শেষ বিকেলের মায়া পর্ব ১১

0
230

#শেষ_বিকেলের_মায়া (১১)

গভীর ঘুমে ডুবেছে রিহান। পর পর ছয় বার বমি করেছে। শারীরিক অবস্থা আসলেই ভালো নেই। ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। বলেছেন রেস্ট করতে। ফারিহা বাইরে দাঁড়িয়ে। আকাশে আঁধার জমেছে। ঘড়িতে রাত প্রায় দশ টা বাজে। এদিকে মা কল করে চলেছেন। অথচ সে রিসিভ করতে পারছে না। তার ভেতর থেকে খারাপ লাগা কাজ করছে। রুনা কল করে রিহানের শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা বলতেই ছুটে আসতে হলো তাকে। অনেক টা দায় বদ্ধতা থেকেই এসেছে। তবে রুনা খুশি। ভীষণ খুশি তিনি। মেয়েটি যে তার ছেলের জন্য অনেক খানি ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছে এ বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত সে। ফারিহা একটু দূরে দাঁড়িয়ে। হাত পা অবশ হওয়ার মতো অবস্থা।
“এখানে এসে বসো মা।”

নীরবে কাছে আসল মেয়েটি। তবে কথা বলল না এমনকি বসল ও না। ওর মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছু সময় তাকিয়ে রইলেন রুনা।
“বড়ো লক্ষ্মী তুমি মা। এভাবে ছুটে এসেছ দেখে আসলেই ভালো লাগছে।”

এবার ও কথা বলল না ফারিহা। শুধু নত হয়ে রইল। রুনা রুম থেকে যাওয়ার পূর্বে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। পুরো ঘরে এখন রিহান আর সে। যদিও মানুষটি ঘুমে তবু কেমন যেন লাগছে মেয়েটির। একটা ধীম ধীম আওয়াজ হচ্ছে ভেতর থেকে। হৃদয়ের গতিও বেশি। সে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল। তবে পারল না। খানিক বাদে রুনা এলেন। খাবারের বাটি হাতে। সেটা রেখে বললেন,”অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ আর যাওয়ার দরকার নেই।”

ফারিহা চমকে উঠল। রাতে না ফিরলে সমস্যা হবে। মা কে কীভাবে কি বলবে? সে একটু সময় নিয়ে বলল,”আসলে আন্টি আজ আমাকে যেতেই হবে।”

“এভাবে কি করে যাবে? রাত দশটা বাজে। তোমার হোস্টেল তো বেশ অনেকটা দূর। বাসায় গাড়ি আছে তবে ড্রাইভার টা নেই। ছুটি নিয়েছে।”

“আমি চলে যেতে পারব।”

“এমন করে বলে না। কল দাও, আমি হোস্টেলে কথা বলে দিচ্ছি। সমস্যা হবে না।”

ফারিহা যেন বিপাকেই পড়ল। সে মৃদু হেসে কল করার অভিনয় করল। তারপর বলল,”আন্টি এক গ্লাস পানি হবে?”

রুনা খাবারের সাথে পানি আনতে ভুলে গিয়েছেন। তিনি চলে যেতেই মায়ের নাম্বারে কল করল ফারিহা। তারপর কথা বলে নিল। জানাল জরুরি কাজে একটু আটকে গেছে। আজ আর আসতে পারবে না। ফাহিমা যেন ক্লান্তির নিশ্বাস ফেললেন। যুবতী মেয়ে রাতে বাইরে থাকা মানে মায়েদের চোখে মুখে মন কিংবা মস্তিষ্কে একরাশ চিন্তা। মাকে কোনো মতে বুঝিয়ে বলল সে। রুনা তখন পানি নিয়ে এসেছে। ফারিহা ধীর স্থির করে বলল,”সকাল সকাল চলে আসব। এখন রাখছি।”

পানির গ্লাস রেখে রুনা বললেন,”কথা হলো?”

“জি।”

“আচ্ছা। তুমি একটু ওর পাশে বসো। আমি পাশের রুমেই তোমার থাকার ব্যবস্থা করছি।”

মৌনতায় সম্মতি জানাল ফারিহা। রুনা ওকে রেখে চলে গেলেন। ফারিহা এক বার চার পাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বাড়িটা। এত বড়ো বাসায় মানুষ বলতে তিনজন। তাও সব সময় থাকা হয় না। যেমন আজ বাসায় নেই বাড়ির কর্তা ইরফান জোয়ার্দার। ফারিহা দেখল দেয়াল জুড়ে রিহানের বিশাল ছবি টাঙানো। ছবিটা আরো বেশ কিছু বছর পূর্বের। তখনকার রিহানের মাঝে এই রাগী ভাবটা দেখা যাচ্ছে না। বিশাল ছবির দিকে এগোয় ফারিহা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ওমন সময় ঘরে আসেন রুনা। ফারিহাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন,”এই ছবিটা রিহান বিদেশ যাওয়ার পূর্বে তোলা। সুন্দর লাগছে না খুব? ছেলেটা বিদেশ যাওয়ার পর ই যেন কেমন হয়ে গেল। আগে কিন্তু পরিবারের সাথে সময় কাটাতে খুব পছন্দ করত। প্রতি মাসে ফ্যামিলি ট্যুর হত আমাদের। ইদানীং ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে।”

এত গুলো কথা বলে ছেলের পাশে বসলেন তিনি। মা শব্দটি বিশাল হয়। রুগ্ন ছেলের পাশে বসে থেকে তিনি বললেন,
“রুম ঠিক হয়ে গেছে। ঘুমিয়ে পড়। আমি ওর পাশে আছি।”

ফারিহা চলেই যাচ্ছিল। কি মনে করে যেন ফিরে এল। তারপর বলল,”আন্টি আপনি চাইলে আমি ওনার পাশে থাকতে পারি। শুনেছি আপনার শরীর ভালো থাকে না। রাত জাগা নিষেধ।”

রুনা হাসলেন। কিছু সময় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,”আচ্ছা,ঠিক আছে। তবে সমস্ত রাত জেগে থেকো না যেন। একট জিরিয়ে নিও। আর দরকার হলে অবশ্যই ডেকে নিও।”

রুনা চলে গেলেন। ফারিহা রিহানের থেকে বেশ দূরত্ব নিয়ে বসে রইল। রাত তখন দেড় টা। পিপাসায় ককিয়ে উঠল রিহান। চট করে পানি খাওয়াল ফারিহা। ছেলেটার জ্ঞান পুরো আসে নি। সে শুয়ে রইল। পানির গ্লাসটা নেওয়ার সময় রিহানের শরীরে স্পর্শ লাগল। বুঝতে পারল জ্বর এসেছে। ডাক্তার বলে গিয়েছেন জ্বর আসতে পারে। তখন যেন মাথায় জল পট্টি দেওয়া হয়। এত রাতে রুনা কে ডাকা ঠিক হবে না। তাই নিজেই বুদ্ধি খাটাল সে। নরম কাপড় বের করে নিয়ে রিহানের মাথায় জল পট্টি দিতে লাগল। যা চলল শেষ রাত অবধি। আজানের কিছু পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েছিল ফারিহা। ভোরের দিকে উঠে এলেন রুনা। এসে দেখলেন রিহানের মাথায় জল পট্টি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে ফারিহা। মেয়েটাকে দেখে ওনার ভীষণ মায়া হলো। তিনি বুক ভরে শ্বাস নিলেন। ফারিহার ঘুম ছুটে যেতেই প্রায় হুড়োহুড়ি করে উঠল সে।
“পাশের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে নাও কিছু সময়।”

“না, না ঠিক আছি আন্টি। এখন তাহলে আসি।”

“এটা কেমন কথা? খাবার না খেয়ে যেতে পারবে না।”

“আন্টি অন্যদিন।”

“না খেয়ে বের হতে নেই মা। হাত মুখ ধুয়ে নাও। আমি খাবার রেডি করছি।”

“আমি আপনাকে সাহায্য করি?”

“সহযোগী আছে। তুমি রেস্ট কর। সারারাত কষ্ট করলে, একবার ডাকলেও না।”

ফারিহা কিছু বলল না। রিহানের জ্বর নেমে গিয়েছে। একটা সময় পর রুনা বললেন,”তোমার আঙ্কেলের সাথে কথা বলেছি। তোমরা এক বছর পর ই বিয়েটা করবে।”

এই টুকু বলে ফারিহার নিকটবর্তী হলেন তিনি। হাল্কা ছোঁয়াতে মুখটা উঠিয়ে বললেন,”আমি জানি আমার ছেলেকে কখনো ছাড়বে না তুমি। সর্বদা ওর পাশে থাকবে। তাই তোমরা যখন চাইবে তখনি বিয়েটা হবে। কোনো জোর নেই।”

ভদ্রমহিলা চলে যেতেই তাকাল রিহান। শেষ কথাটা ইষৎ শুনতে পেয়েছে সে। তার মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে। রাতের ঘটনা কিছুই মনে নেই। ফারিহাকে দেখে একটু বিস্মিত হলেও পর পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“মম কি বলল?”

রিহানকে উঠতে দেখে সম্বিৎ ফিরে পেল ফারিহা। একটা ক্লান্তি নিয়ে বলল,”বললেন এক বছর পর বিয়ে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।”

রিহান যেন সমস্ত শক্তি ফিরে পেয়েছে। লাফিয়ে উঠল এক প্রকার। একদম কাছে এসে বলল,”সত্যি? মম এটা বলে গেল।”

রিহানের চোখে মুখে খুশির ঝলকানি। সে দৃষ্টিতে ফারিহা নিজের জন্য কোনো মায়া খুঁজে পেল না। অবশ্য পাওয়ার কথা ছিল কি? উহু,ছিল না। তবু তার খারাপ লাগল। রিহান খুশিতে যেন পাগল ই হয়ে গেছে। সে চট করেই কিয়া কে কল করে নিল। তারপর চলল তাদের বাহারি সব আলাপ। এদিকে দাঁড়িয়ে প্রায় সমস্তটাই শুনল ফারিহা।

| সেই সকাল থেকে ভাবছি লিখতে বসব। তবে আর লেখা যেন হচ্ছিল ই না। যাক এক পর্ব দেওয়ার মতো লিখলাম বোধহয়। সবাই আমার পরীক্ষার জন্য দোয়া করবেন।|

চলবে….
কলমে~ফাতেমা তুজ নৌশি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here