যখন তুমি এলে পর্ব – ২৫।

0
649

যখন তুমি এলে
লেখা- জাহান লিমু।
পর্ব – ২৫।

মেয়ের গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় বসালেন, রিতি চৌধুরী।
রুমে উপস্থিত সকলেই স্তব্দ হয়ে গেলো।
কেউ কোন কথা বলছেনা।
আরাদ নিজেও নিশ্চুপ। সেও ভাবতে পারেনি,রোহানী এমন কিছু করতে যাবে। এতোটা আবেগ দেখানোর মত বয়স তো রোহানীর নয় অন্তত। আরাদ তো আগেই সতর্ক করেছিলো। কিন্তু তখন রোহানী পাত্তা দেয় নি। আরাদ জানতো,রোহানীর মা কখনোই এ সম্পর্ক মানবেনা। কিন্তু রোহানী এতো বড় একটা স্টেপ নিবে,সেটাও ভাবতে পারেনি।
আরাদ ভেবেছিলো হয়তো,রোহানী শেষ পর্যন্ত মায়ের কথায় রাজি হয়ে যাবে। প্রেম তো সবাই করে। বিয়ে কজন করতে পারে?
রোহানী ফ্লোরে বসে কাঁদছে। রিতি চৌধুরী কাউকে মেয়ের কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না। তিনি মেয়ের মুখোমুখি বসে আছেন। দূরে আরাদ,সোহানী আর রায়হান সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু কারো কিছু বলার সাহস নেই এখানে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে মা মেয়ের কথোপকথন শোনা ছাড়া।
রিতি চৌধুরী এবার শান্ত গলায় কথা বলছেন। এর মানে হলো উনি ক্ষোভটা ভেতরে রেখে,সবার সামনে ভদ্রতা বজায় রাখছেন। একদম ঠান্ডা স্বরেই বললেন,
” বিয়ে তো তোমাকে আমার পছন্দ করা ছেলেকেই করতে হবে। এখানে দ্বিতীয় কোন অপশন নেই। এমনকি তোমার সুইসাইড করার অপশনও নেই। তাই এসব উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথা থেকে ঝেঁড়ে ফেলো। থার্ডক্লাস ছেলের সাথে রিলেশান করে,চিন্তাভাবনাও থার্ডক্লাস হয়ে গেছে তোমার। এরকম একটা ফ্যামিলির ছেলের সাথে রিলেশানে যাওয়ার আগে,একবার আমার স্ট্যাটাসটা তোমার মনে আসলো না? নাকি আজকাল খুব বেশিই স্বাধীনতা দিয়ে ফেলেছিলাম,যে কারনে লাগামছাড়া ঘুড়ির মতন উড়তে শুরু করছিলে। যতই উড়াউড়ি করো তোমরা,সুতোর নাটাই তো আমার হাতে। সেটা কেন ভুলে যাও?
আশা করি এরপর একই ভুল আর দ্বিতীয় কেউ করবেনা। এটা বলে রিতি চৌধুরী সোহানীর দিকে আঁড়চোখে তাকালেন। সোহানী ওর বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিল। ভয়ে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলো। ওর শরীর কাঁপছিলো, বোনের অবস্থা দেখে। সেই মুহুর্তে সোহানী ভেবে নিলো,সে বিয়েই করবেনা। যদি করতেই হয়,এরেঞ্জ মেরিজই করবে।
লাভ শব্দটা জীবনের ডায়েরি থেকে মুছে দিলো আজকের পর থেকে। একবার কেবল আঁড়চোখে আরাদের দিকে তাকালো। ওরা দু’বোন আরাদের উপর ভরসা করে ছিলো। কিন্তু এখন আর কোন ভরসা নেই। সোহানী নিজের চোখ মুঁছে নিলো। যখন কান্না করা কোনকিছুর সমাধান নয়,তখন অযথা চোখের জল ব্যয় করার কোন মানেই হয় না।
রিতি চৌধুরী সবাইকে তৈরি হয়ে সেন্টারে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিলেন। আর সোহানীকে বললেন,বোনকে নিয়ে উনার পরিচিত পার্লারে যাওয়ার জন্য। ড্রাইভার দিয়ে আসবে। মেকআপ শেষ হলে,আবার গিয়ে নিয়ে আসবে। এর আগে পার্লার থেকে বের হতে পারবেন না।
আরাদ বুঝতে পারলো,রিতি চৌধুরীর এমন করার কারন। যেন গাড়ি নিয়ে পালানোর কোনরকম চেষ্টা না করে।
সেটা দেখে আরাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।
সিনেমার ভিলেনকেও হার মানাচ্ছেন উনি।
.

স্যার,” আপনার কি শরীর খারাপ?”
” না,কে বলছেন?”
” আমাকে চিনেন নাই,স্যার?”
” তানিম ভাবলেষহীনভাবে উত্তর দিলো,আপনি কি বিল গেটসের মেয়ের জামাই,যে আপনাকে সবাই চিনবে?”
” চেষ্টা করলে হতেও পারি। জানেন তো মনীষীরা বলে গেছেন,চেষ্টার অসাধ্য কোন কাজ নেই। আপনি একটা বেশ ভালো আইডিয়া দিলেন তো স্যার। এবার কি তবে আমার বিশ্বব্যাংকে জব পাওয়ার জন্য স্টাডি করা উচিত? এই ব্যাংকে থাকলে তো,বিল গেটসের মেয়ে কোনদিন আমার নামও শুনবেনা।
তানিমের এবার আর বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না,এই টকিং মেশিনটা কে। কিন্তু এই ছেলে ওর নাম্বার কোথায় পেলো?
পরক্ষণেই তানিম ভাবলো,দূর!
নাম্বার তো অফিস থেকেই নিতে পারে। কিন্তু এই ছেলে তানিমের পিছে পড়লো কেন হঠাৎ?
এমনিতেই জীবনে প্যারার তো অভাব নেই।
তানিম নিজেকে সংযত রেখে বললো,
” ফোন দিয়েছেন কেন জানতে পারি?”
“সত্যি বলবো?”
“না,মিথ্যা বলুন।”
মাঝে মাঝে আপনিও বেশ ভালোই মজা করেন তো, স্যার। অবশ্য এটা ভালো। এতে মন ফ্রেশ থাকে। সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকলে,এতে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। ধরাবাঁধা নিয়মে থাকতে থাকতে,আমরা সব মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। মানসিক অবসাদ দিন দিন আমাদের ঝেঁকে ধরছে।
তানিম বোধহয় এবার নিজের মেজাজ ধরে রাখতে পারছেনা। তবুও সে বললো,
” বাদল সাহেব,আপনি কি এসব বলার জন্য আমাকে ফোন দিয়েছেন? তাহলে রাখছি।”
আরে না না,স্যার। বলছি বলছি,রাখবেন না। তানিম কলটা কাঁটতে গিয়েও,ভদ্রতা রক্ষার্থে মুখের উপর কাঁটলোনা।
তখন হঠাৎ বাদলের কথা শুনে,তানিম থমকে গেল!
বাদল বললো,” স্যার,আজকে নাকি আপনার গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে?”
তানিম কোন কথা বললোনা। কিন্তু বাদল এসব জানলো কি করে? ছেলেটা এভাবে তানিমের পিছে পড়েছে কেন?
তানিমকে চুপ থাকতে দেখে,বাদলও চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,” একটা কাজ করুন স্যার। গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ভেগে যান। তারপর একেবারে জুনিয়র সহ ফেরত আসবেন। এবার আর তানিম নিজেকে স্থির রাখতে পারলোনা। ঠাস করে ফোনটা কেটে দিলো। যথেষ্ট ভদ্রতা দেখিয়েছে। এ ছেলে ভদ্র ব্যবহারের যোগ্য না। একেবারেই না।
ফোনটা একটু সময়ের জন্য বন্ধ করে দিলো,যেন এখন আর ফোন না দেয়।

.

পার্লারে যাওয়ার আগে,রোহানী আরাদের সাথে সাচীকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকালো। এ দুজন একসাথে কি করে?
রোহানীর এখন আর মাথা কাজ করছেনা। চোখে মনে হয় ভুলভাল দেখছে সে।
নিজের নিয়তিকে সে মেনে নিয়েছে।
রোহানী একটা বিষয় অদ্ভুত ভাবে খেয়াল করলো। আরাদ রোহানীর কাছে আসারও কোন চেষ্টা করছেনা। সারাক্ষণ ওর মায়ের সাথে থাকছে। বিয়ের কেনাকাটা পর্যন্ত ও মায়ের সাথে গিয়ে করেছে। সবাই কেমন বদলে যায়,বিপদের সময়। বন্ধুও আজ,শত্রুর মত আচরণ করছে। রোহানী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, আরাদের সাথে সম্পর্ক এখানেই শেষ। এমন বন্ধুর কোন প্রয়োজন নেই।
আবার রোহানী এটাও ভাবলো,আচ্ছা আরাদের কি এখানে করার মত কিছু আছে? ওর মা কি কোন সুযোগ রাখছে?
তাহলে আরাদের উপর রাগ দেখিয়ে কি লাভ?
কিন্তু তবুও কেন জানি,এইমুহুর্তে আরাদকে অসহ্য লাগছে। কেমন সারাক্ষণ মায়ের সাথে লেগে থাকছে।
কয়েক মুহুর্তের ব্যবধানেই,মানুষের জীবন কেমন করে পাল্টে যায়!
অথচ আমরা কত কত স্বপ্ন সাজায় জীবন নিয়ে। সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে যায়। জীবনের পথে পথে চলতে চলতে, একদিন সেই পুরোনো স্বপ্ন ভুলে গিয়ে আবার নতুন স্বপ্ন বুনি। নতুন স্বপ্ন বুনতে হয়। সেটা বাঁচার তাগিদেই। মানুষ স্বপ্ন দেখা ছাড়া বেঁচে থাকতে পারেনা। একটা না একটা স্বপ্ন,আশা বুকে নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে।
তবে রোহানী এ মুহুর্তে জানেনা, সে কি স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকবে। সে এটাও জানেনা, তার এভাবে বেঁচে থাকার আদৌ কোন মানে আছে কিনা। বেশ হতো,যদি ঐ সময় ফ্যানের সাথে ঝুঁলে থাকতো। কিভাবে যে দরজা লাগাতে ভুলে গেলো সে,নিজের প্রতিই রাগ হচ্ছে। কোনকাজই সে ঠিকঠাক করতে পারেনা। মরতে গিয়েও, গলদ করে ফেললো। আর প্রেমটা তো ছিলো, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
নিজের অবস্থা দেখে,নিজেরই হাসি পাচ্ছে রোহানীর। পার্লারে যাওয়ার পুরোটা রাস্তা জুরে এসব ভেবে ভেবে বিদ্রুপের হাসি হাসলো সে। নিজের প্রতি, নিজের করুণা হচ্ছে।
মা,বাবার ভালোবাসা ঠিকমত না পাওয়া স্বত্বেও, জীবনতো বেশ ভালোই চলছিলো। নিজের মত একা একা বেশ কেটে যেতো। আর এক আরাদ ছিলো, ওর সবকিছুর সঙ্গী। আরাদের সাথে পরিচয়টাও হয়েছিলো অদ্ভুত ভাবে।
তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে কেবল।
একদিন টিফিনে আরাদ ফ্রাইড রাইস,আর ফ্রাইড চিকেন এনেছিলো। আরাদ হাত ধোঁয়ার জন্য বাইরে গেলে,রোহানী চিকেনের টুকরো সরিয়ে নেয়। ঐদিন রোহানী ভেজিটেবল স্যান্ডউইচ টিফিন নিয়েছিলো। যেটা ওর পছন্দ নয়। কিন্তু ওর খাওয়া দাওয়ার একটা রুটিন করা ছিলো। তাই যেদিন যেটা দিতো,সেটাই খেতে হতো। তখন সে এতো মোটা ছিলো না। মোটা হওয়া শুরু করে কলেজে উঠার পর থেকে। যখন বাইরে একা একা খাওয়া-দাওয়া শুরু করে।
অবশ্য আরাদ থাকতো সাথে। তবে সে এতোটা ফুডি না।
রোহানী এরপর প্রায় প্রতিদিনই আরাদের বক্স থেকে এটা ওটা সরিয়ে নিতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো,আরাদ এরপর থেকে সবকিছু একটু বেশি বেশি করে আনতো।
রোহানীর তাতে অবশ্য ভালোই।
এভাবে অনেকদিন কেটে গেলো। আচমকা একদিন আরাদ ওর টিফিন বক্স নিয়ে রোহানীর পাশে এসে বসলো। রোহানী ভয়ে তোতলাচ্ছিলো। আরাদ রোহানীকে অবাক করে দিয়ে,একসাথে শেয়ার করে খাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলো। রোহানী সেই মুহুর্তটা এখনো ভুলেনি। আরাদ কোনদিনও রোহানীকে এটা জানতেই দেয়নি যে,সে প্রথমদিনই রোহানীকে চিকেন চুরি করতে দেখেছিলো।
যখন নবম শ্রেণীতে,তখন রোহানী নিজেই বলে দিলো। বিনিময়ে আরাদ হেসে বলেছিলো,আমি আগেই জানতাম রে মুটকি। রোহানী তখন ছিঁচকে চোরের মত চুপসে গিয়েছিলো। আর আরাদ অট্রহাসিতে ফেটে পড়েছিলো।
দিনগুলো আজ ভীষণ মনে পড়ছে। আজকের পর আরাদের সাথে আর দেখা হবে কিনা,সেটা জানেনা সে। কারন ওর হবু বর ওকে নিয়ে কানাডা চলে যাবে,বিয়ের একসপ্তাহ পরেই।
আরাদের সাথে কথা বলতে ভীষণ মন চাইছে।
মা সোহানীর ফোনটা দিয়েছে,আমারটা দেয়নি। আর সোহানীর ফোনেও নতুন সিম ঢুকিয়ে দিয়েছে,যেন অন্য কেউ ফোন না দিতে পারে। অথচ মা এটা বুঝলোনা,রোহানী চাইলেই ফোন দিতে পারে। নাম্বার মুখস্তই আছে। কিন্তু সেটা সে আর করবেনা। তার মা যেটা চাইছে,সেটাই হবে।
এতো চেষ্টা করছে তার মা,যেন দেশের টপ বিজনেস ম্যানদের একজনের সাথে তার বিয়ে হয়। মা মেয়ের ভালোবাসার গুরুত্ব না দিলেও,মেয়ে ঠিকই দিবে। আর সেটা খুব ভালোভাবেই।
সেন্টারের দিকে ছুটে চলেছে আরাদ। সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। আরাদ হাঁফাতে হাঁফাতে রিতি চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রিতি চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে তাকালেন আরাদের দিকে। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে বললেন,
” ইজ এভরিথিং ওকে রাদ?”
” নাথিং ওকে। নাথিং এট অল!”
রিতি চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। আরাদকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন,রোহানী আবার কিছু করেছে? আজকে তো ওকে শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো। এতোদিনেও যে শিক্ষা দিতে পারিনি,আজকে সেটা পুরোটা একেবারে দিবো।
রিতি চৌধুরী সামনে আগাতে নিলেই,আরাদ কান্নামিশ্রিত কন্ঠে পেছন থেকে জোরে বলে উঠলো,
” সে বেঁচে থাকলে তো, তাকে উচিত শিক্ষা দিবেন আপনি!”

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here