সূর্যোদয় পর্ব ৪৪

0
80

#সূর্যোদয়
#পর্ব_৪৪
#কারিমা_দিলশাদ

১৪৭.

ঐশী বিরক্তি নিয়ে পার্লারে বসে আছে। এই প্রথম সে পার্লারে এসেছে। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে তার৷ অথচ বাকিরা কত কমফোর্টেবল। এই যে স্মৃতি আর শ্রাবণী ওরাই তো বেশ কমফোর্টেবল। পার্লারের মেইন বিউটিশিয়ান এখনো আসে নি। উনিই নাকি ঐশীর মেক-আপ করবেন। তিনি আসতে দেরি হবে দেখে শ্রাবণী ঐশীকে জোর করে ম্যানিকিউর-পেডিকিউর করতে বসিয়ে দিয়েছে।

যেই মেয়েটা ঐশীকে এসব করে দিচ্ছে ঐশী তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছে মানুষ দ্বায়ে পড়ে কতকিছুই না করে। এরা নিশ্চয়ই খুব শখ করে এসব করছে না। কার অন্যের হাত পা ঘষার এতো শখ হবে। আরও বেশ কিছুক্ষণ পর মেইন বিউটিশিয়ান আসে। উনারই পার্লার এটা৷ খুব মিশুক একজন মানুষ। লেইট করার জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন অনেক। যখন সাজানো শুরু করবে তখন ঐশী বলে,

“ আপু একদম লাইট মেক-আপ করবেন। যেটা না করলে না হয় আরকি আসলে…..” – ঐশীকে শেষ করতে না দিয়ে উনি বলেন,

“ আপনি একদম চিন্তা করবেন না আপু। ভাইয়া আমাকে সব বুঝিয়ে দিয়েছে। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।”

ঐশী আর কিছু বলে না। অনেকক্ষণ পর উনি সাজাতে সাজাতে বলেন,

“ আপনি অনেক লাকি আপু। ভাইয়া আপনাকে খুব ভালোবাসে আর কেয়ারও করে। ভাইয়া বারবার করে বলে দিয়েছে তার বউকে যেন মেকআপ দিয়ে একদম ভুত না সাজাই। তার বউ এমনেই সুন্দরী।” – ঐশী উনার কথা শুনছে আর ভাবছে লোকটা কি এভাবেই বউ বউ করে বলেছে? বলতেও পারে। এই লোকের মাথায় তো আবার ছিট আছে।

ঐশীর সাজ কমপ্লিট। সাদা স্টোনের ব্লাউজ, সাদা স্টোনের কাজ করা লেহেঙ্গা। লেহেঙ্গার নিচের দিকে লাল ফুলেল ডিজাইন করা। সাদা ডিজাইনার উড়নাটা শাড়ির মতো ভাজ করে পড়ানো। হাতে,কানে,গলায়, মাথায় সাদা স্টোনের জুয়েলারি। মাথায় সাদা উড়না। সবই জয়ের পছন্দ। খোঁপায় একগাদা বেলি ফুলের মালা প্যাচানো, ঠোটে লাল লিপস্টিক, চোখে কাজল আর একদম হালকা মেক-আপে আসমান থেকে নেমে আসা কোনো পরী মনে হচ্ছে ঐশীকে।

মেক-আপ প্রকৃতপক্ষে কাউকে সুন্দর বানায় না। মেক-আপের প্রকৃত অর্থ নিজের সৌন্দর্যটাকে একটু হাইলাইট করা। কিন্তু বিষয়টাকে মানুষ অন্যভাবে ব্যবহার করে। মেকআপ দিয়ে এখন একটা মানুষের মুখটায় বদলে দেওয়া হয়। মেক-আপ তুলে ফেললে ওই মানুষটাকে আর মেক-আপ করা মানুষটার মাঝে রাতদিন তফাৎ পাওয়া যাবে।

১৪৮.

পুরো কমিউনিটি সেন্টার জুড়ে মানুষ। জয় তার কর্মস্থলের প্রায় সবাইকেই ইনভাইট করেছে। কলিগ, সিনিয়র, জুনিয়র, শুভাকাঙ্ক্ষী কাউকে বাদ রাখে নি। ইলোরা ইয়াসমিনও তার ভার্সিটির কলিগদের দাওয়াত করেছে। সেন্টার জুড়ে হাই প্রোফাইল লোকজনের আনাগোনা। ঐশীর বাবার বাড়ির পক্ষ থেকেও বেশ লোকজন আছে। রিসিপশন হলেও দুই পরিবার মিলেই আয়োজন করেছে। বিয়েটা জাঁকজমকহীন ছিল। কিন্তু সামাজিক স্বীকৃতি স্বরূপ রিসিপশন নাকি করতেই হবে। এতে কোনো বারণ শুনে নি ইলোরা ইয়াসমিন এবং ঐশীর বাড়ির লোক। তাই ঐশীর কথায় দুই পরিবার মিলে রিসিপশনের আয়োজন করেছে। যেন বরপক্ষের উপর এককভাবে চাপ না পড়ে।

বেশিরভাগ আমন্ত্রিত অতিথিই এসে পড়েছে। কিন্তু বউয়ের আসার কোনো খবর নেই। জয় ঐশীর জন্য কমিউনিটি সেন্টারের দোরগোড়ায় অপেক্ষা করছে। সিয়ামকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু এখনোও তাদের আসার নাম নেই।

উঁচা-লম্বা, সুঠাম, বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী পুরুষটির দেহে কালো রঙের ফরমাল স্যুট শোভা পাচ্ছে। সাদা শার্ট, কালো স্যুট-প্যান্টে জয়কে একদম সিনেমার হিরোর মতো লাগছে। জয় পকেট থেকে ফোন বের করে স্মৃতিকে কল দেবার উদ্দেশ্য। কিন্তু তখনই দেখতে পায় কাঙ্খিত গাড়িটি সেন্টারে প্রবেশ করছে। জয় ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে গাড়ির দিকে এগোয়। ততক্ষণে স্মৃতি আর শ্রাবণী গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। কিন্তু ঐশী এতো ভারী লেহেঙ্গা পড়ে নড়তে পারছে না। জয় গিয়ে ঐশীর হাত ধরে তাকে নামতে সাহায্য করে। ঐশী নেমে বিরক্তি নিয়ে বলে উঠে,

“ উফফ এতো ভারী কাপড় পড়ে আমি থাকবো কি করে। আল্লাহ!” – ঐশী বিরক্তি নিয়ে কিছু বলে যাচ্ছে আর জয় হা করে ঐশীকে দেখছে। এ তো সাক্ষাৎ পরী। এতো সুন্দর কেউ হয়৷ জয় পলকহীন ঐশীকে দেখে যাচ্ছে। ঐশী জয়ের মুখের সামনে হাত নাড়ায়। কিন্তু জয়ের সেদিকে হুশ নেই। সে কাল-পাত্র ভুলে ঐশীকে দেখতে মত্ত। ঐশী এবার জয়ের বাহু ধরে বলে,

“ সবাই আমাদের দেখছে ডাক্তার সাহেব। এভাবে সবার সামনে হা করে চেয়ে থাকার কি আছে? একটু তো শরম করুন।”

“ চলো সবার আড়ালে যাই তাহলে…” – জয় আনমনে উত্তর দেয়। জয়ের উত্তরে শ্রাবণী আর স্মৃতি হেসে দেয়। সিয়াম দাঁত কেলিয়ে বলে,

“ বন্ধু বউ তো তোরই। পড়ে মন ভরে দেখিস, সমস্যা নাই। এখন সব মানুষ দেখছে এবার তো চোখের পলকটা ফেল ভাই।”

জয় এবার ঐশীর হাত ধরে ভিতরে যায়। ওরা দু’জন ভিতরে যেতেই সবার হুড়োহুড়ি শুরু হয়। ক্যামেরা ম্যান ফটাফট ছবি তুলছে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে ঐশীর চোখ বারবার ধাঁধিয়ে উঠছে। বর-বউ দুজনকে আসতে দেখে সবার চক্ষুশীতল হয়। সবার মুখে কেবল মাশাল্লাহ ধ্বনি। ঐশীর মা এসে ঐশীকে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করে। ঐশী স্বাভাবিকভাবেই তাকে একটু সান্ত্বনা দেয়। এরমধ্যেই ইলোরা ইয়াসমিন সায়মা আর স্মৃতিকে ঐশীকে স্টেজে নিয়ে যেতে বলে। বর-বউ দুজনকে স্টেজে নিয়ে যাওয়ার পর একে একে সবাই আসে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে, গিফট দিতে আর মোস্টলি ছবি তুলতে।

সবাই নতুন জুটিটা দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ঐশী উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের হলেও তার মুখে একটা মাধুর্য আছে। যা অনেক ফর্সা মানুষের মাঝেও নেই। আর ঐশীর হাসিটাই তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। সবাই জয় আর ঐশীকে দেখে মেইড ফর ইচ আদার জুটি বলছে। যদিও অনেকেই ঐশীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করছে, হেয় করছে, খোঁচা দিচ্ছে। কিন্তু ইলোরা ইয়াসমিন, আকলিমা আক্তার হাসিমুখে তাদেরকে সঠিক জবাব দিয়ে সবটা সামলে নিচ্ছে। সব জায়গায় এমন মানুষ তো থাকেই। যাদের অন্যদের চিন্তায় ঘুম আসে না।

এসবের মাঝেই জয় তার নজর সামনে রেখে ঐশীর দিকে হেলে বলে,

“ ইউ আর লুকিং ট্রু লি গর্জিয়াছ বউ। মাইন্ডব্লোয়িং, ফ্যাবিওলাস। পুরাই মাথা নষ্ট করা টাইপ।”

ঐশী জয়ের এমন প্রশংসা লজ্জা পায়। তারপর সেও সামনের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলে,

“ এন্ড ইউ আর লুকিং সো হ্যান্ডসাম জামাই।” – জয় ঐশীর কথায় ঐশীর দিকে তাকিয়ে হেসে দেয়, আর ঐশীও জয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে দেয়। ঠিক ওই সময়ই ক্যামেরাম্যান সবচেয়ে সুন্দর একটা ছবি তুলতে সক্ষম হয়। ওখানে উপস্থিত কিছু মানুষও এই সুন্দর মুহুর্তটা দেখে মনে মনে মাশাল্লাহ বলে উঠে।

১৪৯.

সেদিন বউভাতের অনুষ্ঠান সবটা সুষ্ঠু সুন্দর ভাবেই হয়েছে। ঐশী আর জয় অনুষ্ঠান শেষে একদিন ঐশীর বাবার বাড়ি থেকেও এসেছে। জয় তার বিদেশ যাওয়ার প্রসেসিং নিয়ে কয়েকদিন বেশ ব্যস্ত ছিল। বিয়ের বাকিসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেছে কবেই।

জয় ঐশীর বিয়ের একমাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। একটু বেশিই হবে। ঐশী তার নতুন পরিবারের সাথে বেশ ভালো আছে। খুব সুন্দর একটা মাস কাটিয়েছে ঐশী। ঐশীর মনে হচ্ছে চোখের পলকে একটা মাস কেটে গেল। এই একটা মাসে কি কোনো কিছু পরিবর্তন হয়েছে?

হ্যা অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। আগে ঐশী ব্যস্ত থাকার উপায় খুঁজতো। বাইরে থাকার উপায় খুঁজতো। আর এখন? এখন ঐশী ঘরে যথেষ্ট সময় দেওয়ার সুযোগ খুঁজে। ঐশীর দিন শুরু হয় ব্যস্ততা দিয়েই। জয়ের ডাকে এখন তার ঘুম ভাঙে। আগে নামাজটা নিয়ম করে পড়া হতো না গাফিলতি করতো নামাজ পড়তে। এখন প্রতিদিন জয় ফজরের নামাজের সময় তাকে ডেকে দেয়। এরপর কখনো দু’জনে একসাথে নামাজ পড়ে আবার জয় যেদিন মসজিদে যায় নামাজ পড়তে সেদিন ঐশী একাই নামাজ আদায় করে নেয়।

এরপরের সময়টুকু একান্ত তাদের দু’জনের। ঐশী নামাজ আদায় করে চা বানায়। জয় ঐশীর বানানো চা খুব বেশিই পছন্দ করে। মানুষটা কিন্তু আগে চা মোটেই খুব একটা পছন্দ করতো না। যেদিন প্রথম ঐশীর হাতের চা খায়, সেদিন থেকেই ঐশীর হাতের চায়ের ফ্যান হয়ে গেছে। কেবল ঐশীর বানানো চা। ঐশীর বানানো চা ছাড়া এখন জয়ের দিন যেন শুরুই হয় না। জয় মসজিদ থেকে ফিরলে দুজন বারান্দায় বসে বা কখনো কখনো ছাঁদে বসে গাছগুলো দেখতে দেখতে চা পান করে। গাছের পরিচর্যা করে। আর জয়’তো ওইসময় ভীষণ ব্যস্ত। সে চাও পান করবে, ঐশীকেও দেখবে আর ঐশীর কাজে ডিস্টার্ব করবে।

কাজের সময় ঐশীকে ডিস্টার্ব করা আর ঐশীকে বিভিন্ন রুপে দেখায় জয়ের মূল কাজ। এই যে যখন ঐশী গাছগুলোকে পানি দেয়, মাটিগুলো নিড়ানি দেয় ওইসময় কর্মরত ঐশীকে দেখা। আবার ঐশীর কাজে ডিস্টার্ব করে তাকে বিরক্ত করে ঐশীর বিরক্ত মুখশ্রী দেখা। কখনো কখনো বেশি বেশি ডিস্টার্ব করে তাকিয়ে রাগিয়ে দিয়ে তার রাগান্বিত মুখশ্রী দেখা, আবার বিভিন্ন ভাবে ঐশীকে হাসিয়ে ঐশীর হাসিমুখ দেখা। ঐশী জয়কে কিছু বলতেও পারে না। জয়ের বক্তব্য বউকে ডিস্টার্ব করা তার স্বামীগত অধিকার। এতে ঐশী বিরক্ত হলেও জয়ের কিছু করার নেই। ঐশী উপরে উপরে যতই বিরক্তি দেখাক না কেন, মনে মনে ঐশী নিজেও এই সময়টা খুব উপভোগ করে।

দু’জনে একান্ত কিছু সময় কাটানোর পর জয় হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। আর ঐশীকে জয়ের সবকিছু গুছিয়ে দিতে হয়। গুছিয়ে দেওয়াটা তো নামে। জয় নিজেই সব করতে পারে, সে নিজেই খুব গোছালো একজন মানুষ। তবে তা সে করবে না। জয় যখন তৈরি হবে তখন ঐশীকে তার পাশে থাকতে হবে এটাই হচ্ছে পয়েন্ট। ঐশী যদি কোনো কাজ করে বা ইলোরা ইয়াসমিনকে কাজে সাহায্য করে তখন শুরু হবে জয়ের ডাকাডাকি। যেন সে কিচ্ছু খুঁজে পাচ্ছে না। আবার ঐশী রুমে এলেই তার ডাকাডাকি বন্ধ। ঐশী যতক্ষণ রুমে থাকে ততক্ষণ জিনিসপত্র জয় এমনেই পেয়ে যায়। জয় তৈরি হবে আর হুটহাট করে ঐশীকে আদর করে দিবে, ছুঁয়ে দিবে। এটাই হচ্ছে তার রুটিন। জয়কে রেডি করে ঐশী নিজেও তৈরি হয়ে নেয়।

রান্নাবান্না এখনো ইলোরা ইয়াসমিনই করেন। ঐশী বহুবার না করেছে, জোর করেছে কিন্তু ইলোরা ইয়াসমিন শুনেন না। আসলে তিনি রান্নাবান্না করতে খুব পছন্দ করেন। রান্নাবান্না তার একটা শখ। রান্না করতে এবং তা অন্যদের খাওয়াতে তিনি খুব পছন্দ করেন। যদিও চাকরি-বাকরি করে সংসারের সব ঝামেলা সামলে এসব করার তেমন সময় হতো না। তবুও যখনই সময় পায় রান্নাবান্না করে সন্তানদের খাওয়ান। রান্নাবান্না করতে তার শরীরে কোনো খারাপ লাগা নেই অলসতা নেই। কয়েকদিন ঐশী কারফিউ জারি করে দেখেছে এটা নিয়ে। কারণ তিনি এখনো ওয়ার্কিং, ঐশী চেয়েছিল রান্নাটা করে উনার উপর থেকে ধকলটা একটু কমাতে। কিন্তু না, মুখটা এমন ফুলিয়ে রাখে আর এমন মায়া মায়া করে তাকায়। ঐশী তাই আর না করে না। উনার এই আচরণে ঐশী বুঝেছে জয় এই মুখ ফোলানো অভ্যাস কার কাছ থেকে পেয়েছে। এখন ঐশী খালি সাহায্য করে।

সকালটা সবারই ব্যস্ততায়ই কাটে। এরপর ঐশী স্মৃতিকে নিয়ে বের হয়ে যায়। স্মৃতির এখন এইচএসসি পরীক্ষা চলছে। তাই স্মৃতিকে কলেজে দিয়ে ঐশী চলে যায় তার ডান্স ক্লাসে। আর জয় ইলোরা ইয়াসমিনকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে হাসপাতালে যায়। আগে অবশ্য ইলোরা ইয়াসমিন ভার্সিটির টিচার্স বাসেই যেত। তবে বিয়ের পর থেকে জয়ই তাকে দিয়ে আসে। আসলে জয় ওইসময়টুকু মাকে দেয়। বিয়ের পর না চাইতেও মা আর সন্তানের মাঝে একটা দূরত্ব এসে যায়। যেমন এখন সারাটা সকাল জয় ঐশীর সাথে কাটায়। কিন্তু আগে তা মায়ের সাথে কাটাতো আর নাহলে নিজের মতো থাকতো। মা যদি এটা ভেবে কষ্ট পায় বা শাশুড়ী বৌমার মাঝে এটা যদি কোনো প্রভাব ফেলে তাই সে এই কাজটা করে। বিষয়টা ইলোরা ইয়াসমিন বুঝে। তবে সে এটা নিয়ে কখনো কিছু বলেন নি, বরং তিনি এতে খুব খুশি। তার ছেলের যে সবদিক ব্যালেন্স করার মতো বুদ্ধি আছে সেটা দেখে তিনি খুব খুশি হন।

ঐশী এখন স্মৃতির পরীক্ষার টাইম অনুযায়ী ব্যাচ ঠিক করে। যেদিন স্মৃতির পরীক্ষা থাকে না সেদিন ঐশী জয় আর ইলোরা ইয়াসমিন যাওয়ার পরে দুপুরের রান্না সেরে কলেজে যায়। ব্যাচগুলো সেদিন কলেজের পর থেকে বিকাল পর্যন্ত রাখে। আবার যেদিন স্মৃতির পরীক্ষা থাকে সেদিন ঐশী সকাল থেকে ব্যাচ শুরু করে। আবার পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে সব ছেড়ে দেয়। এরপর স্মৃতিকে নিয়ে বাসায় ফিরে। বিকালে আর কোনো ব্যাচ রাখে না। মানে পরীক্ষার সময়টুকু ঐশী স্মৃতিকে আনা নেওয়া করে। এটা করার যদিও তেমন কোনো দরকার ছিল না তবে ঐশী কাজটা স্মৃতির জন্য করে। কারণ ঐশী জানে এই সময় বেশিরভাগ পরীক্ষার্থীর গার্ডিয়ানরা সন্তানদের পাশে থাকে। জয় আর ইলোরা ইয়াসমিন তা পারবে না। মাঝেমধ্যে সম্ভব, তবে প্রতিবার না। স্মৃতি যেন কখনো একলা ফিল না করে তাই ঐশী এই কাজটা করে।

এরপর বিকালটা তিনজনে একসাথে কাটায়। গল্প করা, নতুন নতুন রান্না করা, গাছের পরিচর্যা করা। জয়ও প্রায় তাদের সাথে যুক্ত হয়। আবার মাঝে মাঝে কেবল জয় আর ঐশীও একা একা যখন তখন নিজেদের মতো সময় পার করে। যথেষ্ট স্পেস আছে তাদের।

ইলোরা ইয়াসমিন ব্যক্তি জীবনে খুব একা। যতই তিনি চাকরিজীবী হোক, ছেলে মেয়ে যতই তাকে সময় দিক তবুও কোথাও যেন তিনি একা। জয়ের বাবা মা’রা যাওয়ার পর থেকেই এই একাকিত্ব। কেবল সঙ্গীহারা হওয়ার না। বাসায় ফিরে রাতের বেলায় তাও নিজের মনের কথাগুলো কাউকে বলতে পারতেন। জয়ের বাবা মা’রা যাওয়ার পর তা বন্ধ। ছেলেমেয়েরাও তো এসময় তাদের নিজেদের কাজে ব্যস্ত৷ তার এই একাকিত্বটা ঐশী আসার পর দূর হয়েছে। সন্ধ্যার পরের সময়টা শাশুড়ী বৌমা দুজনে আলাপচারিতায় পার করে। ইলোরা ইয়াসমিন প্রায় অতীত জীবন মন্থর করেন, আর ঐশী একজন আদর্শ শ্রোতার ভুমিকা পালন করে। সময় সময়ে কথার রেলগাড়ীকে ধাক্কা দিয়ে এগোতে সাহায্য করে। আবার কখনো শাশুড়ীর একাডেমিক কাজে সাহায্য করে।

মানুষ কথার কথা বলে না ছেলে বিয়ে করিয়ে এনে ঘর আলো করার কথা? কথাটা ইলোরা ইয়াসমিনের ক্ষেত্রে সত্যি হয়ে গেছে। ঐশী আসার পর এবাড়ি যেন আলোয় ভরে গেছে। এতদিন কোথাও তো একটা জায়গা বেরঙিন ছিল। ঐশী এসে তা রঙিন করে তুলেছে। ইলোরা ইয়াসমিন, স্মৃতি দুজনেই আগের থেকে এখন আরও বেশি হাসিখুশি থাকে। বিশেষ করে ইলোরা ইয়াসমিনের পরিবর্তন বেশ লক্ষণীয়।

জয় তার মাকে বাবার চলে যাওয়ার পর কখনো এতো প্রানখুলে হাসতে দেখে নি৷ ঐশী আসার পর তার মা যেন আবার কিশোরী রুপে ফিরে এসেছে। এখন বাসায় ঢুকলে বা থাকলে প্রায় সময় তিন নারীর কোলাহল শোনা যায়, খিলখিলিয়ে হাসির ধ্বনি শোনা যায়। আগে যা কখনো হয় নি। জয় ঘরে থাকলেও মাঝে মাঝে ওদের স্পেস দেয়। আর দূর থেকে উপভোগ করে তার জীবনের প্রিয় তিনটি মানুষের আনন্দ। এই তিন নারী তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। এদের জন্য জয় যেকোনো কিছু করতে পারে।

জয়ের মাঝেও পরিবর্তন এসেছে। এখন সারাক্ষণ বাসায় বসে থাকতে ইচ্ছে করে তার। এই তিন নারীর হৈ-হুল্লোড়, হাসির শব্দ উপভোগ করতে ইচ্ছে করে। সারাক্ষণ ঐশীর সাথে লেপ্টে থাকতে ইচ্ছে করে। জয় কেনো জানি এখন খুব বেশিই ছেলেমানুষী করে। বিষয়টা সে বুঝে। কিন্তু ঐশীর সাথে তার আরও ছেলেমানুষী করতে ইচ্ছে করে। তবে তার একটা ইচ্ছে এখনও পূর্ণ হয় নি। ঐশীকে পুরো একটাদিন জড়িয়ে ধরে থাকা হয় নি। চুমু খাওয়াটাও হয় নি। যদিও সে এই বিষয়ে একচুল ছাড়ও দেয় নি। তার হুটহাট চুমুতে ঐশী এই একমাসেই ত্যাক্ত বিরক্তের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। সকালে রেডি হতে গেলেই জয়ের বুক জ্বালা করে। ইশশ এই মেয়েটাকে কতক্ষণ দেখা হবে না চুমু খাওয়া হবে না এটা ভেবে। আর তাই জয় সকাল বেলা রেডি হতে গেলেই ঐশীকে তার পাশে রাখার বাহানা করে। রেডি হতে হতে হুটহাট চুমু খেয়ে নিজের পাওনার কিছু অংশ বুঝে নেয়।

ঐশী আসার পর কেবল বাড়ির মানুষের মাঝেই পরিবর্তন হয় নি। বাড়ির রুপেও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বাড়ির সামনের জায়গা এখন দেশি বিদেশি বিভিন্ন জানা অজানা ফুল গাছের দখলে। একপাশে আবার সবজির বাগানও করে ফেলেছে। বাসার মানুষের প্রয়োজনীয় সবজির জোগান এখান থেকেই হয়ে যাবে। তবে সেগুলো হতে এখনও দেরি আছে। বাসার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে প্রতিটা রুমের বাথরুমেও ঐশী সৌন্দর্যবর্ধক ইনডোর প্ল্যান্ট রেখে দিয়েছে। ছাঁদে বিভিন্ন জাতের ফুল এবং গাছের পাশাপাশি আরও কিছু প্রয়োজনীয় সবজিও জায়গা পেয়েছে। তবে সেগুলো ভোগ করতে এখনও দেরি। ফুল ফলের গাছও ফুল-ফল দিয়ে ভরা না। সবে তো প্রসেসিং করা হয়েছে। একসময় এগুলো ফুল-ফল দিবে ইনশাআল্লাহ। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

১৫০.

ঐশী নামাজ পড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আজ শুক্রবার। সবাই আজ বাসায়। জয় জুম্মার নামাজ পড়তে গেছে। শাশুড়ি মা কোরআন শরিফ পড়ছে। আর স্মৃতি হয়তো পড়ছে। আর দুইটা পরীক্ষা বাকি আছে স্মৃতির। ঐশী বারান্দায় বসে এবাড়িতে আসার জার্নির কথা ভাবছিল। এই একমাস কিভাবে কাটলো তা ভাবছিল। কিছু হিসাব কষছিল। সে কি এই জীবনে সুখী না অসুখী? মন বললো এখন অবধি সুখীই। পরে কি হবে জানে না।

ওভার থিংকারদের এই সমস্যা। ভালো চিন্তার মাঝেও কিন্তু লাগিয়ে দিবেই দিবে। তবে ঐশীকে এরজন্য দোষী করা যায় না। ও তো এসবই দেখে আসছে এতদিন ধরে। তার মস্তিষ্কে এসবই তো সেট হয়ে আছে। এখন রাতারাতি তো আর এটা চেঞ্জ হবে না। সময় লাগবে। কেবল ঐশী না আমরা বেশিরভাগ মানুষই পজিটিভ বিষয়টার থেকে নেগেটিভ বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবি। সবার মাঝেই কম বেশি এই সমস্যা আছে। কেবল তো একটা মাস। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।

ঐশীর ভাবনার মাঝেই কেউ একজন তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ঐশী জানে এটা কে। ঐশী তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত। ঐশী না ঘুরেই সামনে তাকিয়ে বলে,

“ পড়া শেষ?”

“ পড়া কি আর শেষ হয় বলো। ভালো লাগছে না এখন পড়তে। ভাইয়া আসছে না কেন বলো তো? খিদে পেয়েছে আমার।”

“ তোর ভাই তুই ভালো জানিস৷ দেখি ছাড় আমায়। তোকে কতবার না বলেছি আমাকে এভাবে জড়িয়ে টড়িয়ে ধরবি না৷ বিরক্তিকর লাগে আমার। দুই ভাইবোনেরই এসব বদ অভ্যাস। অসহ্য। ”

স্মৃতি ঐশীকে না ছেড়ে হেসে বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরে। ঐশী ইশ আশ করলেও ছাড়ে না।

“ আমার সম্পদে দখলদারি না দিতে তোকে কতবার বলেছি বল তো? তুই কি মানুষ হবি না বলে ঠিক করে রেখেছিস?” – জয়ের গমগমে স্বরে স্মৃতি ঐশীকে জড়িয়ে ধরেই পিছন ফিরে তাকায়। জয়কে দেখে বলে,

“ তুই ভিতরে ঢুকলি কি করে? ”

“ ভুত হয়ে ঢুকেছি। আমার বউকে ছাড়।” – জয়ের শক্ত গলায় বলা কথা শুনেও স্মৃতি ছাড়ে না। বরং আবার ঐশীকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“ ওহুম…আমার ভাবী এটা৷”

“ আর আমার বউ।” – জয় এসে সামনে থেকে স্মৃতিকে সহ জড়িয়ে ধরে ঐশীকে।

“ তো?”

“ আগে আমার বউ তারপর তোর ভাবী। ছাড় আমার বউকে ছাড় বলছি।” – ঐশীকে মাঝে রেখে দুই ভাইবোনে কুস্তি শুরু করেছে। জয় দুজনকে জড়িয়ে ধরেই ছাড় ছাড় করছে আর স্মৃতি খিলখিলিয়ে হাসছে। আর ঐশী ওদিকে চিল্লিয়ে জয়কে বলছে,

“ ডাক্তার সাহেব ছাড়ুন আমায়, আপনি বাইরের কাপড় পড়েই ধরেছেন আমাকে।”

তিনজনের চিল্লাচিল্লি থামে ইলোরা ইয়াসমিনের ধমকে। তিনি এসে তিনজনকেই ইচ্ছেমতো ঝাড়ছে। কিন্তু তা মিনিট খানেক। ইলোরা ইয়াসমিনের ধমকে তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে উঠে। আর ইলোরা ইয়াসমিন তা দেখে কপাল চাপড়িয়ে আদুরে রাগে গজগজ করতে চলে যায়। তার পিছে পিছে স্মৃতিও চলে যায়।

স্মৃতি যেতেই জয় আবার ঐশীকে ঝাপটে ধরে নিজের সাথে। ঐশী এবার চোখ গরম করে তাকায় জয়ের দিকে। জয় সেই রাগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টুস টাস করে ঐশীর সারামুখে চুমু একে দেয়। ঐশী চোখমুখ কুঁচকে গরম শ্বাস ফেলে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,

“ আমি গোসল করেছি ডাক্তার সাহেব। এখন খাবার সময়, মা খাবার গরম করেছে। আর আপনি বাইরের কাপড় পড়ে আমার সাথে এমন করলেন?”

জয় ঐশীর কথায় তার নাকে চুমু একে বলে,

“ থ্রি পিছ পড়েছ কেন? আজকে শাড়ি পড়তে বলেছিলাম না। পরো নি কেন? এটা তার শাস্তি। যাও এবার চটপট শাড়ি পড়ে এসো। আমি আবার নাহয় খাবার গরম করে দেব।” – বলেই ঐশীর ঠোঁটে চট করে চুমু দেয় জয়।

ঐশী যদিও শাড়িতে কমফোর্টেবল। তবে প্রতিদিন শাড়ি পড়া, ধোয়া খুব প্যারাদায়ক। ঐশী আবার গোসল করে শাড়ি পড়ে এসেছে। যদিও বেশি সময় লাগে নি। পাঁচ মিনিটেই এসে পড়েছে। ঐশী আসতেই জয় সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দেয়। আজকে শুক্রবার সবাই বাসায় আছে তাই স্পেশাল কিছু রান্না করেছে দুই শাশুড়ী বৌমা মিলে। প্রতি শুক্রবারই করে। চারজন মিলে ভালবাসা, হাসি-মজা আর খুনসুটির মাঝে দুপুরের ভোজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

১৫১.

আজ পূর্ণিমা। আকাশে মস্ত বড় চাঁদ দৃশ্যমান। যে তার আলো দিয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করছে। এই পূর্ণিমা রাতে শুনশান রাস্তায় দুজন কপোত-কপোতী পূর্ণিমার আলো শরীরে মাখছে। এই রাতের বেলায় ঐশীর শখ জেগেছে আইসক্রিম খেতে। ঐশীর জিদের কাছে হার মেনে দুজনে বেড়িয়েছিল আইসক্রিম খেতে। রাত এখন প্রায় বারোটা।

যদিও এটা তাদের জন্য নরমাল। প্রায়ই রাতেই একজনের না একজনের এভাবে হুটহাট কিছু শখ জাগে। সেই শখ পূরণ করতেই রাত বিরাতে তারা বের হয়। কখনো আইসক্রিম খেতে, কখনো মিষ্টি কিছু খেতে, কখনো বা হাওয়া খেতে।

রাস্তা এখন জনশূন্য। শরৎকাল আসবে আসবে ভাব। মৃদু মন্দ ঠান্ডা বাতাসে শরীর মন দুটোই শীতল হচ্ছে দুজনের। জয় দুই পকেটে দুই হাত গুঁজে হাঁটছে। ঐশী তার খুব কাছাকাছি। ঐশীর পড়নে গোল্ডেন পাড়ের কালো শাড়ি। হাতে, কানে, গলায় জয়ের পড়িয়ে দেওয়া গয়না। পূর্ণিমার আলোয় ঐশীকে অপার্থিব লাগছে। অবশ্য জয়ের কাছে তাকে কখনোই খারাপ লাগে না। এই মেয়েটার প্রতিটা রুপে সে মুগ্ধ। ঐশীর সাথে ম্যাচিং করে জয়ও কালো প্যান্ট শার্ট পড়া।

“ বউ….” – জয়ের এমন আবেগমাখা ডাকে ঐশীর মন কেঁপে উঠে। জয় যতবার এমন আবেগমাখা গলায় তাকে বিভিন্ন নামে ডাকে সে ততবারই আলাদা একটা ভালো লাগায় কেঁপে উঠে।

“ হুমম?” – জয় নিশ্চুপ।

“ সুহাসিনী….” – জয় আবার ডেকে উঠে।

“ হুমম?”

“ এই মেয়ে…”

“ হুমমমমম…..” – ঐশী এবার লম্বা করে টেনে বলে।

“ ভালবাসি..”

ঐশী কিছু বলে না। সে জয়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হেসে বলে,

“ দিনের মধ্যে কয়বার, কয়ভাবে আপনি এই কথাটা বলেন বলুন তো?”

“ সত্য কথা দিনের মধ্যে চৌদ্দ বার বলা যায়।”

জয়ের কথায় ঐশী খিলখিলিয়ে হেসে উঠে তার সাথে জয়ও। শুনশান রাস্তায় তাদের এই হাসি অন্যরকম এক মাধুর্য সৃষ্টি করে।

#ক্রমশ…
( কপি করা নিষেধ।

কেমন লাগলো জানাবেন। আর আশা করছি কালকে একটা সারপ্রাইজ পর্ব পাবেন সবাই। 🙂)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here