হৃদয়ের সন্ধিক্ষণ পর্ব ৬

0
106

#হৃদয়ের_সন্ধিক্ষণ
#পর্বঃ৬
#ফারিহা_খান_নোরা

এখন মধ্যরাত! ঘড়িতে দুইটা বেজে দশ মিনিট।এখনো নিষ্প্রভ বাড়িতে আসে নি।তুরকে নিষ্প্রভের ঘরে দেওয়া হয়েছে।পরনে আগের শাড়িটাই রয়েছে সে নিষ্প্রভের বিছানায় এলোমেলো ভাবে বসে রয়েছে।তার কোনো দিকেই মন নেই।তানিয়া বেগম অনেক আগেই বাড়িতে চলে গেছে।যাওয়ার আগে তুরের হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে কেঁদে গেছে।মায়ের এসব ব্যাবহার তুর কিছুতেই বুজতে পারলো না।সে তানিয়া বেগমের সাথে যাওয়ার জন্য জেদ করে কিন্তু তিনি তুরকে নেন নি।এখন তুর শুধু তার মেয়ে নয়,আজ থেকে তুরের সাথে না চাইতেও নিষ্প্রভের নাম জড়িয়েছে।প্রথম ঘটনায় তুর বাকরুদ্ধ আর দ্বিতীয় ঘটনায় তুর মর্মাহত।মাত্র একদিন দিনের মধ্যে তার জীবণটা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।চেনা নেয় জানা নেই একটা অচেনা ছেলের সাথে কিভাবে তার বাকি জীবন পার করবে?

দরজা খোলার শব্দে তুরের বুকের ভিতর ধড়াস করে উঠে।সে ভয় পাচ্ছে,তার হাত পা অবশ হয়ে যাবে এমন অবস্থা।নিষ্প্রভ রুমে ঢুকে তুরকে দেখে একটু চমকে যায় তবুও নিজেকে সামলিয়ে ওয়াসরুমে ঢুকে পড়ে। আধঘণ্টা সময় নিয়ে বের হয়।একদম শাওয়ার নিয়ে,মাথার চুল গুলো টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে বারান্দায় যায়।তুর এতোক্ষণ ধরে বসেই ছিলো।সে ভেবে পায় না, ওয়াশরুমে ছেলে মানুষের আবার এতো সময় লাগে কিভাবে?

নিষ্প্রভ বারান্দা থেকে রুমে এসে বিছানায় বসে।তুর নড়ে চড়ে সরে যায়,বেপারটা নিষ্প্রভ খেয়াল করে। নিষ্প্রভ ধীর কন্ঠে বলে,

‘এই নাও।’

তুর মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে নিষ্প্রভ একটি খাম তার দিকে ধরে আছে।তুর বুজতে না পেরে বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকায়।নিষ্প্রভ তুরের দৃষ্টি বুজতে পেরে ধীর কন্ঠে বলে,

‘এটা দেনমোহর যা স্ত্রী হিসাবে তোমার প্রাপ্য।তুমি মানো আর নাই মানো আমি তোমার প্রাপ্য তোমায় বুঝে দিলাম।যদিও এখানে সামান্য টাকা আছে। আমি এক লক্ষ টাকা নগদে পরিশোধ করতে পারবো বলেই কাবিন নামায় এই টাকা অংক ই দিয়েছি। আমার বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও বাবার টাকায় কোনো কিছু করতে আমি ইচ্ছুক না।’

নিষ্প্রভের কথায় তুর মুগ্ধ হয়ে গেল।ছেলেটার চিন্তা চেতনা সত্তিই খুব সুন্দর।নিষ্প্রভ খামটা তুরের কোলের উপর রেখে দেয়।তুর আমতা আমতা করে বলে,

‘আমি কি করবো!’

‘সেইটা তোমার বেপার।আমি জাস্ট তোমার প্রাপ্য তোমায় বুঝিয়ে দিলাম।’

‘হুম।’

‘শোনো তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো যা আমাদের দুজনের জন্যই ইম্পর্ট্যান্ট।’

তুর কাঁপা কন্ঠে বলল,

‘জি বলুন।’

‘প্রথমেই বলি বয়সে তুমি আমার অনেকটাই ছোট হবে তাই শুরু থেকেই তুমি করে বলেছি কিছু মনে করো না।আমি জানি আজকের এই ঘটনা আমাদের দুজনের উপরেই খারাপ প্রভাব পড়েছে।এই বিয়েটা আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে দেওয়া হয়েছে।আমি চেষ্টা করলে সময় নিয়ে হলেও বিয়েটা মানতে পারবো তবে তুমি পারবে না।এমন নয় যে, তুমি আফসানকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলে বলে মানতে পরবে না। তুমি আফসানের উপর কোনো কালেই ইন্টারেস্ট ছিলে না আমি জানি। তুমি ত অন্য একজনকে ভালোবাসো সেজন্য বলছি তুমি চাইলে আমার থেকে ডির্ভোস নিতে পারো। তুমি কেন? আমি নিজেই তোমাকে ডির্ভোস দিতে ইচ্ছুক। আমি চাই না, আমার সাথে সংসার করবে আর ভালোবাসবে অন্য কাউকে এর থেকে আমাদের দুজনের আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো।’

নিষ্প্রভ কথা গুলো বলেই থেমে গেলো।তুর শকে চলে গেছে।অন্য কাউকে ভালোবাসে অথচ সে নিজেই জানে না।কিছুটা রেগে বলল,

‘আমি কাকে ভালোবাসি?’

নিষ্প্রভ প্রতিত্তর না করে তুরের একদম কাছে চলে আসে।তুর ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়।কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলে দেখে নিষ্প্রভ বালিশ ও চাদর নিয়ে নিচে শুয়ে পড়েছে।এমন বোকামিতে নিজের বেশ লজ্জা লাগছে।সে কি ভেবেছিলো।

‘আকাশ কুসুম না ভেবে শুয়ে পড়ো। আমার কাছে ‘হৃদয়ের সন্ধিক্ষণ’ গুরুত্বপূর্ণ দেহের সন্ধিক্ষণ নয়।ভয় নেই আমি তোমাকে ছুঁয়েও দেখবো না।’

নিষ্প্রভের এমন কথায় তুর লজ্জিত হয়ে কিছুক্ষণ কুচুমুচু করে শুয়ে পড়ল।

_____________

সব আঁধার কাটিয়ে দিনের আলো ফুটেছে।সারা রাত ফ্লোরে থাকার ফলে নিষ্প্রভের পুরো শরীর ব্যাথা করছে।উঠতে নিয়ে বুজতে পারলো।তার ত নিচে থাকার অভ্যাস নাই তবে এখন থেকে অভ্যাস করতে হবে।বেডের উপর তাকিয়ে দেখতে পেল তুর হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে আছে।তার এলোমেলো অবস্থা শাড়ির আঁচলা বুক থেকে সড়িয়ে বেশ খানিকটা নিচে পড়ে আছে।যার ফল সরূপ স্পর্শকাতর জায়গায় অনেকটাই দেখা যাচ্ছে।নিষ্প্রভের মাথাটা ঝিমঝিম করছে।না চাইতেও চোখ দুটো চলে যাচ্ছে তবুও নিজেকে সামলিয়ে উঠে পড়ে ফ্রেশ হতে।

ওয়াসরুমের দরজা বন্ধ করার শব্দে তুরের ঘুম ভেঙ্গে যায়।এক মিনিট সময় নিয়ে সে বুজতে পারে এটা নিজের বাড়ি বা নিজের ঘর নয় সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ নতুন জায়গা।নিজের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে।এভাবে সে একটা পুরুষের সামনে সারারাত ছিলো ছিঃ ছিঃ।যেখানে বিয়েটাই মেনে নিতে পারছে না,সেখানে আর ভাবতে পারছে না।

নিষ্প্রভ বেরিয়ে এসে দেখে তুর গভীর চিন্তায় মগ্ন।সে বলল,

‘কি ভাবছো যাও ফ্রেশ হয়ে নেও।আর শোনো আমি জানি না আশা বেগম অই মহিলার সাথে পূর্বে তোমার কি সম্পর্ক ছিলো।উনি আমার বাবার ব‌উ কাজেই তোমার সাথে এখন থেকে আগের মত ব্যাবহার করবে না এটা নিশ্চিত থাকো।সো বি কেয়ারফুল।’

‘আচ্ছা।’

বলেই চুপ হয়ে গেল।তুর আমতা আমতা করছে।কিভাবে বলবে বুজতে পারছে না।

‘তুমি কি কিছু বলবে আমায়?’

‘মানে বলছিলাম কি ফ্রেশ হব কিন্তু আমার এখানে কোনো ড্রেস নেই। আমি ফ্রেস হয়ে কি পড়বো।’

নিষ্প্রভ কি জেন ভেবে আলমারির কাছে যায়,আলমারিটা খুলে কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করে রাণী গোলাপী রঙের শাড়ি বের করে তুরকে দেয়।তুর হাতে নিয়ে দেখে সুতির গোল্ডেন জরির পারের রাণী গোলাপী রঙের একটি শাড়ি।শাড়ির ভিতরে কালো রঙের ব্লাউজ ও পেটিকোট। কিন্তু কথা হলো মেয়েদের শাড়ি নিষ্প্রভের আলমারিতে কেন।তাহলে কি নিষ্প্রভের জীবণে অন্য মেয়ে ছিলো? না এটা হতে পারে না।যতো বিয়েটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে হোক না কেন তবুও স্বামী ত।

নিষ্প্রভ তুরের মুখে এক্সপ্রেশন দেখে কিছু একটা আন্দাজ করে বলল,

‘শাড়িটা আমার মায়ের তুমি আবার অন্য কিছু ভেবো না।এমনিতে মহিলা মানুষ একটু বেশি বুঝে।’

নিজের মনের কথা নিষ্প্রভের মুখে শুনে তুর লজ্জায় পড়ে যায়।নিজেকে সামলিয়ে ওয়াসরুমে যায় শাওয়ার নিয়ে শাড়ি পড়ে বের হয়।সে আগে থেকেই শাড়ি পড়তে জানতো তাই কোনো অসুবিধা হয় নি।ভাগ্গিস জানতো নয়তো এই পরিস্থিতিতে সে কি করতো? এ বাড়িতে ওর চেনা পরিচিত তেমন কেউ নেই।তুর বের হতেই নিষ্প্রভ সে দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য জমে যায়।তুরকে ভালো ভাবে লক্ষ্য করে ফর্সা শরীরে রাণী গোলাপী শাড়িটা বেশ মানিয়েছে,সাথে কালো ব্লাউজ আরও চোখে লাগছে।ভেজা চুল দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ে ব্লাউজের কিছু অংশ ভিজে পিঠের সাথে লেগে আছে যা আর‌ও আর্কষনীয় করে তুলছে। গোলগাল মুখটা বেশ স্নিগ্ধ দেখতে।

নিষ্প্রভের এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তুরের বেশ অস্বস্তি হয় কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজায় নক পড়ে। নিষ্প্রভ ঘোর থেকে বেড়িয়ে এসে বলে,

‘কে?’

‘বড় ভাইজান আমি সেতারা। খালুজান ডাকে নতুন ভাবিরে নিয়ে নিচে আসেন।’

নিষ্প্রভ তুরকে চল বলেই সে যেতে থাকে।তার পিছন পিছন তুর যায়।যদিও তার ভয় করছে তবুও ত যেতে হবে।নিচে এসে নিষ্প্রভ একটা চেয়ার টেনে তুরকে বসার ইশারা করে সে পাশেরটাই বসে। ইলিয়াস মির্জা তুরকে দেখে নড়েচড়ে বসে আবার খেতে শুরু করে।আশা বেগম দুজনকে এভাবে দেখে রাগে ফুঁসছে।

‘যেভাবেই হোক আমার মান সম্মান ডুবিয়ে বিয়েটা ত করেছ এখন পরিপূর্ণ ভাবে মেয়েটার দায়িত্ব নেও।তুরের জেনো তোমার নামে কোনো অভিযোগ না থাকে এমন ভাবে মেয়েটাকে সব সময় সুখী রাখবে।’

ইলিয়াস মির্জা নিষ্প্রভের উদ্দেশ্য বলল।নিষ্প্রভ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

‘ঠিক আপনি যেমন আপনার স্ত্রীকে রেখেছেন।’

‘চুপ বেয়াদব ছেলে।বাবার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না।’

নিষ্প্রভ আর কিছু বলল না।তুর অবাক চোখে দেখছে এই ছেলে বাবার সাথে কিভাবে কথা বলছে। ইলিয়াস মির্জা তুরের হাতে লাল রঙের একটা বক্স দিয়ে বলল,

‘এটা তোমার মা। নিষ্প্রভের মায়ের ছিলো যা এতোদিন যত্ন করে আমি রেখেছি।এটার উপর শুধু তোমার অধিকার।’

আশা বেগম ভিতরে ভিতরে গর্জে উঠছে।প্রথমে নিষ্প্রভের কথায় তারপর তুরকে এসব দেওয়াতে।তার স্বামী এতো বছর ধরে এসব কোথায় রাখছিলো।সে স্বামীকে এমন ভাবে বস করে নিয়েছে যে,বিয়ের এক সপ্তার মধ্যে‌ই নিষ্প্রভের মায়ের যতো গহণা ছিলো সব নিজের কাছে নিয়েছে।তাহলে এই বাক্স তে কি আছে আর এতো বছর কোথায় রেখেছিল তার স্বামী যা সে জানে না।

আফসান নিচে নেমে এসে তুরের মুখোমুখি চেয়ারে বসে পড়ে।তুরের দিকে তাকিয়ে তাঁর ভেতরের লালসা জেগে উঠে।তুরকে এই রূপে প্রথম দেখলো,আরে গোসল ও করছে।তার পাখিকে কিনা অন্য কেউ উপভোগ করলো। এ হতে পারে না। আফসান বিরবির করে বলল,

‘এক দিনের জন্য হলেও পাখিটাতে তার চাই।’

চলমান।

বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। নিয়মিত গল্প দেয় ছোট্ট করে হলেও মন্তব্য করে যাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here