হৃদয়ের সন্ধিক্ষণ পর্ব ৮

0
84

#হৃদয়ের_সন্ধিক্ষণ
#ফারিহা_খান_নোরা
#পর্বঃ৮
‘বড় মেয়ের আগেই ছোট মেয়ের বিয়ে তাও আমার অনুপস্থিতিতে! আমি ওদের বাবা বেঁচে নেই?সেখানে তুমি আমার পারমিশন ছাড়া আমার মেয়ের বিয়ে দিয়েছো কোন হিসাবে তানিয়া?’

নুরুল সাহেবের হুংকারে তানিয়া বেগম কেঁপে উঠে।এই বয়সে এসে সন্তানের সামনে স্বামীর এমন ঝাড়ি খেতে হবে তা ভাবতে পারে নি।তুরফা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো বাবা মায়ের এমন অবস্থা দেখে সে রুমে চলে আসে।তার সেখানে না থাকাই উচিত মা অস্বস্তিতে পড়বে।এই বাবাটাও আসতে না আসতেই ড্রয়িং রুমেই শুরু করে দিয়েছে।আর শুরু করবেই না কেন? বাবাকে না জানিয়ে আজকাল মা যেসব কান্ড করে বেড়ায়।তবে একটা দিক ভালো হয়েছে আফসানের সাথে বিয়ে না হয়ে বিয়েটা নিষ্প্রভের সাথে হয়েছে এটা ভেবে স্বস্থির নিঃশ্বাস পড়ছে।

অপরদিকে তানিয়া বেগম স্বামীর রাগী চেহারার দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে,

‘আসলে হঠাৎ করেই হয়ে গেছে।’

‘মায়ের কাছে মাসির বাড়ির গল্প শুনাও।বিয়ে কখনো হঠাৎ করে হয়?’

‘সত্য বলছি আমরা কেউ জানতাম না।’

তানিয়া বেগম চমকে যায় আমতা আমতা করে উঠে বলে।তার স্বামী সহজে রেগে যায় না।তবে একবার রেগে গেয়ে গায়ে অবধি হাত তুলার রের্কড আছে।

নুরুল সাহেবের চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায়।তিনি চেঁচিয়ে বলেন,

‘এসব তোমাদের দুই বান্ধবীর বুদ্ধি নয়তো? তোমাদের দ্বারা এসব হ‌ওয়া অবিশ্বাসের কিছু নয়। তোমারা আমার মেয়ের সঙে কি করেছ বল?’

তানিয়া বেগম আর কুল না পেয়ে নুরুল সাহেবকে সব সত্য বলে দিলেন তবে আফসান ও তাঁদের ব্যাপারটা চেপে।এমন ভাবে সবকিছু উপস্থাপন করেছেন জেনো সব দোষ নিষ্প্রভের।

সব শুনে নুরুল ইসলাম প্রথমেই যে কাজটি করলেন তা হলো, তানিয়া বেগমের গালে কষে দুইটা থা*প্প*ড় লাগিয়ে দেন।রাগের বশে তার শরীর কাঁপছে। চেঁচিয়ে বলেন,

‘তুই আমার মেয়েকে অই বাড়িতে নিয়ে গেছিস কেন। আমার পারমিশন নিয়েছিলি।আমি নেই বলে সেই সুযোগে যা ইচ্ছে করে বেরিয়েছিস, তা কর কিন্তু তুই আমার মেয়েকে এসবে নিয়ে গেছিস কেন?’

তানিয়া বেগম গালে হাত দিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বলে,

‘এখন আমার মেয়ে বলছো!বাপ হয়েছ ছেলে মেয়ের কি কোনো খোঁজ খবর রাখো। শুধু মাস গেলে টাকা পাঠালেই হয় না,ব‌উ বাচ্চাকে সময় দিতে হয়।দিয়েছ কখনো সময়?
সারাদিন রাত বাহিরে থাকো এমন কি মাসের ২৫ দিন ই ত বাড়ির বাহিরে ।ছেলে মেয়ে কে কি করলো না করলো জানবে কিভাবে!এখন বিয়ে হয়েছে বলে সব দোষ আমার তাই না।বিয়ে দিয়েছি বেশ করেছি যা ইচ্ছা করো যাও।’

তানিয়া বেগম এর কথার প্রতিত্তরে নুরুল ইসলাম শান্ত কন্ঠে বললেন,

‘ব‌উ বাচ্চা ছাড়া মাসের উপর মাস বছরের পর বছর সাধে বাড়ির বাহিরে থেকেছি! তোমাদের মুখে তিন বেলা ভালো খারাপ দিতে মাথার উপর স্থায়ি ছাদ দিতে আমায় থাকতে হয়েছে।এই এখন এতো বিলাসীতায় আছো কার পয়সাই।উহু ভেবো না টাকার খোঁটা দিচ্ছি,তোমায় আমি সত্যটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি। তোমাদের ছাড়া থাকতে আমার ভালো লেগেছে?কোনো বেলা খেয়েছি কোনো বেলা খাই নি,এভাবে টাকা রোজগার করে তোমাদের ভরন পোষণ এর দায়িত্ব নিতে হয়েছে।সমাজ শুধু মায়ের সেক্রিফাইস দেখে একজন বাবার সেক্রিফাইস চোখে পড়ে না।’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে নুরুল সাহেব আবার ও বলা শুরু করে তবে এবার বেশ রেগেই বললে,

‘তোমায় আমি পরে দেখে নিবো আগে আমার মেয়েকে এবাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। আমি এই বিয়ে টা কিছুতেই মানি না।’

তানিয়া বেগম জেনো বাকরুদ্ধ।স্বামীর কথার পিঠে বলার মতো কিছুই খোঁজ পাচ্ছে না, তবুও অতি কষ্টে বলল,

‘শুনন আপনার দোহাই লাগে আপনি এমনটা করবেন না।নিষ্প্রভ ভালো ছেলে,তুরকে ভালো রাখবে।বিয়ে তো হয়েই গেছে। কিভাবে হয়েছে এটা বড় কথা নয়,বড় কথা হলো তুরের কপালে নিষ্প্রভ ছিলো বলেই বিয়েটা তার সাথেই হয়েছে।মেয়ের জীবণটা এভাবে নষ্ট করবেন না।’

নুরুল সাহেব মুখ ঝামটা দিয়ে চলে গেলেন।পিছনে তানিয়া বেগম ফ্লোরে বসে কাঁদতে শুরু করল। নুরুল ভাবছে নিষ্প্রভ ছেলে হিসাবে খারাপ তবে তানিয়া বেগম জানেন নিষ্প্রভ একদম খাঁটি সোনা। শুধু মাত্র বান্ধবী আশার ব্লাকমেইলে আফসানের সাথে বিয়ে দিয়ে রাজি হয়েছিল ভাবছে মির্জা বাড়ির সম্পত্তি পাবে তাঁর মেয়ে এই ভেবেই ত মনে বুজ দিয়েছে।তবে আল্লাহ যা করার ভালোই করে।হোক অর্থ কম তবে সঠিক মানুষের হাতেই তার মেয়েটা পড়েছে। আল্লাহ তার চোখ খুলে দিয়েছে নয়তো পার্টিতে এমন একটা সত্যের মুখোমুখি হবে তানিয়া বেগম কখনো ভাবে নি।তবে তার স্বামীকে ত আসল কথা বলতে পারছে না।এখন কি করবে সে?

_______________

এখন স্বন্ধ্যা! তুর নিজের জামদানি কালো শাড়িটাই পড়েছে। নিষ্প্রভ তখন শপিং এ নিয়ে যেয়ে পাঁচটা থ্রিপিস ও ছয়টার মত শাড়ি কিনে দিয়েছে। তাঁর মধ্যে তিনটে ছিলো কাতান সিল্ক ও তিনটা জামদানি শাড়ি।আর থ্রিপিস গুলোর মধ্যে সব কয়টাই নরলাম যেহেতু সে রেগুলার ইউজ করবে। থ্রীপিস গুলো যেহেতু রেডিমেড না আর ব্লাউজ গুলোও।যার জন্য টেইলার্স এ বানাতে দিয়েছে। অজ্ঞাত নিজের শাড়িই পড়তে হলো।

রাত থেকে তাকেই রান্না করতে হবে যার জন্য তুর নিচে আসলো।আশা বেগম এই অপেক্ষাতেই ছিলেন।মুখ গম্ভীর করে বলল,

‘আমার কথা মাথায় রেখেছ ভালো লাগলো। শোনো তুমি আমার বান্ধবীর মেয়ে, আমি তোমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করতে চাই না।তাই আমি যখন যা বলব তুমি সেভাবেই চলবে।এ বাড়িতে আমার কথার উপর কেউ কথা বলে না।এমনকি আফসানের বাবাও না।যাও এখন কাজে লেগে পড়।’

‘আচ্ছা।’

বলেই তুর রান্না ঘরে যায়।এই মহিলাকে সে কিছুতেই বিশ্বাস করে না।নিষ্প্রভ কাল রাতেই সাবধান করে দিয়েছে এমন কিন্ত না,আসলে তার মায়ের বান্ধবী সম্পর্ক তুর আগে থেকেই আগত।ছেলের চরিত্র খারাপ জেনেও তার দোষ ঢাকতে কতো নাটক করে সে মহিলা কেমন হবে তা জানা আছে।নিশ্চয়ই মনে মনে কোনো ফন্দি আঁটছে না হলে এতো ভালো ব্যাবহার করবে কেন?

তুর রান্নাঘরে যেয়ে দেখে সিতারা নেই কারণ আশা বেগম তাকে সরিয়েছে তুরকে জেনো কোনো রকম সাহায্য করতে না পারে।তুর রান্না তেমন জানে না,বাড়ির ছোট মেয়ে যার জন্য সবার আদরের যা চেয়েছে তাই পেয়েছে।কোনো কিছু খেতে চাইলা মা কিংবা বোন করে দিতো।ফোন ও তার কাছে নেই যে, ইউটিউব দেখবে।কি রান্না করা যায় অনেক ভেবে তার মাথায় আসে। খিচুড়ি রান্না করবে তার সাথে ডিম ভাজা, বেগুন ভাজা ও চাটনি করবে।তুর সেভাবে কাজে লেগে পড়ে। পেঁয়াজ কাটতে যেয়ে তার অবস্থা নাজেহাল।চোখের পানি নাকের পানি এক জায়গায় করেছে।

এরমধ্যে আফসান শিশ বাজাতে বাজাতে ফোন হাতে নিয়ে নামতে থাকে।রান্নাঘরে তুরের দিয়ে চোখ পড়তেই সে লা*ল*সা*র দৃষ্টিতে তাকায়।মনে মনে ভাবে এই খা*সা মা*ল কে তার সৎ ভাই উপভোগ করতেছে।যে কিনা তার পথের একমাত্র শত্রু ।না এমনটা হতে দেওয়া যাবে না।

তুরের রান্না প্রায় শেষ সে সবকিছু ঠিক ভাবে রেখে বেরিয়ে আসে।দেখে আফসান তারদিকে বি*শ্রি ভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।সে অস্বস্তিবোধ করে নিচ দিকে তাকিয়ে চলে আসতে নেয়।ঠিক তখনি আফসান নিজের পকেট থেকে কয়েকটা মার্বেল বের করে তুরের পায়ের দিকে গড়িয়ে দেয়।

হঠাৎ করে পায়ের নিচে কিছু পড়ায় তুর মুখ থু*ব*ড়ে প*ড়ে যায়।আশা বেগম মনোযগ সহকারে টিভিতে সিরিয়াল দেখছিল। কিছু পড়ার শব্দ পেয়ে তাকিয়ে দেখে তুর কোমড়ে হাত দিয়ে প*ড়ে আছে কিছুটা দুরে আফসান দাড়িয়ে মজা নিচ্ছে।তিনি খেয়াল করল তুরের পায়ের কাছে বেশ কয়টা মার্বেল পড়ে আছে। এবার ভালো ভাবেই বুজতে পারল আফসান এসব করেছে।আশা বেগম তুরকে ধরতে যাবে তার আগেই মনে হলো থাক আর একটু কষ্ট পাক।মায়ের উপর ক্ষোপ মেয়ের উপর পড়ছে।

তুর ব্যাথায় কাতরায়।উঠতে চেষ্টা করছে তবে পারছে না। হঠাৎ করে তাকে পাঁজাকোলে করে কেউ তোলে। ব্যাথায় চোখ মুখ খিচে আসে।অতি কষ্টে কোলে নেওয়া ব্যাক্তিটির দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে যায়।

নিষ্প্রভের আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়েছে।সময় নষ্ট না করে সে বাড়িতে চলে আসে তার মনে এখন একটাই ভয় না জানি মেয়েটার যদি কোনো ক্ষতি করে মিসেস আশা।নিজ স্বার্থের জন্য তিনি সব করতে পারেন।বাড়ি এসেই দেখে তুরের এই অবস্থা।

তুরকে নিষ্প্রভের কোলে দেখে আফসান জ্বলে যায়। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলে,

‘ভেবেছিলাম একে সারাজীবন আমার বিছানা সঙ্গী করে রাখবো কিন্তু না।এখন ডিসিশন চেঞ্জ একে আমি আমার ব্যাবসায় লাগাব।’

চলমান।

বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।নেক্সট নাইচ না বললে কি হয় না ভাইয়া/আপুরা? আপনাদের জন্য এতো সময় নিয়ে গল্প লিখছি আপনারা কি আমার জন্য দুই মিনিট সময় নিয়ে মন্তব্য করতে পারবেন না? পাঠকদের মন্তব্য লেখকদের লেখার আগ্রহ বাড়ায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here