সিন্ধু ইগল, পর্ব:১৮

0
601

সিন্ধু ইগল – (১৮)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

যে-কোনো নারীর কাছে সব থেকে দামী তার রূপ। আজ সেই রূপের করুণ দশা আলিয়ার। ক্ষিপ্ত কুকুরকে তার কাছে লেলিয়ে দিয়ে রেজা ব্যালকনির দরজা হালকাভাবে লাগিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেটে সুখ টান দিচ্ছিল। এত পাশবিক অত্যাচার সহ্য করার পরও আলিয়া কোনোভাবেই বাংলোর মালিকের খোঁজ দিতে নারাজ। আত্মচিৎকারে কান ঝালাপালা হওয়ার দশা হতেই রেজা গিয়ে ক্ষিপ্ত কুকুরকে ধরে আটকে নেয়৷ আলিয়ার সারা শরীরে কামড়, আঁচড়ের দাগ তো ভরেছেই, তার সুন্দর চেহারাটাতেও বাদ নেই আঁচড়ের দাগ পড়তে। আত্মচিৎকারের মাঝে আলিয়া শুধু জায়িন বলেই চিৎকার করছিল। তার ধারণা, সম্পর্কটা অল্প দিনের হলেও তার প্রতি জায়িনের নিশ্চয়ই একটু হলেও মায়া অনুভব হবে। আলিয়ার এমন বোকামো ভাবনাটা রেজা বুঝতে পেরে বিরক্ত ছাড়া কিছু হতে পারল না। এত নির্মম অত্যাচারের পরও মেয়েটা কী করে জায়িনের থেকে ইতিবাচক কিছু আশা করে? মেয়েরা এত বোকা হয় কেন? কেন তারা জায়িনের সুন্দর চেহারার পেছনের ভয়ঙ্কর রূপটা খুঁজে পায় না? তারা কি কোনোদিন জানতে পারবে না, জায়িন মাহতাব শুধু তার পরিবার আর তার অতি আকাঙ্ক্ষিত প্রিয় রমণী ছাড়া আর কারও প্রতি কোমল নয়?

নিস্তেজ, বিধ্বস্ত আলিয়াকে ফ্লোর থেকে তুলে দেয়ারের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিলো রেজা। সেন্টার টেবিলের ড্রয়ার থেকে তুলো আর স্যাভলন বের করে তা দিয়ে কাড়ম আর আঁচড় দেওয়া জায়গা পরিষ্কার করতে করতে আলিয়াকে বলল, ‘ডক্টরের ট্রিটমেন্ট আপনার নসিবে নেই আলিয়া। এটুকু সেবা দিচ্ছি তা-ই আপনার নসিবের জোর। তবে মুখ খুললে এই কামড় আর আঁচড় থেকে ভয়ানক কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই আমি ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করে দেবো।’

কথাগুলো বলে থামল রেজা, তাকাল একবার আলিয়ার মুখের দিকে। যন্ত্রণায় দগ্ধ, তবুও ঠোঁট কামড়ে সহ্য করে যাচ্ছে। একটা কথাও মুখে আনছে না। তাচ্ছিল্যের সুরে রেজা বলে উঠল, ‘ঘরের আশেপাশে আমাকে ছাড়া আর কাউকে দেখছেন না। দেখলেন কুকুরটাকে আমিই আপনার খেদমতে ছেড়ে গেলাম। তাও আমাকে না ডেকে স্যারকে স্মরণ করছিলেন। কী করে এখনো জায়িন মাহতাবের থেকে আদর পাওয়ার প্রত্যাশা করেন বলেন তো?’

ক্ষীণ সুরে জবাব দিলো আলিয়া, ‘ও এখানে নেই, তাই না? আমি জানি, ও থাকলে আমার এই ভয়াবহ মুহূর্ত সহ্য করতে পারত না। তাই তো তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে গেছে৷’ বলেই মলিন হাসল একটু।

এমন কথাগুলো শুনে এই মুহূর্তে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়া উচিত, না কি আলিয়াকে করুণার চোখে দেখা উচিত? রেজা ভেবে পেল না। চাইলেও কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে না পেরে চেহারাটা যেমন হয়, তেমন করেই আলিয়ার দিকে চেয়ে বসে রইল সে। খানিকক্ষণ মৌনতা চলার পর রেজা বলল, ‘এখন আপনার জায়িন তার প্রেমিকার সঙ্গে ঘুমাচ্ছে।’

কথাটা শুনেই আলিয়া চোখ তুলে তাকাল রেজার দিকে। যেদিন আয়মানের থেকে এসব জেনেছিল জায়িনের ব্যাপারে, সেদিন তার সারা পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে মন চাচ্ছিল। জায়িনকে অন্য নারীর কাছে দেখার মতো সহ্যশক্তি তার ছিল না। সে ভেবেছিল, নিজের এই চেহারা আর শারীরিক সুখ দিয়ে এক সময় জায়িনকে সে তার প্রতি দুর্বল বানিয়েই ছাড়বে। বাকি প্রেমিকাদের নিমিষেই ভুলে যাবে জায়িন। কিন্তু তাকে জেলে আটকানোর পর থেকে জায়িনকে নিয়ে তার সমস্ত ধারণা একেক করে বদলে যাচ্ছে।

রেজা বোধ হয় বুঝতে পারল আলিয়ার খারাপ লাগাটা।সে যেন জায়িনের থেকে আর কিছু আশা না করে তাই চরম সত্যটা বলল, ‘যৌন আবেগ আর মনের আবেগের মাঝে পার্থক্য অনেক। মনের আবেগ বলতে বোঝাচ্ছি ভালোবাসাকে। এই আবেগে ফেঁসে গেছে জায়িন মাহতাব। আপনার সঙ্গে সে ঘুমিয়ে সন্তুষ্ট হলেও মনের খোরাক থেকে আত্মতৃপ্তি পায়নি। এই আত্মতৃপ্তি তো শুধু সোলমেট থেকেই পাওয়া যায়। আপনার আর স্যারের মাঝের সম্পর্কটা ছিল জাস্ট সেক্সুয়াল আর্জ।’

স্যাভলন আর তুলোটা আলিয়ার কাছে রেখে উঠে পড়ল রেজা৷ পকেট থেকে ফোনটা বের করে সময় দেখে আলিয়াকে বলল, ‘সময় হয়ে গেছে স্যারের ফেরার। আমার কাছে তো মুখ খুললেন না। সব থেকে ভয়ঙ্কর টর্চারের জন্য ওয়েট করুন। আমার থেকে নয়, জায়িন মাহতাবের থেকেই৷ আপনি এখনো আন্দাজ করতে পারেননি স্যার কতোটা ডেস্পারেট আপনার বোনের জন্য। সেদিন হেলিকপ্টার থেকে আমার বিনা অনুমতিতেই আপনার বোনকে শুট করতে শুরু করেছিল ওরা। তখন যেন আজরাইল এসে স্যারের জানটাই কবজ করে নিচ্ছিল। আমি হেলিকপ্টার থেকে নামতেই সেদিন প্রথমবার স্যার আমাকে একের পর এক হিট করতে থাকে। আপনার বোন আর স্যারের পরিবারের পর আমি ওনার বিশ্বস্ত আর আপনজন। ওই মুহূর্তের জন্য স্যার হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে আমাকে খুনও করে ফেলতে গিয়েছিলেন। সেখানে আপনি তো বহু দূরের। এই চেহারাতেও আজ আর স্যার দুর্বল হবেন না। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছেন যে। এক মাস হয়ে গেল, এখনো যে আপনি জীবিত আছেন তাই তো অবাক করা বিষয়।’

নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল আলিয়া। রেজা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। রাত বাজে আড়াইটা। আর বসে থাকা সম্ভব নয়। বিশ্রামের প্রয়োজন এবার। বাসা থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেল সে নিজের বাসায়।

রাত সাড়ে তিনটায় ফিরল জায়িন৷ শরীর আর মন দুটোতেই সতেজতা ফিরিয়ে আনতে এত চিন্তার মাঝেও সে ফারজানার কাছে গেল। কিন্তু কী লাভ হলো তাতে? মনের অস্থিরতা তো আর কাটাতে পারল না। ফারজানার থেকেও এখন কোনো চমৎকার, সুশ্রী নারী এলেও তার অস্থিরতা যে কাটবে না, তা সে বুঝে গেছে। ভাবনাচিন্তা না করে শুধু শুধু সময়গু নষ্ট করে এল সে৷ যতক্ষণ না আয়মানের কাছে পৌঁছতে পারবে, ততক্ষণ যে শান্তি মিলবে না তার। নিজের এমন অবস্থা দেখে সে নিজেই অবাক হয়। সতেরোটা বছর আগের কথা। সময়টা তো কম নয়। তখন না হয় অল্প বয়সের অতি মাত্রার আবেগ ছিল বলে আয়মানকে ছাড়া সে পাগল বোধ করেছিল। সময়ের সাথে সাথে তার জীবনের ধারাও বদলে গেল তারপর। ভুলেই গেল আয়মানকে। তাহলে তো সেই ষোলো বছর বয়সের আবেগও এতদিনে নিঃশেষ হয়ে যাবার কথা। অথচ দীর্ঘ একটা সময় বাদে আয়মানকে দেখে ওকে চিনে নিতে একটুও কষ্ট হয়নি তার। তাকে ঘিরে পুরোনো আবেগ ভয়াবহ সর্বনাশ হয়ে ফিরে এলো তার কাছে ভালোবাসা রূপে। একটু দ্বিধা, একটু বাধা কাজ করল না তার, আয়মানকে ভালোবেসে ফেলতে৷ কিন্তু এগুলো কী করে সম্ভব? সে না ভুলে গিয়েছিল এই মেয়েটিকে? তাহলে কীভাবে এত ক্ষণিক সময়ে জন্ম নিলো এই সর্বনাশা ভালোবাসা? এত সব প্রশ্নের উত্তর তো একটাই হয় তবে। আর তা হলো ভালোবাসাটা আজকের নয়। সেই ষোলো সতেরো বয়সের মারাত্মক আবেগটাই তার মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা ছিল। হ্যাঁ তা-ই তো। শুধু আবেগ কী করে হয়? শুধু আবেগ হলে তো দুই দুইটা বছর সে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগত না আয়মানকে হারিয়ে। ওই বাচ্চা মেয়েটাকে আবেগ, ভালোবাসা স্পর্শ না করলেও তাকে তো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছিল এসব। দীর্ঘ নয়, দশটা মাসের প্রতিদিনকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তার, ওই ছোট্ট পরীটা। হঠাৎ করে একদিন নিখোঁজ হয়ে গেল তার সেই পরী। পাগলের মতো হয়ে খুঁজেও তাকে আর পেল না সে৷ তারপর দীর্ঘ একটা সময় পেরিয়ে আয়মান আবার ফিরে এল ঠিকই। কিন্তু তার জীবনের কাল হয়ে এল। ও ফিরে আসবে বলেই হয়তো এতগুলো বছরে সে নারীতে মত্ত হয়েও কাউকে মনের কুঠুরিতে জায়গা দিতে পারেনি। কী সাংঘাতিক তবে তার ভালোবাসা! আর এই ভালোবাসাকে আয়মান মেহরিন পায়ে ঠেলে দেবে? তা সে হতে দেয় কী করে? এই ভালোবাসার প্রাপ্তি যে আয়মানকে দিতেই হবে।

কিছুদিন আগেই উত্তরাতে নিচতলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে জায়িন। আলিয়াকে সেখানেই রাখা হয়েছে। ঘরগুলো সাউন্ড প্রুফ করা হয়েছে বলে আলিয়ার চিৎকার চেঁচামেচি ঘর ছেড়ে বাইরে যায় না। চব্বিশ ঘণ্টার বিশ ঘণ্টায় জায়িন এই বাসায় কাটায়। রেজাও ডিউটি শেষ করে চলে আসে এখানে। আলিয়ার ঘরে এসে ওকে বেকায়দায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেও জায়িনের মায়া হলো না। সেখানে দয়ার প্রশ্নও তবে আসে না৷ আজ সে সত্যিই ধৈর্যহারা হয়ে পড়েছে। রেজার থেকে কাঙ্ক্ষিত খবর না পেয়ে উত্তপ্ত মেজাজ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে সে ফারজানার বাসা থেকে। প্রয়োজনের তাগিদে সে খুন করতে বাধ্য হলেও একজন নারী ছাড়া সে আর কোনো নারীকে নিজ হাতে খুন তো দূরে থাক, আঘাতও করেনি৷ আজ তার সেই নীতি হারাল আলিয়ার জন্যই। এই চেহারা তার দুর্বলতা। এটা সত্যিই, এই দুর্বলতার জন্যই রেজাকে সে দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু রেজা ব্যর্থ। ধৈর্য হারিয়ে আবশ্যকভাবে হাতে ছুরি আর মরিচের গুঁড়া নিয়ে এগোলো সে আলিয়ার কাছে। তার পায়ের আওয়াজ পেয়ে আলিয়া দৃষ্টি উঠানোর পূর্বেই ক্ষিপ্ত জায়িন অসহনীয় আঘাত করতে শুরু করল আলিয়াকে। পা’দুটো ছড়িয়ে বসে ছিল ও, তাই পা থেকেই শুরু করল নৃশংস আঘাত। কুকুরের কামড় আর আঁচড়ের ওপর বিনা বাক্যেই ছুরির একেক টান দিয়ে চলেছে বিরতিহীন। আর্তনাদের শেষ নেই আলিয়ার। ছুরির টানগুলো থামলেও তার ওপর মরিচে গুঁড়া ছিটিয়ে ডলতে থাকল জায়িন। এমনটা চলতেই থাকল আলিয়া জ্ঞান না হারানো অবধি। জ্ঞান হারালেই চেতনা ফিরিয়ে আবার সেই একই অত্যাচার। জায়িনও দেখতে চায়, কতটা সহ্যক্ষমতা এই মেয়েটির!

এতদিনে আলিয়ার ওপর মানসিক, শারীরিক টর্চার চললেও তা কিছু সময়ের জন্য ছিল। কিন্তু আজকের এই আঘাতের সময় যেন নিঃশেষই হচ্ছে না। চোখ মেলে শান্ত চেহারার জায়িনকে দেখে বিশ্বাস হওয়ার উপায় নেই, সেই বসে বসে এত ধৈর্য নিয়ে তাকে ক্ষত বিক্ষত করে চলেছে। ‘জায়িন থামো’, ‘জায়িন ছেড়ে দাও প্লিজ’, ‘মরে যাব জায়িন’ আরও নানারকম অনুরোধেও জায়িন নির্বিকার৷ আর সম্ভব নয় সহ্য করা। তৃতীয়বারের মতো জ্ঞান হারানোর পর আবার জ্ঞান ফিরে পেতেই হীনবল কণ্ঠে বলে উঠল আলিয়া, ‘মুম্বাইতে আছে নিশা, মুম্বাইতে।’

ক্রুর এক হাসি দেখা গেল জায়িনের সুন্দর ঠোঁটের কোণে। এই হাসিটাতেই আলিয়া কত শতবার প্রহত হয়ে বারবার স্বেচ্ছায় নিজেকে সঁপে দিয়েছে হাসির মালিকের কাছে। আজ সেই হাসি কত ভয়ঙ্কর লাগছে তার কাছে।

আলিয়াকে কোলে তুলে বিছানাতে শুইয়ে দিয়ে কানেকানে বলল ওকে, ‘উহুঁ, গল্পটা একটা লাইনের নয়। পুরোটা শোনাতে হবে আমায়।’

কথাটা শুনতেই আলিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমাকে একটু রেহাই দাও জায়িন। আমি মরে যাচ্ছি৷’
-‘যতক্ষণে রেহাই পাবার জন্য কাকুতিমিনতি করবে, ততক্ষণে ডিটেইলস বলা হয়ে যাবে তোমার। তারপর নিজ হাতে তোমাকে সেবা দেবো, অপ্রিয় শালিকা!’
___________

নাম করা কফিশপে বসে সকালটা শুরু হয় আয়মানের এক ফালি কেক আর ফ্যাট হোয়াইট কফি দিয়ে। ওয়ার্কআউট, জিমন্যাস্টিক ব্যায়াম চলে না বেশ ক’দিন৷ মনের সুখে খাবারের ব্যাপারেও কিছুদিন সে ভোজনরসিক মানুষের মতো হয়ে গেছে। বন্ধু সারা সারাদিনে তার কর্মব্যস্ততা নিয়ে থাকলেও রাত হলে আয়মানের সঙ্গে সময় কাটায় সে বাইরে। সারার জন্মস্থান পাকিস্তান লাহোর। বাবা এখানে কর্মের জন্য চলে আসার বেশ কয়েক বছর পরই সেও চলে আসে মা আর ছোটোবোনকে নিয়ে। সারার বিয়ে হয়েছিল এখানেরই এক শ্বেতকায় ছেলের সঙ্গে। বাবা-মায়ের অমতে ছিল বিয়েটি। কিন্তু সম্পর্কটা বেশিদিন যায়নি। ছেলেটি ডিভোর্স দিয়ে দেয় তাকে, বিয়ের মাস ছয়েক পরেই। তারপর থেকেই সে পরিবার ছেড়ে সিডনির মাসকটে চলে এসে একা জীবন কাটাচ্ছে চার বছর। বছর তিন আগে লন্ডন গিয়েছিল সে বেড়াতে। সেখান থেকেই দারুণ এক ঘটনার মাধ্যমে আয়মানের সঙ্গে তার পরিচয়। তারপর বন্ধুত্ব৷ এবং সেই বন্ধুত্ব একটা সময় বেশ গাঢ় হয়ে যায় তাদের মাঝে।

সন্ধ্যার মধ্যেই রোজ চলে আসে সারা। কিন্তু আজ সন্ধ্যা পার হয়েও সারার ফেরার খবর নেই৷ একা একা সময় কাটানো আয়মানের জন্য কখনোই একঘেয়েমিতা নয়। কিন্তু তার হঠাৎ করেই অকারণে চিন্তা হতে লাগল সারার জন্য। বলা বাহুল্য, সারার বাসাতে শুধু সে আর সারা একা নয়। তাদের সঙ্গে আরও একটি চব্বিশ বছর বয়সী মেয়ে থাকে৷ যার দায়িত্ব আয়মানের সুবিধা অসু্বিধা দেখাশোনা করা। মেয়েটির নাম জাইমা। মুম্বাইতেই বসবাস ছিল তার। কিন্তু বছর দুই ধরে সে আয়মানের একান্ত বাধ্যগত সহকারী এজেন্ট। বেশ কিছু গুণে গুণান্বিত সে। যার মধ্যে বড়ো দু’টো গুণ তার, সে তায়াকুন্দো আর কারাটেতে বেশ দক্ষ। তবে আয়মানের মতো গ্রান্ড মাস্টার নয়। মেয়েটি হ্যাকিং কাজেও পারদর্শী ভীষণ। তার জীবনেও মানুষকে শোনানোর মতো একটা গল্প আছে৷

রাত ন’টার মধ্যে এই জায়গাটা বিজনপুরী হয়ে যায়। মাসকট শপিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়মান। নাম না জানা অনেকগুলো ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছের পাতাগুলোর দিকে চেয়ে কিছু ঠাওর করার চেষ্টা করছে সে।

সারা আসেনি বলে সে একাই ঘুরতে বেরিয়েছিল। পাবেও গিয়েছিল সে৷ সেখানে সারারই কিছু বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর মিউজিকের তালে নাচানাচি করে ফিরতে ফিরতে ন’টা বেজে যায়। ড্রিঙ্কসের গ্লাসে চুমুক আর মিউজিকের তালে নাচের ফাঁকেও তার সতর্ক দৃষ্টি পড়ে যায় অজ্ঞাত এক শ্বেত সুন্দরীর ওপর। বহু সময় ধরে মেয়েটি তাকে খুঁটে খুঁটে পরখ করছিল। হাবভাবে যতটুকু বোঝার বুঝে নেয় সে তখন। আজ সাথে সারা নেই, যে মাতাল হলে তাকে সামলে নিয়ে যাবে। এই চিন্তা হতেই সে গ্লাসের সংখ্যা কমিয়ে শুধু আড্ডাতেই ব্যস্ত থাকে। একটা সময় দেখা যায় সুদর্শনা মেয়েটি মৃদু হেসে তার গা ঘেঁষে বসে। তাদের সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করে। তার পক্ষ থেকে আয়মানের জন্য ওয়াইল্ড টার্কি এক গ্লাস মদও দেয়। আয়মানও মৃদুহাস্যে তা গ্রহণ করে সিগারেটের সাথে চুমুক দিতে দিতে মেয়েটির সঙ্গে আলাপে মজে যায়৷ ন’টা বাজতেই আড্ডা শেষ করে বেরিয়ে আসে সে পাব থেকে। পেছন পেছন মেয়েটিও বেরিয়ে এসে তাকে চোখের ইশারায় অতৃপ্ত বাসনা পূরণের ইচ্ছা প্রকাশ করে। আয়মান শুধু মুচকি হাসে৷ মেয়েটি তার প্রস্তাবে আয়মানের সম্মতি পেয়ে শপিং সেন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। সেখান থেকে সেন্ট্রাল রেল স্টেশন যাবে। আয়মানও তার পিছু পিছু গিয়ে শপিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। মেয়েটি হেঁটে হেঁটে বাসের কাছাকাছি চলে গেছে তখন। ফিরে চেয়ে আয়মানকে ইশারা করে বাসে উঠতে। আয়মান মুচকি হাসির মাঝে ঠোঁট চোখা করে তাকে চুমু দিয়ে বাসে উঠতে ইশারা করে। ভ্রু কুঁচকে মেয়েটি ওর দিকে এগিয়ে আসতে গেলেই হঠাৎ আয়মানকে পার করে জাইমা কোথা থেকে যেন চলে আসে। মেয়েটির কাছে এগিয়ে যায়। কানে কানে কিছু বলে সে মেয়েটিকে। আয়মানের ধারণা জাইমা ওকে বলেছে, ‘তোমার রাতের ঘুম উড়াব আমি। চলো, আজ আমি তোমার সঙ্গী।’

আয়মান তার সরল হাসিটা শুধু হাসে। মেয়েটিকে টেনে জাইমা ততক্ষণে বাসে উঠে পড়ে। তারপরই ঝাঁকড়া গাছগুলোর তেজপাতার মতো দেখতে পাতাগুলোর দিকে চেয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে শুরু করে। তার আগে পিছে কিছু চলছে। যা সে স্পষ্টভাবে টের পাচ্ছে৷ ধীরে ধীরে চারপাশ একেবারে জনমানবহীন হয়ে পড়লে সে মন্থর গতিতে হেঁটে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলতে থাকে। এর মাঝে কেউ যদি তাকে হুট করে টেনে নিয়েও যায় কোথাও, তাও তার চিৎকার কারও কাছে পৌঁছবে না। মাসকট জায়গাটা রাত ন’টার মাঝে নির্জন হয়ে যায় বলেই এমন একটা ঝুঁকি থেকে যায়। অবশ্য আয়মান এ কারণেই এখানে আছে। এমন নিরিবিলিতেই থাকাটা তার অভ্যাস।

হাত ঘড়ির দিকে চেয়ে বাসার ভেতর ঢুকল সে। আশ্চর্যের বিষয়, সারা এখনো ফেরেনি। চিন্তাটা এখন তবে তার দুশ্চিন্তাতে পরিণত হলো। জাইমা আসা অবধি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে ভাবতে পারছে না সে৷ আদৌ তার দুশ্চিন্তার কোনো যুক্তি আছে কিনা, তা নিয়েও তো জাইমার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ফোনটা বের করে শেষবারের মতো সারাকে কল করল। কোনো জবাব নেই। চুপচাপ বাথরুমে ঢুকে গোসল নিয়ে স্প্যাগেটি টপ আর শর্টস পরে শুয়ে পড়ে। ঘুমের ভাব চলে এলেও সে জেগে থাকার চেষ্টা করছে। বাসায় এই মুহূর্কে একা সে। জাইমাকে পাঠানোটা বড়ো ভুল করে ফেলল বোধ হয়। সারাও আজ হঠাৎ লেট। ব্যাপারটা এমন নয় তো, তাকে বাসায় একা করাটাই কারও পরিকল্পনা? এই চিন্তাটা এতক্ষণে মাথাতে আসতেই ঝট করে উঠে পড়ে মুখ দিয়ে একটা গালি উচ্চারণ করে ক্যাবিনেটের গায়ে লাথি মেরে বসল। আরেকটু মাথাটা খাটিয়ে ওই মুহূর্তেই মেয়েটাকে বাসায় নিয়ে আসাটা সব থেকে বেশি বুদ্ধিমতীর কাজ হতো।

নেশাটা কাটানো দরকার আগে। এই অবস্থায় পরিপূর্ণ জ্ঞানে থাকা জরুরি তার। দ্রুত পায়ে কিচেনে চলে গেল সে। ঠিক তখনই মেইন দরজার লকটা খুলে কেউ একজন সাবধানী পায়ে ভেতরে ঢুকল। হেলেদুলে সে চলে গেল আয়মানের শোবার ঘরে। বিছানার ওপর তখন আয়মানের খুলে রাখা শার্টটা ফেলে রাখা। সেটা তুলে দু’হাতে ধরে ঠোঁট আর নাকের কাছে জড়িয়ে ধরে রাখল। শার্টটাতে আয়মানের শরীর থেকে জড়ানো ঘ্রাণ নিতে মত্ত সে৷
__________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here