শ্রাবন আধারে তুমি শেষ পর্ব।

1
3865

শ্রাবন আধারে তুমি
লেখিকা:আফরিন ইসলাম
পার্ট:শেষ

রাই মারা গেছে ৷আবরার পাগলের মতো বিলাপ করছে ৷হাসপাতালের ডাক্তারদের কাছে যাচ্ছে ৷আর বলছে

এই ডাক্তার ভাই আমার ৷আমার বউটাকে বাচিঁয়ে দে না ৷আমার সব টাকা নিয়ে নে তোরা ৷আমার কিছু লাগবে না ৷তোরা নিয়ে যা সব ৷শুধু আমার বউটাকে বাচিঁয়ে দে ৷তোদের পায়ে পড়ি আমি ৷কিছু একটা কর ভাই তোরা ৷ কেউ কোনো কথা বলছে না ৷আবরার তার বাবার কাছে গেল দৌড়ে ৷

বাবা ও বাবা তুমি তো সব পারো ৷আমার রাইকে একটু কথা বলতে বলো না বাবা ৷আমি আর পারছি না ৷ও বাবা আমি রাইকে নিয়ে চলে যাবো অনেক দূরে ৷আর ফিরে আসবো না কখনো ৷কোনো টাকা আমার লাগবে না ৷শুধু ওকে কথা বলতে বলো না ৷

আফজাল খান ছেলের গালে হাত বুলিয়ে বললেন রাই আর আমাদের মাঝে নেই বাবা ৷টাকা দিয়ে মানুষকে বাচাঁনো যায় না ৷

তোমরা কেউ আমার আপন নও ৷সবাই আমার শত্রু তোমরা ৷আমার কাউকে লাগবে না ৷আবরার চিৎকার করে কথা বলতে বলতে রাইয়ের কাছে গেল ৷তারপর বলল

তোকে আর কি বলবো ৷তুইও তো আমাকে বুঝলি না ৷সবার মতো তুইও দিনের পর সব লুকিয়ে গেলি ৷এই কথা বল আমার সাথে ৷এই রাই কথা বল না একটু ৷আবরার চিৎকার করে কথা গুলো বলতে বলতে কেদেঁ দিল ৷

আনিলা বেগম ছেলের কাছে দৌড়ে গেলেন ৷তারপর বললেন

আবরার তুমি কি চাও না রাই এখন একটু ভালো থাকুক ৷ যদি তুমি ওকে ভালোবাসো তাহলে এভাবে পাগলামি করো না বাবা ৷ওকে নিয়ে যেতে হবে তো ৷

আবরার কোনো কথা বলল না ৷উঠে দাড়ালো আবরার ৷তারপর পর রাইয়ের নিথর শরীরটা নিজের কোলে তুলে নিল ৷রাইয়ের নিথর শরীরটা আবরার বুকের সাথে লেপ্টে আছে ৷

আনিলা বেগম আবরারকে বললেন এটা কি করছো আবরার ৷রাইকে লাশবাহী গাড়ীতে করে নিয়ে যাবে হাসপাতাল থেকে ৷

মরা মানুষকে ঐ গাড়ীতে ওঠায় মা ৷কিন্তু আমার রাই আমার কাছে মৃত নয় ৷আমি নিজেই আমার বউকে তার শেষ ঠিকানায় রেখে আসবো ৷

আবরার হেটে চলল হাসপাতালের বাইরে ৷কেউ আবরারকে বাধাঁ দিল না ৷আবরার রাইকে নিয়ে গাড়ীতে বসলো ৷তারপর গাড়ী চালাতে শুরু করলো ৷আবরার নিজের স্ত্রীকে আলতো করে জরিয়ে আছে ৷ রাই চুপ করে শুয়ে আছে ৷কোনো সাড়াশব্দ নেই ৷

অন্যদিকে আফজাল খানের মোবাইলে পুলিশের নাম্বার থেকে একটা কল আসে ৷ওপর পাশের কথা শুনেই তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে ৷ আফজাল খান কাউকে কিছু না বলে পুলিশ স্টেশনের দিকে গাড়ী নিয়ে বেড়িয়ে যায় ৷

আবরার গাড়ী বাড়ীতে এসে গেছে ৷ আবরার পেছনের গাড়ীতে সবাই এসেছে ৷ সবাই কাদঁছে ৷

আফজাল খান নিজের বোনের সামনে বসে আছে ৷তার চোখেও পানি ৷রুহানা খান মাথা নিচু করে বলল

আমাকে পারলে মাফ করে দিও ৷আর দ্বীপকে আমি তার পাপের শাস্তি দিয়েছি ৷আর তাকে ভালোবেসে আমি যেই ভুল করেছি ৷তার শাস্তি এখন আমি ভোগ করবো ৷রাইয়ের কাছে আর মাফ চাইতে পারলাম না ৷ সে যেন আমায় মাফ না করে ৷আমি সেটার যোগ্য নই ৷

রাই আর বেচেঁ নেই রুহানা আফজাল খান বললেন ৷

রুহানা খানের চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো ৷ তিনি বললেন আমার এই অভিশপ্ত জীবন থেকে আর মুক্তি হবে না ভাইয়া ৷ঐ মেয়েটার দীর্ঘ নিঃশ্বাস আমার পরকালও শেষ করে দেবে ৷তুমি আমার মতো একটা জঘন্য মেয়ের জন্য নিজের সময় নষ্ট করো না ৷রাইয়ের কাছে যাও ৷বাবার মতো তার শেষ কাজ গুলো করো যাও ৷ আর আমাকে এখান থেকে বের করার চেষ্টা করো না কখনো ৷

অপর দিকে রাইয়ের শেষ গোসল হয়ে গেছে ৷ একটু পরেই জানাযা ৷রাইয়ের মা , বাবা ,মামা ,মামীও এসেছে ৷তারাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে ৷ সবাই রাইকে শেষ বারের মতো একবার দেখে নিল ৷

রাইয়ের জানাযা শেষ হলো ৷তারপর তাকে মাটির ঘরে রেখে দেওয়া হলো ৷সাদি নিজের হাতে সব কাজ গুলো করেছে ৷রাইকে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে আপন ঘরে রেখে দেওয়া হল ৷যেখান থেকে কেউ চাইলেও আর ফিরতে পারে না ৷আবরার শুধু বাগানের এক কোনায় বসে সব দেখ ছিল ৷একটা পাথরের মতো বসে আছে সে ৷তার কোনো হেলদুল নেই ৷ শুধু তাকিয়ে আছে রক্ত জবা গাছটার নিচের কবরটার দিকে ৷

একে একে খান বাড়ী খালি হয়ে যাচ্ছে ৷শুধু আত্মীয় স্বজনরা আছে ৷রুহানা খানের ব্যাপারটা সবাই জেনে গেছে ৷কিন্তু যাবে না তার কাছে ৷ বাড়ীতে এখনো কান্নার রোল ৷ সন্ধ্যা হয়ে রাতের অন্ধকার নেমে গেছে ৷

আবরার এক পলক কবরটার দিকে তাকালো তারপর উঠে দাড়ালো ৷আবরার বাড়ীর ভেতর ঢুকলো ৷তার পুরো শরীরে ধুলো বালি মাখা ৷ আবরার কারো সাথে কোনো কথা না বলে ঘরের ভেতর ঢুকলো ৷ আবরার কাবার্ড খুলল ৷সেটার ভেতর থেকে রাইকে দেওয়া তার প্রথম শাড়ী ,চুড়ি গুলো নিয়ে নিল ৷অতঃপর রাইয়ের তাকে দেওয়া পাঞ্জাবীটা বের করে নিল ৷তার পর আবারো নিচে নেমে গেল ৷মিশকা আবরার কাছে যেয়ে কাদঁতে কাদঁতে বলল

কোথায় যাচ্ছো ভাইয়া ৷

আবরার কথা বলল না ৷মিশকা আবারো বলল ভাইয়া তুমি কথা বলছো না কেন ৷

আবরার মিশকাকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিল ৷তারপর বলল আমি তোকে কেন বলবো কোথায় যাচ্ছি ৷আমার বউ বাইরে ঘুমিয়ে আছে ৷সে একা থাকতে ভয় পায় জানিস না ৷তার কাছে যাচ্ছি ৷একদম আমাকে জালাবি না ৷সর সামনে থেকে ৷

আবরার আচরন অস্বাভাবিক ৷সে স্বাভাবিক ভাবে কথা গুলো বলে নি ৷রাইকে আবরার সত্যিই ভালোবাস তো ৷কিন্তু তা আর প্রকাশ করতে পারলো না ৷

আবরার রাইয়ের কবরের কাছে বসে আছে ৷ আবরার রাইয়ের মাথার দিকটায় বসে বলল

এখন খুব শান্তিতে আছো তাই না ৷আজ তোমাকে ঘুমাতে দিতে ইচ্ছে করছে না ৷ দেখেছো আজ আকাশে কত বড় চাদঁ উঠেছে ৷কত আলো চারিদিকে ৷কিন্তু দেখ আমার আকাশের চাদঁটা মাটির তলায় শুয়ে আছে ৷ কোনো আলো নেই আমার দুনিয়ায় ৷ আবরার নিজের পাঞ্জাবীর পকেট থেকে শুকনো বুনোফুল বের করলো ৷তারপর বলল দেখেছো তোমার দেওয়া বুনোফুল গুলো এখনো আছে ৷কিন্তু তুমি আর নেই ৷তোমার শাড়ীর ভাজে এখনো তোমার ঘ্রান মেলে ৷কিন্তু তুমি নেই ৷আমার ভালোবাসা আজ মাটির তলায় বন্দি ৷আবরার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল

আল্লাহ আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে ৷তুমি তো অন্তরের সব জানো ৷আমাকে একটু শান্তি দাও খোদা ৷আবরার দুই চোখ পানি গড়িয়ে পড়লো ৷চোখের পানি গাল বেয়ে গলা অতিক্রম করেছে ৷

রাত একটা বাজে আবরার এখনো কবরের কাছে বসে আছে ৷অনেকে তাকে নিতে এসেছে কিন্তু যায় নি ৷তার রাই নাকি ভয় পাবে এখানে একা থাকতে ৷তাই বাধ্য হয়ে সবাই ফিরে গেল ৷

আবরার রাইয়ের ডান দিকে শুয়ে পড়লো ৷ বুকের মধ্যে রাইয়ের শাড়ীটা চেপে ধরলো ৷ আবরার রাইয়ের কবরের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো ৷রাতের অন্ধকার আবরার নিঃশ্বদের কান্নার চোখের পানি আড়াল করলো ৷

সকাল নয়টা বাজে ৷খান বাড়ীতে আজ আবারো মানুষের ভিড় জমেছে ৷তবে আজ কেউ রাইয়ের জন্য আসে নি ৷সবাই খান বাড়ীর বড় ছেলে আবরার খান জয়কে শেষবারের মতো দেখতে এসেছে ৷ বাড়ীর সামনেই একটা খাটিয়াতে আবরার লাশটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা ৷একটু আগেই তাকে ডাক্তার মৃত ঘোষনা করেছে ৷ সকাল পাচঁটার দিকে মিশকা আর আফজাল খান আবরাকে নিতে আসে ৷অনেক ডাকার পরেও আবরার ওঠে না ৷ অনেক চেষ্টা করেও আবরারকে কেউ ওঠাতে পারে নি ৷অবশেষে আফজাল খান বাড়ীতে ডাক্তার ডাকে ৷ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করে দেয় ৷ ডাক্তারের ভাষ্য মতে আপন জনকে হারানোর কষ্ট সইতে না পেরে কাল রাতেই হার্ট এ্যাটাক্ট করেছে সে ৷ যার ফলে মৃত্যু হয়েছে ৷

একটু পরেই হয়তো আবরার গোসল তারপর জানাযা হবে ৷ তাকেও রাইয়ের পাশেই কবর দেওয়া হবে ৷ রাইয়ের পাশেই কবর খোড়া হচ্ছে ৷

সবাই কাদঁছে ৷নিজের প্রান প্রিয় বন্ধকে ধরে সাদি কাদঁছে ৷ চারিদিকে আজ হাহা কার ৷কোথাও কেউ ভালো নেই ৷শ্রাবন আধারে সব ঢেকে গেছে ৷

কিছু ভালোবাসা মাটির তলায় চাপা পরে যায় ৷

.কিছু ভালোবাসা মিলনের অপেক্ষায় রয়ে যায় ৷

কিছু ভালোবাসা অপ্রকাশিত রয়ে যায় ৷

কিছু ভালো আর্তনাদ করে অপর মানুষটাকে আবারো দেখার ৷

কিছু ভালোবাসা আর্তনাদ করে আবারো ফিরে আসার ৷

কিছু ভালোবাসা হারিয়ে যায় কালের বিবর্তনের ধাধাঁয় ৷

তবুও ভালোবাসাকে ভালোবাসি ৷

সমাপ্ত

যারা এত দিন সাথে ছিলেন তাদের প্রান ঢালা ভালোবাসা ৷ সবাইকে বলবো একটু কষ্ট হলেও আপনার মনের অনুভূতি জানিয়ে যাবেন ৷ কাল নতুন গল্প আসবে ৷এই গল্পটাকে আপনারা অনেক সাপোর্ট দিয়েছেন ৷আমি যদি আপনাদের. সাথেনো ব্যবহার করে থাকি তার জন্য সরি ৷ যদিও আমি কখনো খারাপ আচরন করি নি ৷ আমার ইন্ডিয়ান পাঠকদের অনেক অনেক ভালোবাসা ৷তারা আমায় প্রচুর ভালোবাসা দিয়েছে ৷ আর ভালো থাকবেন সবাই ৷নতুন গল্পে সবাইকে আমন্ত্রন রইলো ?????৷

1 COMMENT

  1. Apnader golpo gulo pori nijer mon vlo korar jonnp kintu tar poriborte apnara mon ta aro beshi kharap kore kadiye charen amader. Pathok der eto kosto diye ki moja pan apnara khali kadiye charen. Golpota ki onno rokom hote partona. Kichu bolar nei apnake. Bhishon raag hoche amar apnar upor.Ektu sundor vlo happy golpo din na dekhben nijero vlo lagbe. Jotokhun golpota porechi sudhu kedei gechi. Suru theke shesh obdi sudhu dukkho anonder chite photao nei. Golpo ekebarei blo na. Tobe ekta vlo korechen hero keo last e mere diyechen noile khub baje galagali ditam apnake.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here