সূর্যোদয় পর্ব ৪১

0
42

#সূর্যোদয়
#পর্ব_৪১
#কারিমা_দিলশাদ

১৩০.

দুপুর সবে গড়িয়েছে। ইলোরা ইয়াসমিন সকাল সাড়ে দশটা থেকে ফোন দিচ্ছে ঐশীকে। তবে ঐশী গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে তাই বিকেলে যাবে বলে কথা কাটিয়ে দিয়েছে। তিনিও ঐশীর কথা মেনে নিয়ে বলেছে জয় তাকে নিতে যাবে। কাজ তো কেবল একটা বাহানা, আসলে তার মোটেও যেতে ইচ্ছে করছে না৷ কিন্তু নাও করতে পারছে না। ঘরের পরিবেশ এখনো থমথমে। এসব বিষয়ে ঐশী যতই মাথা না ঘামাক তারপরও ঘরের মধ্যে এমন থমথমে ভাব থাকলে কোন মানুষটার শান্তি লাগতে পারে? বাসস্থান বড়ই শান্তির স্থান, সেখানেই যদি শান্তি না পাওয়া যায় এর মতো দূর্ভাগ্যজনক বিষয় কমই আছে।

আজকে বাসায় দুপুরের রান্নাটাও হয় নি। তার বাবা অফিসে, শওকত তো তখনই বাইরে চলে গিয়েছে। বাসায় কেবল ঐশী আর তার মা। ঐশী পারে রান্নাবান্না করে মা’কে খেতে দিতে, বড় সন্তান তাও আবার কন্যা। সন্তান হিসেবে তার এটাই করা উচিত। কিন্তু ঐশী নিজের বুদ্ধি দিয়ে বা নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী যদি কিছু রান্না করে তবে তার মা সেটা নিয়ে গজগজ করবে। আবার রান্না ভালো হয় নি ভালো হয় নি বলে হাজারটা কথা শুনাবে। তবে অবাক করা বিষয় হচ্ছে ঐশীর মায়ের হাতের রান্নার থেকে ঐশীর হাতের রান্না অনেক বেশি সুস্বাদু । ঐশী যতই ভালো করে রান্না করুক তবুও তিনি রান্নায় একটা না একটা খুত ধরবেই ধরবে।
একসময় ঐশী তিনবেলাই রান্না করতো। অথচ ঐশীর মা সেগুলো নিজে রেঁধেছে বলে চালিয়ে দিত। রান্না হঠাৎ এক দুইদিন খারাপ হতেই পারে। যেদিন এমন হয় তখন সেদিনের রান্না ঐশী করেছে। আর সবাইকে বলে বেড়ায় ঐশী নাকি সংসারে ক্ষের’টা (খড়) ছিঁড়ে দুই ভাগ করে না।

ঐশী সুনামের আশা ছেড়ে দিয়েছে বহু আগেই, তবে তার কাজগুলোকে নিজের নাম দিয়ে আবার তারই নামে দূর্নাম করে বেড়াবে এতো সুযোগ করে দেওয়ার তো কোনো মানে নেই। দূর্নাম যখন করবেই তো তার কষ্ট করার মানে কি? দুর্নামটা সত্যি করেই নাহয় দুর্নামের ভাগী হোক। এরপর থেকে ঐশী সত্যি সত্যি কুটো নাড়া পর্যন্ত করে না। এমন আজাব মেয়েরা সাধারণত শশুরবাড়িতে ভোগ করে আর সে বাপের বাড়িতেই ভোগ করছে।

ভেবেছিলো দুপুরে বোধহয় খাওয়া হবে না। কিন্তু পরে দেখে তার মা ভাত খাচ্ছে। ঐশী ভাবে তাহলে বোধহয় রান্না করা আছে। সে যখন খাবার নিতে যায় দেখে ভাতের পাতিল একদম খালি। তরকারির পাতিলে একটা মাছের পিছসহ কিছু ঝোল আছে। ঐশী সব দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর এক চুলায় নিজের জন্য ভাত বসিয়ে আরেক চুলায় একটা ডিম সিদ্ধ করে সুন্দর মতো ডিম কোরমা করে খেয়ে নেয়।

গা ঘেমে গেছে। ঘিনঘিন করছে শরীর, আবার গোসল করতে হবে। নিজের ঘরে এসে গোসল করে নেয় ঐশী। জয়ের মেসেজ পেয়ে তৈরি হতে শুরু করে। ঐশী আজকে পিচ কালারের থ্রি পিছ পড়েছে। সে সবসময় সিম্পল থাকতেই পছন্দ করে। তারমতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে অযথা এতো সময় ব্যয় করার চাইতে অন্যকোনো কাজে সেই সময়টা ব্যয় করা ঢের ভালো। তার তৈরি হওয়া বলতে ভালো একটা কাপড় পড়া আর চুল আঁচড়ানো ব্যস।

মাথার চুলগুলো ভালো করে সেট করে, ঠোটেঁ একটু মেরিল লাগিয়ে নেয়। এবার নিজেকে আগাগোড়া পরখ করে নেয়। সে কোনো অর্নামেন্টসও পড়ে না। হাত, কান, নাক,গলা একদম খালি। কি মনে করে যেন আজকে কানে একদম ছোট্ট একজোড়া টপ পড়ে নেয়। ব্যস তার সাজগোজ শেষ। এরমধ্যেই ফোনে কল আসে। জয় কল করেছে। সে জয়কে একটু অপেক্ষা করতে বলে ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বের হয়।

বের হয়ে দেখে তার মা ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। ঐশী সেদিকে নজর না দিয়ে কিচেনের দিকে যায়। ঠান্ডা পানি খাওয়ার উদ্দেশ্য। যেতেই ঐশী শুনতে পায় তার মা বলছে,

“ আর কইয়ো না বুবু। কি কু-শনি পেটের মইধ্যে ধরছিলাম। মা ঘরের মইধ্যে মইরা পইরা থাকলেও আইসা ধরে না। উইল্টা ন** সাইজা ভাতা* এর সাথে ঘুরবার যাইতাছে। বিয়ার আগে মদ্দা (পুরুষ) মানুষের সাথে ছিঃ ছিঃ ছিঃ গো ছিঃ ছিঃ। ইয়া আল্লাহ….কি বে’শরম মা** মানুষ গো….”

ঐশী স্বাভাবিকভাবেই পানি খেয়ে নেয়। এবার ওর মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখমুখ শক্ত করে বলে,

“ ভাতা*টা তো তোমরাই ধরাইয়া দিছ। আর ওই ভাতা* এর বাড়িতি নিজের পুরা মিছকিন বংশ নিয়া যাওয়া ধরছিলা। হাভাইত্তাগর মতো। তহন তুমি কি ছিলা? পোলার হাতের প্যাদা”নি খাইয়াও যার শরম হয় না তারে কি কয় জানো? বেশ’রম। নিজে বে’শরম হইয়া আরেকজনের শরম নিয়া কথা না কইলেই ভালা হয়।” – বলেই বের হয়ে যায় ঐশী। ঐশীর মা মেয়ের যাওয়ার দিকে চোখ কটমট করে চেয়ে থাকে।

ঐশী বাসা থেকে বের হয়েই একটা শ্বাস ফেলে। একহাতে রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরে। রাগে শরীর রি রি করছে ঐশীর। নিরবে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। এরমধ্যেই ফোনে কল আসে। সে জানে জয় কল দিয়েছে, সে রিসিভ না করে ওভাবেই রেখে দেয়। উড়না দিয়ে মুখটা মুছে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে।

১৩১.

জয় গাড়িতে হেলান দিয়ে ঐশীর জন্য অপেক্ষা করছে। অনেক্ক্ষণ হলো এখনও ঐশী আসছে না। ফোন দিয়েছে ফোনটাও রিসিভ করছে না। জয় আরেকবার ফোন করতেই কাছেই রিংটোন বেজে উঠে। রিংটোনের শব্দ পেয়ে সামনে তাকাতেই জয়ের চক্ষুশীতল হয়ে যায়।

একদম সাদামাটা স্নিগ্ধ সাজ মেয়েটার। তবে আজকে কেন জানি একটু বেশিই স্নিগ্ধ লাগছে মেয়েটাকে। চৌদ্দ দিন পরে এই শ্যামসুন্দরীকে সে আপন করে পাবে। কিন্তু এই চৌদ্দটা দিন তার কাছে চৌদ্দটা বছরের সমান মনে হচ্ছে। জয় ঠিক করেছে বিয়ের পর গোটা একটা দিন সে ঐশীকে একদম বুকে চেপে রাখবে। যখন যখন মন চাইবে তখন ঐশীর মুখটা তুলে টুসটাস করে চুমু একে দিবে, একটাদিন কোনো ছাড়াছাড়ি নেই।

ঐশীর ধাক্কায় জয়ের হুশ আসে। ওদিকে ঐশী রেগে চিল্লিয়ে যাচ্ছে,

“ কি সমস্যা আপনার, এমন খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কখন থেকে একটা কথা বলছি কানে যায় না?”

জয় বলবে কি। সে তো ঐশীকে নিয়ে স্বপ্নে বিভোর ছিল। সে দুহাত দিয়ে শক্ত করে ঐশীর মাথা ধরে ঝাঁকি দেয়। ঐশী অবাক হয়ে যায়। জয় মৃদু হেসে বলে,

“ রাগ কমেছে?” — ঐশী আনমনেই মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোঝায়।

“ টেকনিক। এটা আপনার মতো তুফানকে শান্ত করার টেকনিক ম্যাডাম। এবার বলো কি যেন বলছিলে।”

ঐশী কিছুটা থতমত খায়। সে বাসার মেজাজ জয়ের উপর দেখাচ্ছে। সে নিজেকে একটু গুছিয়ে নেয়। তারপর নরম স্বরে বলে,

“ এই গাড়িতে করে যাব?”

“ হ্যা ম্যাডাম৷ এই গাড়িতে করেই যাব। উঠে পড়ুন লেইট হচ্ছে। মা সকাল থেকেই অপেক্ষা করছে। ”

বলতে বলতেই ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটের ডোর খুলে দাঁড়িয়ে থাকে। ঐশী একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে গিয়ে বসে। জয় ডোর লাগিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে। নিজের সিটবেল্ট লাগাতে লাগাতে ঐশীর দিকে তাকিয়ে দেখে নেয় ঐশী সিটবেল্ট ঠিকঠাক লাগিয়েছে কি না৷ সব ঠিক থাকলেও খেয়াল করে ঐশী কেমন একটা আনমনা হয়ে আছে, আর মনে হচ্ছে কোনো বিষয় নিয়ে রেগেও আছে।

“ ঐশী কোনো সমস্যা?”

ঐশী চমকে জয়ের দিকে তাকায়। তারপর হালকা হেসে বলে,

“ না তো। কোনো সমস্যা নেই। ”

“ তাহলে এমন আনমনা হয়ে আছো যে। রেগেও আছো মনে হচ্ছে। ”

“ না না সেরকম কিছু না। আপনি চলুন।”

জয় হালকা মাথা নেড়ে গাড়ি স্টার্ট করে। ঐশীর কেন জানি কিচ্ছু ভালো লাগছে না, সব ভেঙে গুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। জয়ের দিকে তাকায় ঐশী। লোকটার সাথে বিয়েটা তো তারাই ঠিক করেছে। তাও আবার দু দু বার৷ তারপরও এমন কথাগুলো বলতে ওই মহিলার মুখে আটকালো না? ছিঃ। ঐশী নিজেকে তাড়াতাড়ি ধাতস্থ করে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর কিছু মনে হতেই ঐশী জয়কে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ এটা কি আপনার গাড়ি? ”

“ হুম? ওহহ না। এটা সিয়ামের গাড়ি। ওরাও এসেছে। তবে আমরাও কিনব কেমন? আমাদেরটা বিয়ের পর কিনবো ইনশাআল্লাহ।” -গাড়ি চালাতে চালাতেই জয় জবাব দেয়।

“ ওহহ। তবে জানেন আমার না এসব প্রাইভেট কারের থেকে রিকশা আর বাইকই বেশি পছন্দ।”

“ তাই? অন্য কোনো মেয়ে হলে কারের কথা শুনে খুশিতে লাফাতো। তুমি এতো সিম্পল কেন বলোতো?”

“ সিম্পলের কি আছে এখানে। সবার পছন্দ তো আর সমান না। আমার মতো এমন আরও অনেকেই আছে দেখেন গিয়ে।”

“ আচ্ছা শোনো কিছু কথা বলি। আমাদের ফ্যামিলির সবাই কিন্তু আমাদের মতো না। একেকজনে একেক কথা বলবে। কেউ ভালো কথা বলবে আবার কেউ কটুকথাও বলবে। মন খারাপ করবে না। সব কিছু চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করারও দরকার নেই। যেখানে তোমার মনে হবে তোমার কিছু বলা উচিত সেখানে বুদ্ধি খাটিয়ে স্মার্টলি জবাব দিবে। আই নো ইউ আর ভেরি স্মার্ট। আর আমরা তো আছিই তোমার পাশে, একদম ভয় পাবে না। কারো কথায় নিজেকে ছোট মনে করবে না। ঠিক আছে?”

ঐশী জয়ের কথায় অবাক হয়ে জয়ের দিকে তাকায়। ঐশী ভেবেছিল জয় হয়তো তাকে চুপ থাকতে বলবে, সহ্য করে নিতে বলবে। এমনটাই তো হয়, আজ পর্যন্ত এসবই তো হয়ে আসছে। সে তো এসবই দেখেছে। কিন্তু জয় আজ প্রমাণ করে দিল সব পুরুষ নারীদের চুপ থাকাকেই উচিত বলে মনে করে না। ঐশীর মুখে না চাইতেও হাসি ফুটে উঠে। এতোক্ষণ যেই মন খারাপ ভাবটা ছিল তা এখন আর নেই। তার চোখটা আদ্র হয়ে আসে। সে মুখে কিছু না বলে হ্যা সূচক মাথা নাড়ে। কিন্তু জয় ড্রাইভিং করা অবস্থায় তা দেখতে না পেরে উত্তরের জন্য আবার জিজ্ঞেস করে,

“ ওকে?”

“ হুম ওকে।” জয় বিনিময়ে মুচকি হাসে। কথা বলতে বলতে দুজনে জয়দের বাসায় পৌঁছায়। গেটে এসে জয় হর্ণ বাজাতেই দারোয়ান গেটটা খুলে দেয়। এই প্রথম ঐশী জয়ের বাসায় আসে। বাইরের গেটটা দেখেই ঐশীর বেশ পছন্দ হয়। জয় গাড়ি থামিয়ে নিজে বেরিয়ে তারপর ঐশীর সাইডের ডোর খুলে দেয়। ঐশী মুচকি হেসে আশপাশটা দেখতে থাকে।

১৩২.

বেশ খোলামেলা জায়গায় এক তলা একটা বিল্ডিং। তবে খুব সুন্দর সাজানো গোছানো। গেট থেকে বাড়ির সামনের পথটা পাকা করা। দুপাশে বিভিন্ন ঝোপালো গাছ সুন্দর শেপ দিয়ে কেটে রাখা। মেইন গেটের একপাশে মাধবিলতার গাছ আর অপরপাশে বাগানবিলাসের গাছ। বাউন্ডারির ধার ঘেঁষেও বিভিন্ন ফল-ফুলের গাছ আছে। সব মিলিয়ে খুব সুন্দর বাড়িটা।

ঐশী বাড়িটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, আর জয় ঐশীকে দেখছে আর মিটমিটিয়ে হাসছে। জয় ঐশীর পিছনে দাঁড়িয়ে ঐশীর কানে নরম স্বরে বলে,

“ আপনার নতুন বাড়ি পছন্দ হয়েছে ম্যাডাম?”

ঐশী চমকে জয়ের দিকে ঘুরে। জয়কে এভাবে মুচকি মুচকি হাসতে দেখে ঐশী লজ্জা পায়। সে লজ্জামিশ্রিত মুখে সরি বলে উঠে। কিন্তু তা জয় এখন শ্রবন করার মতো অবস্থায় নেই।

জয় ঐশীকে এই প্রথম লজ্জা পেতে দেখে। মেয়েদের নাকি লজ্জা পেলে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে। জয় আজ তার চাক্ষুষ প্রমাণ। মেয়েটা এত্তো সুন্দর কেন? জয় ঐশীর দিকে ঘোর লাগা চেখে চেয়ে বলে,

“ বিয়ের আগে তোমার লজ্জা পাওয়া নিষেধ শ্যামময়ী। একদম নিষেধ।”

ঐশী জয়ের এহেনও কথায় এখন যেন তাকাতেও পারছে না। ঐশীকে এই লজ্জা থেকে বাচাঁতেই যেন ইলোরা ইয়াসমিনের আগমন ঘটে। তিনি দুজনের অপেক্ষাই করছিলেন। বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বাইরে বেরিয়ে আসেন তিনি।

ঐশীকে দেখে তিনি মমতায় ঐশীকে জড়িয়ে ধরেন। ঐশীও ইলোরা ইয়াসমিনের মমতা লুফে নেয়। এই মহিলাটাকে তার খুব ভালো লাগে। ইলোরা ইয়াসমিন যখন তাকে জড়িয়ে ধরে তখন তার বেশ শান্তি শান্তি লাগে। ঐশী এসছে শুনে স্মৃতিও দৌড়ে এসে ঐশীকে জড়িয়ে ধরে। আস্তে আস্তে নিতু,রুপাও বেরিয়ে আসে। সবাই তাকে এত্তো আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করে। যার ফলে ঐশীর মনে যে অস্বস্তি ছিল তা কেটে যায়। এরমধ্যেই ইলোরা ইয়াসমিন বলে উঠে,

“ দেখি দেখি মেয়েটাকে আগে ঘরে যেতে দেও। বাইরে দাঁড়িয়েই কথা বলছো সবাই।”

সবাই হ্যা হ্যা করে উঠে। ইলোরা ইয়াসমিন ঐশীকে নিয়ে যেতে যেতেই ঐশীর কানে আস্তে আস্তে বলে,

“ এটা তোমার নিজেরই বাড়ি। কোনো অস্বস্তি রাখবে না। আমার ভাই ভাবিরা আছে ড্রয়িংরুমে বুঝছো। আমি জানি তুমি খুব বুদ্ধিমতী। কোনোরকম ভয় পাবে না, আর একদম নার্ভাস হবে না। এটা একটা ক্যাজুয়াল গ্যাট টুগেদার। সো রিলাক্স।”

ওরা সবাই ভিতরে চলে গেলে জয়ও আস্তে আস্তে সবার পিছন পিছন যায়। ঐশী গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসা সবাইকে হাসিমুখে সালাম দেয়। জয়ও সবাইকে সালাম দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসছি বলে সোজা গিয়ে তার রুমে ঢুকে। ঐশী ঘরে আসতেই একটা মেয়ে তাকে এসে জড়িয়ে ধরে।

মেয়েটা সিয়ামের ওয়াইফ সায়মা। জয়, ফয়সাল আর সিয়ামের মধ্যে একমাত্র সিয়ামই বিবাহিত। তার স্ত্রী সায়মাও ডাক্তার। লাভ ম্যারেজ। এতোদিন কেবল ওনার বিষয়ে শুনেছে কিন্তু এই প্রথম দেখা হলো। নিতু আর রুপাও বিবাহিত। ওরা ওদের বাচ্চাকে নিয়ে এসেছে।

ইলোরা ইয়াসমিন ঐশীকে নিয়ে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর ড্রয়িংরুমে সোফায় বসায়। স্মৃতি আর রুপাকে ঐশীর সাথে থাকতে ইশারা করে তিনি নিতুকে নিয়ে কিচেনে যায়। ইলোরা ইয়াসমিনের ভাই ভাবি, ভাগ্নে-ভাগ্নি সবাই এসেছে। যদিও ইলোরা ইয়াসমিন তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় নি তবে তারাই গায়ে পড়ে আসে। তাই তিনিও আর না করে না। তবে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই চলেন। তিনি জানেন তার ভাই ভাবিরা ঐশীকে ছোট দেখাতে, কষ্ট দিতে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু বলবে। জয়ের সাথে তাদের মেয়েদের বিয়ে দিতে কম তো চেষ্টা করেন নি। কিন্তু তিনি কখনোই তাদের কথায় কান দেন নি৷ প্রতিবার স্পষ্ট ভাষায় না করে দিয়েছে। মন রক্ষা করার ধার ধারেন নি। কিন্তু তারা সেসব গায়ে না মেখে বারবার একই প্রস্তাব দিতেন। তার বড় ভাইয়ের মেয়ে কনিকা ঐশীর সমবয়সীই। একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে। ভীষণ উশৃংখল আর বদ চরিত্রের অধিকারী। আর ছোট ভাইয়ের মেয়েটা কেবল স্মৃতির সমবয়সী। জয় ওই মেয়ের থেকে বয়সে কতো বড় তারপরও বারবার তার ছোট ভাই-ভাবী প্রস্তাব দিয়েছে, আরও কয়েকবছর আগে থেকে। তখন তো আরও ছোট। ওনার ভাই-ভাবীকে তিনি বেশ ভালো করে চিনে। এসবের আক্রোশ তারা ঐশীকে কথা শোনানোর মাধ্যমে ঠিকই নিবে। তাই তিনি স্মৃতি আর রুপাকে ঐশীর সাথে রেখেছে।

ইলোরা ইয়াসমিন যেতেই সায়মা ঐশীর সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সায়মা ঐশীর কথা অনেক শুনেছে। ছবিতে দেখলেও সামনাসামনি দেখার ইচ্ছে ছিল। ঐশী হাসিমুখে সায়মার কথা শুনছে। মেয়েটা ভীষণ চটপটে বুঝাই যাচ্ছে। ওদিকে যে কয়েক জোড়া চোখ তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাতে তার কোনো হুশ নেই।

জয়ের মামা-মামীরা ঐশীকে দেখে চোখমুখ কুঁচকে নিয়েছে। জয়ের সাথে নিজেদের মেয়ের বিয়ে দিতে তারা তো কম চেষ্টা করে নি। জয়ের সাথে বিয়ে দিতে পারলে তারা তো একেবারে সোনায় সোহাগা হয়ে যেতেন। একেতো ডাক্তার ছেলে, তার উপর এতো সয়-সম্পত্তির উপর তাদের মেয়েরও অধিকার থাকতো। কিন্তু প্রথমে ওই পুতুল আর এখন এই মেয়ে। ইলোরার চয়েস বরাবরই খারাপ। মনে মনে তারা এসবই ভাবছে।

জয়ের বড় মামী প্রথম মুখ খুললেন। তিনি ঐশীকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ তা তোমার বাবা মা তোমাকে বড়দের সালাম করতে শিখায় নি?”

এই প্রশ্নের জবাবে স্মৃতি চট করে জবাব দেয়,

“ সেকি বড় মামী! ভাবী এসেই তো সবাইকে সালাম দিল।”

এবার জয়ের ছোট মামী বলে,

“ ভাবী সেই কথা বলে নি। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার কথা বলেছে। বড়দের যে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হয় জানো না?”

এবার ঐশী হাসিমুখে জবাব দেয়,

“ না মামী। আমাদের ধর্মে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার কোনো নিয়ম নেই। এটা শরীয়ত সম্মত না। শরীয়তে মুখে সালাম দেওয়ার কথা বলা আছে। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলে গুনাহ হয়।”

ঐশীর জবাবে জয়ের দুই মামীর মুখই বন্ধ হয়ে যায়। এরমধ্যেই নিতু দুই গ্লাস শরবত নিয়ে আসে। আর ঐশীকে বলে,

“ ঐশী তারাতাড়ি এটা খেয়ে নাও। বাইরে থেকে এসেছো খেলে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাবে।” -ঐশী বাকিদের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা এখন এগুলো খাবে না জানায়। ঐশী সবে এক চুমুক মুখে নিয়েছে। তখনই জয়ের বড় মামা গলা খাঁকারি দিয়ে ঐশীকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ তা মেয়ে কি নাম যেন তোমার?”

“ তারান্নুম ঐশী।” – ঐশী হাসিমুখে জবাব দেয়।

“ কিসে পড়ো?”

“ ইংলিশে অনার্স করছি। থার্ড ইয়ারে।”

“ কোথায়?”

“ আনন্দমোহনে।”

তিনি এবার তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

“ আমাদের জয় ডাক্তার। তারপাশে এমন মেয়ে ইরি কিভাবে পছন্দ করলো আল্লাহ মালুম।” – বলেই হা হা করে হেসে উঠে। তার সাথে তার বউ ছোট ভাই, ভাই বউও হেসে উঠে।

পিছন থেকে শীতল গলায় জয় বলে উঠে,

“ ওকে আমার পাশে মানাবে নাকি মানাবে না তা আমার উপরেই ছেড়ে দিন বড় মামা। আমি বুঝে নিব সেটা।”

বলেই জয় ঐশীর বাম পাশের একটা সোফায় বসে পড়ে। জয়ের এমন জবাবে তাদের সবার হাসি থেমে যায়। তার বড় মামা থতমত খেয়ে একটা মেকি হাসি দিয়ে বলে,

“ আরে বাবা তুমি ভুল বুঝছ। দেখো তোমাদের ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব তো আমাদেরই বলো। অথচ আমাদের না বলেই ইরি এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, আমাদের একবারো জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না। আমরা তোমার জন্য এর থেকেও ভালো মেয়ে নিয়ে এসে দিতাম।”

জয় কিছু বলবে তার আগেই ইলোরা ইয়াসমিন কিছু নাস্তাসহ ট্রে নিয়ে আসতে আসতে বলে,

“ আমাদের ভালো মন্দ ভাবার দায়িত্ব আমাদের নিজেরই বড় ভাই৷ আমাদের ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব তোমাদের কবে থেকে ছিল। আমার সংসার আমার ছেলে মেয়ের দেখভাল এতবছর ধরে আমি একাই করে এসেছি। কারো জন্য বসে থাকি নি৷ কারণ আমি একাই সেটার জন্য যথেষ্ট। আমি কোনোসময়ই আমার সংসারের বিষয় কোনোকিছু তোমাদের জানিয়ে করি নি। আর আল্লাহর রহমতে আমার প্রতিটা সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। আর রইল ঐশীর কথা। আমার ছেলের জন্য ঐশীর থেকে যোগ্য মেয়ে আর হতেই পারে না। আমার ছেলের কিসে ভালো হবে না হবে সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছে।”

এবার জয় বলে,

“ আর ঐশীকে কিন্তু আমি নিজেই পছন্দ করেছি। আমার কোনো আফসোস নেই, বরং আরও আগে পেলেই ভালো হতো। এখন তো ম্যাডামের জন্য আমার তপস্যা করতে হচ্ছে।” -শেষের কথাটা জয় আস্তে বলে। কিন্তু ঐশী আর স্মৃতি জয়ের কাছাকাছি থাকায় জয়ের কথা শুনে স্মৃতি হেসে দেয় আর ঐশী গরম চোখে তাকায়। জয় তার দিকে তাকিয়ে হেসে তার বড় মামাকে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে বলে,

“ ওসব ছাড়ুন। এখন চা টা নিন, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”

জয়ের বড় মামা চা টা না নিয়ে ইলোরা ইয়াসমিনকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ তোরা আমাদের ডেকে নিয়ে এসে আমাদের অপমান করছিস ইরি।”

“ ভুল বললে বড় ভাই। আবারও ভুল বললে। তোমরাই বিয়ের আগে আমার ছেলের বউকে একবার দেখতে চেয়েছিলে। তাই আমি তোমাদের কথায় সম্মতি দিয়েছি। তোমরা কিছু ভুল কথা বলেছ আমি কেবল সেটার সঠিক জবাব দিয়েছি, ব্যস। বরং এখানে তোমরাই আমার ছেলের বউকে অপমান করছো। আমার ছেলের জন্য কি ভালো হবে না হবে সেটা আমি বুঝবো। সংসার আমার ছেলে করবে, আমার ছেলে যেখানে খুশি সেখানে অন্যকেউ কিছু বলার অধিকার রাখে না।”

পরিস্থিতি অন্যদিকে যাচ্ছে দেখে এতক্ষণে নিতু বলে উঠে,

“ আহা কি যে গম্ভীর কথাবার্তা বলছেন আপনারা। গরম গরম চা সিঙ্গারা সামনে রেখে কেউ এতো কথা বলে নাকি। আগে সবাই খাওয়া শুরু করুন তো।” – নিতুর সাথে রুপা, সায়মা আর জয়ও তাল মিলিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।

এরমধ্যেই সিয়াম আর ফয়সাল কিছু জিনিস নিয়ে বাসায় ঢুকে জয় সেগুলো তাদেরকে ছাঁদে রেখে আসতে বলে। ছাঁদে বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা হয়েছে।

১৩৩.

স্মৃতি ঐশীকে সবটা বাসা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। তার রুমে বসিয়ে ঐশীকে নিয়ে কত রকম কথা। ভাবী এটা ওটা কত্ত কি। ঐশী মেয়েটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকায়। মেয়েটা কৃষ্ণবর্ণের। কে বলে কালো মানুষ সুন্দর হয় না? এই মেয়েটা যে কি সুন্দর। মেয়েটার মুখের গড়ন, বড় বড় চোখ, হাসি কি মিষ্টি। এই মেয়েটাকে যে অসুন্দর বলে তার চোখই নেই। মানুষের গায়ের রঙে কি আসে যায়?

এরমধ্যেই জয় দরজায় নক করে ভিতরে আসে। স্মৃতিকে ছাঁদে ডাকছে বলে পাঠিয়ে দেয়। বড়রা ছাড়া বাকি সবাই এখন ছাঁদে বারবিকিউ এর প্রিপারেশন নিচ্ছে। ইলোরা ইয়াসমিন আর তার ভাই ভাবীরা ড্রয়িংরুমেই আলাপ আলোচনা করছে। তখনকার পরিস্থিতিটা সবাই মিলে সামলে নিয়েছিল। এখন সব স্বাভাবিক। হয়তো কেবল বাইরে থেকে।

ঐশী ড্রেসিংটেবিলে হেলান দিয়ে জয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। জয়ও ঐশীর দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে এসে ঐশীর সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ দুজনই দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ঐশী বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না, চোখ নামিয়ে নেয়। লোকটার চোখে কেমন নেশা নেশা ভাব। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে কেমন জানি লাগে। ঐশী চোখ নামিয়ে নেওয়াতে জয় মৃদু হাসে। এরপর ঐশীর দিকে ঝুঁকে বলে,

“ যেদিন ভালোবাসার জন্য প্রস্তুত হবে, নিজেকে আমার মাঝে বিলীন করার জন্য প্রস্তুত হবে, সেদিনই আমার চোখের দিকে তাকানোর সাহস করো সুহাসিনী। নইলে এভাবেই হেরে যাবে।
এবার চলুন ম্যাডাম আপনাকে আপনার ঘরটার সাথে একটু পরিচয় করিয়ে দেই।” -বলে হাত বাড়ায় জয়৷ ঐশী জয়ের হাত না ধরে জয়কে পাশ কাটিয়ে যায়, জয়ের অলক্ষ্যেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। জয় মুচকি হেসে নিজের মাথায় নিজেই একটা চাটি বসিয়ে দেয়। এরপর সেও ঐশীর পিছন পিছন যায়।

ঐশী জয়ের রুমটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। রুমটা খুব একটা বড়ও না আবার ছোটও না। রুমের একপাশের ওয়াশরুমের দরজা, আরেকপাশের দরজা বারান্দার। ঐশী বারান্দায় গিয়ে দেখে বেশ বড়সড় একটা বারান্দা। বারান্দা দেখে ঐশীর মনটা ভালো হয়ে যায়। এখানে অনেক গাছ রাখা যাবে। ঐশী বারান্দার গ্রীল ধরে দাঁড়ায়। বারান্দার সামনের জায়গাটুকু খালি। এটা বাসার পিছনের দিক। সারি সারি গাছপালা লাগানো। বেশ ভালো লাগে ঐশীর।

জয় পকেটে হাত দিয়ে ঐশীর পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,

“ পছন্দ হয়েছে রুম? ”

ঐশী সামনে তাকিয়েই জবাব দেয়,

“ হুমম।”

“ বাসা?”

“ হুমম।”

“ শাশুড়ী?”

“ হুমম।”

“ ননদ?”

“ হুমম।”

“ বর?”

“ হুমম…. কিহ্!”

ঐশী চট করে জয়ের দিকে ফিরে। জয় এবার জোরে জোরে হেসে উঠে। ঐশীও হেসে উঠে জয়ের সাথে। আর বলে,

“ আপনি খুব পাঁজি আছেন।”

“ খালি তোমার কাছে।”

“ একটা কথা বলি?”

“ হাজারটা বলো।”

“ পার্সোনাল….”

“ ঐশী….. কয়েকদিন পর তুমিও এই পরিবারের সদস্য হবে। এতো আমতা আমতা করলে কি করে হবে বলো তো। এই সবকিছুই তোমার এটা মানতে শিখো।”

ঐশী হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলে,

“ আসলে মামাদের সাথে আন্টির কোনো সমস্যা আছে নাকি আমার জন্যই এমনটা…..”

“ ওহহ এই ব্যাপার। আসলে মামাদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা ভালো না। ফুপি ছাড়া আমার দাদার বংশে তেমন কেউ নেই। আব্বুর চাচাতো ভাইবোনরা আছে তবে আপন বলতে ফুপিই। বাবা যখন মারা যায় তখন মামাদের প্রয়োজন ছিল আমাদের পাশে। কিন্তু তারা আমাদের পাশে থাকার নাম করে আমাদের সম্পত্তি হাতানোর চেষ্টায় ছিল। আমাদের দুর্ভোগের সময় তাদের অনেক খারাপ রুপ দেখেছি ঐশী। কেবল মা শক্ত ছিল বলে সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু মন থেকে তারা উঠে গেছে। এরপর আর তাদের সাথে আমরা সম্পর্ক রাখি নি। কিন্তু তারাই আমাদের গায়ে পড়ে সম্পর্কটা রেখেছে। মা যদিও তাদের মুখের উপর সব বলে দেয় তবে তারা সেসব গায়ে লাগায় না। তাই তোমার জন্য কিচ্ছু হয় নি। এই সম্পর্কটা এমনই। সো চিল।”

ঐশী একমনে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছে। জয় ঐশীর দিকে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে। এরপর ঐশীর মাথার কাছে নিজের ডান হাতটা রেখে ঐশীর দিকে ঝুকে দাঁড়ায়। ঐশীর মুখের সামনের খুচরো চুলগুলো তার কানে গুঁজে দেয়। জয়ের ছোঁয়ায় ঐশী তার ভাবনা থেকে বের হয়ে আসে। জয়কে নিজের এতো কাছে দেখে ভড়কে যায়। সে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই জয় ঐশীর ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। আর নরম স্বরে বলে,

“ কথা বলো না। আমাকে দেখতে দেও। তোমাকে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে ঐশী। তুমি এতো সুন্দর কেন? এতো জ্বালাময়ী কেন তুমি? খুব জ্বালাও আমাকে।
উফফ আরও চৌদ্দটা দিন! কোনো মানে হয়? তোমাকে পাওয়ার জন্য আরও চৌদ্দটা দিন অপেক্ষা করতে হবে ঐশী৷ এটা যে কত কষ্টের তা তুমি বুঝবে না। আই ওয়ান্ট ইউ।”

জয়ের এমন হুটহাট আচরণে ঐশী সবসময় ভীষণ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় না। এই তো এতোক্ষণ ভালো করে কথা বলছিল এখন হুট করে এসব বলা শুরু করেছে। ঐশী নিজেকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। জয়কে সে কিছু বলতে চায়। এখনই বলাটা ভালো। ঐশী বলে উঠে,

“ ডাক্তার সাহেব? ”

জয় ঘোর লাগা গলায় জবাব দেয়,

“ হুমমমমম….”

“ আপনার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। ইটস সিরিয়াস।”

জয় এবার নিজেকে স্বাভাবিক করে ঐশীর দিকে তাকায়। ঐশী এমন কিছু বললেই তার ভয় হয়। মনে হয় এই ঐশী বিয়েটা ভেঙে দিল।

“ বলো।”

“ আসলে আমি জাঁকজমক করে বিয়ে করতে চাই না। আমার পছন্দ না এগুলো। আমার বরাবরই শখ ছিল সাদামাটা একটা বিয়ের। মসজিদে বিয়ে করার। আসলে আমার মনে হয় বিয়ে খুব আনন্দের কিছু না। এটা মানুষের জীবনে একটা পরিবর্তন, হয়তো নতুন কিছুর শুরু, হয়তো না। কিন্তু এতো জাঁকজমক করে আয়োজন করে অন্যের পেট ভরে অন্যের গসিপের অংশ হওয়ার কোনো মানেই নেই। বিয়েতে যারা আসবে তারা কয়জনই আমাদের দোয়া করবে বলেন তো? আসবে ফর্মালিটি স্বরুপ কিংবা শো-অফের জন্য কিছু গিফট দিয়ে খেয়ে দেয়ে খুঁত ধরে চলে যাবে। এর থেকে আমার মনে হয় স্বল্প একটু আয়োজনই ভালো। কিন্তু ওই আয়োজনটুকুতে আমরা সবকিছু সুন্দরভাবে অনুভব করতে পারব। কেবল আপনার কাছের কয়েকজন আর আমার কাছের কয়েকজন। অবশ্য আমার কাছের মানুষ না, আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা প্রয়োজন হবে। এই কয়জন মিলে একটা সাধারণ আয়োজন করে কি বিয়েটা করা যেতে পারে?”

জয় বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ভাবে। তারপর ঐশীর দিকে তাকিয়ে বলে,

“ পারে।”

ঐশীর মুখে হাসি ফুটে উঠে। জয়ও হেসে ফেলে। ঐশীর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলে,

“ সত্যি বলতে আমিও এসব পছন্দ করি না। কিন্তু বিয়ে নিয়ে সবার আলাদা কিছু শখ থাকে তো। বিশেষ করে মেয়েদের। তবে তোমার যখন এটাই ইচ্ছা তাহলে এমনটায় হবে। আর জানো তো যেই বিয়ে তে খরচ কম সেই বিয়েতে বরকত বেশি। আমি আমাদের সম্পর্কটা বরকতময় হওয়ার আশা রাখি।”

“ আপনি কি আমার মন রাখবার জন্য….. ”

জয় ঐশীকে কথা শেষ না করতে দিয়েই বলে,

“ না ঐশী এমন কিছু না। আমি নিজেও এসব সত্যিই পছন্দ করি না। যেখানে মিয়া বিবি দুজনেই এসব পছন্দ করে না সেখানে এসব আয়োজন করার কোনো মানেই হয় না৷ যেখানে আয়োজনটা আমাদের ঘিরে। আমরাই তো কম্ফোর্টেবল না। তবে তুমি এটা আগে বললে না কেন?”

“ বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেন যেনো বলা হয়ে উঠে নি।”

ঐশী সত্যিই এই কথাটা জয়কে বলতে চেয়েছিল। কিন্তু বিয়েটা নিয়ে দ্বিধা থাকায় আর বলা হয়ে উঠে নি। আজকে ও এমনেতেই এটা বলতো। বাসায় হওয়া ঘটনার জন্য না।

জয় একটু চিন্তিত হয়ে বলে,

“ এখন সবাইকে ম্যানেজ করাটাই টাফ হয়ে যাবে। বাট তুমি টেনশন নিয়ো না। আমি সব সামলে নিব। তুমিও তোমার বাসায় বলে দেখো।”

“ হ্যা আমি বলবো।”

“ আচ্ছা এবার ছাদে চলো। ওরা সবাই অপেক্ষা করছে। ”

১৩৪.

জয়দের বাসাটা বেশ নিরিবিলি। আশেপাশে বড় বড় বিল্ডিং খুব কমই আছে। ছাঁদের বর্তমান পরিবেশ বেশ রমরমা। সিয়াম, সায়মা, ফয়সাল, নিতু, রুপা, স্মৃতি,জয় আর ওর কাজিন সবাই আছে। নিতু আপুর দুইটা বেবি। একটা ছেলে একটা মেয়ে। ছেলেটা সবে ক্লাস ওয়ানে পড়ে আর মেয়েটাকে এখনও স্কুলে দেয় নি। রুপা আপুরও দুইটা বেবি। একটা ছেলে একটা মেয়ে। ওরা জমজ।

বড় মামার ছোট ছেলে মাজিদ, ছোট মামার মেয়ে শ্রাবণী, আর তার ভাই শোভন। সবাই খুব মজা করছে। ওদের মা বাবার মাঝে হয়তো মিল নেই কিন্তু ভাইবোনদের মাঝে খুব মিল। স্মৃতি, মাজিদ, শ্রাবণী তিনজনই সমবয়সী। শোভনটাই খালি একটু ছোট। ক্লাস নাইনে পড়ে। ওদের সাথেও ঐশীর খুব ভাব হয়ে গেছে।

ঐশী আপাতত রেলিঙে হেলান দিয়ে সবাইকে দেখছে। বারবিকিউটা জয় করছে। জয় নাকি বারবিকিউটা খুব ভালো করে। জয়ের পড়নে বাদামী টিশার্ট আর সাদা টাউজার। চুলগুলো এলোমেলো। ঐশী জয়কে এমনভাবে খুব কমই দেখেছে। কি অভ্যস্ত হাতে কাজ করছে আবার নিতু আর রুপা আপুর বাচ্চাগুলোর সাথে খেলছে। আবার সিয়াম ভাই ফয়সাল ভাইদের সাথে মিলেও অন্যদের পচাঁচ্ছে। ঐশী আজকাল জয়কে বেশ গভীরভাবে পরখ করে। আগে তো কেবল খুঁত ধরার ধান্দায় থাকতো তবে আজকাল ঐশী জয়কে চেনার চেষ্টা করে।

এখন রাত আটটা বাজে। ঐশী জানে আজকে বাসায় আরও অনেক কথা শুনতে হবে। যদিও ইলোরা ইয়াসমিন তার বাবাকে ফোন দিয়ে বলেছে। তার বাবাও গদগদ হয়ে ইলোরা ইয়াসমিনের কথায় হ্যা হ্যা করেছে। তবে সে জানে তা কেবল উপরে উপরে। কিন্তু সে এখন ওসব ভেবে এই সুন্দর সময়টা নষ্ট করতে চায় না।

খাবার পর্ব শেষে সবাই ছাঁদে মাদুর পেড়ে আড্ডা দিচ্ছে। কেবল ঐশী আর জয় ছাড়া৷ তারা দুজন রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিজেদের মতো গুটুর গুটুর করে অনেক গল্প করছে। বেশিরভাগ কথাই ঐশী বলছে। আর জয় তা উপভোগ করছে।

#ক্রমশ…..

( কপি করা নিষেধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here