সিন্ধু ইগল, পর্ব:১৭

0
637

সিন্ধু ইগল – (১৭)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

গত পরশু রাতে ক্রিমিনাল আলিয়া মেহজাবিন কয়েদিখানায় হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জরুরি ভিত্তিতে তাকে জেল থেকে হাসপাতাল নিয়ে আসা হয় চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য। ডাক্তার জানায়, অতিরিক্ত মানসিক চাপে প্রেশার ফল করেছে। এক সপ্তাহের মতো তাকে হাসপাতাল অ্যাডমিট থাকতে হবে। এবং ততদিন তাকে কোনো প্রকার ইনভেস্টিগেট করা যাবে না। তাই জায়িনও এর মাঝে আর তার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি। কিন্তু লোমহর্ষক বিষয়টি হলো, হাসপাতাল ভর্তি হওয়ার দু’দিন পরই আলিয়া মেহজাবিন অর্থাৎ মাধু তার সেবা দানকারী নার্সকে মাথায় ও ঘাড়ে বেশ কয়েকবার আঘাত করে তাকে অজ্ঞান করে তার জায়গায় নার্সটিকে বেডে ফেলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। পাঁচদিন যাবৎ আলিয়াকে শহরের অলিগে গলিতে কোথাও পুলিশ খুঁজতে বাদ রাখেনি। এক সপ্তাহ ধরে এই খবরটি প্রতিটা নিউজ চ্যানেলে প্রকাশ হচ্ছে নিয়মিত। ঢাকাসহ ঢাকার পাশ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এই গুঞ্জনে, টেরোরিস্ট দলটি হয়তো আবার যে-কোনো মুহূর্তে কোথাও না কোথাও আক্রমণ করে বসতে পারে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশ কর্মকর্তাসহ সেনা কর্মকর্তাকেও নিয়োজিত করা হয়েছে। এমন চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি ঢাকায় এর আগে কখনো তৈরি হয়নি বলে মানুষের মাঝে ভীতি বোধ দারুণভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতির মাঝেই জায়িন হঠাৎ করে তার এত প্রিয় চাকরিটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে ওপর মহলে। তার এই সিদ্ধান্ত জানার পর থেকে ওপর মহলের কর্মকর্তারা ভীষণভাবে আহত হয়েছেন। তারা এমন কিছু জায়িনের থেকে কোনোভাবেই আশা করেননি এই মুহূর্তে।
_________

ধূমপান বা মদ্যপান কোনোটারই নেশা জায়িনকে আজ অবধি কাবু করতে পারেনি। তার চরিত্রের গুণাবলির মাঝে এই গুণটি সে অর্জন করেছে। এদিক থেকে তার বড়ো দুই ভাই ব্যতিক্রম। জাকির অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েই মদ্যপানের অভ্যাস তৈরি করে নিয়েছিল প্রথম দু’তিন বছরে৷ এখন অবশ্য সে পুরোপুরি আল্লাহ পাকের ইবাদাতে মশগুল থাকতে চেষ্টা করে। আর জাহিদ ধূমপানের অভ্যাসটি আজীবনের জন্য গড়ে নিয়েছে, ব্যবসাতে ঢোকার পর থেকে। কিন্তু জায়িনের মতো তাদের দু’ভাইয়ের চরিত্রে নারীঘটিত কোনো দাগ আজ অবধি লাগেনি।

জায়িনের পাশে বসে সিগারেটে শেষ টান দিতে দিতেই রেজা এই ব্যাপারগুলো ভাবছিল। তার বদ অভ্যাসের মাঝে ধূমপান আর মদ্যপান দুটোই অন্তর্ভুক্ত। শুধু নারী দেহের সুধাপানেই সে তীব্র মাত্রায় অনাসক্ত। অনেকবার সুযোগ পেয়েও কোনো নারীকে কামুক নজরে দেখতে পারেনি। বলা যায়, দেখার ইচ্ছা হয়নি তার। কেননা, তার মনের খোরাক আর শরীরের খোরাক উভয়ই জোগাতে চেয়েছিল এবং আজও চায় তার কাছে আসমানের চাঁদ সমতুল্য এক মনোহারিণীতে। যার বসত এখন পরের ঘরে।

ফোনে কথা বলা শেষ করে জায়িন মনোযোগী দৃষ্টিতে ল্যাপটপে চোখ বুলাতে বুলাতে রেজাকে বলে উঠল, ‘যাবার আগে তোমার একটা বিয়ে দিয়ে যাব, বুঝলে? একা ঘরে চান্দের টুকরার মতো একটা বউ থাকলে ঢের ভালোবাসা খেদমত পাবে বউয়ের থেকে।’
হেসে উঠে রেজা জবাব দিলো, ‘চান্দের টুকরা নিয়ে রিস্ক আছে স্যার। কয়লার টুকরা হলে ভালো হয়৷ টেনশন থাকবে না কোনো, পরপুরুষের সাথে পরকীয়াতে জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে।’
-‘কথাটা ঠিকই বলেছ। তোমার ভাবিজানের মতো কেন সব মেয়েগুলো হলো না? তাহলে কোনো স্বামীরই টেনশন থাকত না।’
-‘অমূল্য জহরের সৃষ্টি অহরহ হয় না৷ আর তার খোঁজও ভাগ্যবানরা ছাড়াও পায় না। আমি হতভাগা৷’
-‘অমূল্য জহর! এটাও ঠিকই বললে। আমার জন্য সে বিষই।’
-‘তারপরও কেন তার খোঁজ করে চলেছেন? জীবনটাকে ভালোবাসুন না স্যার! স্বাভাবিক জীবনের হদিস একদিন আপনিও করবেন। কিন্তু সেদিন না খুব বেশি দেরি হয়ে যায়।’
-‘জটিলতা ছাড়া জীবনটাকে মূল্যহীন লাগে, রেজা। খুব সহজে সুখপ্রাপ্তি হলে সেই সুখের কদর করি না আমরা মানুষ। কষ্টকে ভুলে যাই তখন। আর কষ্ট দেখলে অতি সহজেই দুর্বল, ধৈর্যহারা হয়ে পড়ি।’

আর কোনো জবাব দিলো না রেজা। অন্যকে তো খুব সহজেই পরামর্শ দেওয়া যায়। সেই একই পরামর্শ কি নিজের বেলাতে ফলানো যায়?

-‘আজই ওর শেষদিন, সব কিছুর উত্তর না পেলে। যাও, ওকে জাগিয়ে তোলো। আমি উঠছি এখন। ফারজানা ওয়েট করছে। একটু রাত হবে ফিরতে আমার।’
রেজা মুচকি হেসে বলল, ‘আমি তো ভাবলাম আমার স্যার তার পূর্বের রুটিনে ফিরে গেছে আবার৷ ফিরে আসবেন কেন তাহলে?’
জায়িন উঠে দাঁড়িয়ে শার্টের নিচের দিকে কুঁচকানো ভাবটা ঠিক করতে করতে জবাব দিলো, ‘মাঝেমাঝে আফসোস করি। ফারজানার জন্য আমার ভালোবাসাটা জন্ম নিলো না কেন? প্রচণ্ড বুঝদার আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একটা মেয়ে। আপন মানুষ থেকেও একা জীবনটাকে কীভাবে উপভোগ করতে হয়, ও তা জানে। নিজের কষ্টকে দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশে ও নারাজ। ও চায় না কারও অনুগ্রহ। এ দেশে থাকলে ওকে আমি একা ফেলে রাখতে পারতাম না। কোথাও একটা কোমলতা কাজ করে আমার ওর জন্য৷’
-‘আপনাকে ও ভালো না বাসলেও কি একই রকম ভাবনাগুলো বহাল থাকত ওর জন্য?’
-‘অবশ্যই। আমাকে ও ভালোবাসে বলে কিন্তু ওর জন্য আমার কোমলতা নয়। ওর মতো মানুষকে আমি পছন্দ করি বলেই ওকে পছন্দ করি।’
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রেজা, বলল, ‘পছন্দের মানুষ হয়েই বা কী লাভ হলো? ভালোবাসার পূর্ণতা যে পেলো না ওর।’
-‘কারণ, ওর জন্য এর থেকেও বেটার কিছু আছে নিশ্চয়ই।’
-‘হয়তো। ঠিক আছে, আপনি তাহলে যান। আমি ওর সঙ্গে গিয়ে কথা বলি।’
__________

মুম্বাইতে আরব সাগর থেকে কয়েক কিলো দূরে স্বামী নিয়ে বেশ নিশ্চিন্তেই বসবাস করছিল নিশা। আলিয়া পুলিশের অধীনে ছিল। আর এখন সে পলাতক। এসব জানার পর থেকে বেশ চিন্তাতে আছে সে, তার অবস্থান সম্পর্কে না আবার জানিয়ে দেয় আলিয়া!

দু’গ্লাস কমলার জুস হাতে নিয়ে সে একটি দিয়ে এলো তার প্রাণপ্রিয় স্বামী এহসানকে। আরেকটি নিয়ে গেল তার ছোটোবোন সমতুল্য আয়মানের জন্য। সন্ধ্যার পর পরই হালকা খাবার খাওয়ার অভ্যাস ছিল আয়মানের ছোটোবেলা থেকেই। অবশ্য অভ্যাসটা তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিল আয়মান। মা প্রতিদিন তাকে এ সময়টা হালকা খাবার খাইয়ে পড়তে বসাতেন৷ এসব কিছু আয়মান ভুলে গেলেও নিশা ভুলেনি৷ মায়ের পর আদুরে বাচ্চা আয়মানকে তো সেই যত্ন নিয়েছে। তার প্রতিদান হিসেবে অবশ্য আয়মান তাকে আজ এত সুন্দর একটা জীবন দিয়েছে। না হলে তার মতো এইট পাস করা প্রায় অশিক্ষিত একটা মেয়েকে এহসানের মতো একজন গুনী মানুষ কেন জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করবে?

ঘরের এসি বন্ধ। কিন্তু জানালা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে বাতাস আসছে। রুম অন্ধকার করে ওয়াল পুস আপ করছে আয়মান৷ মাত্র সপ্তাহ একটা হলো সুস্থ হয়েছে সে। তারপর থেকে জিমন্যাস্টিক ব্যায়ামের ওপর আছে, শরীর আগের মতো এক্সট্রা শক্তি ফিরে পাবার জন্য৷ বগালেকে ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্তে আহত হয়েছিল বেশ। ওই মুহূর্তটা মৃত্যু বলেই ধরে নিয়েছিল সে। ওই অবস্থায় খুব বেশি সময় সে পানিতে অতিবাহিত করতে পারবে না। এদিকে দ্রুত পাড়ে ফেরাও ছিল অতিব জরুরি৷
তবে ভাগ্য সহায় ছিল তার। পুলিশের ধারণা ছিল, সে পাহাড়ের কোনো খাদে পড়েছে৷ হেলিকপ্টারের আওয়াজে কারও কানে পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার শব্দটিও পৌঁছয়নি। আর টর্চ লাইটের আলো পাহাড়ের চূড়া ঘিরে রাখলেও পাহাড়ের নিচে আঁধার ছিল বলে সেই মুহূর্তে আয়মানকে চোখেও দেখা যায়নি। তার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে বগালেকের পাড়ে অপেক্ষায় থাকা টেরোরিস্ট দলটির দুজন মানুষ দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ফেলেছিল। সেদিন পাড়ে ফেরা ছিল তার জন্য এক প্রকার চ্যালেঞ্জ। প্রাইভেট জেট করে তাকে ফিরতে হয়েছিল মুম্বাইতে। তারপর পঁচিশটা দিনের মতো সে চিকিৎসারত অবস্থাতে ছিল গোপনে৷ পালিয়ে আসার পরদিনই একটি খাদ থেকে তার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই নিউজটি দেখার পর বেশ চমক পেয়েছে সে আর নিশাও। লাশটির দৈহিক গঠন আর শরীরের পরিচ্ছদ অবিকল তার মতোই। কিন্তু মাথা আর চেহারা থেঁতলে গেছে। চেনার উপায় নেই লাশটিকে। খবরে দেখেছে সে, জায়িন আয়মানকে মৃত বলে ঘোষণা করেছে। রিপোর্টারদের কাছেও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে সে এভাবেই। সারা দেশ জানে এখন, আয়মান মৃত। পোস্টমর্টেম করা লাশটিকে দাফনও করা হয়ে গেছে। পুরো ব্যাপারটিই যে নিঁখুত কোনো নাটক, তা কেউ না বুঝলেও আয়মান আর নিশা ঠিকই বুঝেছে। জায়িনের এই নাটকের অর্থ কী? তা কোনোভাবেই ভেবে পাচ্ছে না আয়মান।

ঘরের লাইট জ্বেলে নিশা বলে উঠল, ‘ও আপুমনি, জুসটা খাইয়া নাও না!’
আয়মান থামল না, পুস আপ দিতে দিতেই বলল, ‘খাইয়া নয়। খেয়ে নাও। এতগুলো বছরেও শুদ্ধ রূপ উচ্চারণ করা শিখলে না কেন বলো তো? এহসান খান কীসের অধ্যাপক হলো? আজ পর্যন্ত বউকে উচ্চারণ শেখাতে পারল না।’
-‘থাক, হইছে আর লজ্জা দিয়ো না। যেটুকু শিখছি তাই তো মেলা। তুমি এখনে থামো, জুসটা খাইয়া…না স্যরি স্যরি! খেয়ে নাও। তারপর তোমারে একটা খবর দেবো।’

আয়মান এবার থেমে গিয়ে ঘরের এসিটা চালু করে দিয়ে বিছানাতে বসল। নিশা এগিয়ে এসে জুসের গ্লাস হাতে তুলে দিলো আয়মানের। দুই চুমুকে শেষ করে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে যাবার জন্য পা বাড়াতেই নিশা বলে উঠল, ‘তোমারে মুম্বাই ছাড়তে হবে কাল পরশুর মধ্যেই৷ আলিয়া ভাগছে, সে খবর তো পাইছো নিশ্চয়ই।’
-‘ভাগলে এ কয়দিনে এখানে এসে হাজির হওয়ার কথা ওর। জায়িন মাহতাব এত সহজে ছাড়বে না ওকে। ওকে জেল থেকে বের করে এনে নিশ্চয়ই বউয়ের আদর দিচ্ছে কোথাও লুকিয়ে রেখে। যা মাখোমাখো প্রেম ছিল ওদের!’
-‘থামো তো তুমি। আমার বিশ্বাস হয় না কোনো বুদ্ধিমান পুরুষ ওর মতো ছিন্নারে বিয়ে করবে।’
-‘আহ্ঃ নিশাবু। আমার বোন লাগে সে।’
বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল সে। নিশা চুপ রইল না। বলতে থাকল, ‘কীসের বোন! ওই **কি মাইয়া হলো একখান ডাইনি, বেঈমান। তোমার জায়গায় আমি হইলে কবে ওরে কুচিকুচি করে ফেলতাম! যার খায়, যার পরে, আর তার ওপরেই ছুরি ঘুরায়?’
ওয়াশরুম থেকেই জবাব দিলো আয়মান, ‘আমার খেল, আমার পরল কবে? চাকরি করে খায় ও নিশাবু।’
-‘সেই চাকরিখানা পাইলো ক্যামনে তা বলো না ক্যান? তোমার সার্টিফিকেট, তোমার সিভি দেখাইয়া চাকরি হাতায়। ওর দৌড় কতদূর তা যেন জানি না? নিজেরে আয়মান বলে পরিচয় দেয় ও সবখানে। ওর ক্ষমতা আছে আয়মান হওয়ার?’
আয়মান হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল ওয়াশরুম থেকে। তোয়ালেতে হাত মুখ মুছতে মুছতে বিছানাতে বসে বলল, ‘তুমি শুনলে হাসবে৷ ঘরের মধ্যেও ওকে আয়মান বলে না ডাকলে রেগে যেত। নামে কী আসে যায় বলো তো?’
-‘ও তো চিরকালই তোমার মতো হতে চাইত। তোমার সব কিছুতে দখলদারি করে আসতে আসতে যুত পেয়ে বসছে।’
নিশার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আয়মান হাস্যযুক্ত চেহারাতেই বলল, ‘আর আমিও এ জন্যই এই সুযোগটা নিয়ে ওকে কট খাইয়েছি। সব সময় বলতে আমি ওকে কেন প্রশ্রয় দিই? আমি তো ওকে শুধু বছরের পর বছর বাড়তে দিয়েছি। দুর্বলকে শিকার করার মাঝে কোনো আনন্দ নেই।’
-‘আমি সত্যিই সেদিন মেলা খুশি হইছিলাম, যেদিন তুমি কইলা ওরে ভয়ানক এক শিকারির কবলে ফেলাইতেছ।’

আয়মান এবার আর লন্ডন যাবে না। এবার সে কিছুদিন অস্ট্রেলিয়া গিয়ে থাকবে তার অতি ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধুর কাছে৷ বেশ কয়েক মাস সে সফরের ওপরই থাকবে। তার জন্যই সব কিছু প্যাকিং করতে শুরু করল৷ হঠাৎ করে নিশা হাসিতে ফেটে পড়ল। আয়মান তার দিকে বোকা বোকা চোখে তাকাতেই নিশা বলে উঠল, ‘খান্নাসি নিজেরে বহুত ঘাগু মাল মনে করে। ও এইটুকু বুঝল না যে আয়মান বিয়ে-শাদি সম্পর্কের নামই শুনতে পারে না, সেই আয়মান হঠাৎ করে কারও প্রেমে পড়ে ক্যামনে? ওর মনে একটুও প্রশ্ন আসলো না এই ব্যাপারে?’
-‘এসেছে অবশ্যই। কিন্তু ওকে বিশ্বাস করানোর মতো অনেক কাহিনি করতে হয়েছে আমাকে। প্রথম মিথ্যা বলতে হয়েছে, বহু বছর আগে একজনকে দেখে আমার প্রেমের অনুভূতি হয়েছিল। সেই অনুভূতি আজ আবার জেগেছে জায়িন মাহতাবকে দেখে। ওকে দেখানোর জন্য ঘনঘন জায়িন মাহতাবের বাড়িতে গিয়ে সময় কাটিয়েছি। ও আসলেই ড্রামাবাজের মতো চোখে মুখে লজ্জা এনে জায়িন মাহতাবের প্রতি দুর্বল হওয়ার গল্প শুনিয়েছি, আনমোনা থেকেছি। এসব দেখেই কিনা ও বিশ্বাস করেছে! তারপরই তো ওর কৌতূহল জেগেছে জায়িনকে দেখার জন্য। আর এই হিসাব তো পুরোনো। আয়মান যে জিনিসে আকৃষ্ট হবে, আলিয়ার সেই জিনিসই দখল করবে। সেখানে একটা ছেলের ব্যাপারে তো আরও আগ্রহী হবে ও। ছেলেটা জায়িন মাহতাব না হলে এত সহজে টোপটা গিলত না আলিয়া। জান্নাতি আন্টি যেদিন আমাকে জায়িনের গল্প শোনালেন, সেদিনই খুব সুন্দরভাবে গল্পটা সাজিয়ে ফেলেছিলাম বলে আজকে রক্ষা। তবে তুমি গল্পটা পছন্দ না করলে টোপটা ফেলতাম না।’
-‘আরে আমি একশো ভাগ নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম, আলিয়া এই টোপ গিলবেই। ইস! বাংলোটা কেনার সময় আরেকটু ভালো করে খোঁজ খবর নেওয়া উচিত ছিল আমাদের। শালা বাঘের ডেরায় বাড়ি কিনে কী একটা টেনশনে পড়ে গেছিলাম!’
-‘এর জন্যই এমন একটা খেলা খেলতে হলো। জায়িন মাহতাব অমন ধূর্ত ডিটেক্টিভ না হলে কোনো টেনশন ছিল না।’
-‘আল্লাহ আমাদের সহায় ছিল বলেই এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারছি। আলিয়াকেও উচিত শিক্ষা দেওয়া গেছে। আর সেই সুযোগে ওই গোয়েন্দা শালাকেও থামায় রাখা গেছে।’

আয়মান চুপচাপ কাজ করতে থাকল। কিন্তু নিশার চেহারাতে তখনো যেন চিন্তার ছাপ। কিছুক্ষণ নিরবে কী যেন ভেবে সে বলে উঠল, ‘কিন্তু আপুমনি, তুমি ওই ছেলের কাজের কথা যা শুনাইছিলা তা শুনে আমার এখনো মনে হচ্ছে ছেলেটা তোমার প্রেমেই পড়ছে। আলিয়াকে সেও টোপ হিসাবে ব্যবহার করছে।’
আয়মান একটু হেসে বলল, ‘আলিয়াকে টোপ হিসেবে নিয়েছে তা তো জানিই। আর সেটা আমাদের পুরো টিমটাকে ধরার জন্য। কিন্তু ওই ছেলে প্রেমে পড়ার মতো মানুষ না। আলিয়ার মেল ক্যারেক্টার ও। সেক্স লাইফ এনজয়, এটাই ওর মূলনীতি। তবে সে সত্যিই দারুণ একটা চিজ। কী করে যে চিনে ফেলত আমাকে! আবার সামনে এসে এমন মায়া নিয়ে তাকাত, যেন আমার ব্যথায় ও নিজেও কাতর। ভুলটা সেদিনই করেছিলাম ওকে বাঁচিয়ে। শুটটা করার জন্য সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েও হঠাৎ করে কী যেন হয়ে গিয়েছিল ওর কাতর গলায় প্রিয় ডাক শুনে। জীবনে প্রথমবার খুন করতে ব্যর্থ হলাম সেদিন।’
কথাটুকু বলতে বলতে কেমন উদাস হয়ে পড়ল সে। জায়িনের আহত কণ্ঠস্বরে সেদিনের ডাক, নেতিয়ে পড়া মুখটা ওর, আকুল চোখে তার দিকে চেয়ে থাকা, সব কিছুতেই তাকে দুর্বল করে দিয়েছিল জায়িন। উদ্দেশ্যর কথা ভুলে গিয়ে ওকে খুন করার পরিবর্তে উলটে সাহায্য করল। আর তার ফলাফল স্বরূপ তাদের দলের লিডারের ক্রোধের শিকার হয়ে প্রচণ্ড মার খেতে হলো তাকে। সেই দিনটার পর থেকেই জায়িনের প্রতি কেমন মায়া অনুভূত হলো তার। জায়িন এসে যখন হুটহাট ছুঁয়ে দিতো তাকে, কোনোক্রমেই বাধা দেওয়ার ইচ্ছাশক্তি কাজ করত না তার মাঝে। তার সঙ্গে প্রথমবার এসব অদ্ভুত কাণ্ড হওয়ার আরও একটি প্রধান কারণ, জায়িন তার কাছে অপরিচিত হয়েও কেন যেন ভীষণ পরিচিত আর আপনজন বলে মনে হতো ওকে। তার প্রতি জায়িনের আচরণ আর কথাবার্তাতেও মনে হতো যেন জায়িন তাকে বহু আগে থেকেই চেনে, তার প্রতি আলাদা এক অধিকার আছে জায়িনের।

আয়মানের ঘোর কাটিয়ে দিয়ে নিশা বলে উঠল, ‘হুঁ, আমারই বুঝতে ভুল হইছে। তবে সাংঘাতিক খেলোয়াড় ওই ছেলে। সে তোমাদের দুই বোনকে চিনে ফেলত। কিন্তু তোমাদের সাথে তাল মিলিয়ে ঠিকই নাটক করে যাইত। আমি ছাড়া তোমাদের দুইবোনরে আর কেউ আলাদা করতে পারে না। আমি না হয় তোমারে খেয়াল যত্ন করছি বলে চিনি। ওই ছেলে ক্যামনে চিনত বলো তো?’
প্রশ্নটা আয়মানেরও। জায়িন যেদিন হুট করে বাসায় এসে পড়ত, সেদিনই শুধু ওর সঙ্গে কথা হতো ওর। তাছাড়া অধিকাংশ সময় আলিয়াই কথা বলে কাটিয়েছে ওর সঙ্গে। তাই এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার মতো সুযোগ বা খেয়াল কোনোটাই হয়নি তার। এসবের মাঝে আয়মানের হঠাৎ মনে পড়ল সেদিন ভোরবেলার সময়টা। নাম্বারটা সেদিন তার কাছেই ছিল। সেদিনও কেমন আগ্রহন্বিত সুরে তাকে বারবার প্রিয় বলে ডাকছিল জায়িন। এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়েছিল তার, জায়িন সত্যিই দুর্বল তার প্রতি।

আর ভাবতে চাইল না আয়মান। এই ছেলেটিকে নিয়ে ভাবতে বসলে অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে যায় তার। নিশাকে বলে উঠল, ‘বাদ দাও এসব হাবিজাবি চিন্তা। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আলিয়াকে জায়িনের কবলে ফেলে আসা। সেটা সফল। কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে। আমাকে মৃত প্রমাণ করে বিশাল একটা উপকার করে দিয়েছে জায়িন মাহতাব। তবে সে যদি এই ব্যাপারটা গেম হিসেবে নিয়ে এটা ভেবে থাকে যে, আমি এই নিউজ দেখে নাকে তেল দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকব। আর সে সেই সুযোগে খুঁজে বের করে আমাকে অ্যারেস্ট করে নেবে, তবে তার এই চালাকি খাটবে না আমার বেলায়।’
_________________________________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here