Monday, May 18, 2026

তনয়া পর্ব ১০

0
812

#তনয়া
#পর্ব -১০

বেশ কিছু মাস পার হয়েছে আয়রার বিয়ের।এরই মধ্যে আয়রা বেশ গুছিয়ে নিয়েছে নিজেকে।একটু একটু করে সংসার বুঝে উঠতে শিখছে।রাফাতের পুরো পরিবার তাকে আগলে রাখে সবসময়।বাড়ির জন্য মন খারাপ হলেই রাফাত প্রায় সময় অফিসে যাওয়ার পথে আয়রাকে নামিয়ে দিয়ে যায় আবার ফেরার পথে নিয়ে আসে।তবে আজ আয়রা বেশ চিন্তিত হয়ে আছে। একটু আগেই শ্বাশুড়ি ডেকেছিল।শ্বাশুড়ির ভাষ্যমতে,

“আজ বিকেলে রাফাতের বড় খালা আসবেন।আয়রাকে নিয়ে আগামীকাল তনুকে দেখতে যাবেন।আরাফ নাকি তনুকে খুব পছন্দ করেছে।যদিও একি ঘরে দুবোনের আত্মীয়র সম্পর্ক হোক তাতে নাকি আয়রার খালা শ্বাশুড়ির আপত্তি ছিল।আরাফ একমাত্র ছেলে হওয়ার দরুন না করতে পারেননি।তাছাড়া তনুকে অপছন্দও হয়নি।সবমিলিয়ে কথা হচ্ছে, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আয়রাদের বাড়িতে যাবে।”

কথা গুলো শোনার পর থেকেই আয়রা অস্থির হয়ে আছে।শ্বাশুড়িকে কিছু বলতে পারেনি।তনুর কথা ভেবে কান্না পেয়ে যাচ্ছে। এসব ব্যাপার নিয়ে তনুকে ঘাটানো মানে পুরোনো ক্ষতয় আঘাত করা।বাবা এখনো কিছুই জানে না তনুর বিষয়টা নিয়ে।এরকম ভালো একটা বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে বাবা নিশ্চয়ই খুশি হবে।আরও একটা ব্যাপার আছে,বলতে গেলে প্রস্তাবটা আয়রার শ্বশুর বাড়ি থেকেই যাচ্ছে!এটা নিয়ে তেমন আপত্তি করা মানে ঝামেলা তৈরি হওয়া।সমস্যাটা খুলে বলতে হবে না হয় একদম মানা করে দিতে হবে।সরাসরি মানা করে দেয়াটা আয়রার শ্বশুড় শ্বাশুড়ি ভালো ভাবে নেবে না।এসব ব্যাপার আয়রা আগে বুঝত না।বিয়ের পর অনেক বিষয় এখন বুঝতে শিখেছে। আয়রা ঠিক করেছে মাকে আগে জানিয়ে রাখবে।এখন প্রায়ই এই ধরনের পরিস্থিতিতে পরতে হবে।তাই বাবাকে সবটা জানানো প্রয়োজন। দূ্র্বলতা কখনো ঢেকে রেখে চলা যায় না।প্রকাশ করতেই হয়।আর সম্পর্কের মধ্যে স্বচ্ছতা থাকা খুব প্রয়োজন।যে তনুকে ভালোবাসবে সে সবটা জেনেই ভালোবাসবে।সৃষ্টিকর্তা চাইলে তনুর জীবন অনেক সুন্দর হবে।যেটা দেয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই সেটা নিয়ে আঘাত দেয়ার অধিকারও নেই।

তনুর দিনগুলো ভালোই কাটছে।নিয়মিত ভার্সিটিতে যাওয়া,মাঝে মধ্যে বান্ধবীদের সাথে বেড়াতে যাওয়া,বাড়িতে থাকলে পড়াশোনা, মায়ের সাথে টুকটাক কাজ করা,ছাঁদের দোলনাটায় বসে বই পড়া এভাবেই বেশ ভালো সময় পার করছে।আয়রার বিয়ের পর প্রায় একা হয়ে গেছে।তন্ময় দিনের বেশি সময় স্কুলে থাকে,বাবা অফিসে। শায়লা বেগম সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকেন।সময় চলছে তার নিজস্ব গতিতে সেই সাথে তনুও এগিয়ে চলছে নিজের মতন।নতুন করে ওঠা ঝড়টা খুব দ্রুত সামলিয়ে নিয়েছে।মিশকাত নামটা খুব করে ভুলে থাকতে চাইছে।তনু নিজের মতো বাঁচতে চায়।সামাজিক নিয়মের বাইরে বেরিয়ে নিজের নিয়মে চলতে চায়।পড়াশোনা শেষে চাকরি করবে।কাজের মধ্যে থাকলে ভালো থাকবে সে।সময় পেলে শহরের কোলাহল থেকে দূরে যাবে।কিছুটা সময় প্রকৃতির বুকে শুয়ে কাটিয়ে দেবে।এইতো,জীবনে আর কি চাওয়া?সবাইকেই যে ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে,পরিপূর্ণ থাকতে হবে এমনটাও নয়।কিছু অপূণর্তা থাকুক না,ক্ষতি কি?

বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে জানতে পারলো, আয়রার শ্বশুর বাড়ি থেকে মেহমান আসবে । তাই আজ কিছু রান্নাবান্না করে রাখছে।তনুকে শুধু বলেছে ড্রয়িংরুমটা ভালোভাবে গোছাতে।

তনু ঘরে এসে শুয়ে পরলো।ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।ভার্সিটি থেকে ফিরলে খুব ক্লান্ত লাগে।কাল আপা আসবে ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে গেল।গোসল করার জন্য উঠে কার্বাড থেকে কাপড় বের করতেই ফোনটা বেজে উঠলো।অচেনা নম্বর দেখা ফোনটা রিসিভ করবে কিনা ভাবতেই বন্ধ হয়ে গেল।সাথে সাথেই আবার ফোনটা বেজে উঠলো।এবার সে রিসিভ করে সালাম দিলো,

ওপাশ থেকে কোনো জবাব পেল না।তনু কয়েকবার হ্যালো বললেও কোনো সাড়া না পেয়ে কেটে দিলো।বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

ওপর প্রান্তে থাকা মিশকাত তখনও ফোনটা কানে চেপে ধরে আছে।অনেকদিন পর তনুর কথা শুনতে পেল,নিশ্বাসের শব্দ অনুভব করতে পারলো!সেই রাতে ছাঁদে বলা তনুর কথাতেই আঁটকে ছিল এতদিন।মনটাকে আর দমিয়ে রাখতে না পেরে আজ তনুকে ফোন করে বসলেও গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারেনি।কি দরকার তনুর তিক্ততা বাড়িয়ে তোলার?

সেদিন জ্বরের ঘোরে তনু যখন লুটিয়ে পরেছিল মিশকাতই তাকে আঁকড়ে ধরেছিল।তনুর শরীরের তীব্র উষ্ণতা খুব করে টের পাচ্ছিলো।সেই প্রথম ছিল দুজনের উষ্ণ আলিঙ্গন। না ভুল হলো,দুজনের নয় তার একার।তনু তো নিজের জ্ঞানেই ছিল না।ছিল না জন্যই মিশকাত তনুর কাছাকাছি আসতে পেরেছিল।তনুকে অসুস্থ দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।তনুকে পাঁজাকোলা করে ছাঁদ থেকে নামিয়ে ঘরে নিয়ে এসেছিল।ঘন্টাখানেক পাশে বসে তনুর হাত চেপে ধরেছিল।পরে মারুফের সাহায্য নিয়ে শান্তাকে ডেকে এনেছিল।ব্যাগ থেকে ওষুধ এনে শান্তাকে দিয়েছিল তনুকে খাইয়ে দেয়ার জন্য। এরপর সে রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে পরেরদিন সকালেই বেরিয়ে পরেছিল ফুফু আর বাবাকে বলে।পরিক্ষার অযুহাত দেয়ায় খুব সহজ হয়েছে আসাটা।অসুস্থ তনুকে ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হয়েছিল।সে কষ্টটাও সহ্য করে নিয়েছিল শুধুমাত্র তনুর জন্য!একদিন সে ঠিক তনুকে বুঝিয়ে দেবে তার ভালোবাসা কোনো ঠুনকো বিষয় নয়।মিশকাতের কাছে তনুকে ভালোবাসা গোটা একটা জীবনের নাম!

***

শায়লা বেগম মনে মনে ছটফট করছেন।এমন একটা সময় তনুর জন্য এমন ভাবে বিয়ের প্রস্তাব আসবে তা কি ভাবতে পেরেছিল?তনুর বাবা নিশ্চয়ই খুব খুশি মনেই প্রস্তাবটা গ্রহণ করবেন!তনুর মতামত জানতে চাইলে তখনই হবে আসল সমস্যা। তনু কিছুতেই রাজি হবে না।বিয়ে বিষয়টা ভাবলেই তনু অন্যরকম হয়ে যায়।এবার বোধহয় তনু চুপ করে থাকবে না?বাবাকে সবটা জানিয়ে দেবে মেয়েটা।মেয়েটার বুকে যে কষ্টের পাহাড় জমে আছে!

“মা, তনুকে তো কিছুই বলা হয়নি?ওরা এখন হয়ত বাবার সামনে কথা গুলো বলবে।তনু যে কি কান্ড ঘটিয়ে বসে কে জানে?আয়রা ফিসফিসিয়ে মায়ের কানের কাছে এসে বলল।”

“তাই তো ভাবছি।এতদিন যা চেপে ছিল তা আজ বলে বসবে?তনু রেগে গেলে তোর শ্বশুর বাড়ির মানুষজন কি ভেবে বসে কে জানে?”

“আমি বা কি করবো? নিজের বোনের কথা তো ওভাবে বলা যায় না!আর তনুকে ছোট করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।ওরা যা ইচ্ছে ভাবুক, তনু শুধু কষ্ট না পেলেই হয়।”

“কষ্ট নতুন করে আর কি পাবে?আমার এত ভালো মেয়েটার জীবনে এতকষ্ট কেন আসলো বলতো?বড় ভাবীর কাছ থেকে যেদিন জেনেছিল সেদিন থেকেই ওর সমস্ত সুখ হারিয়ে গেছে?মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতাম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।হুট করে এসে আমায় প্রশ্ন করে বসতো,মা আমার বাচ্চা না হলে কি খুব সমস্যা হবে?বাচ্চা না থাকলে কি সুখ থাকে না?এটা কি খুব বড় দোষ আমার?ও যখন নিজেকে বোঝাতে পারতো না তখন এসব বলতো।এখন দ্যাখ, এসব প্রশ্ন ভুলেও কখনও করে না।ধীরে ধীরে মেনে নিয়েছে,স্বাভাবিক হয়েছে।ভুলেও বুঝতে দেয় না ওর কষ্ট গুলো।”শায়লা বেগম শাড়ির আঁচলে চোখ মুছলেন।

আয়রাও প্রায় কেঁদে ফেলেছে। তনুর জীবনটা কেন এত এলোমেলো?আয়রা মনে মনে ঠিক করে নিলো যতদিন না তনুর জীবনটা সুন্দর হচ্ছে ততদিন সে বাচ্চা নেবে না!তনুর দুর্বল জায়গায় আঘাত সে কখনো করবে না।নিজের বোনটা গুমরে গুমরে শেষ হয়ে যাবে আর সে হাসি আনন্দে জীবন কাটাবে তা হতে পারে না!

আরাফের মায়ের পাশে বসে তনু উসখুস করছে। সেই কখন থেকে বসে আছে!ভদ্রমহিলা তার হাত ছাড়ছেই না।অথচ বড়দের কথার মাঝে একটু থাকতে ইচ্ছে করছে না তার।তনু খেয়াল করেছে ভদ্রমহিলা নিজের ছেলের গুনগান করছেন খুব।আরাফের ছোট বেলা থেকে পড়াশোনা চাকরি,প্রমোশন সবকিছু বলা শেষ করেছেন।তনু বুঝতে পারছে না কেন এত আরাফের কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে শোনানো হচ্ছে। বিয়ের দিন উনি অনেক প্রশ্ন করছিল কথাটা মনে হতেই তনু খুব সহজেই বিষয়টা বুঝে গেল।সাথে সাথেই শিরদাঁড়ায় শিরশিরে অনুভূতি হলো।বুকের ভেতর কাঁপন ধরলো।চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

আন্টি আপনারা বসেন আমি একটু আসছি।কথাটা বলে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।এমন পরিস্থিতিতে যে তাকে পরতে ত অনেক আগে থেকেই বুঝেছিল।।মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিল এসবের মুখোমুখি হওয়ার জন্য। তবু আজ নিজেকে হঠাৎ অসহায় লাগছে।আরাফের মায়ের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বিধ্বস্ত হয়ে গেল কেন?কেন নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারলো না?

এরপরের ঘটনা গুলো খুব দ্রুতই ঘটে গেল।তনুর বাবা খুশি মনে প্রস্তাবটা গ্রহণ করলেন।আয়রার খালা শ্বাশুড়ি সবাই নিজের বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন।তনুর মতামত থাকলেই দ্রুত সবকিছু করার ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন।তনুর বাবাও আস্বস্ত করেছেন,তনুর মতামত অবশ্যই থাকবে।

শায়লা বেগম আয়রা অসহায় হয়ে সবটা দেখে গেল।শায়লা বেগম নিজের ভুলটা এতদিনে বুঝতে পারলেন।তনুর বাবার থেকে এতবড় একটা বিষয় লুকোনো মোটেও ঠিক হয়নি।এই ব্যাপারটা লুকিয়ে তিনি তনুকেও কষ্ট দিয়েছেন।কারণ,মা হতে না পারাটা কোনো অন্যায় বা দোষের নয়!এই বিষয়টা তনুর গোটা জীবন হতে পারে না বড়জোড় জীবনের একটা অংশ হতে পারে।সত্যি তো এতবড় দুর্বলতাও নয় যে এভাবে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক করে তুলতে হবে?যেটা মানুষের হাতে নেই তা নিয়ে দুর্বল হওয়ারও কিছু নেই!

চলবে..

(আজকের পর্বটা গুছিয়ে লিখতে পারিনি ব্যস্ততার কারণে। ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here