মেঘের আড়ালে রোদ পর্ব ৩০

0
117

#মেঘের_আড়ালে_রোদ
#পর্ব_৩০
লেখিকা #Sabihatul_Sabha

শ্রাবণ বউ নিয়ে প্রথম গ্রামের বাড়িতে এসেছে সবাই বউকে ঘিরে বসেছে।
মেঘলা ক্লান্ত মুখে সবার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করছে।
একেক জন একেক রকমের প্রশ্ন করছে। বউয়ের বাড়ি কোথায়.? পড়াশোনা কতোটুকু করেছে.? বাবা কি করে..? বিয়ের কতো গুলো দিন হলো এখনো খুশির খবর শুনছে না কেন.?? একজন তো মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ” তোমাদের কারো সমস্যা থাকলে বলো এখানে ভালো কবিরাজ আছে আমি তাবিজ এনে দিব ” মেঘলা কি বলবে বুঝতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে সে কখনো পড়েনি। কারো কোনো উত্তর দিতে পারছে না।

” কি গো বউ কি বোবা নাকি..? একটু আগে তো দেখলাম কথা কইলো এখন চুপ কেন.?”

শ্রাবণ ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হয়ে উঠানে এতো ভিড় দেখে তাকিয়ে রইলো বুঝতে বাকি নেই মাঝ খানে ওর বউ।

বাড়িটা গোল আকৃতির, মাঝ খানে উঠান, সোজা করে জায়গা রেখে গেইট।
শ্রাবণ এগিয়ে যেতে সবাই সাইডে দাঁড়ালো । মেঘলার কাছে গিয়ে বললো” তোমাকে দেখতে ক্লান্ত লাগছে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নাও।”

~ আজ কোনো বিশ্রাম নেই শ্রাবণ বাবা, এই প্রথম বউ নিয়ে গ্রামে পা রেখেছো আর কবে না কবে আসো বউয়ের সাথে আমাদের অনেক কথা আছে।
শ্রাবণঃ কি কথা চাচি আমাকে জিজ্ঞেস করেন। মেঘলার শরীর ভালো না।
~ তোমারে কেন জিজ্ঞেস করবো.? আমরা বউকে জিজ্ঞেস করবো। শরীর ভালো না আমাদের সাথে থাকলে শরীর ভালো হইয়া যাইবো।
শ্রাবণ বিড়বিড় করে বলে উঠলো ” আপনাদের সাথে থাকলে আমার বউ আর আমি খুঁজে পাব না। বউকে আমি ডিভোর্স দেওয়ার আগে বউ আমাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাবে।”

~ কিছু কইলা বাবা..?
শ্রাবণঃ না চাচি। আপনারা বসেন মেঘলা কাপড় চেঞ্জ করে নেক।

আশেপাশে তাকিয়ে ছোঁয়া আর মহুয়াকে দেখে ডাকলো। ওরা মাত্র রুম থেকে বের হয়েছে।
মহুয়া ঘোমটা ভালো করে দিয়ে চুল ডেকে রাখলো। ছোঁয়া ওড়না গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে, চুল গুলো হাত খোঁপা করা।

ওরা আসতেই শ্রাবণ সবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, ‘ আপনারা ওদের সাথে গল্প করেন আমি মেঘলাকে নিয়ে যাচ্ছি। বলেই মেঘলার হাত ধরে নিয়ে গেল। মেঘলা লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলে উঠলো ” ধন্যবাদ ”

ছোঁয়া রেগে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা এখন রিয়ার সাথে হলুদের শাড়ি, সাজগোছ নিয়ে কথা বলতো আর ভাই এতো মহিলার মাঝে ফাঁসিয়ে দিলো!!..

মহিলারা মহুয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ” ওমা এ দেহি পরী নাইমা আইছে গ্রামে।
মহুয়া লজ্জায় নুইয়ে গেল।

~ নিরুর মাইয়া বুঝি তুমি.?
ছোঁয়া জোর করে মুখে হাসি টেনে বললো,’ জ্বি আন্টি মহুয়া নিরুপমা আন্টির মেয়ে। ‘
মহুয়া অবাক হয়ে তাকাতেই ছোঁয়া চোখ মারলো। এখন যা জিজ্ঞেস করার মহুয়াকে করুক আমি কেটে পড়ি। যদি জানে আমি নিরুর মেয়ে কেউ ছাড়বে না।

~ তুমি কেডা.?
ছোঁয়াঃ আমি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড।
এক মহিলা মহুয়ার থুতনিতে হাত রেখে বলে উঠলো ” মাশাল্লাহ নিরুর ঘরে চাঁদ নাইমা আইছে। ছোট বেলা যখন আইছলা তখন আরও কালা দেহা গেছে এখন ঠিক আফরোজা জেডির মতো দেহা যাইতাছে।

ছোঁয়া আস্তে করে মহিলাদের কাছ থেকে বেরিয়ে গেল আর ফেঁসে গেল মহুয়া।

_______

রাত আটটায় বাড়ির সবাই এক সাথে হলো। মেহমান সবাই আসেনি কাল আসবে।

আনোয়ার চৌধুরী এসেছে বাড়িতে বিয়ের মতো আয়োজন শুরু হয়েছে।
খাবার টেবিলে আনোয়ার চৌধুরীর ভাই আর পৃথিবীতে নেই উনার বউ এই বাড়ির সর্দার।

আশা বেগম আনোয়ার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, ‘ আফরোজা কেমন আছে.? শুনলাম শুয়া থেকে উঠতো পারে না।
আনোয়ার চৌধুরীঃ জ্বি ভাবি…
আশা বেগমঃ তোর ছেলের বউ কই.? দেখা করাইবি না?
আনোয়ার চৌধুরী মনে মনে একটু ভয় পেলেন। মেঘলার শ্রাবণের বিয়ে কিভাবে হয়েছে তারা কেউ জানে না। মেঘলা না আবার উল্টা পাল্টা কথা বলে বসে।

আনোয়ার চৌধুরী নির্জনকে ডেকে বললো মেঘলা আর শ্রাবণকে নিচে পাঠাতে।

নির্জন গিয়ে নিয়ে আসলো।

মেঘলা সালাম দিয়ে দাঁড়ালো।
আশা বেগম পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো৷
মেঘলা গোলাপি শাড়ি সাথে হাল্কা গয়না পড়ে আছে। আশার সময় শাশুড়ী নিজের গহনা গুলো ওর হাতে দিয়ে বলে ছিলো” এইগুলো পড়ে থাকবে, সুন্দর করে কথা বলবে, শাড়ি দিয়েছি ভালো লাগলে পড়, সাবধানে থেকো।” এই টুকুই মেঘলার জন্য অনেক ছিলো। আমেনা বেগম এইসব দিবে, এতো সহজ ভাবে কথা বলবে ভাবতেও পারেনি কেউ।

আশা বেগমঃ সব ঠিক আছে তবে গায়ের রং একটু চাপা।
নির্জনঃ আহ্ দাদি ভাই ফর্সা, ভাবিও ফর্সা হলে কেমন মূলা মূলা লাগবে না.? এটাই ওদের কিউট লাগে।
আশা বেগম নির্জনের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো ‘ জয় তুই আমার পাশে বস।’
নির্জন আশা বেগমের পাশে বসলো। আশা বেগম নির্জন কে একটু বেশিই ভালোবাসেন। ভালোবেসে জয় বলে ডাকে।
মেঘলার দিকে তাকিয়ে আশা বেগম বললো,’ তোমার বাপ কি করে..?? তোমার পড়াশোনা কি.? ‘
মেঘলা থমকে গেল। সে তো সত্যি কথা বলতে পারবে না আবার মিথ্যা ও বলতে পারবে না।

মেঘলাকে চুপ দেখে নির্জন কিছু বলার আগে শ্রাবণ মেঘলাকে এক হাতে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বললো,’ দাদি ওর পরিচয় আমি, এখন ও আমার পরিচয়ে বাঁচবে তাহলে আগের কথা জিজ্ঞেস করে লাভ কি.??? তুমি বরং ওকে সংসার সম্পর্কে বুঝিয়ে দাও।
আশা বেগমঃ তোর পরিচয়ের আগে ওর আরও একটা পরিচয় আছে।কিভাবে বিয়ে হলো,পরিচয় হলো জানতে হবে না। চুপচাপ বসে থাক। এখনি বউ পাগলা হয়ে গেছস। তোর দাদাও বউ পাগল ছিল, গ্রামের সবাই হাসতো।
শ্রাবণ আরও কিছু বলতে চেয়ে ছিল কিন্তু মুরব্বিদের মাজে বেশি কিছু বললে হেতে বিপরীত হবে।
নির্জন হেঁসে বলে উঠলো, ‘ দাদি আমার বন্ধুকে দেখলে না সাজ্জাদ ভাবি ওর বোন হয়। আমার বন্ধুর আবার ভাইকে একটু বেশি পছন্দ তাই বিয়ের প্রস্তাব দিল আর আমরাও রাজি। ভাবি পড়াশোনায় ভালো, পরিবার ভালো।

পেছন থেকে সাজ্জাদ বেআক্কেলের মতো তাকিয়ে রইলো। নির্জন কে খুজতে খুঁজতে এখানে এসে ছিলো এমন কথা শুনতে হবে ভাবতেও পারেনি।
শ্রাবণ মুচকি হেঁসে বললো, ‘ শান্তি হয়েছো.?’
আশা বেগমঃ হ ছেলেডারে দেখলাম ভালোই। পরিবারও শুনলাম ভালো।

আশা বেগম কিছু সময় চুপ থেকে বললো,’ শুনলাম নিরুর মাইয়া এসেছে সেই কবে দেখছি, শুনলাম একটা মাইয়াও আইছে খুব সুন্দর আর বুদ্ধিমতী।

নির্জন ছোঁয়া আর মহুয়াকেও নিয়ে আসলো।

আশা বেগম মহুয়াকে নিরুর মেয়ে ভাবে বলে উঠলো, ‘ তুমি তো দেখতে আফরোজার মতো হইছো।’

” এটা মহুয়া দাদি, আর ফুপিমণির মেয়ে হলো ছোঁয়া। ”
ছোঁয়া হেঁসে সালাম দিল, টুকটাক কথা বললো।
মহুয়ার দিকে তাকিয়ে আশা বেগম বলে উঠলো, ‘ তুমি ছোঁয়ার বান্ধবী.? ‘
মহুয়াঃ জ্বি দাদি।
আশা বেগমঃ মাশাল্লাহ। আমাদের আফরোজাও যৌবন কালে তোমার মতো ছিল। তোমারে দেখে আফরোজার কথা মনে পইরা গেল।
মহুয়া বিনিময় মুচকি হাসি উপহার দিল।
আশা বেগম বিরবির করে বলে উঠলো, ‘ কিছু সৌন্দর্য জীবনে অন্ধকার ডেকে আনে আবার কখনো অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যায়। সাবধানে থেকো মেয়ে তোমার জীবন না আবার আফরোজার মতো হয়।

____________

সাজ্জাদ রেগে একের পর এক সিগারেটে টান বসাচ্ছে। একটু আগেই গ্রামের দোকান থেকে কিনে এনেছে। জীবনে কখনো যা স্পর্শ করে দেখেনি আজ তাই খাচ্ছে।
নির্জনঃ তোর কি হয়েছে.? থামবি এবার.?
সাজ্জাদ কোনো উত্তর দিল না। এখন এতোটাই রাগ লাগছে সব কিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করছে।

যাকে ভালোবাসা, যাকে নিয়ে ঘরবাঁধার স্বপ্ন দেখছে আজ সবার সামনে তার ভাই হয়ে গেল!!।

নির্জন সাজ্জাদকে নিজের মতো ছেড়ে দিল। শান্ত হলে নিজেই বলবে এমন কি হয়েছে। হঠাৎ করে কেন রেগে গেল।

ছোঁয়া হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে সাথে রিয়াও। মহুয়া মুখ ভার করে তাকিয়ে আছে।

বিকেলে মহিলা গুলো একের পর এক প্রশ্ন করতে শুরু করলো। একজন থামছে তো আরেকজন শুরু কেউ ক্লান্ত হচ্ছে না মহুয়া উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কেউ নিজের ছেলের কথা বলছে কেউ বোনের, ভাইয়ের, আত্মীয়স্বজন কারো ছেলে বাকি রাখেনি বিয়ের জন্য, প্রসংশা করতে করতে মুখে ফেনা তুলে নিয়েছি। মহুয়ার মনে হলো সে পাত্রের বাজারের মাঝে বসে আছে আর বাজার ভর্তি পাত্র। সবাই বলছে পাত্র রেডি বেছে নাও, দেখে নাও………

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here