সূর্যোদয় পর্ব ২৫

0
30

#সূর্যোদয়
#পর্ব_২৫
#কারিমা_দিলশাদ

৬৪.

জয় নৃত্যশৈলী একাডেমির সামনে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতর থেকে গানের সুর আর ঘুঙুরের ছন্দ ভেসে আসছে। স্মৃতি তাকে একটা প্যাকেট ঐশীকে দিতে বলেছিল। বেশ কয়েকদিন আগে। তবে সে এতদিন ঐশীর সামনে আসতে চায় নি। তবে পরশু ঐশী ফোন দিয়েছিল এটার জন্য। তাই আজকে না পারতে আসতে হলো। কিন্তু সে ঐশীর সম্মুখীন হতে চাইছে না।

এই মেয়েটার সামনে গেলেই তার নিজের মন নিজের সাথেই বেই’মানী শুরু করে দেয়। মেয়েটার কথা মনে হলেই এখন তার কান্না পায়। এখন মেয়েটার সামনে গেলে না জানি সে উল্টাপাল্টা কি করে ফেলে।

এভাবেই আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সে শপিং ব্যাগটা নিয়ে এগোয়। দরজায় নক করলেও ওপাশ থেকে গান এবং ঘুঙুরের সুর ব্যতিত অন্যকোনো আওয়াজ আসে না। হয়তো শুনতে পায় নি কেউ। সে দরজায় হালকা ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে যায়।

সামনে তাকাতেই তার হৃদপিণ্ড যেন তার শরীর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সামনে নৃত্যরত তার না পাওয়া প্রেয়সী। চোখ ভরে সে ঐশীকে দেখতে থাকে। কিন্তু তবুও যেন মন ভরে না।

সাদা কামিজ, লাল টুকটুকে সালোয়ার-ওড়না, ওড়নাটা কাঁধের এক সাইড থেকে নিয়ে অন্য সাইডে কোমরে বেঁধে রাখা, সামনের কিছু চুল নিয়ে পিছনে ক্লিপ দিয়ে বাঁধা, হাতের চুড়ি, কানের দুল, কাজলে আঁকা চোখ সবকিছু তাকে মোহাচ্ছন্ন করছে। আর লাল টুকটুকে ঠোঁট যেন তার জন্য রেড সিগন্যাল। নাহ্ এতো জ্বালা আর সহ্য করা যায় না। সে ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়।

৬৫.

একটু পরেই ঐশী বের হয়ে আসে। সে দরজার আওয়াজ শুনে এসেছিল। এসে দেখে জয় ওইদিক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে গিয়ে জয়কে ডাক দেয়। কিন্তু জয় কোনো উত্তর দেয় না। আবার ডাকলে জয় তারদিকে ঘুরে। কিন্তু জয় মাথানিচু করে আছে।

ঐশী তা দেখে কিছুটা অবাক হয়৷ জয় তার দিকে না তাকিয়েই বলে,

“ স্মৃতি এটা আপনাকে দিতে বলেছে। ধরুন।”

ঐশী সেটা জয়ের হাত থেকে নেয় কিন্তু জয় এখনও নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। ঐশী আশ্চর্য হয়ে যায় লোকটা তারদিকে তাকিয়ে কথা বলছে না কেন! সে নিচ থেকে উঁকি দিয়ে জয়কে দেখার চেষ্টা করে। তখন জয় তারদিকে তাকায়।

জয় তাকাবে না তাকাবে না করেও ঐশীর দিকে তাকায়। এই মেয়েটাকে এতো সেজেগুজে তার সামনে কেন আসতে হবে। ঘর্মাক্ত শরীর ও মুখশ্রী। সামনের কিছু খুচরো চুল ঐশীর মুখে এবং ঘেমে যাওয়া গলায় লেপ্টে আছে। ঐশীর গলায় একটা কুচকুচে কালো তিল আছে। যা সবসময় তাকে আকৃষ্ট করে। আর এই ঠোঁট…উফফফ।

জয়ের ইচ্ছে করছে ঐশীর এই পাতলা শরীরটাকে নিজের বলিষ্ঠ শরীর দিয়ে ঝাপটে ধরতে। ওর ওই লাল রং দেওয়া ঠোঁট দুটো তার পুরুষালি ঠোঁট দিয়ে পিষে ফেলতে। জয় আর থাকে না সেখানে। ঐশীর সাথে কোনো কথা না বলে বাইকটা ওখানে ফেলেই ঝড়ের মতো চলে যায়। আর ঐশী অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে হা করে জয়ের চলে যাওয়া দেখে। লোকটা মাঝেমধ্যে এমন অদ্ভুত ব্যবহার কেন করে?

৬৬.

জয় বেশ কিছুটা পথ চলে গিয়েছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সে। ঐশীর ওই মুখশ্রীটা বারবার তার চোখের সামনে ঘুরঘুর করছে। সে মাথার চুলগুলো খামচে ধরে ঝাঁকি দেয়। একটা মেয়েকে নিয়ে সে এমন চিন্তা কিভাবে করতে পারে। ছিঃ। পুতুলকে নিয়েও সে কখনো এসব চিন্তা করে নি। ঐশী যদি তার মনের কথা কখনো জানতে পেরে যায় তাহলে আর জয়ের মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না। ছিঃ। ইয়া আল্লাহ মাফ করো। ইয়া মাবুদ মাফ করো আমায়।

নাহ্ ঐশীর মুখটা তার চোখের সামনে থেকে কোনোভাবেই যাচ্ছে না। সে বিড়বিড় করে বলে,

“ স্টপ দিস। স্টপ দিস ঐশী। গেট আউট। প্লিজ গেট আউট….. আই সেইড গেট আউট।”

পিছনে বাইকের হর্ণের আওয়াজে জয় চমকে উঠে। সে একদম রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। একটুপর দলে দলে কিছু বাচ্চা বেরিয়ে আসে। জয় সেদিকে অতো খেয়াল করে না। খেয়াল করলে বুঝতে পারতো এরা ঐশীর ডান্স ক্লাসেরই বাচ্চা। বেশ সময় নিয়ে স্বাভাবিক হয় জয়। এরপর খেয়াল আসে সে বাইক ফেলেই চলে এসেছে। সে নিজেই নিজের কপাল চা’পড়ায়।

৬৭.

দুরুদুরু বুকে সে আবার ফিরে আসে। গেটের কাছে এসে একটু উঁকি দেয়। নাহ্ ঐশী নেই। এরপর সে তাড়াতাড়ি পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করতে নেয়। এরমধ্যেই শুনতে পায়,

“ আপনি ওমন দৌড়ে চলে গেলেন কেন? আর মাঝেমধ্যে এমন অদ্ভুত ব্যবহারই বা কেন করেন?”

বলে না যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। জয়ের দশাও তেমন। ঐশী জয়ের এই অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ জানার জন্যই আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। বাচ্চাদেরও সে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। জয় এখনও ওদিকে ঘুরে আছে। ঐশী আবার জয়ের উদ্দেশ্য বলে,

“ কি হলো কথা বলছেন না কেন? এদিকে ঘুরুন। ”

জয় একটু সময় নিয়ে ঐশীর দিকে ঘুরে কিন্তু এবারও মাথা নিচু করে রাখে। ঐশীর এবার বিরক্ত লাগে। সে সেই বিরক্তি নিয়েই বলে,

“ আমি কি আপনার শ্বশুরবাড়ির লোক, যে আমাকে দেখে মেয়েদের মতো লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখেন? ”

জয় মনে মনে জবাব দেয়,

“তুমি আমার শ্বশুরবাড়ির বউ লাগো।” — কথাটা অপ্রকাশিতই রয়ে যায়। কিন্তু জয় মাথা উঁচু করে না।

৬৮.

আজকে মারুফের বাসা থেকে লোক আসবে ঐশীকে দেখতে। এই প্রথমবার সে এমন অফিসিয়ালভাবে কোনো পাত্রপক্ষের সামনে যাচ্ছে। এর আগেও অনেক বিয়ের প্রস্তাব এসেছে তবে কোনোটা এভাবে দেখাদেখি পর্যায়ে যায় নি৷ আর জয়ের মা যখন দেখতে এসেছিল তখন তিনি একেবারে সাদামাটাভাবেই ঐশীকে দেখে গেছে। মনেই হয় নি যে পাত্রপক্ষের কেউ তাকে দেখতে এসেছিল। ক্যাজুয়ালভাবে বেড়াতে এসছে তারা, এটাই ভেবেছিল ঐশী। এই বিষয়ে সে পরে জানতে পেরেছিল। এরপর তো সোজা জয়ের সাথে রেস্টুরেন্টে মিটিং।

এটাই প্রথম তাম-ঝাম করে পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়া। ওরা কি আদি কালের মতো হাত,পা, দাঁত, চুল, নখ এসব দেখতে চাইবে? হেঁটে দেখাতে বলবে? এসব শুনলেই তো তার মেজাজ বিগড়ে যাবে।

আবার এমন নাও করতে পারে। শুনেছে স্যারের পরিবারের সবাই শিক্ষিত, অনেকে অনেক ভালো ভালো জায়গায় কর্মরত। উনার নিজের বোনেরাই নাকি একজন ব্যাংকের কর্মকর্তা আর একজন শিক্ষক। সেই হিসেবে এমন একটা পরিবার থেকে সে ন্যূনতম ভদ্র আচরণ চাইতেই পারে।

ঐশীকে তার মা খালারা মিলে বেশ জোর জবরদস্তি করে একটা শাড়ি পড়িয়েছে। একটা কালো রঙের শাড়ি পড়েছে ঐশী। যদিও তার মা আর বড়খালা কালো শাড়ি পড়তে মানা করেছিল। তাদের ভাষ্য শ্যামলা মানুষ কালো পড়লে আরও কালো দেখা যাবে। কিন্তু ঐশী তাদের কথার তোয়াক্কা করে নি। শাড়িটা পড়ার পর ঐশীর মা নিজেই মেয়ের থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলেন না। কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করেন না।

কালো শাড়ি, দু হাত ভর্তি কালো চুড়ি, আর ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস এইটুকুতেই ঐশীকে অপার্থিব লাগছিল।

এদিকে মারুফ মেসেজ দিয়েছিল সে নাকি আজকে আসতে পারবে না। সে কালকে দুপুরের পরে ময়মনসিংহের বাইরে একটা কাজে গেছে। তবে সে তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করবে।

৬৯.

ঐশীর বাবার এক বন্ধুকে দিয়ে মারুফ ঐশীর বাসায় প্রস্তাব পাঠায়। আসলে মারুফ চাইছিল বিষয়টাকে যেন এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হিসেবেই সবাই জানে। ঐশীরা ভেবেছিল হয়তো কয়েকজন মানুষ আসবে। কিন্তু মারুফের পরিবার থেকে আসা লোক দেখে তারা অবাক। প্রায় ১৫-১৬ জনের বেশি মানুষ নিয়ে এসেছে তারা। একদম আন্ডা বাচ্চা সব নিয়ে। মারুফের মা, মারুফের দুই বোন, তাদের হাজব্যান্ড, তার ছোট ভাই, তার দুই মামা-মামী, তার দুই খালা, ফুফু আর বাচ্চাদের কথা বাদই দিলো।

অথচ যখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাদের পক্ষ থেকে কয়জন আসবে তখন তারা বলেছিল কয়েকজন আসবে। কয়েকজনের কথা বলে পুরো চৌদ্দগোষ্ঠী নিয়ে আসাটা কেবলই অপরপক্ষকে অপমান এবং বিব্রত করার উদ্দেশ্যই।

এই বিষয়টা দেখেই ঐশীর মনে এক বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হয়। কিন্তু ঐশীর জানা ছিল না আরও অনেক কিছু তার জন্য অপেক্ষা করছে।

#ক্রমশ.…

( কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কেউ কপি করবেন না। তবে শেয়ার করতে পারেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here