Saturday, March 21, 2026
Home "যখন_তুমি_এলে যখন তুমি এলে পর্ব – ২৯।

যখন তুমি এলে পর্ব – ২৯।

0
749

যখন তুমি এলে।
লেখা- জাহান লিমু।
পর্ব – ২৯।

শেষ মুহুর্তে এসে এমন একটা সমস্যায় পড়ে যাবে,সেটা সাচী কল্পনাও করতে পারেনি। অবশ্য না করারই কথা। কারন দুর্ঘটনা তো আর বলে কয়ে আসে না।
সাচীর সেই কাজিন সোহান, আচমকা এক্সিডেন্ট করে বসেছে। পায়ের আঘাত গুরুতর। আগামী কয়েকমাস,সম্পূর্ণ বেডরেস্টে থাকতে হবে। তাই তার আশা করা, সম্পুর্ণ গুঁড়ে বালি। সোহানও অবশ্য অনেক আফসোস করছিলো। সাচীই ওকে উল্টো বুঝালো যে,সে একটা না একটা ব্যবস্থা করে ফেলবে। যদিও ভেতরে ভেতরে সে নিজেই বেশ চিন্তিত। কারন হুঁট করে কাউকে খুঁজে পাওয়া বড্ড মুশকিল। আর পেলেও, সে ঠিকঠাক কাজ করতে পারবে কিনা, তা নিয়েও চিন্তা। এদিকে স্মরনিকাও ভীষণ নার্ভাস।
সবমিলিয়ে এখন শেষ মুহূর্তে এসে সাচীর মাথা কাজ করছেনা। আরো আগে হলে,অন্তত সে কিছু ভেবে রাখতো। কিন্তু এখন হুঁট করে কার কাছে যাবে?
শর্টফিল্মটা নিয়ে সাচী অনেক এক্সাইটেড ছিলো। থিমটা সাধারণই,তবে বর্তমান সময়োপযোগী। আর সেখানে সাচী সূক্ষ্ম একটা মেসেজ দিতে চাইছে। বিশেষত টিনেজারদের।
একসময় মনমরা হয়ে ভার্সিটিতে চলে গেলো সে। ইদানীং পড়াশোনার সাথে ব্রেকআপের মত অবস্থা হয়ে গেছে সাচীর। যতই বইয়ের কাছে যেতে চায়,ততই দূরে সরে আসে। এভাবে তো চলতে পারেনা। যত কঠিন অবস্থায় আসুক না কেন জীবনে,সবকিছু মেইনটেইন করার মত মানসিক অবস্থা থাকা উচিত সবার। সেটা কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো কঠিন, তবে অসম্ভব না। সাচীর সেটা আছে মোটামুটি।

ক্লাসেও ঠিকঠাক মনোযোগ দিতে পারছিলোনা সাচী। তাই ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলো। একটা উপায় তো খুঁজে বের করতে হবেই। না হলে,কোন কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছেনা সে। ছোট বাচ্চার মত হেলেদুলে হাঁটছিলো সাচী।
একটু সামনে গিয়েই, একজন দোকানির সাথে আলাপ জুরে দিলো সে। অবশ্য দোকানি সাচীর বেশ পরিচিত। বলা যায় সাচী এক প্রকার রেগুলার কাস্টমার উনার। সবসময় উনার দোকান থেকেই যা খেতে ইচ্ছে করে,তা কিনবে। সাচী কয়েকদিন ভার্সিটি আসেনি। তাই দোকানিও সাচীর খোঁজ খবর নিচ্ছিলো।
এর মাঝে দোকানি সাচী কি খাবে, সেটা জানতে চাইলে,পেছন থেকে একটা অদ্ভুত পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসে। দোকানি আর সাচী একইসাথে চকিত দৃষ্টিতে পেছনে ঘুরে তাকায়। দোকানির কাছে ছেলেটাকে হালকা-পাতলা পরিচিত মনে হলেও,ঠিক চিনতে পারলনা। ভার্সিটিতে কতশত ছেলেমেয়ে, সবাইকে কি আর মনে থাকে। তবে সাচীর বিষয়টা আলাদা। প্রথম যেদিন সাচীর সাথে দেখা হয়,সেদিনই সাচী উনার ছবি তুলেছিলো। তারপর ফেসবুক না কি জানি,সেখানে উনার ছবি দিবে বলেছিলো। এরপর উনার বিক্রি বেড়ে যায়, অন্যদের তুলনায়। কারন ক্যাম্পাসে পরিচিতি তৈরি হয়েছিলো আলাদা। বিশেষত মেয়েরা উনার জলপাই,বরই,তেতুলের আঁচারের জন্য পাগল। এই আচার উনার স্ত্রী ঘরেই বানায়।
এছাড়া ঝালমুড়ি, আচার, বাদাম,বিভিন্ন সিজনাল ফল বরই,আমড়া ইত্যাদি নিয়ে ভার্সিটি চক্কর দেন তিনি। অবশ্য একটা নির্দিষ্ট জায়গাতে বসেনও। আর সেটা সাচীর ডিপার্টমেন্ট এর সামনেই। আগে অন্য জায়গায় বসতো অবশ্য।
সাচী কোনকিছু বলার আগেই,দোকানি প্রশ্ন করে বসলো,
” আফনে কি কইরা জানেন,আফামণি আমলকী নিবো?”
সাচীকে পাশ কাঁটিয়ে, আরাদ দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সাচী চোখ উল্টিয়ে আরাদকে দেখতে লাগলো।
দোকানির থেকে একটা শুকনো বরই নিয়ে,খেতে খেতে বললো,
” আপনার আফামণি মিষ্টি মানুষ তো,তাই তেতো খেতে পছন্দ করে। কথাটা বলে সাচীর দিকে না তাকিয়ে, বরই খাওয়াতে মনোযোগ দিলো সে। ”
দোকানি আরাদের সাথে সুর মিলালো। তা অবশ্য কথাখান মিছা কন নাই। আফার আচার-ব্যবহার, আর আফা দেখতে বড়ই মিষ্টি। কোন অহংকার নাই। এক্কেবারে সরল মনের মানুষ, দিলখোলা। আজকালকার অন্য পোলাপানের মত অভদ্র না। আদব-লেহাজ ভালা জানে। মাইনসের মধ্যে, ভেদাভেদ করে না আফা। মোরে লগে নিয়াই, আফা দিব্যি বড় হোটেল গুলায় খাইতে চইল্যা যায়। মোর পোশাক দেইখ্যা মাইনসে কি কইবো,হেইডার তোয়াক্কা করেন না উনি।”
মধ্যবয়স্ক লোকটার কথা শুনে, আরাদ কেমন অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে সাচীর দিকে তাকিয়ে রইলো। সাচী আঁড়চোখে আরাদকে দেখছিলো। তাই আরাদ ওর দিকে তাকাতেই,মুহুর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। আরাদ সেটা দেখে কেবল চুপিসারে হাসলো। মানুষ সামনা-সামনি প্রশংসা শুনলে, লজ্জায় পড়ে যায়। সাচীও বোধহয় অসস্থি বোধ করছে। সেটা কাঁটাতেই আরাদ দোকানিকে বললো,ওকেও আমলকী দেয়ার জন্য। সাচী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তবে কিছু বললোনা। আমলকী কিনে সাচী টাকা দিতে গেলে,তার আগেই আরাদ দিয়ে দেয়। সাচী সরাসরি বলে বসে,এসব আমার অভ্যাসে নেই। আমি আমার বন্ধুদেরও, আমার কোন টাকা পরিশোধ করতে দেয় না। হ্যাঁ,ট্রিট দিতে চাইলে, সেটা ভিন্ন কথা। তবে অন্য ক্ষেত্রে আমি আমার গাড়ি ভাড়াও অন্য কাউকে দিতে দেয় না। এটাই আমার স্বভাব। সাচী একদমে কথাগুলো বললো। কথা বলা শেষ হলে,আরাদ পানির বোতল এনে ধরলো সাচীর সামনে। প্রথমে সাচী কিছু না বলেই, একঢোক পানি পান করলো। পরক্ষণেই কপাল কুঁচকে আরাদের দিকে তাকালো। আরাদ সেটা বুঝতে পেরে বললো,
” আরে কত টাকা আর দিয়েছি?
ত্রিশ টাকা?
ত্রিশ টাকার জন্য, এতোগুলো কথা বলতে হলো? সেটা না হয় আপনি শোধ করেই দিতেন। বাব্বাহ,একেবারে গলা শুকিয়ে ফেলেছেন। নিন, নিন পানি খেয়ে গলা ভেজান। তারপর আমার টাকা ফেরত দিন। বলা তো যায় না,কাল আপনি মরে গেলে আমি হয়তো ত্রিশ টাকার দাবী রেখে বসবো। আরাদ মজা করলো,নাকি সত্যি বললো সেটা সাচী ঠিক ঠাহর করতে পারলনা। তবুও সে আরাদকে বললো,
” হ্যাঁ,মানুষ আজ আছে,কাল নেই। তাই কোন ধার-দেনা রাখতে নেই। যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করে দেয়াই ভালো।” সাচীর সিরিয়াসনেস দেখে আরাদের ভালো লাগলেও,আবার হাসিও পাচ্ছে। ত্রিশ টাকার জন্য, কেউ এমন হাইপার হয়?
হাসিটা অনেক কষ্টে চেপে রাখলো সে। কারন যখন কেউ কোন বিষয়ে সিরিয়াস হয়ে কথা বলে,তখন সেখানে হাসতে নেই। এটা অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আরো বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললো ওরা।
তবে একপর্যায়ে তুহিনের প্রসঙ্গ আসতেই,সাচী চুপ হয়ে যায়। তুহিনের নাম্বারটা এখনো প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে,একবার ডায়াল করে ঘুমায় সে। সবার কাছে দেখায় সাচী স্বাভাবিক, স্ট্রং। কিন্তু ভেতরটা যে কেউ দেখেনা। তাইতো সেই ভেতরটাতে দুঃখগুলো আমরা বাক্সবন্দি করে রাখি। শক্ত তালা আঁটকে দেয়, সেই বাক্সে। যেন দুঃখগুলো কেউ ছুঁতে না পারে। এ জগতে সুখগুলো সবার হলেও,দুঃখগুলো নিজের। একান্তই নিজের। সেখানে কারো প্রবেশাধিকারের অনুমতি নেই।
সেই দুঃখ ছুঁতে হলে,আগে সেই মানুষটার অন্তরটা ছুঁয়ে দেখতে হবে তবে। আজকাল আমাদের অন্তর ছোঁয়ার সময় কোথায়? আমরা তো মুখের ভালোবাসায় বিশ্বাসী। হৃদয় দিয়ে, হৃদয় ছোঁয়াতে বিশ্বাসী নয়। অথচ জগতের শুদ্ধতম অনুভূতি হলো,ভালোবেসে কারো হৃদয় স্পর্শ করা। কারো প্রেমে পড়া যদি হয়, মিষ্টি অনুভূতি। তবে সেই প্রেম দিয়ে, অন্য কারো হৃদয়ে আবেশ জাগানো হলো শুদ্ধতম অনুভূতি।
তবে কি সাচী,তুহিনের ভালোবাসা হৃদস্পর্শী ছিলো না!

.

রোহানীর সাথে সাচীর বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে এ কয়েকদিনে। প্রায় প্রতিদিন কথা হয় টুকটাক। ঐদিন রোহানী সাচীর কাছে মাফ চাইলো। রোহানী আরাদকে না উস্কে দিলো,বিষয়টা নিয়ে আরাদ এতো দূর আগাতো না। রোহানী বারবার নিজেকে দায়ী করছিলো। একপর্যায়ে সাচী বললো,
” দেখো আপু, কিছু কিছু বিষয় এমন হয়,যেখানে আমাদের সরাসরি কোন দোষ থাকেনা। আমি সম্পূর্ণভাবে তোমাদের দুজনকে দায়ী করতে পারিনা। ব্রেকআপের জন্য তোমরা দুজন যতটা দায়ী,তুহিন আর আমিও তার চেয়ে কোন অংশে কম দায়ী নয়। আমার আরো পর্যবেক্ষণ করে,তারপর তুহিনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত ছিলো। আর তুহিনেরও হুঁট করে রাগ না দেখিয়ে,ঠান্ডা মাথায় আমাকে বুঝাতে পারতো। সম্পর্কে এরকম টুকিটাকি ঝামেলা তৈরি হয়ই। তার জন্য নিজেদের সম্পর্কের বাঁধনটা শক্ত থাকতে হয়। যেন সহজে সে বাঁধন না ছিঁড়ে যায়। আমাদের মধ্যে বোধহয় সে রকম শক্ত বাঁধন গড়ে উঠেনি। তাই সামান্য আঘাতেই বালুর ঘরের ন্যায় ভেঙে গেলো। আর সে, না তো নিজে কোন ব্যাখ্যা দিলো,না আমাকে আর কিছু ভাবার সুযোগ দিলো। কেমন অদ্ভুত একটা মানুষের জন্য হুঁট করে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। দূর থেকে যেটা দেখে আমরা পাগল হয়ে যায়, কাছে গেলে সেটা নাও থাকতে পারে। আকাশের সাদা মেঘ,জমিন থেকে দেখতেই সুন্দর লাগে। কাছে গেলে, সেটা কেবল ধোঁয়াশা।
রোহানী সাচীর কথার মানে পুরোপুরি না বুঝতে পারলেও,এতটুকু বুঝলো সাচী মেয়েটা অনেক নরম মনের।
তাই নিজেদের কাজের জন্য ভীষণ লজ্জিত বোধ করছে।
এতোবড় ঘটনার পরেও,মেয়েটা কেমন ওদেরকে সম্পূর্ণ দোষ দিলো না। বয়স রোহানীর চেয়ে কম হলেও,ম্যাচিউরিটি অনেক বেশি।
কথার এক পর্যায়ে সাচী জানতে পারলো,আরাদ স্কুলে মঞ্চ নাটকে কাজ করতো। তবে এরপর আর কখনো অভিনয় করেনি। তবে বেশ ভালো অভিনয় নাকি করতো। মুহুর্তেই সাচীর মাথায় একটা আইডিয়া আসলো। তাই সাথে সাথে রোহানীকে আবার ফোন দিলো। কিন্তু রোহানী যা বললো,তাতে সাচী হতাশই হলো। কারন আরাদ নাকি কখনোই রাজি হবে না। সাচী চূড়ান্ত হতাশ হলো এবার।
এখন সে কি করবে?
নাহ,সে নিজেই আরাদের সাথে সরাসরি কথা বলবে। নিজের কাজ,নিজেরই করতে হয়। দরকার হলে , সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে,আঙুল বাঁকা করে তুলবে।
দুষ্টুমি বুদ্ধিতে সাচীর মাথা গিজগিজ করছে,এই মুহুর্তে।
যদিও একপ্রকার নিরুপায় হয়েই, সাচী কাজটা করতে চলেছে। সে জানে,এভাবে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা ঠিক না। কিন্তু কখনো কখনো প্রয়োজনে করাই যায়। সাচী নিজেই, নিজেকে বুঝাতে লাগলো।

আরাদের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যেই ,বাসা থেকে বের হচ্ছিলো সাচী। কিন্তু পথিমধ্যে এক ভদ্রলোককে দেখে,সে থমকে দাঁড়ালো। এই লোক, এখানে কি করছে?
আগে তো কোনদিন,এদিকে দেখেছি বলে মনে হয়নি।
বিষয়টা কেমন যেন, সুবিধার ঠেকলো না সাচীর। লোকটার মতিগতি, ঠিকঠাক লাগছে না। কোন কু-মতলবে তো এখানে আসেনি?

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here