সূর্যোদয় পর্ব ৭

0
51

#সূর্যোদয়
#পর্ব_০৭
#কারিমা_দিলশাদ

১৫.
রাতের বেলায় ঐশীর বাবা এলে রেহানা বেগম সব কথা তাকে জানায়। ঐশীর বাবা ততটা রিয়েক্ট করে নি। আসলে তিনিও ঐশীর বড়খালাকে একদম পছন্দ করে না। তবুও বেশ অনেকক্ষন অমুকের ছেলে বড় অফিসে চাকরি করে তমুকের মেয়েকে ডাক্তারি পড়ে এসব নিয়ে উদাহরণ দেয়। ঐশী তার রুম থেকেই কথাগুলো শুনতে পায়। তবে কোনো রিয়েক্ট করে না। কিইবা রিয়েক্ট করার আছে তার?

রাতের বেলা যখন সবাই শুয়ে পড়ে ঐশী তখন নিজের রুমে বিছানায় শুয়ে একদৃষ্টিতে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। একবারভাবে ঝুলে পড়বে নাকি, আবার ভাবে না ফাঁ*স নিলে কষ্ট হবে। আবার ভাবে ঘুমের ওষুধ খাবে। একপর্যায়ে উঠে বসে হাতে একটা ঘুমের ওষুধের ফাইল নেয়। এডমিশন টাইমে প্রথমবার মেডিকেল ফেইলরের পর থেকেই যখন তার বাবা মা, বিশেষ করে মা প্রচন্ড অ’ত্যাচার শুরু করলো। তখন থেকেই রাতে তার ঘুম হতো না। অথচ সে ভীষণ ঘুমকাতুরে মানুষ। রাত নয়টার পর তার চোখ খুলে রাখাই দায় হয়ে যেত। সেই ঐশীরই নাকি ঘুম আসতো না। তখন থেকে প্রায় প্রতিদিনই ঘুমের ওষুধ খেতো। এরপর আস্তে আস্তে কমিয়ে দিলেও, এখনও মাঝে মাঝে নেয়। তাই তার কাছে ঘুমের ওষুধ থাকেই। যা তার বাবা মা জানে না।

কিছুক্ষণ হাতে ওষুধ নিয়ে বসে থাকার পর ভাবে। ম’রতে যাব কার জন্য? যারা বিয়ে করে দ্বায়ে পড়ে বাচ্চা জন্ম দেয় তাদের জন্য? কারণ বাচ্চা নাহলে তো সমাজে বা’জা, অক্ষম বলে আখ্যায়িত হবে। সেই দ্বায় থেকে কিংবা সংসার বাঁচাতে নিজেদের প্রয়োজনে বাচ্চা নেয়।

আমাদের সমাজে তো একটা ওষুধ আছেই। ছেলে বাইরে বাইরে থাকে বিয়ে দিয়ে দাও, মেয়ে সংসারী না সারাক্ষণ কিছু ভালো লাগে না ভালো লাগে না করে বিয়ে দিয়ে দাও। বিয়ে হওয়ার পর— ছেলে সংসারী না, বাচ্চা নিয়ে নাও সব ঠিক হয়ে যাবে। ছেলের নারী নে’শা আছে বাচ্চা নিয়ে নাও সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘরে একলা একলা লাগে, বাচ্চা নিয়ে নাও সময় কে’টে যাবে। সব রোগের একটাই সমাধান বিয়ে আর বাচ্চা। সেভাবেই এখন বাচ্চার জন্ম হয়। মা বাবা হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা থেকে বাচ্চার জন্ম এখন কেউ দেয় না।

বাচ্চাকে স্কুলে দেওয়ার পর থেকেই রোল নাম্বার এক হতে হবে। নাহলে লোক সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। এসব বলে বলে সন্তানের ভবিষ্যতের নাম করে নিজেদের শখ, আহ্লাদ, ইচ্ছে, গর্ব পূরণ করার জন্য বাচ্চাদের উপর যারা প্রেশার দেয় সেরকম মানুষদের জন্য ম’রার প্রশ্নই আসে না।
তারা মনে করে সন্তানকে ভালো খাবার পোশাক দিলেই সন্তান সব পারবে, সব পারতে এবং করতে তারা বাধ্য। সন্তানের ভরণপোষণ, খাওয়া, কাপড়চোপড় দিতে তো বাবা মা বাধ্য। যদি তা দিতে অপারগ হয় কিংবা দেওয়াটা যদি সন্তানের মহা ভাগ্য মনে করে থাকে এমন দম্পতির সন্তান না নেওয়ায় উচিত। সন্তান কেবল অনেক বড় দায়িত্ব না একটা আবেগের নাম। সন্তানকে কেবল খাবার, কাপড়চোপড়, সুযোগ সুবিধা দেওয়াই বাবা মা’র দায়িত্ব কর্তব্য না। তাদের খারাপ সময়ে পাশে দাড়ানো, তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার দাম দেওয়াও বাবা মা’র দায়িত্ব কর্তব্য। তেমনি সন্তানদেরও দায়িত্ব কর্তব্য।

ঐশী কখনো তার খারাপ সময়ে তার বাবা মাকে পাশে পায় নি। মায়েরা নাকি সন্তানের মুখ দেখেই সব বলে দিতে পারে। অথচ সে যদি ঘরে ম’রে পরেও থাকে তার মা বলতে পারবে না। ঐশীর বাবা বেশ ভালো ইনকাম করলেও দরকারি জিনিসগুলো সে কখনো প্রয়োজনের সময় পায় না। এমন না যে তার বাবার ওই সময় দেওয়ার সামর্থ্য বা সুযোগ নেই। এদিক দিয়ে ঐশী খুব বোঝদার। যখন দেখে তার বাবার কাছে টাকা আছে এবং তার দরকারি জিনিসটা দেওয়ার মতো সামর্থ্য তার বাবার আছে সে তখনই কেবল কোনোকিছু চায়। কিন্তু তার বাবা আজ দিচ্ছি কাল দিচ্ছি করে এমন সময় দেয় যখন জিনিসটা তার আর কোনো কাজে আসবে না। প্রয়োজনে একটা জিনিস না পেলে ওই জিনিসটা অপ্রয়োজনে দশটা দিলেও তো লাভ নেই। আর তাছাড়াও ঐশীর তেমন কোনো চাহিদা কোনো কালেই ছিল না। মেয়েলি জিনিসপত্র যেমন কসমেটিকস এসব সে কোনো কালেই কিনে না। দুই ঈদে কাপড় দিলে দিল না দিলে নাই। এসব নিয়েও তার তেমন মাথাব্যথা নেই। তবে দরকারি জিনিসগুলোও যখন সাধ্য থাকতে তপস্যা করে পেতে হয় তাহলে বাপের সেই সামর্থ্য থেকেই কি লাভ।
মেয়েদের শখ পূরণ করার একটাই জায়গা। বাবা মা। সেখানেই যদি কোনো মেয়ে তার শখ আহ্লাদ পূরণ না করতে পারে, তাহলে জামাইয়ের কাছ থেকে আশা করাটা বিলাসিতা।

ঐশীর একটা ইচ্ছা ছিল। আত্মনির্ভরশীল হয়ে প্রথম স্যালারীর টাকা দিয়ে বাবা মাকে তাদের পছন্দের কিছু কিনে দিবে। তবে তিক্ততা এখন এতোটা বেড়ে গেছে যে এখন তাদের নিয়ে ভাবতেও ইচ্ছে করে না।

এসব কথা চিন্তা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঐশী। ওষুধের ফাইল থেকে একটা ওষুধ বের করে খেয়ে নেয়। এরপর মশারী টাঙিয়ে শুয়ে পড়ে। আর ঠিক করে নেয়। জা’হান্নামে যাক বাপ মা। সে কেবল নিজেকে নিয়ে ভাববে। নিজের খুশির জন্য বাঁচবে। নিজেকে ভালো রাখতে বাঁচবে। তাকে তার জন্য কিছু করতে হবে। বে’য়াদব বে’পরোয়ার তকমা যখন লেগেই গেছে তখন আর কে কি বললো বা কে কি বলবে তা নিয়ে আর মাথা ঘামাবে না। যা করার তাকেই তো করতে হবে আজ অথবা কাল। কাল থেকে নতুন কিছুর শুরু হবে। নতুন কিছুর চিন্তা করতে করতে ওষুধের প্রভাবে ঘুমে ত’লিয়ে যায় ঐশী।

১৬.

পেরিয়ে গেছে আরও দুইটা মাস৷ বদলেছে দিন বদলেছে সময়৷ বদলে গেছে ঐশীও। নতুন কিছুর সূচনায় বদ্ধ পরিপক্ব ঐশী।

সেদিন রাতের করা প্রতিজ্ঞা রেখেছে ঐশী৷ ঐশী আগে সপ্তাহে তিনটা টিউশনি করাতো। তার মধ্যে একটা নাচের টিউশনি ছিল। একটা পিচ্চি মেয়েকে নাচ শিখাতো। সেই পিচ্চির অভিভাবক তাকে বেশ অনেকবার বলেছে তার মেয়ের কিছু ফ্রেন্ডও নাচ শিখতে আগ্রহী ঐশীর কাছে। কিন্তু সময় না থাকার কারণে সে আর আগায় নি। যেহেতু তার এই টিউশনির কথাগুলো তার পরিবার জানে না। কলেজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে টিউশনি করাতো।

ন্যাশনালে পড়ার এই একটা সুবিধা। নিয়মিত ক্লাস করা লাগে না। ‘লাগে না’ না বলে, বলা ভালো তেমন কেউ করে না। তাই সেই সময়টা সে টিউশনি করাতে পারে। যেহেতু তারও ক্লাস সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। তাই এই উইয়ার্ড টাইমিং এ তেমন টিউশনি সে পেত না। হয় এক বিকালে নাহয় সন্ধ্যায় পাওয়া যায়। আর তাই সে আদ্রিকার বাকি ফ্রেন্ডগুলোকে আসলে নিতে পারে নি। আদ্রিকা তার নাচের স্টুডেন্ট।

তবে সেদিনের পর ঐশী আদ্রিকার মা’র সহায়তায় যারা যারা নাচ শিখতে আগ্রহী তাদের নিয়ে একটা ব্যাচ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই রাতের পরে সে ডান্স ক্লাস খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে তার নাচের শখটাও ঠিক থাকলো সাবলম্বীও হতে পারলো।

আদ্রিকার মা’র সহায়তায় সে আদ্রিকা বাদে আরও চারজন স্টুডেন্ট পায়। ঠিক হয় তাদেরকে বিকাল তিনটার পর নাচ শিখাতে হবে। এবার আর ঐশী লুকোচুরি না করে সাফ সাফ তার বাবা মাকে ডান্স ক্লাসের কথা বলে দেয়। যথারীতি তার বাবা মা নারাজ। মেয়ে বড় হয়েছে এখন আর এসব নাচানাচি করা যাবে না। তাকে তো তারা কোনো অভাবে রাখে নি। কিন্তু ঐশী তার সিদ্ধান্তে অনড়। বাবার ধমক মায়ের মা’রেও এবার আর থামে নি সে।

শুরু করে দেয় ডান্স ক্লাস। ফ্রেন্ড’দের সহায়তায় একটা ছোট্ট রুম ভাড়া নেয়। সেখান থেকেই শুরু হয় ‘নৃত্যশৈলী একাডেমি’। ক্লাসের পর দুইটা টিউশনি আর বিকালে নৃত্যশৈলী। টিউশনি দুটো ছাড়ে নি ঐশী। নাহলে দেখা যায় ডান্স ক্লাসের রুম ভাড়া দিয়ে তার হাতে আর তেমন কিছু থাকে না। তাই টিউশনিগুলো চালিয়ে যায়।

এখন অবশ্য বেশ ভালো চলছে। পাঁচজন থেকে এখন ১২ জন স্টুডেন্ট তার। এখন আর টিউশনিগুলো করার প্রয়োজন পড়ে না তার। ডান্স স্কুল থেকেই বেশ ভালো আয় হয় ৷ তাই ঠিক করেছে এই মাস থেকে একটা টিউশনি ছেড়ে দিবে।

কলেজে আজ নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কলেজ ক্যাটাগরির। ঐশীর জন্য আজকের দিনটা অনেক স্পেশাল। তার ডান্স ক্লাসের স্টুডেন্টদের মধ্যে তার কলেজেরও কিছু স্টুডেন্ট আছে। তারা ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের। আজকের অনুষ্ঠানে তাদের একটা ডান্স পারফরম্যান্স থাকছে। তা নিয়েই ঐশী খুব এক্সাইটেড।
শাড়ি পড়ে রেডি হয়ে ঐশী বেরিয়ে পড়ে কলেজের উদ্দেশ্য।

#ক্রমশ……..

(কপি করা সম্পূর্ণরুপে নিষেধ। তবে শেয়ার করতে পারেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here