হৃদয়ের সন্ধিক্ষণ পর্ব ১২

0
62

#হৃদয়ের_সন্ধিক্ষণ
#পর্বঃ১২
#ফারিহা_খান_নোরা
‘তুষার ভাইয়া হঠাৎ করে কাউকে না বলে পাহাড়ি এলাকার একটি মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে।’

তুরফার কথায় চোখ কোটরে থেকে বেরিয়ে আসে তুরের।তখন আতিয়ার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে তুরফা এসে তুরকে জরিয়ে ধরে।দুই বোনের সেই কি কান্না।এসবের এক পর্যায়ে তুরফা এমন একটা কথা বলে বসে।তুর অবাক হয়ে বলে,

‘এসব কি বলছো আপু। অসম্ভব!তুষার ভাই নাকি কোনো দিন ও বিয়ে করবে না। সারাজীবন দেবদাস হয়ে বন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবে।’

‘সব সম্ভব।এই তার দেবদাস হবার নমুনা শুনলিই তো।’

তুর উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,

‘বাড়িতে এখন কি অবস্থা?’

‘তোর কি মনে হয় মা মেনে নেওয়ার মতো মানুষ? বাড়িতে সব সময় অশান্তি লেগেই আছে।মায়ের কথা বিয়ে যখন করবিই পাহাড়ী মেয়েকে কেন বিয়ে করলি। বাংলাদেশে আর কোনো মেয়ে ছিলো না? আর তুষার ভাইয়ার কথা, ভালো লেগেছে বিয়ে করেছি মানিয়ে নেওয়ার হলে মানিয়ে নেও নয়তো বলে দেও ব‌উকে নিয়ে বেরিয়ে যাবো।এসব নিয়ে প্রতিদিন লগে প’ড়’ছে মা ছেলে।’

তুর এবার হেসে বলে,

‘সবাই তো আর তুরের মতো নয়।যার যা ইচ্ছে হয় জো’র করে চাপিয়ে দিবে। তুষার ভাইয়া ঠিক কাজ করেছে।একেই বলে সুযোগে সৎ ব্যাবহার।’

‘হ্যা ঠিক বলেছিস‌,জানিস বাবা এসেছে।’

তুর মন খারাপ করে বলে,

‘বাবা কি আমার উপর রে’গে আছে?’

তুরফা তুরকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

‘জানিস বাবা অনেক রে’গে গেছে এমনকি মায়ের গা’য়ে হা’ত অবধি তুলেছে।’

‘কি বলো!’

তুরকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা দেখে তুরফা সেদিনের ঘটে যাওয়া সব কিছু বলে দেয়। তার সাথে বলে,

‘বাবা বলেছে তোর আর নিষ্প্রভের ডিভোর্স করিয়ে দিবে। কিন্তু তুষার ভাইয়ার এসব ঝামেলায় তিনি এদিকটা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তবুও বাবা কয়দিন হলো হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে যায়।কাউকে না বলে কোথায় যায় আমার কেন জানি সন্দেহ লাগে বাবাকে।’

তুর তুরফার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।সে রে’গে যায় এই ডিভোর্স নিয়ে সবাই কি শুরু করছে। সবাই বিয়ে করে দুটো মানুষ সারাজীবন একসাথে থাকার জন্য আর তার বিয়ের পর থেকেই সবাই আলাদা করতে ডিভোর্স নিয়ে উঠে প’ড়ে লে’গে’ছে।কেন রে ভাই!বিয়ে যখন একবার হয়ে গেছেই তখন এতো কাহিনী কেন?

তুর তুরফার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে,

‘সবাই ডিভোর্স নিয়ে কি শুরু করছে।’

তুরফা অবাক হয়ে বলে,

‘সবাই মানে আর কে বলেছে?’

তুর আশা বেগমের কথা বলে দেয় তার সাথে নিষ্প্রভ কে ছা’ড়’তে টাকা স্বর্ণ অফার করার কথাও বলে।সব শুনে তুরফা রে’গে যেয়ে বলে,

‘ এই মা ও মায়ের বান্ধবী ও না,এই দুইজন কিন্তু খুব সাং’ঘা’তি’ক।এরা নিজের ভালো ছাড়া কিছুই বুঝে না। খবরদার তুই ওদের কথা শুনে নিষ্প্রভ কে ছে’ড়ে দেওয়ার কথা ভুলেও চিন্তা করবি না।’

তুর অসহায় কন্ঠে বলে,

‘নিষ্প্রভ ও চায়।’

‘মানে কি?’

তুর সব ঘটনা বলে দেয়। তুরফা মনোযগ দিয়ে শুনে কিছু একটা ভেবে বলে,

‘নিষ্প্রভ ভালো ছেলে আমি ওর খোঁজ নিয়েছি তাঁর প্রেম ভালোবাসার কোনো রে’ক’র্ড নেই।ছেলে হিসাবে খুব ভালো। তুই ওর মন বোঝার চেষ্টা কর আমার মনে হয় সে তোকে মন থেকে এসব বলে নি।হতে পারে সে তোকে এই দুই মহিলার থেকে প্রটেক্ট করতেই এসব বলছে কিন্তু সে তো আর জানে না,তার ডিসিশন পুরাপুরি ভুল।তুই ওর কথা না শুনে নিষ্প্রভ কে আপন করার চেষ্টা কর দেখবি অনেক ভালো থাকবি।’

‘তুই এতো কিছু জানলি কি করে?’

তুরফা কোনো উত্তর দিতে পারে না। তুরফার চুপ থাকা দেখে তুর আগ্রহ নিয়ে আবার বলতে শুরু করে,

‘আপু জানিস আমাদের বিয়ের দিনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা আতিয়ার সাথে শেয়ার করেছি। আতিয়া বলেছে এ সব কিছু কাকতালীয় না।মা,আফসান ও তাঁর মায়ের প্ল্যান হতে পারে।যদি এমন কিছু হয় তাহলে আমি আমার মায়ের মুখ কখনো দেখতে চাই না।এটাও বলেছে নিষ্প্রভ আর আমার বিয়ের পিছনে তৃতীয় কারো হাত আছে।তোর কি মনে হয়?’

তুরের প্রশ্নের জবাবে তুরফা কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে তুরের হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলে,

‘এটা রাখ এই ব্যাগে তোর ফোন আর কিছু দরকারি জিনিস আছে। কিছু টাকাও দিয়েছি তোর প্রয়োজনে লাগতে পারে।আজ আসি রে আমার একটুও সময় নেই টিউশন আছে।দেরি হলে সমস্যা হবে,এমনি এই কয়দিন তোর খোঁজে প্রতিদিন ই কলেজে এসেছি কিন্তু তোকে পাই নি।’

‘আরে আপু…

তুরের পুরো কথা শেষ হবার আগেই তুরফা হন্তদন্ত হয়ে চলে যায়।তুর বিরবির করে বলে এর আবার কি হলো।

_________________________

কলেজের মেইন গেটে নিষ্প্রভের জন্য দাঁড়িয়ে আছে তুর। তুরফার আসার পর পরই আতিয়া চলে গেছে বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে।যার ফলে কারো আজ ক্লাস করা হয় নি।তুর অন্য মনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছে হঠাৎ একটা পিচ্চি এসে বলে,

‘আপু।’

তুর একটু হেঁসে বলে,

‘জি।’

পিচ্চিটা কোনো কথা না বলেই তুরের হাতে একটা লাল গোলাপ গুঁজে দিয়ে দৌড় দেয়।তুর অবাক হয়ে একবার পিচ্চিটার দৌড়ের দিকে দেখে আর একবার নিজের হাতের মুঠোয় গুঁজে থাকে ফুলের দিকে দেখে।তুর চেঁ’চি’য়ে বলে,

‘এই পিচ্চি শোনো,এই ফুল আমাকে দিলে কেন?’

‘আপনাকে দিতে বলেছে আপু।’

‘কে দিতে বলেছে?’

পিচ্চিটা দৌড়াতে দৌড়াতে পিছনে তাকিয়ে বলে,

‘ভাইয়া।’

বলেই চলে যায়।তুর ফুলের দিকে তাকিয়ে রে’গে যায়।এসব কি ছেলে মানুষি,রা’গে’র বশে ফুলটা ছুঁ’ড়ে ফেলে যা গিয়ে পড়ে নিষ্প্রভের মুখের উপর।তুর এটা দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে যায় মনে মনে বলে এটা কি হলো!

‘নিষ্প্রভ মাত্র‌ই এসে বাইকটা ব্রেক করে সেই মুহূর্তে তাঁর মুখের উপর তুরের ছুঁ’ড়ে দেওয়া গোলাপ এসে প’ড়ে।সে অবাক হয়ে তুরের দিকে তাকায়।তুর মনে মনে ঢুক গিলে।নিষ্প্রভ ফুলটা নিয়ে তুরের কাছে যায়। তাঁর দিকে খানিকটা ঝুকে ভ্রু কুঁচকে বলে,

‘আজকাল কি ফুল ছুঁ’ড়ে দিয়ে প্রপোজ করা ট্রেন্ড চলছে নাকি।’

তুর আমতা আমতা করে বলে,

‘না আসলে…’

নিষ্প্রভ হেসে বলে,

‘আসলটাই তো শুনতে চাইছি নকল দিয়ে আমার কাজ নাই।’

তুর ঢুক গিলে বাচ্চাটার কথা বলে দেয় তবে কোন ভাইয়া দিতে বলছে সেইটা স্কিপ করে কারণ পরে যদি নিষ্প্রভ তাকে ভুল বুঝে এমনি তাদের সম্পর্কে ঝামেলার কমতি নেই। নতুন করে ঝামেলা সে চায় না।

নিষ্প্রভ হেঁসে উঠে।হাসতে হাসতে বলে,

‘একটা বাচ্চা ছেলে আমার ব‌উকে ফুল দিয়ে প্রপোজ করে আর আমি বিয়ে করে এখনও করতে পারলাম না।’

নিষ্প্রভের মুখে ব‌উ ডাক শুনে তুরের পুরো শরীর শিহরিত হয়।সে লজ্জায় নুয়ে পড়ে।

______________________

আশা বেগম তুরকে যা মুখে আসছে সেটা বলেই গা’লি দিচ্ছে,পাশে দাঁড়িয়ে সিতারা বেশ মজা করে মনযোগ দিয়েই শুনছে।গা’লি শুনতে তার বেশ ভালোই লাগছে কিন্তু তুরকে দিচ্ছে এটা সে মানতে পারছে না। সেজন্য সিতারা আগ্রহের সহিত আশা বেগম কে বলে,

‘আম্মা আপনার যদি গা’লি দিতেই হয় তাহলে অন্য কারো নামে দেন। এমনিতেই আপনার গা’লি গুলা শুনতে আমার ভালই লাগছে কিন্তু নতুন ভাবিকে
দিয়েন না। নতুন ভাবি কি সুন্দর আমি তার অনেক ভালা পাই একদম আপনার গা’লির মতো।’

সিতারার কথা শুনে আশা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এই কে রে কোথায় থেকে আসছে।গা’লি শুনতে কারো ভালো লাগে!কেউ কাউকে গা’লির মতো ভালোবাসতে পারে।কি বলছে এই মেয়ে,পাগল নাকি? আশা বেগম রুক্ষ কন্ঠে বলে,

‘আমি কাকে গা’লি দিবো না দিবো তোর থেকে শুনতে হবে।আর কি জেনো বললি তুই তুর কে আমার গা’লির মতো ভালোবাসিস।এই গা’লি’র মতো কাউকে ভালোবাসা যায় ম’শ’ক’রা করিস আমার সাথে?’

সিতারা এবার প্রফুল্ল সহকারে বলে,

‘যায় তো আম্মা শুধু নতুন ভাবিরে না,এখনি আমারে বিয়া দেন আমি আমার জামাইকেও গা’লি’র মতো ভালোবাসুম।’

আশা বেগম এবার রে’গে সিতারার দিকে তে’ড়ে যেয়ে বলে,

‘ফ‌ইন্নির বাচ্চা যা আমার চোখের সামনে থেকে।পাগল কোথাকার সে আবার বিয়ে করবে! তোকে এই বাড়ি থেকে ঘা’ড় ধা’ক্কা দিয়ে বে’র করে দিবো তখন রাস্তায় বসে থেকে মানুষদের গা’লি’র মতো ভালোবাসা শিখাস।’

সিতারা কিছু টা ঘা’ব’ড়ে যায় ।মনে মনে ভাবে সে খা’রা’প কি বলেছে।সে মিনমিন করে বলে,

‘আমি ফ‌ইন্নি হলেও আমার ভালোবাসা খাটি এই তাঁর প্রমাণ।আপনরা বড়লোক মানুষ তয় আপনাদের ভালোবাসায় ভেজাল আছে।’

আশা বেগম ঝা’ড়ু খোঁজে হাতের কাছে পেয়ে সিতারার গায়ে দুই তিনটা মা’র দিয়ে রা’গে গজগজ করতে করতে বলে,

‘ছোটলোকের বাচ্চা আজকেই তোকে বাড়ি থেকে বে’র করে দিবো।’

সিতারা ভয়ে দৌড় দেয়।আশা বেগম ঝা’ড়ু ফেলে দিয়ে বলে,

‘এই বু’ড়ো আমাকে কখনোই শান্তি দিবে না।এইটারে যে কোন জঙ্গল থেকে তুলে এনেছে আল্লাহ ভালো জানেন।এখানে এসে ছে’ড়ে দিয়েছে, আমি তো আছিই গাধা পিটিয়ে মানুষ করতে।’

এসবের মাঝে সদর দরজা দিয়ে তুর ভেতরে প্রবেশ করে।তরকে দেখে আশা বেগমের জ্ব’ল উঠা রা’গ দ্বিগুন হয়ে যায়।তুর উপরে উঠতে নিলে আশা বেগম গজরাতে গজরাতে বলে,

‘সারাদিন বাহিরে থাকলে হবে, তোমার কি কোনো কাজ কাম নাই। তোমার তো লজ্জা নেই তা জানি কিন্তু নিষ্প্রভ তোমাকে বিয়ে করে সেও কি তোমার মতো হলো।সারাদিন ব‌উ নিয়ে চিপকে চিপকে থাকতে লজ্জাও করে না।’

‘নিজের ব‌উ এর সাথে চিপকে থাকলে লজ্জা করতে হয়।পাশের বাড়ির করিমের ব‌উ এর সাথে চিপকে থাকলে বুজি লজ্জা করতে হয় না?’

চলমান।

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। নতুন বছর সবার জন্য জেনো আনন্দময় হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here