হৃদয়ের সন্ধিক্ষণ পর্ব ২০

0
68

#হৃদয়ের_সন্ধিক্ষণ
#পর্বঃ২০
#ফারিহা_খান_নোরা

আজ সন্ধ্যা থেকে আকাশ গুড়গুড় করছে। মুহূর্তেই আকাশ ভে’ঙে বৃষ্টি নামল।সময়টা শীতকাল,তুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে অসময়ি বৃষ্টি ছুঁয়ে যাচ্ছে।ছোটবেলা থেকেই তার বৃষ্টি ভালো লাগে। বৃষ্টি হলে স্কুল কামাই করা যেত খুব সহজেই।স্কুল কামাই দিয়ে সে দিনভর কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে যেত। ছোট বেলাটা কি সুন্দর ছিল,দুই বোন কতো খুনসুটি করতো।তুরফার কথা মনে পড়ে তুরের বাড়ির কথা মনে পড়ে যায়।ও বাড়ির সবাই তাকে অবহেলা করছে তা না হলে তাঁর বাবা বেশ কয়দিন হলো বাড়িতে ফিরছে তবুও একটি বারের জন্যও তাঁর খোঁজ নেয় নি।সে অই বাড়ির সবার কাছে এতোটাই পর হয়ে গেছে।এসব ভেবে তুর মুখ ভার করে নিচে নেমে এসে দেখে সিতারা টিভি দেখছে।মেয়েটা সারাদিন টিভিতে বাংলা ছবি দেখে। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে কখন সাকিব খান বের হয়ে ভিলেনদের শায়েস্তা করবে।মেয়েটার পছন্দের নায়ক শাকিব খান। তাঁর একটা ছবিও দেখা মিস করে না।হিরো ফা’ই’ট করলে সিতারা কখনো আগ্রহী হয়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকবে আবার কখনো ঠোঁট গোল করে চেঁ’চি’য়ে বলবে,

‘ব্যাটাকে আরও মা’ই’র দেও ডিশুম ডিশুম করে।কতো বড় সাহস নায়িকা তুলে নিয়ে যায়।’

এই কথা গুলো বলার সাথে সাথে সে দুই হাত দিয়ে ঘু’ষি দেওয়ার এক্সপ্রেশন দেখায়। এই ব্যাপার গুলোর জন্য আশা বেগমের তো’পে’র মুখে পড়তো সে সব সময়।

বাড়িতে তুর আর সিতারা ছাড়া কেউ নেই। টিভিতে এখন বিজ্ঞাপন চলছে। সিতারা তুরকে লক্ষ করে মুখে হাঁসি নিয়ে উৎকণ্ঠার সুরে বলে,

‘নতুন ভাবি আমি ছবি দেহি। আপনে আহেন দুই জন এক লগে দেহি। আর মে’শা নায়িকারে তুইলা ল‌ইয়া গেছে পরে যে কি হয় হের লাইগা ব‌ইয়া আছি আর ইকটু হ‌ইলে শেষ হ‌ইবো তহন রাতের রান্না করমু।’

তুর সিতারার মুখের পানে তাকায়।ভাবে মেয়েটা কতো সরল কতো সহজেই খুশি হয়।শ্যামলা মুখটা মায়াই ভরা।সে ঠোঁটে মিষ্টি হাঁসির রেখা টেনে শান্ত কন্ঠে বলে,

‘সবার জন্য আজ আমি রান্না করবো। তুমি পুরোটা সময় টেলিভিশন দেখো সিতারা।’

সিতারা মাথা ঝাঁকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে বলে,

‘আচ্ছা ধন্যিবাদ নতুন ভাবি’

তুর রান্নাঘরের দিকে যায়।রাতের জন্য তুর খিচুড়ি রান্না করবে। যেহেতু বৃষ্টির সময় সাধারনত বাঙ্গালীরা এ সময়টা খিচুড়ি খেতে পছন্দ করে।এর আগেও তুর এই বাড়িতে খিচুড়ি রান্না করেছিলো কিন্তু আফসানের করা থার্ড ক্লাস কর্ম কান্ডের জন্য সেই খিচুড়ি আর পেটে পড়ে নি তাঁদের দু জনের।তুর জমপেশ খিচুড়ি রান্না করে যা দেখতে বেশ লোভনীয় লাগছে।খিচুড়ির সাথে বেগুন ভাজা, ইলিশ মাছ ভাজা‌ও করে। ইলিয়াস মির্জা একটু আগেই বাড়িতে ফিরেছে।এসে তুরের সাথে টুকটাক কথা বলে উপরে চলে যায়।তুর ডিনার সার্ভ করতে চাইলে তিনি ইতস্তত সুরে বলেন,

‘ছেলেটা ফিরলে আমায় ডেকে দিও ওর সাথেই খাবো।’

তুর লিভিং রুমে কিছুক্ষণ ওয়েট করে। এরমধ্যে কলিং বেল বেজে ওঠে।তুর দ্রুত পায়ে দরজা খুলে এক পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিষ্প্রভ বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে ফিরেছে।বৃষ্টির পানিতে জবুথবু ভেজা মানুষটাকে দেখে তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে সরে নেয় তুর। বৃষ্টির পানি সমস্ত শরীর ভিজে গিয়ে গা চুয়েচুয়ে এখন পানি ঝরছে নিষ্প্রভের ।ডান হাত দিয়ে নিষ্প্রভ নিজের মাথার চুল ঝাড়তে ঝাড়তে তুরের দিকে আড়চোখে তাকায়।তুরকে বেশ ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ভ্রু কুঁচকে নেয়। আশাহত দৃষ্টিতে তুরের দিকে তাকিয়ে ফ্লোরে হাঁটু ঠেকিয়ে জুতার ফিতাগুলো খুলতে থাকে।এই ফাঁকে তুর তোয়ালে নিয়ে হাজির হয়ে।তোয়াল নিষ্প্রভের দিকে বাড়িয়ে বলল,

‘মাথা মুছে নিন।’

তোয়ালে ধরা হাতটায় চোখ বুলিয়ে আবারও জুতা খোলার দিকে মনোযোগ দিল। অভিমানী সুরে বলল,

‘লাগবে না।’

নিষ্প্রভ তুরের সাথে কোনো কথা না বলে, যেতে নিলে তুর ভাবুক কন্ঠে বলে,

‘আজ আপনার কিছু হয়েছে?’

নিষ্প্রভ পায়ের গতি কমিয়ে বলে,

‘কেন বলো তো?’

‘কোন আবার! এই যে কোনো কথা বলছেন না।আশার পরে থেকে কেমন অদ্ভুত ব্যাবহার করছেন।বাবা আপনার সাথে ডিনার করার জন্য সেই কখন থেকে ওয়েট করছে। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে আসুন।’

নিষ্প্রভ এবার তুরের একটু কাছে চলে এসে তাচ্ছিল্য পূর্ণ কন্ঠে বলে,

‘সবার কথায় ভাবো শুধু আমার কথা ছাড়া।’

নিষ্প্রভ প্রস্থান করে তুর তাঁর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ পরে দুষ্টু হাসি দিয়ে বিরবির করে বলে,

‘আমাকে অনেক জ্বালিয়েছেন সাহেব কিছুক্ষণ একটু নিজে জ্বলুন।’

_________________

টেবিলে খাবার সার্ভ করছে তুর।দুই বাবা ছেলে কোনো কথা না বলে রোবটের মতো খেতে শুরু করে। ইলিয়াস মির্জা আদেশের সুরে বললেন,

‘তুমিও আমাদের সাথে খেতে বসে যাও মা।বলেছিলাম না আজ সবাই একসাথে খাবো?’

তুরের আজ একটু তাড়া আছে যার জন্য সেও না করে নি। ইলিয়াস মির্জা তুরের রান্নার বেশ প্রশংসা করলেও নিষ্প্রভ স্থির ভাবে খেতেই আছে তাঁর মুখে কোনো কথা নেই।খাবার পর্ব শেষে ইলিয়াস মির্জা নিষ্প্রভকে অনুরোধ করে,

‘কথা আছে বাবা লিভিং রুমে একটু অপেক্ষা কর।’

এই সুযোগে তুর চট করে সব গুছিয়ে রেখে রুমে চলে আসে। সাহেবের মন খা’রা’পে’র কারণ সে শুরুতেই বুঝতে পেরেছে তবুও না,বোঝার মতো করে ছিলো এতোক্ষণ।নিষ্প্রভের আলমারি থেকে শপিং ব্যাগটা বের করে।ব্যাগ থেকে একটা মেরুন রঙের কাতান শাড়ি বেরিয়ে আসে।শাড়িটা দুই পাশে গোল্ডেন জরি দিয়ে সুক্ষ্ম কাজ করা যা খুব সহজেই মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে।তুর চটপট শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নেয়।চুল আঁচড়ে ছেড়ে দেয়,চোখে হালকা কাজল দেয় আর ঠোঁটে মেরুন রঙেরই লিপস্টিক দিয়ে তার চিকন পাতলা ঠোঁট‌ রাঙিয়ে নেয়।আয়নায় নিজের আদল দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায় তুর।এখন শুধু সাহেবের আশার অপেক্ষা।

___________________

‘বাড়িতে গাড়ি আছে বাবা।গাড়ি থাকতে এভাবে কেন ভিজে এসেছিস তুই?’

নিষ্প্রভ সোফায় বসে সামনে সেন্টার টেবিলে রাখা শো পিস এর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যপূর্ণ কন্ঠে বলে,

‘এর আগেও বহুবার এভাবেই এসেছি তখন তো একবারও এমন কথা বলেন নি?’

ইলিয়াস মির্জা অ’প’রা’ধী সুরে নিষ্প্রভকে বলে,

‘আমার মস্ত বড় ভু’ল হয়ে গেছে বাবা।তুই আমায় ক্ষমা করে দে।আমি সত্যি অন্ধ হয়ে ছিলাম।’

নিষ্প্রভ এবার একটু জোরেই হেঁসে ফেলে। ঠোঁটে মৃদু হাঁসির ছটা টেনে বলে,

‘ফিরিয়ে দিতে পারবেন আমার ছোটবেলাটা? মুছিয়ে দিতে পারবে আমার‌ দুর্বিসহ অতীত।ভুলিয়ে দিতে পারবেন আমার প্রতি করা আপনার সুন্দর অল্পবয়সী স্ত্রীর করা সমস্ত অ’ত্যা’চা’র? পারবেন না,তাই এসব কথা আমার সামনে আর কখনো বলতে আসবেন না।’

ইলিয়াস মির্জার নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। তবুও আকুতির সুরে বললেন,

‘আমি বড় অন্যায় করে ফেলেছি তোর সাথে।জানি এর কোনো ক্ষমা নেই। তোকে আর কখনো বলবো না, আমায় ক্ষমা করতে। কিন্তু তুই আর অন্যের অধীনে চাকুরী করিস না।এই সমস্ত ব্যাবসা আর আমার যা কিছু আছে সব তোর।এখন ব‌উ হয়েছে তাঁর ওর ভরোণ পোষণের সমস্ত দায়িত্ব তোর উপর।তুই ব্যাবসার হাল ধর বাবা।’

নিষ্প্রভ অবজ্ঞার সুরে বলে,

‘এতো দিন না জানতাম? এই ব্যাবসা এই বাড়ি সব আফসানের তাহলে আজ কেন আমার হচ্ছে? আপনি বরং একটা কাজ করুণ এই সমস্ত কিছু আফসান ও আপনার শখের ব‌উকে লিখিয়ে দিন। লিখিয়ে দেওয়ার আগে বলবেন আমি আমার ব‌উকে নিয়ে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো।’

নিষ্প্রোভ এক নাগাড়ে এসব বলে গটগট পায়ে উপরে যেতে নেয় একটু পিছনে ফিরে সুক্ষ্ম কায়দায় বলল,

‘আমার ব‌উকে আমি এমন বিলাসীতায় রাখব না।যে বিলাসীতা পেলে অন্য পুরুষের কাছে যেতেও দুই দন্ড ভাববে না।’

ইলিয়াস মির্জার কলিজায় খচ করে উঠে কথাটি।নিজেকে কাপুরুষের সমতুল্য মনে হচ্ছে।

______________________

নিষ্প্রোভ রুমে চলে আসে।ভেতরে ভেতরে রে’গে ফেটে প’ড়ে সে।প্রথমতো তুর তাকে আগ্রহ করেছে, দ্বিতীয় ইলিয়াস মির্জার এসব অবান্তর কথা তার মোটেও সহ্য হচ্ছে না।খুব তো ব‌উয়ের আঁচলা ধরে থাকতেন।ব‌উ তো এখন জে’লে, সেখানে গেলেই হয়। এতোদিনে মনে পড়লো তাঁর ছেলের কথা।শা’লার দুনিয়াটার স্বার্থপর এসব ভাবতে ভাবতে সামনে তাকিয়ে মোমের আলোয় মায়াবতীকে দেখে থমকে যায় নিষ্প্রভ। নেশাগ্রস্ত ভাবে তাকিয়ে থাকে। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুরুষালী হরমোন শিরশির করে জানান দিচ্ছে।এই মেয়েটার কাছে এলেই কেন সমস্ত কিছু ভুলতে বসে নিষ্প্রভ?

মোহগ্রস্ত নয়নে বিছানায় তুরের পাশে যেয়ে বসে নিষ্প্রভ।তার মুখে কোনো কথা নেই তবে চোখর দৃষ্টি দিয়ে তুরকে ঘায়েল করে।তুরের মাথা টা বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ে নিষ্প্রভ।এতোদিন একসাথে ঘুমালেও আজকের অনুভূতি তীব্র। দুজনের মাঝে তেমন দূরত্ব নেই বললেই চলে। নিষ্প্রোভ তুরের পিঠে এক হাত রাখে অন্য হাত তার মাথা বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলে,

‘তুমি আমায় ক্ষমা করেছো?’

‘হু।’

‘তুমি আমাকে নিজের করে চাও না?’

কন্ঠনালী রোধ হয়ে আসে তুরের। নিষ্প্রোভ আরও খানিকটা তুরকে জড়িয়ে ধরে। এতোদিনের জমে থাকা দূরত্ব ঘুচতে থাকে।তুর আবেগী হয়ে উত্তর দেয়,

‘আমি আপনাকে নিজের করে চাই নিষ্প্রভ।একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ঠিক যেমন করে পেয়ে থাকে।’

হাসি বিস্তৃত হয় নিষ্প্রভের। সে গায়ের টি-শার্ট খুলে ফেলে। অবাধ্য হাতে ছুঁয়ে দেয় স্বীয় স্ত্রীর শরীরের প্রতিটি জায়গা,এক চিলতেও খালি রাখে না। শরীরের সমস্ত ভার তুরের উপর দিয়ে অজস্র চুমু দিতে থাকে মুখে, গলায়, বুকে বিশেষ করে বুকের একটু নিচে তিলটাই। চুম্বন গুলো ধীরে ধীরে কা’ম’ড়ে পরিণত হয়।রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছেয়ে যায় পূর্ণতা।বেসামাল মানুষটার স্পর্শ অজানা আনন্দ দেয় তুরকে।আজানা সুখে হারিয়ে যায় সে দুই হাত দিয়ে নিষ্প্রভের পিঠ খামচে ধরে তুর।ক্ষনে ক্ষনে গুঙ্গিয়ে উঠে সে।তার ঠোঁট দুটো নিষ্প্রভের দখলে।তুরের চোখের কার্নিশ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু নির্গত হয়।যা ছিলো সুখের অশ্রু।তবুও প্রথমবার কাছাকাছি আসায় তুরের অবস্থা বেশ নাজুক।এক সময় তুর নিস্তেজ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে।

চলমান।

বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।গল্পটা একদম শেষের দিকে সেজন্য তাড়াহুড়ো করে লিখতে যেয়ে গল্পটা অগোছালো করতে চাইছি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here