সূচনাতে প্রেম পর্ব ৩

0
63

#সূচনাতে_প্রেম
#নুসাইবা_রেহমান_আদর
#পর্ব৩

সাফোয়ানের কথা শুনে সানা আৎকে উঠলো।সাফোয়ান এই কথা বলতে তাহলে তাকে এখানে ডেকে নিয়ে আসছে? আসলে তাকে নিয়ে লাঞ্চে না নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে নিয়ে এসেছে? পরিবারকে ছেড়ে যাওয়ার কথা শোনা মাত্রই সানার দিন দুনিয়ে বিষাদের দমকা হাওয়ায় ভেসে গেলো। এতোক্ষনে সব ভালো লাগা ক্ষনিকের মধ্যে উধাও হয়ে গেলো। সাফোয়ান কে নিয়ে তার মনের মধ্যে গড়া সদ্য অনুভূতিগুলো যেনো ডানা মেলে উড়ে গেলো। কেন যেন স্বার্থপর মনে হচ্ছে সাফোয়ান কে অনেক। তাকে লাঞ্চে নিয়ে এসে তার সিদ্ধান্ত জানানো কি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো? তবুও সানা সাফোয়ানের কোন প্রশ্নের জবাব দিল না। যতক্ষণ সাফোয়ানের সাথে বাহিরে ছিল চুপচাপ বসেছিলো। সাফোয়ানের করা প্রতিটা প্রশ্নের জবাব হুম আর না তে দিয়েছে।

খাওয়া শেষে যখন আবারো সানাকে প্রশ্ন করলো সাফোয়ান।

~আপনার কি মতামত এই বিষয়ে আপনি বললেন না তো সানা?

সানা যতোই এই প্রশ্নটাকে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলো সাফোয়ান তখন বারবার একই প্রশ্ন করছে যাচ্ছিলো। সানা এবার সহ্য করতে পারলো না। আকস্মিক ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিয়ে টেবিলে রেখে দ্রুত ওখান থেকে বেরিয়ে গেলো। সানা যে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলবে তা সাফোয়ানের ভাবনার বাহিরে ছিলো। সাফোয়ানকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে সামনে রিকশা পেয়ে সেটাতে উঠে পরলো। আর সাফোয়ান সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কারন সে বুঝতে পারল না সানার এইরকম ব্যবহারের কারণ। প্রচন্ড আশাহত হলো সে। কি কারনে এসেছিলো আর হলো টা কি। সানার এইরকম ব্যাবহারে অনেক কষ্ট পেলো সাফোয়ান।

সানা তাদের বাসার সামনে দরজায় দাড়িয়ে আছে। কলিংবেল বাজানোর সাহস পাচ্ছেনা। কারন যদি সাফোয়ানের কথা জিজ্ঞেস করে সে কি উত্তর দিবে। রেষ্টুরেন্টে সাফোয়ান কে ফেলে সে চলে এসেছে। কেনো এসেছে এই কথার জবাব তার কাছে নাই। লোকটা কে ওভাবে ফেলে আসা কি তার উচিৎ হয়েছে এভাবে? না এতো কিছু ভাবতে হবেনা। একি তো তার কোনো ভাবনা ছিলোনা বিয়ে নিয়েম হুট করে হয়ে যাওয়া ওই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটা সে মেনে নিতে পারছে না। অথচ কি সুন্দর তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। নিজের বাড়ি পরিবার ছেড়ে সে কেনো যাবে?

দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগে শেষমেষ সানা কলিং বেল বাজালো কাপাকাপা হাতে। ভাই যদি জানে সে একা একা এসেছে তাহলে কি হবে সে ভাবতে পারছেনা।

কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে সুমাইয়া এসে দরজা খুললো। আর সানাকে বলল,

~আমার ভাইজান ও না কি যে করে। হঠাৎ হঠাৎ তার জরুরী কাজ পরে যাবে। আমাকে মাত্রই ফোন দিয়ে বলল তোমাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে তাই চলে গেছে। বলেছিলো সাইফকে দিয়ে দিতে কিন্তু সাইফ যেতে মানা করে দিয়েছে। আজ সাইফ এখানে থাকবে। তার কাজের জন্য তোমাদের ঘোরাফেরা হলো না ভিতরে আসো।

~কখন ফোন দিয়েছে তোমাকে তোমার ভাইজনা ভাবি?

~এই তো মাত্রই ফোনটা কেটে দিলো। আর তুমি কলিংবেল বাজালে ।

সাফোয়ান যে সুমাইয়াকে মিথ্যে কথা বলেছে সেটা সে বুঝতে পারছে।মিথ্যে কথার জন্যই সানাকে কোন জবাবদিহি করতে হবে না। কিভাবে তার মনের কথা সে বুঝে গেল আল্লাহ জানে । সানার মনের মধ্যে প্রচন্ড অনুশোচনা বোধ হতে লাগলো। সাফোয়ান তার কথা ভেবে আগেই বাড়িতে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল যাতে বাড়ির কেউ সন্দেহ না করে। অথচ সে কিনা লোকটাকে ফেলে চলে এসেছে একা একা। লোকটা নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়েছে সে তো পারতো চুপচাপ থেকে একসাথেই আসতে। অথচ অনিচ্ছাকৃতভাবে লোকটাকে সে অপমান করেছে। সুমাইয়ার পিছু পিছু সেও বাসায় ঢুকলো। সোফায় বসে বসে সাইফ কার্টুন দেখছে টিভিতে। ১৪ বছরের ছেলেটা বাচ্চাদের মত কাজ কারবার করে। আজ থেকে সাত বছর আগে তার বাবা-মা মারা গেছে।তখন থেকেই সাইফ সুমাইয়া আর সফোয়ানের এর কাছে বড় হয়েছে। দুই ভাই বোনের কলিজা সাইফ। সুমাইয়া এই বাসায় আসার পর থেকে সাইফ প্রচন্ড একলা হয়ে গিয়েছে। সাফওয়ান সারাদিন অফিস করে রাত আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরে। পুরোটা সময় সাইফ বাড়িতে একা থাকতে থাকতে ডিপ্রেশনে পরে যাচ্ছে। সাইফের দিকে তাকালে প্রচন্ড মায়া হচ্ছে সানার। সেও তো মা ছাড়া মানুষ হয়েছে। মা ছাড়া বড় হতে কত কষ্ট লাগে সেও জানে। তবুও তো তার সাথে তার বাবার বড় ভাইয়া ছিল। কখনো কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দেয়নি। অথচ ছেলেটা সারাদিন একা একা থাকে। সানাকে দেখে সাইফ হাসি মুখে বলে,,

~মিষ্টি ভাবি তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে এলে তোমাদের ঘোরাফেরা শেষ হয়ে গেল?

সানা উত্তর দেওয়ার আগেই সুমাইয়া বলে উঠলো,,

~জানিস তো ভাইয়া কত কাজ পাগল। গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল তাই তোর ভাবিকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে।

~মিষ্টি ভাবির কপাল পুড়ছে ভাইয়ের মত একজন নিরামিষকে বিয়ে করে। সারাদিনরাত কাজকর্ম করবে ভাবীকে নিয়ে আর ঘুরতে পারবে না। তুমি চিন্তা করো না মিষ্টি ভাবি ভাইয়া না নিয়ে গেলেও আমি তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব। তুমি আর আমি মিলে অনেক মজা করব বাড়িতে। তুমি তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়িতে চলে এসো আমার একা একা ভালো লাগেনা।

~আচ্ছা যাবো তো। এখন তুমি টিভি দেখো আমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি।

সানা দ্রুত ওখান থেকে কেটে পরলো। সাইফের কথা শুনে তার মধ্যে অনুশোচনা বোধ দিগুণ বেড়ে উঠছে।উনিতো সাইফের কথা ভেবে সানাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। অথচ সানা তাকে ভুল বুঝে চলে এসেছে। রাতে শুয়ে শুয়ে এইগুলোই ভাবছিল সানা।যেভাবেই হোক সাফোয়ান থেকে ক্ষমা চাইতে হবে তার। সারাদিন এই কথা ভাবতে ভাবতেই তার সময় কেটেছে। কি এক কাজ করল যার অনুশোচনার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু সাফোয়ানের ফোন নাম্বার তার কাছে না থাকায় কল দিতে পারছেনা সে। সব ভাবনা বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পরলো সানা।

সেদিনের পর কেটে গেল আজ ৯ দিন।আর এই ৯ দিনে সানার সাথে কোন রকম যোগাযোগ করেনি সাফোয়ান। আচ্ছা সাফোয়ান কি তার উপর রাগ করে এভাবে আছে? এসব ভাবতে ভাবতেই কলেজের জন্য রেডি হচ্ছিলো সানা।আজ তার কলেজে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে। রেডি হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সানা। কলেজে গিয়ে সানার বেস্ট ফ্রেন্ড বৃষ্টিকে খুঁজতে লাগলো সানা। অনেকদিন যাবত বৃষ্টির সাথে তার কোনো রকম যোগাযোগ নেই। বৃষ্টির তার দাদু বাড়ি গিয়েছিল সেই থেকে তাদের যোগাযোগ বন্ধ। আশেপাশে তাকিয়ে তাকেই খোঁজার চেষ্টা করলো সানা। কিছু দূরে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে দেখি সানার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো সে। সাডেন জড়িয়ে ধরায় সেই ব্যাক্তিও কিছুটা ভরকে যায়। সানা কে দেখে এরপর সেও জড়িয়ে ধরে। সানা তাকে দেখে উৎসাহিত গলায় বলে উঠে,

~জানিস জান তোকে এতদিন আমি কত মিস করেছি? কোন ভাবেই তোর সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে আমার কতটা খারাপ লেগেছিল। কিন্তু তোর সাথে যোগাযোগ আর করতে পারলাম না।

~,আমিও তোকে অনেক মিস করেছি সোনা।কিন্তু কি করবো বল গ্রামে যাওয়ার পর আমার আর আম্মুর ফোনগুলো চুরি হয়ে গেছে। তাই কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। কিছু সমস্যার মধ্যে থাকায় ঢাকায় এসে ফোন কিনবো ভেবেছি। আজ চল তুই আমি গিয়ে আমার ফোন কিনে নিয়ে আসি।

~আচ্ছা ক্লাস শেষে তুই আর আমি যাব নে। বাকি দুইজন কই?

~নীলিমা তো ওর বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গেছে আসে নাই। আর লিসান তো ফাকিবাজ জানিস ভালোভাবে।

#চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here