরাদ এমন করতে বাধ্য হয়েছিলো। এখানে আরাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিলো না। সবকিছু বলার পরেও,তুহিন কেমন যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো আরাদের দিকে। হয়তো তখনো সন্দেহ কাঁটছিলো না। কিংবা আরাদ এতো কিছু কেন করবে,সেটা নিয়ে ওর সন্দেহ ঠেকছিলো। আরাদ মাঝে মাঝে ভেবে পায় না,এতো সন্দেহ করলো, সম্পর্ক রাখার দরকারটা কি?
তবে মুখে সেটা আর বললোনা। যার যার লাইফ,তার তার চয়েস,সিদ্ধান্ত।
আরাদ এ ঝামেলা থেকে এবার একেবারে ছুটি নিবে। তাই সরাসরি তুহিনের কাছে এসে সবটা ক্লিয়ার করলো।
তবে সেখান থেকে বের হয়ে বাদল কেমন অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে আরাদের দিকে তাকিয়েছিলো। আর একটা কথায় বলেছিলো কেবল,
” সবটাই কি সাজানো নাটক ছিলো? নাকি তারচেয়েও বেশি কিছু ব্রো? নাটকের পেছনে, অন্য কোন নাটক লুকানো নেই তো?”
তবে আরাদ বাদলের কথা হেসে উঁড়িয়ে দিয়েছিলো। সে হাসি দেখে,বাদল আরো কেমন সন্দেহের চোখে তাকিয়ে ছিলো। তবে আরাদ সেসব পাত্তা দিলো না। সে মনে মনে ভাবতে লাগলো, এ পৃথিবীর মানুষগুলো এতো সন্দেহবাজ কেন?
পৃথিবীর কোণায় কেণায় সন্দেহের বসবাস। কেউ বাঁচতে পারেনা, সেই সন্দেহ নামক বিষ থেকে। হ্যা,সন্দেহ বিষই বটে। তীলে তীলে মানুষকে শেষ করে দেয়। শেষ করে দেয় সুন্দর সম্পর্ক, পরিবার সব।
আরাদের দাদীর অনুরোধে ঐদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে আসতে হলো সাচীর। আঞ্জুমান এর সাথে আরো বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো। সাচী উনাকেও বিয়েতে আসার জন্য নিমন্ত্রণ করলো। আঞ্জুমানও সাচীকে আবার বাসায় আসার জন্য বললেন। তিনি বেশ কিছুদিন থাকবেন এখানে।
বাসা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তুহিনের ফোন। আরাদ সাচীর পাশেই ছিলো। স্ক্রিনে তুহিনের নাম্বার দেখে,সে সাচীর থেকে বিদায় নিলো। তুহিন সাচী কোথায় আছে জানতে চাইলো। সাচী ঠিকানাটা বললো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুহিন সেখানে উপস্থিত। গাড়িতে বসতেই তুহিন প্রথম প্রশ্ন করলো,
” এখানে তোমার কোন আত্নীয়ের বাসা?”
তুহিনের প্রশ্নে সাচী সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো, কোন আত্নীয়ের বাসা নয়। এখানে আরাদের বাসা। সাচী সরাসরি এভাবে বলায়,তুহিন আর কোন প্রশ্ন করেনি। যদিও সাচীর এখানে আসাটা ওর ভালো লাগে নি। তবে সেটা প্রকাশ করলোনা। বারবার ঝামেলা ওর নিজেরও ভালো লাগছেনা। তাই আজকে লংড্রাইভে যাবে সাচীকে নিয়ে। একটু মন খুলে কথা বলার দরকার। সে উদ্দেশ্যেই বের হয়েছে। যদিও সাচীকে বলেনি এখনো। বললেই কোন বাহানা বের করবে,না যাওয়ার। কি যে এতো ব্যস্ততা দেখায় কে জানে। সম্পর্কে দুজনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো রাখতে হলে,কথা বলা আবশ্যক। এভাবে থাকলে, আরো দূরত্ব বাড়বে। তুহিন মনে মনে ভাবছে,সাচীর ভাইয়ের বিয়ের পরপরই তুহিনও বিয়ের ডেট ফিক্সড করে ফেলবে। তা না হলে,দিন দিন সম্পর্কের অবনতি ব্যতীত কিছুই হবে না। তাও আবার একবার ব্রেকআপ থেকে, পুনরায় প্যাচআপ হওয়া সম্পর্ক। সেখানে এমনিতেই দূরত্ব থেকে যায়। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে করে ফেলাটই বেটার অপশন। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। মনেও আর কোনরকম খুঁত থাকবেনা। একেবারে নিজের করে পেতে হলে,বিয়ের উত্তম কিছু নেই। তুহিন আর কোন রিস্ক নিতে চায় না। মানুষের মন নাকি,আকাশের রং। বদলাতে সময় লাগে না। আর অবহেলা পেলে,আরো দ্রুত বদলায়।
তুহিনকে চুপ থাকতে দেখে,সাচীও কোন কথা বলছেনা। দুজন মানুষ একসাথে, তবুও যেন এক অদৃশ্য দেয়াল ঘিরে রয়েছে তাদের। সে দেয়াল কবে,কখন,কিভাবে গড়ে উঠেছে, তা এই মানব-মানবীর জানা নেই। তারা জানে, একে অপরকে ভালোবাসে। তবে সে ভালোবাসার মাঝেও যে, সময়ের ব্যবধানে খাঁদ তৈরি হতে পারে,সেটা বোধহয় আমরা ঠাহর করতে পারিনা। কারো ভালোবাসা সে খাঁদে পড়ে অতলে হারিয়ে যায়, কেউবা সেই খাঁদ পুনরায় ভালোবাসায় নিখাঁদ করে তোলে।
#চলবে…