যখন_তুমি_এলে পর্ব : ৩৯

0
557

#যখন_তুমি_এলে
লেখা: জাহান লিমু।
পর্ব : ৩৯

আবার একটা ঝামেলা লেগে গেলো সাচী আর তুহিনের মাঝে। আর সে প্যাঁচ লাগানোর মূল হোঁতা হলেন মিস্টার বাদল। ঐ মালটার বকর বকর শুনে, তুহিন সাচীর সাথে রাগারাগি করে ফোন বন্ধ করে রেখেছে। অথচ তুহিন নিজেও জানে,আরাদের সাথে সাচীর কোন কানেকশান নেই। হ্যাঁ,একটা কানেকশান আছে। সেটা হলো সাচীর শর্টফিল্মে আরাদ কাজ করছে। ব্যাস! এরবেশি কিছু নয়।
সাচী মন খারাপ করে ব্যালকুনিতে বসে ছিলো। যখনি মনে হয় সব ঠিক হয়ে গেছে,তখনি উটকো ঝামেলা এসে উপস্থিত হয়। আর ভালো লাগেনা সাচীর। তুহিনও কেমন জানি বদলে গেছে। আগের মত নেই। অথচ তুহিন বলে,সাচী নাকি বদলে গেছে। কিন্তু সাচীর মনে হচ্ছে,তুহিন নিজে বদলে গেছে! সম্পর্ক হয়তো প্যাঁচআপ হয়েছে,কিন্তু মানুষটা বদলে গেছে। একবছর অনেক সময়। চোখের আড়াল হলেই নাকি,মনের আড়াল হয়। অথচ ঐদিন কত যত্ন করে, ভালোবাসায় তুহিন সাচীর অভিমান ভাঙ্গিয়েছিলো। সেদিন সাচী ভেবেছিলো, তুহিন আগের মতই আছে। একটুও বদলায় নি। কিন্তু আজ যে মন বড্ড অশান্ত। মনে হচ্ছে সব ভাবনারা ভুল,সব ধোঁকা।
নাকি সাচীর ভাবনাটায় ভুল!
সহসা সাচী ওর কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেলো। একপলক সেদিকে তাকিয়ে আবার নিজের মতো ভাবনায় বিভোর হয়ে রইলো। সেটা দেখে বিরুনিকা ভ্রু কুঁচকে সাচীর পাশে বসলো। বেশ কিছুক্ষণ সাচীকে পর্যবেক্ষণ করলো। তখন বিরুনিকা একটা গানের কয়টা লাইন গাইলো,

হাসো না,হাসো না, সে হাসি মধুময়…
তুমি আর, নেই সে তুমি।
তুমি আর…তুমি আর…তুমি আর নেই সে তুমি!

বিরুনিকার গান শুনে সাচী মলিন চোখে তাকালো। সাচীর চাহনি দেখে এবার বিরুনিকা একটু চিন্তায় পড়ে গেলো। শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো,

” তুহিন কি আগের মতোই আছে ননদী?”

বিরুনিকার কথায় সাচীর কোন ভাবান্তর হলো বলে মনে হলো না। সে আগের মতই উদাস চোখে বাইরে তাকিয়ে রইলো। তাই বিরুনিকা বলতে লাগলো,
জানো তো, একতরফা ভালোবাসা সময়ের বিবর্তনে যেমন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে,ঠিক তেমনি দু’তরফা ভালোবাসা সময়ের চক্রে ক্রমশ বিলীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মানে কেউ পায়,কেউ পেয়ে হারায়। দূরত্ব সবসময় ভালোবাসা বাড়ায় না,হ্রাসও করে। তবে হ্যাঁ,সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির মানসিকতার উপর। কিংবা ভালোবাসার গভীরতার উপর। ভালোবাসায় গভীরতা না থাকলে,সে ভালোবাসা ক্রমশ ধূ ধূ মরুচরে পরিণত হয়ে যায়। তখন সেখানে যতই জল দাও,তা শুকিয়েই যাবে। কিন্তু গভীরতা থাকলে,সেখানে পানি দেওয়ার প্রয়োজনই পড়বেনা।
আর একতরফা ভালোবাসাটা এমন যে,একজনের ভালোবাসাটা এতোটা নিখাঁদ থাকে যে,অপরজন সেখানে ডুবে যায় অনায়াসে। যদি অন্য কাউকে ভালো না বেসে থাকে। আরেকটা কথা জানো তো,যাকে আমি ভালোবাসি তাকে পাওয়ার চেয়ে,যে আমাকে ভালোবাসে তাকে পাওয়াটা সৌভাগ্যের। আর দুজন একইসাথে দুজনকে ভালোবাসলে,তাহলে তো কথায় নেই।
বিরুনিকা কি বলতে চাইছে,সাচী তার কিছুই বুঝতে পারছেনা। তবে তুহিনের বিষয়ে কথাগুলো বলেছে,সেটা বুঝতে পারছে। ঠিক এমন সময় সাচীর ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে নাম্বারটা দেখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। একবার বেজে ফোন কেটে গেলো,সাচী ধরলনা। আবার ফোন বাজলে, বিরুনিকা ফোনটা রিসিভ করলো।

” হ্যালো,আসসালামু অলাইকুম ভাইয়া।”

অন্য কারো কন্ঠ শুনতে পেয়ে,তুহিন চমকে কান থেকে ফোন সরিয়ে নাম্বারটা দেখে নিলো। নাহ,ঠিকই আছে। তাহলে কে ফোন রিসিভ করলো?
সাচীর তো কোন বোন নেই। তুহিনকে চুপ থাকতে দেখে,বিরুনিকা গলা খাঁকাড়ি দিলো। সাথে সাথে তুহিনের ধ্যান ভাঙলো। সে সালামের জবাব দিলো। এবং এটাও চিনতে পারলো,মেয়েটা কে। ফোনে কথা হয়নি কখনো, তাই চিনতে পারেনি প্রথমে। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলো। কনগ্র্যাচুলেশনও জানালো। বিরুনিকা ধন্যবাদ জানালো।
একপর্যায়ে তুহিন সরি বললো। বিরুনিকা ফোন লাউড স্পিকার দিলো। তুহিনের মুখে সরি শুনে,সাচীও অবাক হলো। হঠাৎ কি হলো আরজে সাহেবের?
নিজে থেকে সরি বলছেন!
সাচী কোন কথা বললোনা। চুপচাপ শুনতে লাগলো। এবং তুহিনের সরি বলার কারন বুঝতে পারলো, কতক্ষণ পর। তার মানে আরাদ তুহিনের সাথে দেখা করেছিলো এর মধ্যে। ছেলেটা সবকিছু বুঝে যায় কি করে?
অথচ প্রথমে নিজে ইচ্ছাকৃত ব্রেকআপ করালো। আবার নিজেই এসে প্যাঁচআপও করালো। নিজের কথা রাখার জন্য, কিছুক্ষণের জন্য নিজে সাচীর প্রেমিকও সাজলো। যে সে প্রেমিক নয়,ভয়ংকর প্রেমিক। ঐদিনটা সাচী একদম মনে করতে চায় না। কেমন গা শিরশির করে ওঠে। ঐদিন বাসায় এসে রাতে সাচী ঘুমোতে পারিনি। সারাক্ষণ চোখে ভাসছিলো সব। সকালে উঠে দেখে চোখ ফুলে গেছে আর লাল হয়ে ছিলো। শফিকুর ব্রেকফাস্টে মেয়ের চোখ দেখেই বুঝে গেলেন,রাতে ঘুমায়নি। উনি ভেবেছেন হয়তো,বিয়ের কথা বলায় টেনশনে ঘুমায়নি। তাই তিনিও মেয়েকে আর কোন প্রেসার দেননি। পরে তো বাদল নিজেই বিয়ে ক্যান্সেল করে দিলো। তবে আরাদ নিজের কথা রাখার জন্য এমন কিছু করবে,সেটা সাচীর ভাবনারও বাইরে। এমনটাও কি সম্ভব?
খাঁটি প্রেমিকের চেয়েও,নিখাঁদ অভিনয় করেছে সে। সাচী পুরো স্তব্দ হয়ে গিয়েছিলো। হয়তো ঐদিন আরো কয়েকটা থাপ্পড় আরাদের গালে পড়তো। কিন্তু সাচী বুঝতে পেরেছিলো, আরাদ যেটা করেছে,বুঝেই করেছে। ঐ মালটা আসলেই বেজাল পাবলিক ছিলো। তাই সাচীও দাঁত কামড়ে সব সহ্য করেছিলো। ভেবেছিলো অন্তত ঝামেলাটা বিদায় হোক। কিন্তু কি হলো?
ঐ ব্যাটা মাল এখন আরো বড় ঝামেলা নিয়ে হাজির হলো। কোন কুক্ষণে যে এই মালটার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো,কে জানে। একটা মানুষ এতো বিরক্তিকর কি করে হয়!
কথা বলা শুরু করলে,রেলগাড়ির মত চলতেই থাকে। থামার নামগন্ধ নেই। লোকটা নেহাত অনেক সিনিয়র,নয়তো ঐদিন সাচী গালে দুইটা বসিয়ে দিতো। অন্যের বিষয়ে এতো নাক গলানোর জন্য।
তবে তুহিনের কথা শুনে যা বুঝা গেলো,আরাদ তুহিনকে বিষয়টা ক্লিয়ার বলে দিয়েছে। এবং সেটা ঐ মালটাকে সাথে নিয়েই। কিন্তু সাচী এটা বুঝতে পারছেনা,আরাদ বুঝলো কি করে?
জাদু জানে নাকি?
তুহিন কথা শেষ করে বিরুনিকাকে বললো,সাচীর কাছে ফোনটা দেয়ার জন্য। তখন ফোন যে লাউডে ছিলো,বিরুনিকা সেটা বলে দিলো। যদিও সাচী হাতের ইশারায় নিষেধ করছিলো বারবার। কিন্তু বিরুনিকা সেটা বুঝতে পারেনি। বলার পর জিভে কামড় দিয়ে, একহাতে কান ধরে সরি বললো সে। ফোনটা সাচীর সামনে রেখে,সে পালালো। যেতে যেতে বললে,
” আমি ডাইনি ভাবী হবো তোমার বুঝছো। আসার সাথে সাথেই তোমাকে বিদায় করবো,যেন সবার আদর আমি পাই। তাই দ্রুত আই লাভ ইউ,আই মিস ইউ বলে মিলে যাওতো এবার। বিরহ আর ভালো লাগেনা। আমার চেয়ে বেশি সেটা কে বুঝবে। এটা বলেই সে চলে গেলো।”
ফোন তখনো লাউডে দেয়া। তুহিন হ্যালো, হ্যালো করছে একনাগাড়ে। সাচী স্পিকার অফ করে ফোন কানে ধরে বললো,

” এতো কথা বলো কেন? তুমি যে আরজে সেটা কি নতুন করে প্রমাণ করতে হবে নাকি?”

সাচীর এককথায় তুহিন পুরো চুপ হয়ে গেলো। অনেকক্ষণ কোন কথা বললোনা কেউই। একসময় তুহিনই আবার বললো,” সরি!”
সাচী কোন উত্তর দিলো না।
তুহিন একা একাই বকবক করে চলেছে। সে বুঝতে পারেনি,আরাদ কেমন। কিংবা সাচীর সাথে আরাদের কি সম্পর্ক। আর বাদলের বিষয়টাও আরাদই তুহিনকে বললো। মূলত আরাদ একটা ঝামেলা মিটাতে গিয়ে,আরেকটা ঝামেলা এখন তৈরি হয়ে গেছে। তবে এখন তুহিনের কাছে সবটা পরিষ্কার। আর সে কারনেই সাচীকে সরি বলার জন্য, ফোন দিচ্ছে বারবার। সব শুনে সাচী কিছু সময় থম মেরে রইলো। তুহিন আবার হ্যালো, হ্যালো করছে। তখন সহসা সাচী বললো,

” এই একই কথাগুলো আমিও তোমাকে বলেছিলাম তুহিন। তখন কেন বিশ্বাস করোনি?”

সাচীর প্রশ্নে তুহিন ভীষণ বিচলিত বোধ করলো। আসলে তখন হঠাৎ বাদলের উল্টাপাল্টা কথা শুনে,তুহিনের মাথা গরম হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এখন সাচীকে সেটা কি করে বুঝাবে সে? ভীষণ অসহায় বোধ করতে লাগলো সে। মাঝে মাঝে যে ওর কি হয়ে যায়,নিজেও বুঝতে পারেনা। আচমকায় অদ্ভুত রকমের রাগ উঠে যায়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। আর তখনি সে উল্টাপাল্টা করে বসে। আগেও করেছিলো,আবার করলো। এরপর আর এমন করলে,সে হয়তো সাচীকে চিরতরে হারিয়ে বসবে। অলরেডি সাচী কেমন যেন হয়ে গেছে। আগের মত তো নেই-ই। কেমন কঠিন করে করে কথা বলে ইদানিং। হয়তো আরেকটু বড় হয়েছে তাই। কিন্তু এটা যে বড় হওয়ার সাথে সম্পর্কিত না,সেটা তুহিন জানে। এটা আঘাত থেকে সাচী এমন কঠিন হয়ে গেছে। আর তুহিনকেই আবার আগের সাচীকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর তার জন্য সাচীর সাথে বেশি বেশি সময় কাটানো দরকার। কিন্তু সাচী ইদানিং এতো ব্যাস্ততা দেখায়! তুহিনের তখন কেন যেন মনে হয়,সাচী তুহিনকে ইগনোর করছে না তো?
পরক্ষণেই ভাবে, নাহ!
সাচী লাভস হিম। আগেও বাসতো,এখনও বাসে। হয়তো কাজ,আর ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে আসলেই বিজি। নেগেটিভ ভাবলে,আরো নেগেটিভ চিন্তা ঝেঁকে বসে। অলওয়েজ থিংক পজিটিভ।
কোনরকমে সাচীকে বুঝাতে সক্ষম হলো তুহিন। যে হঠাৎ বাদলের কথা শুনে রাগ উঠে গেছিলো। এজন্য সাচীর কথা উপেক্ষা করে চলে গিয়েছিলো। আর দেশে এসেও যেহেতু ওদের দুজনকে একসাথে দেখেছিলো। যদিও সে বিষয়টা আগেই ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছিলো। তবুও একবার মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গেলে,সেখানে যত্ন না করলেও সেই বীজ তরতর করে বেড়ে উঠে। আর মনের যত্নে লালিত ভালোবাসা, পুড়ে ছারখার হয়ে যায় সন্দেহের কারনে। আর তুহিনের সাথে সেটাই ঘটেছে।
অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটির পর,দুজনের মান-অভিমানের পালা চুকলো। ফোন রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে রইলো সাচী। আরাদের যতটা দায় ছিলো সাচীর প্রতি,আরাদ বোধহয় এবার সাচীকেই দায়গ্রস্ত করে ফেলছে।
পৃথিবীতে এমন কিছু অদ্ভুত মানুষ আছে দেখেই বোধহয়,পৃথিবীটা এতো বিচিত্র। সাচীর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসির লহর বয়ে গেলো,ঠিক শরতের শুভ্র মেঘের মতন। যদিও সন্ধ্যার আকাশ তখন ধূসর মেঘে ঢেকে ছিলো।

বিরুনিকা যাওয়ার আগে সায়াহ্নর ঘরে একটা ঢু মেরে গেলো। তবে ভেতরে গেলো না। বলবে যে,বিয়ের আগেই বরের ঘরে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে। সায়াহ্ন তখন রং তুলি হাতে নিয়ে একধ্যানে ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে ছিলো। বিরুনিকার খুব ইচ্ছে করছিলো,পেছন থেকে সায়াহ্নকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারলনা। নিজেই নিজেকে বেহায়া বলে গালি দিলো।
তবে সায়াহ্নকে একপলক দেখার জন্য মন আঁকুপাঁকু করছিলো। সেদিনের পর সায়াহ্নর সাথে আর দেখা হয়নি। যদিও দুজন একি বাসায়। কারন সায়াহ্ন ওর কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত ছিলো এ কয়দিন। ওর লেখা দেশসেরা ডিরেক্টর রাজবীর পছন্দ করেছে। আগামী মাসেই মুভির শ্যুটিং শুরু হবে। সায়াহ্ন ভীষণ এক্সাইটেড। পুনরায় সে স্ক্রিপটা ভালোভাবে পড়ে, সব ঠিকঠাক করে নিচ্ছে। কোন ভুল রাখতে চায় না সে। নিজের সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করছে। দিনরাত খেটে চলেছে। আবার এখন আর্টও করছে। আসলে যে জিনিসটা আমাদের পছন্দের,সেটা করতে আমরা ক্লান্তিবোধ করি না। এটাই হলো প্যাশন,আর প্রফেশনের পার্থক্য। তবে জীবনে সবাই প্যাশনটাকে প্রফেশনে রুপান্তর করতে পারে না। দাঁত কামড়ে পড়ে থাকতে হয় সেজন্য। প্রতিনিয়ত সবার তেতো কথা হজম করতে হয়। যেমনটা সায়াহ্নকেও করতে হয়েছে। কিন্তু সে তার লক্ষ্যে অনড় ছিলো। তাই হয়তো আজ সে তার স্বপ্ন পূরনের সোপানে পা রাখতে চলেছে। বিরুনিকা মনে প্রাণে এ ছেলেটার জন্য দোয়া করে। যেন জীবনে সর্বোচ্চ সফলতা পায়। অনেক বেশি ভালো যে বাসে ওকে,কিন্তু বুঝতে দিতো না কেবল। এখনতো বিরুনিকা জানে সব। তাই এতোদিন যত দুঃখ মনে পুষে রেখেছিলো,সব উঁড়িয়ে দিলো এবার। না হলে যে,ভালোবাসারা অভিমান করবে। বলবে, আমাকে পাওয়ার জন্য দুঃখী ছিলি,এখন পেয়েও কেন দুঃখী?

বিরুনিকা আর দুঃখে ডুবে থাকতে চায় না। সে সায়াহ্নর ভালোবাসায় ডুবে মরতে চায়। যে ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এতোদিন চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে ছিলো। সে ভালোবাসা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ুক বিরু,সায়াহ্নতে।
বিরুনিকার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধির উদয় হলো সহসা। সে সায়াহ্নর দরজায় আস্তে নক করে,সেখান থেকে সরে গেলো। যদিও দরজা খোলাই ছিলো। প্রথমে সায়াহ্ন সেটা টেরই পেলো না। এতো গভীর ভাবনায় ডুবে ছিলো সে। তাই এবার একটু জোরে শব্দ করলো বিরু। সাথে সাথেই সেখান থেকে সরে গেলো। সায়াহ্ন দরজায় উঁকি দিয়ে এদিক-ওদিক দেখলো। কেউ নেই। মনের ভুল ভেবে আবার রুমে ফিরে গেলো। বিরুনিকা এবার ড্রয়িংরুম থেকে পেপার নিয়ে আসলো। সেটা মুড়িয়ে বলের মতো করে নিলো। যেই দরজার কাছে এসে সায়াহ্নর দিকে ছুঁড়তে যাবে,তখনি সায়াহ্ন ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বিরুনিকা সায়াহ্নকে এভাবে সম্মুখে দেখে, ভূত দেখার মত চমকে গেলো। সায়াহ্নকে দেখে বিরুনিকার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। আমতা আমতা করতে লাগলো। আর সায়াহ্ন তখন ঠোঁট কামড়ে হাসছে। সেটা দেখে বিরুনিকার জান যায় যায় অবস্থা। সে এখান থেকে দৌঁড় দিয়ে পালানোর চিন্তা ভাবনা করছে। মনে মনে কাউন্টডাউন করতে লাগলো। তখন সায়াহ্নর কথা শুনে বিরুনিকার শরীর কাঁপতে লাগলো। সায়াহ্ন চোখেমুখে দুষ্টুমির হাসি নিয়ে বললো,

” যেই শুনলে,আমিও ভালোবাসতাম ওমনি আমাকে টিজ করা শুরু করে দিলে? তাও এভাবে ব্যাচেলর ছেলের দরজায় নক করে,পেপার ছুঁড়ে!
তোমাকে তো ভদ্র মেয়েই ভাবতাম আমি। কিন্তু তুমি তো দেখছি বেশ সেয়ানা মেয়ে। বিয়ের আগেই বরের রুমে আসার জন্য টালবাহানা শুরু করে দিলে? লোকে কি বলবে? বর পাগল মেয়ে!

কথাগুলো বলে সায়াহ্নর পেট ফেটে হাসি আসছে। বিরুনিকার মুখটা দেখার মতন হয়েছে। চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ভীষণ অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে সে। যেন বড়সড় কোন অপরাধ করে ফেলেছে।
বিরুনিকা এবার পারে তো কেঁদেই দেয়। চোখ টলমল করছে জলে। সায়াহ্নও সেটা বুঝতে পারলো। বিরুনিকার কাছে যেতে নিবে,তার আগেই বিরুনিকা দৌঁড়ে চলে গেলো। সায়াহ্ন পুরো বোকা বনে গেলো!

কি হলো?

সে তো মজা করছিলো। মেয়েটা কি সিরিয়াসলি নিয়ে নিলো নাকি? এতো মহা মুশকিল দেখছি। মজাও করা যাবেনা। বিরুনিকা, এতো আনকমন নাম না রেখে, সিরিয়াসনিকা রাখার দরকার ছিলো। এতটুকু কথায় কেউ কান্না করে দেয়? বোকা মেয়ে। স্টুপিড,ইডিয়ট কি আর এমনি এমনি বলি।
এখন হয়তো বাংলা সিনেমার নায়িকার মতো বিছানায় শুয়ে গাল ফুলিয়ে কাঁদবে।
এটা বলে সায়াহ্ন নিজেই ভাবলো,যাহ!
আমি নিজেওতো এখন বাংলা সিনেমা লিখছি। এখন আর এসব নিয়ে ট্রল করা যাবে না। তাহলে দু’দিন পর পাবলিক আমাকে নিয়েও ট্রল করবে। অবশ্য আমি ঐ টিপিক্যাল গল্পগুলো লিখতে চাই না। চৌধুরী সাহেব আমরা গরীব হতে পারি, কিন্তু ছোটলোক নয়। এটা ভেবে সায়াহ্ন নিজেই হাসলো।
গল্প, সিনেমা মানেই শুধু নায়ক,নায়িকার কাহিনী তা নয়। এদের কেন্দ্র করে আরো অনেক কাহিনী উঠে আসে। তবেই গল্প,সিনেমাতে পরিপূর্ণতা আসে। আর আমাদের জীবনে যেমন সব হ্যাপী এন্ডিং হয় না,তাই জীবন এতো বিচিত্র। ঠিক তেমনি গল্প,সিনেমাতেও সব হ্যাপী এন্ডিং হয় না। জীবন থেকেই যে গল্পগুলো উঠে আসে। আমাদের আনাচে-কানাচেতে কত শত গল্প লুকিয়ে আছে। শুধু আমাদের খুঁজে নিতে হয়।
কিন্তু বিরুপাখির মান ভাঙাতে হবে যে এবার। পাখি একটু বেশিই অভিমান করে ফেলেছে বোধহয়। পরক্ষণেই ভাবলো, নাহ, থাক। একটু অভিমান করুক। বিয়ের দিন অভিমানী বউ দেখতে পাবো। মেকআপ বউ নয়। যদিও তখন অভিমান ভাঙাতে ডাবল কষ্ট হবে। তবে আর কয়টা দিনই তো। সব অপেক্ষা, সব অভিমান পুষিয়ে দিবো। ভালোবাসি যে।

.

আজ প্রথমবার রোহানী ব্যতীত অন্য কেউ আরাদের বাসায় আসলো। বাসাটা একতলা। মোটামুটি বড়। বাসার গেইটে কুঞ্জলতার সমাহার। চিকন সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে গাঢ় মেঝেন্টা ফুল ফুটে রয়েছে। হয়তো বাড়ির কারো ফুলটা পছন্দ ছিলো। আগত ব্যক্তি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো পুরো বাসাটা। মোটামুটি গোছালো। তবে কোথাও যেন কিসের একটা অপূর্ণতা। মনে হয় অভিমান জমে আছে বাড়িটার পরতে পরতে। কোন যত্নের ছাপ নেই। আরাদ এই বাড়িটাতে একা থাকে। একজন লোক আছে সেই আরাদের টেক কেয়ার করে। যদিও আরাদ বেশিরভাগ বাইরেই খাওয়া-দাওয়া করে। কেমন ছন্নছাড়া জীবন বাবা,মা দুজনই জীবিত থাকা স্বত্বেও। কি এমন হয়েছিলো উনাদের,যে এতো অভিমান? দুজনের একজনও কি ছাড় দিতে পারতেন না? সম্পর্কে একজনকে যে ঝুঁকতেই হয়। না হলে সম্পর্কই ঝুঁকিতে পড়ে যায়।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here