মেঘের আড়ালে রোদ পর্ব ২৬

0
65

#মেঘের_আড়ালে_রোদ
#পর্ব_২৬
লেখিকা #Sabihatul_Sabha

” মেঘ আপনি এখানে…?”

মেঘলা বিরক্ত হলো এই সময় সাজ্জাদকে এখানে দেখে। তবুও মুখে জোর করে হাসি ফুটালো।

সাজ্জাদঃ বললেন না তো! এতো রাতে এখানে কেন.??
মেঘলা ঘাবড়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো” অনেক রাত হয়ে গেছে বুঝি..?”
সাজ্জাদঃ আপনার কাছে মোবাইল বা ঘড়ি নেই..?
মেঘলাঃ আসলে আমি মোবাইল ব্যাবহার করতে পারি না আর ঘড়ির টাইম চিনি না।
সাজ্জাদঃ ওহ্ আচ্ছা, বেপার না আমি শিখিয়ে দিব সব।
মেঘলাঃ জ্বি এখন আমি আসি।
সাজ্জাদঃ এখানে কেন এসেছেন..? মনে হচ্ছে সিআইডি অফিস থেকে বের হলেন।
মেঘলাঃ আসলে একটা কেইসে আমাকে একটু দরকার ছিল।
সাজ্জাদঃ আপনাকে? কিন্তু কেন.?
মেঘলাঃ আসলে……. আমার বাসায় যেতে হবে উনি নিশ্চয়ই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
সাজ্জাদ অন্য দিকে ফিরে হাসলো। মেঘলা যখন জানবে মেঘলা আর শ্রাবণের সম্পর্কের কথা সাজ্জাদ খুব ভালো করেই জানে নিশ্চয়ই অবাক হবে।

মেঘলা মাথার কেপ টেনে চোখের কাছে এনে মাথা নিচের দিকে করে পকেটে হাত দিয়ে হাটতে শুরু করলো।

দূর থেকে সাজ্জাদ তাকিয়ে কিছু সময় মেঘলার যাওয়া দেখলো। কোনো মেয়েকেও এমন লোকে এতো সুন্দর লাগতে পারে সাজ্জাদের জানা ছিল না সে দৌড়ে মেঘলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

মেঘলা দেখেও দেখলো না। এখন সে একটু একা রাস্তায় হাঁটতে চাচ্ছে।

সাজ্জাদঃ আপনি তো অনেক দ্রুত হাঁটতে পারেন।
মেঘলাঃ হুম, হাঁটতে হাঁটতে অভ্যাস হয়ে গেছে।
সাজ্জাদঃ তাহলে চলুন এই নির্জন রাস্তায় হাঁটার রেস লাগাই!.?
মেঘলাঃ আজ নয়।
সাজ্জাদঃ আজ প্লিজ, এতো সুন্দর একটা রাত। এভাবে চুপচাপ হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।
মেঘলা সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
মেঘলাঃ চলুন।
সাজ্জাদ খুশিতে মাথা ঝাঁকিয়ে মেঘলার দিকে তাকালো।

রাস্তার মাঝে দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো সাজ্জাদ আর মেঘলা।

মেঘলাঃ যে আগে বাড়ির সামনে যেতে পাড়বে সেই আজকের বিজয়ী।

সাজ্জাদঃ আর যে বিজয়ী হবে তার জন্য..?
মেঘলা কিছু একটা ভেবে বলে উঠলো, ‘ তার একটা ইচ্ছে পূরণ করা হবে।”

_____________

ছোঁয়া ছাঁদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো নির্জন ছোঁয়া দেখেও দেখলো না আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ আজকের আকাশটা এতো অন্ধকার কেন.??”
নির্জন ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। মেয়েটা অল্পতেই ইমোশনাল হয়ে যায়।
নির্জনঃ তোর চোখ অন্ধকার সেই জন্য সব কিছু অন্ধকার লাগছে।

ছোঁয়াঃ সর তুই।
নির্জন ছোঁয়ার হাতে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,’ ওই দূরের চাঁদের মতো আমার পাশেও এক চাঁদ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এটা কিন্তু ঠিক না ছোঁয়া তোর জন্য আজকের আকাশটা অন্ধকার হয়ে আছে এই হাস্যজ্বল মুখে আমাবস্যা মানায় না।
ছোঁয়াঃ আমি কোনো চাঁদ নই।
নির্জনঃ তাহলে তুই কি..?
ছোঁয়াঃ আমি মানুষ।
নির্জনঃ না তুই পেত্নী।
ছোঁয়া রেগে বলে উঠলো, ‘ তাহলে তুই পেত্নীর জামাই জ্বীন।
নির্জনঃ ভুল বললি জ্বীন হলো পরীর জামাই।
ছোঁয়া রেগে আরেকটা বললো তো নির্জন বলছে আরেকটা ঝগড়া বাড়ছো কমছে না, তবে এই ঝগড়ায় রাগ ঘৃণা নেই আছে শুধু জিতার পালা…

শ্রাবণ ব্যালকনি থেকে রাস্তার দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর একের পর এক সিগারেট শেষ করছে।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে মেঘলার। নিজের পরিবর্তনে সে নিজেই অবাক হচ্ছে। একটা মেয়ের জন্য সে কাজ,ঘুম ফেলে রাস্তার পানে চেয়ে চেয়ে রাত কাটাচ্ছে!!

ঘড়ির দিকে তাকালো রাত ১টা বাজে। এখন তো টেনশন হচ্ছে। মেয়েটা কোনো বিপদে পড়ল না তো!..?কোথায় এখনো.? খুব রাগ হলো মন তো চাচ্ছে!! নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলে উঠলো ” কাল থেকে এই মেয়ের বাহিরে যাওয়া বন্ধ। ”

মোবাইল পকেটে রেখে আবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো। দূর থেকে কাউকে আসতে দেখে সিগারেট নিচে ফেলে তাকালো। মেঘলাকে চিনতে একটুও ভুল করলো না। এই কয়দিনে মেয়েটার হাঁটা, কথা বলার ধরন, তাকানো, রাগ, অভিমান সব শ্রাবণ চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে পারে।

মেঘলা গেইটের সামনে এসে থামলো। দশ মিনিট পর সাজ্জাদ এসে দাঁড়ালো মেঘলার পাশে। শ্রাবন মেঘলার সাথে সাজ্জাদকে দেখে তাকিয়ে রইলো। ওরা হেঁসে হেঁসে কথা বলছে আর এই সিগারেটের আগুনের ধোঁয়ার মতো শ্রাবণের ভেতর জ্বলছে, কিন্তু কেন!!..? মেঘলার আশেপাশে সাজ্জাদকে কেন শ্রাবণের সহ্য হয় না..? কেন এতো জ্বলে.??

শ্রাবণ মেঘলার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এতোক্ষনের এতো চিন্তা এক মুহুর্তেই রাগে পরিনত হলো।

নির্জন ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রেগে বলে উঠলো, ‘ এতো বকবক কিভাবে করছ.?? সাথে আমার চুল গুলো তো অর্ধেক শেষ করে দিলি।’
ছোঁয়াঃ প্রথম তুই আমার চুল কেন দরলি..?
নির্জনঃ আমি তো আস্তে করে টান দিলাম।
ছোঁয়াঃ হাতির মতো হাত আবার বলে আস্তে করে টান দিছি সর সামনে থেকে।
নির্জনঃ আগে সরি বলে মাফচা।
ছোঁয়াঃ জীবনেও না।
নির্জন ছোঁয়ার ছোট শরীর টাকে কোলে তুলে নিল।
ছোঁয়াঃ এ্যাঁই এ্যাঁই নির্জন নামা বলছি।
নির্জনঃ আমি এখন তোকে একদম ছাঁদ থেকে ফেলে দিব।
ছোঁয়াঃ নাএএএএএএএএএএ..
নির্জন ছোঁয়ার মুখ চেপে ধরে বলে উঠলো,’ চুপ,একদম চুপ, মাফ চাইলে ছেড়ে দিব।’
ছোঁয়া একবার ছাঁদ থেকে নিচের দিকে তাকালো।
নির্জনঃ জলদি কর আমি একটা আটার বস্তা কে বেশিক্ষন নিয়ে রাখতে পারবো না।
ছোঁয়াঃ কিইই!! আমি আটার বস্তা..?
নির্জনঃ একটু কম করে খাবি..
ছোঁয়া গাল ফুলিয়ে নির্জনের দিকে তাকালো।
নির্জনঃ আজ কি আমার কোল থেকে নামার ইচ্ছে নেই.??
ছোঁয়াঃ সরি..
নির্জন কান উপরের দিকে করে বললো,’ আবার বল শুনতে পাইনি!!..’
ছোঁয়াঃ সরিইই…
নির্জনঃ সুন্দর করে বল।
ছোঁয়া দাঁতের সাথে দাঁত চেপে কিছু বলার আগেই নির্জন বলে উঠলো, ‘ ছোঁয়া গেইটের দিকে তাকা।’

ছোঁয়া রাগি চোখে নির্জনের দিকে তাকিয়ে গেইটে তাকালো। মুহূর্তেই চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো। খুশিতে নিজের অজান্তেই নির্জনের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিলো৷

নির্জন থমকে গেল। আধো অন্ধকারে তাকিয়ে রইলো ছোঁয়ার হাস্যজ্বল মুখের দিকে…

আহনাফের পিছু পিছু মেঘলা বাসায় ঢুকলো। এখন বাসার সবাই গভীর ঘুমে..
মেঘলা রেগে থাকলেও ভয়ে আহনাফ কে কিছু বলতে পারছে না আর না পারছে কিছু করতে।মন চাচ্ছে ঠিক বুকের বা পাশে চা*কু ঢুকিয়ে দিতে। কিন্তু মন চাইলেও সেই সাহস নেই মহুয়ার। সে এই পুরুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারে না আর বুকে চা*কু ঢুকাবে.!!.??’

মহুয়া আহনাফের পেছনে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এমনিতেই বেশি কথা বলার জন্য একটা থাপ্পড় খেয়েছে আর কোনো কথা সে ভুলেও বলবে না।
আহনাফ পেছন ফিরে ব্যাগ মহুয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, ‘ কাল সব চলে আসবে নিজের রুমে যাওও.. আর তুমি চাইলে আমি কাল সবটা সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই.. আর তুমি না চাইলেও জানাতে চাই এবং জানাব’
মহুয়া রোবটের মতো ব্যাগ হাতে নিয়ে উপরের দিকে যাচ্ছে। আহনাফ পেছন থেকে ডাকলো।
মহুয়া থামলো কিন্তু আহনাফের দিকে ফিরলো না। আহনাফ কিছু বলার আগেই উপরের রুম থেকে বিরাট এক শব্দ আসল।
আহনাফ মহুয়া দুইজন উপরে তাকিয়ে দেখলো শ্রাবণ রেগে নিজের দরজায় লাথি বসিয়ে হনহন করে ছাঁদের দিকে চলে যাচ্ছে ।
ছোঁয়া ছাঁদ থেকে নামছে শ্রাবণকে দেখে থামলো। অবাক হয়ে শ্রাবনের দিকে তাকালো। দেখেই বুঝা যাচ্ছে প্রচুর রেগে আছে৷
শ্রাবণ ছোঁয়ার দিকে না তাকিয়ে ছাঁদে চলে গেল৷
ছোঁয়া ঠোঁট উল্টে বলে উঠলো,’ আমাদের বাড়ির ছেলেদের সমস্যা কি!.?? এরা এখনি ভালো তো এখনি রেগে বোম।

ছোঁয়া প্রথম প্রথম কিছু সময় একটু রেগে থাকার ভান করলো। মহুয়া জড়িয়ে ধরতেই সব শেষ ।
ছোঁয়াঃ তুমি আর যাচ্ছ না তো..? দেখ মহুয়া আমি আর তোকে ভুলেও যেতে দিব না।
মহুয়া হাসলো। ছোঁয়ার পাগলামি দেখে মহুয়ার নিজেকে খুব মূল্যভান কিছু মনে হচ্ছে আজ।

ছোঁয়াঃ ভাইয়াকে তো অনেক গুলো ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।
আহনাফের কথা উঠতেই হাসি উড়ে গেল।
মহুয়া থমথমে মুখে বলে উঠলো,’ ওই লোকের নামও আমার সামনে নিবে না ছোঁয়া। ‘
ছোঁয়াঃ কিছু কি হয়েছে.?
মহুয়া চুপচাপ একটা পেপার ছোঁয়ার দিকে এগিয়ে দিলো।
ছোঁয়া পেপারটা হাতে নিয়ে মহুয়ার দিকে তাকাতেই মহুয়া বলে উঠলো, ‘ আশা করি এই বিষয় তুমি আমি আর উনি ছাড়া কেউ কোনোদিন জানবে না।

ছোঁয়ার মুখে কোনো কথা নেই সে অশ্রু টলটল চোখে পেপারটার দিকে তাকিয়ে রইলো ।

চলবে…
ভুলত্রুটি মার্জনীয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here