প্রিয় তুই পর্ব ২৭

0
1216

#প্রিয়_তুই
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্ব_২৭

-”আমার চাচী শাহিনা সুলতানা।”

-”মানে? উনি নিশান স্যারের প্রাক্তন? এটা কীভাবে সম্ভব?”

-”অসম্ভবের কী হলো?”

-”আমার হিসাব মিলছে না স্যার।”

-”মিলানোর চেষ্টা করো মিলে যাবে। ”

-”নিশান স্যার দেশে কবে ফিরলেন? ভোর ম্যাম জানেন?”

-”ফিরেছে মাস দেড়েক হবে। না ভোর এখনো কিছু জানে না। কারণ নিশান এসে গা ঢাকা দিয়ে আছে।”

একথা শুনে রবিন হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপাতে লাগল। সে এটাও ভাবছে, তিতাস তার সঙ্গে মজা করছে কী না। কিন্তু ওর মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না সে মজা করছে। বরং চাপা ক্ষোপে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে নিশানের দিকে। এই দৃষ্টি মোটেও মঙ্গলজনক নয়। বরং এটা ধ্বংসের দ্বার-প্রান্তরে পোঁছানোর নীরব হুমকি। রবিন তিতাসের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো ড্রয়িংরুমের দিকে। সেদিকে তাকিয়েই সে
ভাবগ্রাহী, সে ভোরের সহকারী হয়ে আছে বছর দুয়েক হতে যাচ্ছে। ভোরের বাসায় প্রত্যেকটা সদস্যকে সে চিনে, জানে। কার ব্যবহার কেমন সুক্ষভাবে স্মরণেও রেখেছে। নিশানকে তার কখনোই খারাপ মনে হয় নি। বরং মিশান (ভোরের বড় ভাই) এর চেয়ে নিশানকে অনেক নম্রভদ্র বলে জানে। কারণ এই নম্রতা ওর চলনবলনে সুস্পষ্ট।নিরহংকারী নিশান বাসার সকলের স্নেহের পাত্রও বটে।মিশান ও নিশান দুই ভাই হলেও তাদের বনিবনা খুব একটা সুবিধার নয়। কেমন যেন লাগাম ছাড়া মনে হলেও বাকিদের সাথে ঠিকঠাক। এতদিনের এত পরিচিত কারো এমন রুপ দেখে রবিন হতবাক। তাই সে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

-”স্যার বোধহয় আমাদের কোথাও বুঝতে ভুল হচ্ছে। আমার জানামতে, নিশান স্যার এমন ধরনের ছেলে নয়।”

-”আমি কি বলেছি নিশান খারাপ? ”

-”না।”

-”তবে?”

রবিনের এবার নিজেকেই পাগল পাগল লাগছে। তিতাসের কথার মর্ম বুঝতে সে অক্ষম। প্রাক্তন হলেই খারাপ হবে এর কোনো মানে নেই। বরং এটা অযৌক্তিক অবান্তর এক যুক্তি।
কারণ প্রাক্তন মানে একটি ব্য/থা। ক্ষেত্রবিশেষ এই ব্য/থাটা কারো ক্ষেত্রে গভীর তো কারো কাছে অতি নগন্য। কেউ বা এই ব্য/থাটা আজীবন বুকের অভ্যন্তরে পুষে রাখে তো কেউ
স্মরণেও আনতে চায় না। কারো প্রাক্তনের অভিজ্ঞতা সুমিষ্ট তো কারো ক্ষেত্রে জঘন্য। যদিও বেলাশেষে ব্যর্থ প্রেমের গল্প
রচিত হয় অহরহ। আর এ পৃথিবীর বুকে প্রণয়ের ছলে কেউ হাসি মুখে ঠকায় তো কেউ হাসিমুখে জেনে বুঝে মেনে নেয়। তবুও তিতাসের পাল্টা প্রশ্নে রবিন চিন্তিত। তার মস্তিষ্ক জুড়ে এখন একটা কথায় ঘুপরপাক খাচ্ছে, শাহিনার সঙ্গে নিশান সম্পর্কে জড়িয়ে কবে এবং কীভাবে?কী এমন ঘটল যে এক
বাচ্চার মা হয়েও প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে শাহিনা।
তবে মহিলা প্রচুর ধূর্ত নিশ্চয়ই অন্য কোনো কাহিনি লুকিয়ে আছে। তাছাড়া, শাহিনা অজপাড়াগাঁয়ের আর নিশান শহুরে
শিক্ষিত ছেলে।ওরা দু’জন দুই মেরুর পথিক তাহলে কীভাবে কী? এছাড়াও,নিশান তো অবগত এটা তার বোনের সংসার। কেনই বা সে যেচে বোনের সংসারে আ/গু/ন লাগাচ্ছে? এর ফলে ভোর কত কষ্ট পাবে সে কী ভাবছে না? নাকি ভোরকে কষ্ট দেওয়া তার মূল উদ্দেশ্যে। রবিন এসব ভাবনার ক/র্তন
ঘটিয়ে বিরক্তমাখা দৃষ্টিতে শাহিনাকে দেখল। অদূরের থাকা এক সোফায় সে কফির মগ হাতে বসে আছে। নিশান তাকে
কিছু বলছে আর সে বিরক্তমাখা মুখে তাকিয়ে আছে। তখন উপর থেকে রোজার ডাক শোনা গেল।শাহিনা তখন চেঁচিয়ে
বললেন,

-”আর একটা টু শব্দ করলে তোর ডাকাডাকি জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিবো, বেয়া/দব একটা। এত মার খেয়েও লজ্জা হয় না ,ম/রে গিয়ে শান্তিও দেয় না। কতদিন বললাম বৈদ্যুতিক সুইচে চেপে তার মধ্যে আঙুল দিয়ে আমাকে চিরতরে মুক্তি দে। সবাই যেনো ভাবে দূঘর্টনা। কিন্তু না তা করবে কেন, সে তো বেঁচে থাকবে আমার হাঁড় মাংস জ্বালিয়ে খেতে। মন চায়
সারার মতো শ্বাসরোধ করে মা/রি।”

বাসায় কেউ নেই ভেবে শাহিনা তার মনের কথাগুলো বলেই যাচ্ছেন। নিশান নীরব শ্রোতা। রবিন আর তিতাস এসব শুনে হতবাক। তখন রোজা কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিলো,

-” আম্মু আমি ওয়াশরুমে যাবো। প্লিজ তাড়াতাড়ি এসো।”

-”পারব না, তুই একা একা যা।”

-”আর ডাকব না আমি এবারই শেষ। বিছানা থেকে নামতে পারছি না আমি, আমার হুইলচেয়ার দূরে রাখা। তুমি এসো আম্মু, প্রমিস আজ রাতে খাইয়ে দিতে বলব না।”

একথা শুনে শাহিনা রাগে গজগজ করে রোজার কাছে চলে গেলেন। তারপর দু’ ঘা বসিয়ে দিলেন রোজার পিঠে। রোজা ছটফটিয়ে নিঃশব্দে কেঁদে দিলো। কারণ শব্দ করলেও আম্মু আবার মারবে। সেদিনের মতো করে জোরপূর্বক মুখে ওড়না ঢুকিয়ে চিৎকার করে কান্না করার শা/স্তি দিবে। তারপর এক হ্যাঁচকা টানে রোজাকে উঠিয়ে শাহিনা ওকে ধরে ওয়াশরুমে রেখে আসল। অতঃপর হুইলচেয়ারটাও সেখানে রেখে উনি
হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। এখন বাকি কাজ রোজা একা একা সামলে নিতে পারবে, তার অভ্যাস আছে। ড্রয়িংরুমে এখন শুনসান নীরাবতা। নিশান কিছুক্ষণ আগে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে আর শাহিনা তার রুমে। এই সুযোগেই তিতাস রবিনকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে পনেরো মিনিটের মধ্যেই রোজাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তিতাসের বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে ছোট্ট রোজা। তার গলা জড়িয়ে ধরে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে তিতাসের মুখপানে। তিতাস আর কালবিলম্ব না করে গাড়ি নিয়ে ওদের ফ্ল্যাটে চলে এলো। তিতাসের মা- বাবা রোজাকে দেখে বিষ্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন। রোজা উনাদের দেখে কেঁদে ওর আম্মুর নামে বেশ কয়েকটা অভিযোগ করল। একে একে বলেও দিলো শাহিনা ওর সঙ্গে কী কী করেছে, কতবার মেরে/ছে। পিয়াস, তিতাস আর সারাকে দেখে ছোট্ট রোজাও তিতাসের বাবাকে ‘ বাবা’ ডাকে আর মাকে বড় মা। উনারাও খুব ভালোবাসেন বাঁচাল রোজাকে। তোতাপাখির মতো বকবক করে বাসাটা মাতিয়ে রাখা ছোট্ট পাখিটাকে। পিয়াসও নেই, সারাও নেই, বর্তমানে
তিতাস আর রোজায় হচ্ছে উনাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
এই বাসায় জ্বলতে থাকা জ্বলন্ত প্রদীপ। উনাদের চাওয়া এই প্রদীপ দুটো যেন চিরকাল এই বাসা আলোকিত করে রাখে।
রোজা বাবা ও বড় মাকে পেয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে। তিতাসের মা রোজার পিঠে মলম লাগিয়ে দিচ্ছেন। পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে মেয়েটার ফর্সা পিঠে।শাহিনা ওর ব্যবহারে বুঝিয়ে দিচ্ছে, সে মা নামের কলঙ্ক। নয়তো এমন ফুলের গায়ে কেউ এভাবে হাত তুলে, কষ্ট দেয়। তখন তিতাস রোজাকে রেখেই রবিনকে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল। এখন খাবারের প্লেট হাতে
বাবা- মায়ের রুমে প্রবেশ করল। তারপর রোজার পাশে বসে
ইয়া বড় হা করে বলল,

-”আম্মু খবরদার বলছি ওই টেপিকে একটুও দিবা না। এখন চটজলদি আমাকে খাইয়ে দাও। আহা, স্পেশাল বিরিয়ানি।”

-”আমাকেও একটু দাও ছোট মিয়া।”

-” তোর মাকে গিয়ে বল কিনে দিতে, এখন যা ভাগ।”

-”আম্মু কিনে দিবে না বরং বললেই মারবে।”

-”একটা শর্তে দিবো যদি তুই রাজি থাকিস।”

-”কি শর্ত?”

-”তুই এখন থেকে আমাদের সঙ্গে থাকবি, ভুলে তোর আম্মুর কাছে যাওয়ার আবদার করতে পারবি না, রাজি?”

-”আচ্ছা, এমনিতেই আম্মু আমাকে ভালোবাসে না। বারবার মরে যেতে বলে। আমি না থাকলেই নাকি আম্মু খুব ভালো থাকবে।”

-”যদি এই শর্তের নড়চড় করিস তোকে সিলিংয়ের সঙ্গে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখব, মনে রাখিস।”

-”আচ্ছা।”

তিতাসের আম্মু হেসে প্রথম লোকমা রোজার মুখেই দিলেন।
তা দেখে তিতাস মুখ ভেংচি দিয়ে পরের লোকমা মুখে পুরে ওর আম্মুকে বলল,

-”আম্মু বাকিটুকু তোমার স্বামী আর রোজাকে খাইয়ে দাও।
ভদ্রলোক যেভাবে তাকিয়ে আছে পেট খারাপ হবে নিশ্চিত।
আর আমি আমার বউয়ের কাছে গেলাম। তোমাদের এসব ঝামেলায় বউটাকেও সময় দিতে পারি না, কবে যে আমাকে ছেড়ে চলে যায়, কে জানে।”

তিতাসের বাবা জবাবে কিছু বলতে গেলে তিতাস হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে হাঁটা ধরল। আর ওর মা সত্যি সত্যিই ওর বাবার মুখে খাবার পুরে রোজার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লেন। একপর্যায়ে মুখে খাবার নিয়ে ওর বাবা হেসে ফেললেন। কারণ তিতাস যাওয়ার আগে উনাকে ইশারায় বলে গেছে” খুশি তো? এবার হাসো।” তার এহেন কান্ডে উনি সত্যিই না হেসে পারলেন না। ততক্ষণে তিতাস শিষ বাজিয়ে রুমে ঢুকে দেখে ভোর আধশোয়া হয়ে বসে বই পড়ছে। ঘুরে বসার কারণে তিতাসকে দেখতে পায় নি। তিতাস নিঃশব্দে পা টিপে ভোরকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে গিয়ে বলল,

-“ম্যাও।”
-”ঢং করা হয়ে গেলে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়।”
-”না ঘুমিয়ে জেগে কেন শুনি?”
-”আগামীকাল থেকে হসপিটালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন ছাড় আমায় উঠব।”
-”উহুম না, ছুটিতে আছেন তাহলে হসপিটালে কেন?”
-”ছুটি ক্যান্সেল করেছি।”
-”কেন?”
-”সেই কৈফিয়ত তোকে দিবো না। আর তোর ঢং আমার সহ্য হচ্ছে না, ছাড় বলছি, ছাড়!”
-”আশ্চর্য, আমি আবার কি করলাম?”
-”আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিস না, আমার থেকে দূর সর। ঘৃনা হচ্ছে তোকে দেখে। তোর ছোঁয়া আমার শরীরে কাঁটার মতো বিঁধছে। যার শরীরের টানে বার বার ছুটে যাস সেখানেই যা।”

একথা শুনে তিতাসের শক্ত বাঁধন আপনাআপনিই ঢিলে হয়ে গেল। সে বিষ্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ভোরের দিকে। এসব বলার কারণ তিতাসের বোধগম্য হচ্ছে না। তাই সে জিজ্ঞাসা করতে উদ্যত হলেই ভোর তাকে ঠেলে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। আর তিতাস সেভাবেই শুয়েই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

To be continue………………..!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here