মেঘের আড়ালে রোদ পর্ব ২

0
80

#মেঘের_আড়ালে_রোদ
#পর্ব_2
লেখিকা#Sabihatul_Sabha

কালো ওড়না দিয়ে মাথা অর্ধভাগ ডেকে এক হাতে ওড়না ধরে ছোঁয়ার পিছে দাঁড়িয়ে আছে মহুয়া।

শ্রাবণ কিন্তু সময় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। কালো সেলোয়ার-কামিজ পড়া, হাতে চিকন চুড়ি, ভীতু চোখে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব সুন্দরী রমনী।ছোঁয়ার ডাকে হুস ফিরলো শ্রাবণের।

স্বাভাবিক ভাবে দাদাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,’ মেয়েটি কে..?’
আনোয়ার চৌধুরীঃ আগে মার্কেট থেকে আসো।
শ্রাবণঃ দাদিজান কোথায়.?
আনোয়ার চৌধুরীঃ রুমে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে ঘুমাচ্ছে।
শ্রাবণ আবার জিজ্ঞেস করলো,’ দাদিজান তাহলে উনার কথা বলে ছিলো.?
আনোয়ার চৌধুরীঃ হুম।
শ্রাবণ বিড়বিড় করে বলে উঠলো, ‘ দাদিজান সব কিছু কমিয়েই বলেন।দাদিজান বললো এক সুন্দরী মেয়ে নিয়ে এসেছে দাদাজান কিন্তু বলা উচিত ছিলো এক রুপকথার রাজকন্যা নিয়ে এসেছে দাদাজান।

ছোঁয়া বেস বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো, ‘ ভাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি ভাবছো…??’

শ্রাবণ দাদাভাইকে বলে বেরিয়ে গেলো।

আনোয়ার চৌধুরী মহুয়ার মাথায় হাত রেখে বললো,’ ভয় নেই শ্রাবণ আমার বড় নাতি। ওর সাথে সাথে থাকবে। যা যা প্রয়োজন নিয়ে আসবে। দুই একদিনের মধ্যে কলেজে ভর্তির ব্যাবস্থা করে দিবে শ্রাবণ।

মহুয়া মাথা নিচু করে সবটা শুনলো। সে এখানে বেশিদিন থাকবে না, কলেজে ভর্তি হয়ে ছোটো খাটো একটা জব খুঁজবে। পেয়ে গেলেই এখান থেকে চলে যাবে।

ছোঁয়া মহুয়ার হাত ধরে তাড়া দিলো। আনোয়ার চৌধুরী মহুয়ার দিকে ইশারা করতেই ছোঁয়ার পিছু পিছু গেলো মহুয়া।

শ্রাবণ মোবাইলে কারো সাথে কথা বলে পেছন ফিরে দেখলো ছোঁয়া ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মেইন দরজা থেকে বের হচ্ছে মহুয়া। শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিতে চাইলো কিন্তু চোখ আঁটকে গেলো মহুয়ার মুখে। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো কাঁটা দাগ গুলোর দিকে, জেনো চাঁদের গায়ে কেউ আচঁ কেঁটেছে।

মহুয়া ছোঁয়ার সাথে পেছনে বসতেই শ্রাবণ বলে উঠলো,’ আমাকে কি তোর ড্রাইভার মনে হয় ছোঁয়া..?? ‘
ছোঁয়া মহুয়ার দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলে উঠলো, ‘ আজকের জন্য হয়ে যাওও ভাই। ‘

শ্রাবণ ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে হেঁসে মেনে নিলো ছোটো বোনের আবদার।

মহুয়া চুপচাপ তাকিয়ে রইলো বাহিরের দিকে।
ছোঁয়া এটা সেটা বলেই চলছে আর মহুয়া তা বসে বসে শুনছে।
ছোঁয়ার ভীষণ ভালো লেগেছে মহুয়া কে। মেয়েটা কম কথা বলে, হাজারটা কথা বললে একটা উত্তর দেয়। আজ পাঁচ দিনে এক মিনিটের জন্য হাসতে দেখেনি ছোঁয়া। ভীষণ অবাক হয় একটা মানুষ রোবটের মতো কিভাবে চলাফেরা করতে পারে!..?

__________

নিরুপমা রান্না ঘরে যেতে যেতে বলে উঠলো, ‘ আমার তো সন্দেহ হচ্ছে! আসলেই কি মেয়েটা আব্বার পরিচিত কিনা..? এতো সুন্দর মেয়ে আমি আগে কখনো দেখিনি। এই মেয়েনা আবার এই পরিবারের ধ্বংশ ডেকে আনে।
হালিমা বেগমঃ শশুর আব্বা যাকে তাকে বাসায় আশ্রয় দেয়। কেনো মেয়ের অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিলেই হয়। বাড়িতে দুইটা ছেলে আজ বাদে কাল আরেক ছেলে আসবে কি দরকার খাল কেটে কুমির নিয়ে আশার।
নিরুপমাঃ আজ আবার মার্কেট করাতে শ্রাবণ কে পাঠিয়েছে।
হালিমা চৌধুরীঃ সুন্দরী মেয়েরা খুবই ভয়ংকর হয়। মেয়েটার মুখের কাঁটা দাগ গুলো দেখে মনে হয় কেউ ভীষণ মেরেছে। আমার তো আব্বার কথা একটুও বিশ্বাস হয়নি।

আমেনা বেগম রান্না ঘরে এসে ধমকে বলে উঠলো, ‘ চুপচাপ কাজ করো। মেয়েটাকে নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ । বিপদে পড়ে এসেছে। বাড়িতে রুম কি কম পড়েছে থাকলে সমস্যা কি! নিজের মেয়ের মতো দেখতে শুরু করো।
নিরুপমাঃ ভাবি আমরা তো মেয়েটিকে বেরিয়ে যেতে বলছি না। শুধু নিজের ছেলেদের সাবধানে রেখো যেই আগুন সুন্দরী। এমন মেয়েরা কিন্তু ভয়ংকর, যেখানে যায় ধ্বংস ডেকে আনে।
আমেনা বেগমঃ হয়েছে বলা!.? মেয়েটার মুখ দেখলেই বুঝা যায় খুব ভদ্র পরিবারের। আমাদের ছোঁয়া কি কোনো অংশে কম..? আমাদের ছোঁয়াও ভীষণ সুন্দর কই সে তো ধ্বংস ডেকে আনছে না। এইসব আলোচনা বন্ধ করো, কাল আমার ছোটো ছেলে আসছে ওর জন্য কি কি আয়োজন করবো!..? কতোগুলো বছর পর বাড়িতে ফিরছে। বলতে বলতে চোখে জল জমা হলো। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে রান্নায় হাত বাড়ালো তখনি দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো।

আমেনা বেগম হাতের মাছটা রেখে হালিমা বেগমকে দিতে বলে দরজা খুলতে গেলেন।

দরজা খুলতেই থমকে গেলেন তিনি। খুশিতে কি করবেন তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। চোখ কি আজকাল ভুল দেখতে শুরু করলো.?
কেউ একজন উনাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমেনা বেগম খুশিতে কাঁদতে শুরু করলেন। পাঁচটা বছর পর চোখের সামনে ছেলেকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়ে ছিলেন।

আহনাফ চৌধুরী মা’ কে জড়িয়ে ধরে কান্না থামাতে বললো।
আমেনা বেগম ছেলের মুখে হাত রেখে তাকিয়ে রইলেন জেনো কতো, কতো যোগ পরে ছেলেকে দেখছেন।

আহনাফ মা’কে শান্ত করিয়ে বলে উঠলো, ‘ সারপ্রাইজ আম্মু।’

আমেনা বেগম কে আসতে না দেখে নিরুপমা রান্না ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। চোখের সামনে আহনাফ চৌধুরী কে দেখে অবাক হয়ে বলে উঠলো, ‘ আহনাফ বাবা তুমি!!.’?
নিরুপমার মুখে আহনাফ ডাক শুনে ভ্রু কুঁচকে বের হয়ে আসলো হালিমা বেগম। কিছু সময়ে মধ্যে বাড়িতে খুশির বর্ষা ভয়ে গেলো।
আহনাফ সবার সাথে দেখা করেই চলে গেলো দাদিজানের রুমে।
আনোয়ার চৌধুরী বাড়িতে নেই। নেই উনার দুই ছেলে। সবাই হয়তো রাতে আসবে।

নিরুপমা ভাবতে লাগলেন। কতো সারপ্রাইজ রেডি করে রেখে ছিলো ছোঁয়া আহনাফের জন্য। এসে যদি দেখে ওর সারপ্রাইজের আগেই আহনাফ নিজেই সারপ্রাইজ দিতে চলে এসেছে মেয়েটা ভীষণ কষ্ট পাবে।

আহনাফ আফরোজা বেগমের সামনে গিয়ে বসলো।
আফরোজা বেগম নাতিকে দেখেই কাঁদতে শুরু করলো। উঠে বসতে চাইলে আহনাফ সাহায্য করলো।
আফরোজা বেগমঃ আমি তো ভেবে ছিলাম বউ বাচ্চা নিয়ে ফিরবে।
আহনাফ হেঁসে ফেললো দাদিজানের এমন অদ্ভুত কথা শুনে।
আফরোজা বেগমঃ হেঁসো না, আমি বুঝি মৃত্যুর আগে নাতির বউ দেখে যেতে পারবো না। তোমার বড় ভাই আমার কথা শুনছে না।
আহনাফঃ দাদিজান আমি চলে এসেছি খুব জলদি বড় ভাইকে বিয়ে দিয়ে আপনার ইচ্ছে পূরণ করে দিবো। আপাতত নিচে চলুন আপনার জন্য বেনারসি এনেছি।
আফরোজা বেগম লজ্জামাখা হাসি দিয়ে বলে উঠলেন,’ তুমি ভীষণ পাঁজি হয়ে গেছো।’
আহনাফঃ কি করবো বলেন আমার আফরোজা বঁধুকে বউ সাজে দেখার ভীষণ সখ জেগে ছিলো।
আফরোজা বেগম চমৎকার হাসলেন। এখনো হাসলে কি ভীষণ মুগ্ধতা মিশে যায় উনার হাসিতে।

আহনাফঃ আপনি জানেন, আপনি এখনো সেই আফরোজা সুন্দরী রয়ে গেছেন। দাদার সাথে দেখা না হয়ে আপনার আমার সাথে প্রথম দেখা হওয়া প্রয়োজন ছিলো। ওই বুড়ো লোকটার পাশে এতো সুন্দরী নারী কিভাবে মানায় বলুন!!..?
আফরোজা বেগম আহনাফের কান মুচড়ে ধরে বলে উঠলেন,’ আমার সাথে ফ্লার্ট করছো!..?
আহনাফ হেঁসে উঠলো সাথে আফরোজা বেগম ও হেঁসে উঠলেন।

আফরোজা বেগমের সব থেকে প্রিয় নাতি আহনাফ। আর আহনাফের প্রানপ্রিয় তার দাদিজান। আর এই নিয়ে যুদ্ধ চলে দাদা নাতির মধ্যে।

আহনাফ আফরোজা বেগম কে সাথে নিয়ে নিচে আসতেই। আমেনা বেগম শাশুড়ীকে দেখে হেঁসে বললো, ‘ আম্মা চা করে দিবো..?’
~ নিয়ে আসো।
আমেনা বেগমঃ আহনাফ আব্বু তুমি ফ্রেশ হয়ে নাওও। বাড়িতে সবাই চলে আসলে আর রুমেও যাওয়ার সুযোগ পাবে না। তুমি আসবে শুনে বিকেলে সবাই চলে আসবে বলেছে। উপরের রুম তোমার জন্য।

____

বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়ে ছিলো নির্জন। আজ ১৫দিন পর বাসায় ফিরলো।
বাসায় এসেই আফরোজা বেগম কে এতো খুশি দেখে সোফায় ঘা এলিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,’ কি বুড়ি এতো খুশি কেনো.?? ‘
আফরোজা বেগম চোখ গরম করে তাকিয়ে বলে উঠলো, ‘ দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস! একদম বুড়ি বলবি না!!..।

আফরোজা বেগম কে রাগীয়ে বেস মজা পেলো নির্জন।
~ তাহলে কি কচি খুকি বলবো..!? তোমার যেই হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে কচি খুকি বলা উচিত ছিলো বুড়ি বয়সে যত ভীমরতি! ।
~ আফরোজা বেগম আর রেগে তাকিয়ে বলে উঠলো, ‘ আমি এখনো অনেক সুন্দরী। ‘
হুঁ হুঁ করে হেঁসে উঠলো নির্জন।
~ তা বুড়ি এখন কি পাত্র খুঁজবো.? বুড়ো তো তোমার রুপের জ্বলকানিতে চোখে দেখে কম।
আফরোজা বেগম চা মুখে দিয়ে বলে উঠলো,
~বাসায় এসেছো নিজের রুমে যাও।
~ বুড়ো কই.?? বাসায় এতো আয়োজন কিসের..? মনে হচ্ছে মহিলারা রান্নার প্রতিযোগিতা লেগেছে! বেপার কি.? সত্যি কি তোমাকে দেখতে আসছে নাকি.?

আফরোজা বেগম হেঁসে বললেন,’ আহনাফ এসেছে। ‘
নির্জন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো, ‘ সত্যি বুড়ি!..? সেই জন্য এভাবে কচি সেজে বসে আছো!.?
আফরোজা বেগম কটমট চোখে তাকালেন। নির্জন পাত্তা না দিয়ে ছুটলো ভাইয়ের রুমের দিকে।

_____

ছোঁয়া যেটা দেখছে সেটাই নিচ্ছে।
মহুয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে তা দেখছে।
ছোঁয়াঃ মহুয়া আমি দেখতে দেখতে ক্লান্ত তুমি দেখো এখন।
মহুয়াঃ আর কতো নিবে.?
ছোঁয়াঃ টাকা ভাই দিবে বুঝতে পারছো!! এমন সুযোগ আর কবে না কবে পাই। হাত ছাড়া করা যাবে না।
মহুয়া ছোঁয়ার কথা শুনে হাতের দিকে তাকালো। এতোগুলো নিয়েছে তাও নাকি আরও নিবে!

শ্রাবণ পকেটে এক হাত দিয়ে অন্য হাতো মোবাইল দেখছে। মোবাইল নয় সে তো আঁড়চোখে বার বার আয়নার মধ্যে মহুয়াকে দেখছে।

ছোঁয়ার পাঁচ ঘন্টার শপিং শেষ হলো।

ওরা বাড়িতে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

শ্রাবণ ওদের বাড়ির সামনে নামিয়ে চলে গেলো। অফিস থেকে কল আসছে জলদি যেতে হবে।

ছোঁয়া সব শপিং সোফায় রেখে বসে পড়লো। নিরুপমা মেয়ের দিকে এগিয়ে আসলো৷ আফরোজা বেগম গম্ভীর মুখে মহুয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন।
মহুয়া চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে আসলো।
নিজের রুমে প্রবেশ করেই অবাক হয় মহুয়া। রুম এতো অন্ধকার কেনো!.?

মোবাইলের ফ্লাশলাইট অন করে রুমের লাইট জ্বালায়। আশেপাশে তাকিয়ে বেস অবাক হয়। রুমে ওর কোনো জিনিসপত্র নেই!সাথে ছোঁয়ার ও কিছু নেই!।
বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা শার্ট। ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। মহুয়া বাহিরে এসে একবার দরজার দিকে তাকায় এটাই তো তার রুম।
আবার রুমে এসে ফ্যান ছেড়ে বিছানায় বসতেই কারেন্ট চলে গেলো খট করে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো একটা ছেলে।
মহুয়া রুমে আবছা ছেলের অবয়ন দেখেই ভয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। দ্বিতীয় বার ছেলেটার দিকে আর তাকালো না।
এক ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ভয়ে চুপসে গেলো মুখ,কাঁপতে থাকলো শরীর। তারাও কি সেই মানুষগুলোর মতো..? ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসলো।

আহনাফ বিড়বিড় করে বলে উঠলো এটা কি কোনো মানুষ ছিলো নাকি পেত্নী!.?

চলবে…

ভুলত্রুটি মার্জনীয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here