মুঠোবন্দী লাজুকলতা পর্ব ৮

0
80

#মুঠোবন্দী_লাজুকলতা
#অপরাজিতা_মুন
#পর্ব_৮

🍁
নিকষ কালো আঁধার চারিদিকে। আজ আকাশের বিশালতায় নেই কোনো নক্ষত্রের মেলা। চাঁদটাও মেঘার আড়ালে ঢেকে আছে। আশেপাশের বিল্ডিং গুলোতে অল্প কিছু ফ্লাটে আলো জ্ব/লছে। কোলাহল ময় শহর ঢেকে আছে পিনপতন নিরবতায়। পিঠ টান টান করে রাইফ বারান্দায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে অনেক ক্ষণ হলো। পরনে নেভি ব্লু টিশার্ট। বুকের উপর দু হাত আড়া আড়ি ভাঁজ করা। অন্ধকারে ঢেকে আছে তার মুখাবয়ব। এক ধ্যানে সম্মুখে স্থির দৃষ্টি। বিষন্ন মন তার। কিছুক্ষণ আগে বাবা জাহাঙ্গীর আলম এর কবর জিয়ারত করে এসেছে মা ছেলে মিলে। ফেরার সময় থেকে বাসায় আসা অব্দি একে অপরের সহিত একটা টু শব্দও করে নি দুজন। এসেই রাজিয়া বেগম সোজা তার রুমে ঢুকেছে। রাইফ জানে উনি আর বের হবেন না আজ। মুখে আঁচল চেপে ডুকরে কাঁদবে সারা রাত। প্রিয় জন হারানোর ব্যাথা তিল তিল করে আঘাত করবে তাকে। এক সময় তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হবেন। কিন্তু রাইফ, তার কি আজ দু চোখের পাতা এক হবে! জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুর পর কতো রজনী যে বারান্দায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে কেটেছে তা এক আল্লাহ আর এই শহরের কাক পক্ষী ব্যাতিত বোধহয় কেউ জানে না। রাইফের খুব ইচ্ছে করে মায়ের মতো করে কেঁদে নিজেকে হালকা করতে। এই যে ভেতরটায় পাথর জমে আছে সেটা গলিয়ে ফেলার নিরন্তর প্রচেষ্টা তার ভেতর। কিন্তু আঁখিজল যেনো কঠিনপণ করেছে বাহিরে না আসার। এই বোঝা যে ভীষণ ভারী। বুকে রক্তক্ষরণ হবে কিন্তু চোখে বের হবে না একবিন্দু নোনাজল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে সুস্থে মায়ের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। রাতের খাবার খায়নি কেউ ই। মেডিসিন টুকু না নিলে ব্লা/ড প্রেসার হাই হয়ে যাবে রাজিয়া বেগমের। রুমের ভেতর থেকে গুঙ্গিয়ে কান্নার চাপা আওয়াজ আসছে। কি যে হাহাকার সেই কান্নায়!রাইফের হৃদয়টা যেনো এবার আরো বেশি ভার হলো। জড়তা কাজ করছে মা কে ডাকাতে। দ্বিধা-দ্বন্দ করে সময় নিয়ে টোকা দিলো হালকা কারুকাজের কাঠের দরজায়। খুব মোলায়েম স্বরে আবেগ মাখা কন্ঠে ডাকল,

-‘আম্মা?’

ডাকার সাথে সাথেই কান্নার আওয়াজ থেমে গেলো। ঘড়ির কাটার সময় টিকটিক করে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। রাইফ নড়ছেনা। চলেও যাচ্ছে না। সম্মুখে স্থির দৃষ্টি তার। যেনো এখান থেকে ঠিক কিছু আসবে, তাকে ফিরিয়ে দিবে না। ভেতরের মানুষটি নিজেকে সামলানোর জন্য যে সময় প্রয়োজন তা রাইফ জানে।মিনিট চারেক পেরুতেই ভেতর থেকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠের আওয়াজ এলো,

-‘আমি ঠিক আছি আব্বা। তুই শুয়ে পর। মেডিসিন খেয়ে নিবো, চিন্তা করিস না।’

রাইফ পলক ঝাপ্টালো। মায়ের এই যে ‘আমি ঠিক আছি’ বলাটা। কিন্তু আসলেই কি উনি ঠিক আছেন? উনার ভেতর বাহির পুরোটাই যে আজ বিধ’স্ত। তারপরেও এখন একটু স্বস্তি বোধ করছে রাইফ। মাকে দ্রুত শুয়ে পড়ার জন্য আদেশ দিয়ে শব্দবিহীন পায়ে আবারও বারান্দায় এলো। চেয়ারে বসে পা তুলে দিলো সামনের গ্রিলে। আজ আকাশ এর গভীরতা দেখেই কাটাবে নিঃসঙ্গ রাত্রী। কিন্তু তার অজানায় রয়ে গেলো তার মতো এই শহরেরই ঠিক দুতলা নিচে ফ্লোরে বসে ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক ব্যাথাতুর নারী। রাইফের মতো প্রিয় জন হারানোর ব্যাথায় সে জর্জরিত হয়ে আসছে দিনের পর দিন। রাতের পর রাত। নিজেকে নিজে সামলানো এখন আরো কঠিন হচ্ছে মেয়েটির।

____________________

রাতের শেষ ভাগে আকাশে নক্ষত্র রাজি ফুটে উঠেছে। জ্বল জ্বল করছে আপন স্বত্তায়। ফজরের আজান আসছে পাশের এবং দূর দূরান্তের মসজিদ হতে। কি সুমধুর তার বানী।
‘আস সালাতু খাইরুম মিনার নাউম….
আস সালাতু খাইরুম মিনার নাউম…’

মীরা নড়ে চড়ে উঠলো। ফোলা ফোলা ঝাপসা চোখে আশে পাশে আবছায়া আলোয় পরখ করে নিলো নিজের অবস্থান। মাথাটা প্রচন্ড ভার ভার লাগছে তার। কোনো রকমে উঠে বসলো। কতোক্ষণ ঝিম মে/রে থেকে এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে নিল। ফ্লোর থেকে উঠে তাওয়াল নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পরেছে। গোসল না করলে কিছুতেই ফ্রেশ লাগবে না। হালকা হবে না শরীর এবং মন।

_______________________

ভোরের সূর্য এখনও উঠেনি পূর্ব আকাশে। অন্ধকার ভাব এখনও বিরাজমান। ধরণীতে আলো ফুটবে ফুটবে ভাব। শীতল হাওয়া বইছে।
শওকত রহমান আর উর্মি আগে আগে হাঁটছেন। মীরা পেছন পেছন। ধীর পায়ে ভোরের স্নিগ্ধতা টাকে অনুভব করছে সবাই। উর্মি মামু মামু করে অস্থির করে তুলেছে শওকত রহমান কে। একের পর এক প্রশ্ন চলছেই। এটা কেনো হলো, না হলে কি হতো, হওয়ার কি খুব দরকার ছিলো? শওকত রহমান ধৈর্যের সহিত বুঝিয়েই যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর পর হীম শীতল বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে তাদের। রাতের ঘটনার পর খারাপ ছিলো মীরার মন। এমন চমৎকার পরিবেশ পেয়ে মূহুর্তেই ফুরফুরে হলো মীরার হৃদয়। পিচ ঢালা রাস্তায় পথ চলতে চলতে হঠাৎ কি মনে করে পিছু ফিরলো। রাইফের সেদিনের বলা কথাটা ‘বারান্দায় আসো না কেনো মেয়ে, সমস্যা কি? কেউ অপেক্ষা করে তোমার জন্য।’ মনে হতেই উপরে তাকিয়ে নিজের বারান্দায় চোখ বুলালো। দৃষ্টি ফিরাবে তখন বেহায়া নজর গেলো পাঁচ তলা বিল্ডিং এর বারান্দায় অবস্থান করা পুরুষটির দিকে। কেমন শক্ত হয়ে বসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দুই পায়ে দুই হাতের কুনুই ভর দিয়ে শরীর একটু সামনের দিকে ঝুঁকে একত্র করে দেখেছে দু হাতের দশটি আঙ্গুল। চুল এলো মেলো, বি’ধ্ব’স্ত চেহারা, স্থির তার চাহনী। নিশ্চয় চোখ দুটি রক্তিম লাল হয়ে আছে। অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে মীরার দিকেই। মীরা সম্মুখে হাঁটছে ধীর পায়ে। কিন্তু দৃষ্টি তার পেছন দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেই যাচ্ছে আজ। সংকোচ কাজ করছে না একটুও। কোনো এক শক্তির বলে নজরও ফেরাতে পারছে না। মীরার মনে হচ্ছে আজ কেনো যেনো লোকটিকে অন্য রকম লাগছে। আজ তার চোখে মুখেও নেই কোনো দুষ্টমির ছোঁয়া। এমন কেনো লাগছে লোকটিকে? রাইফ ও স্থির। ভাবলেশহীন তার চেহারা। গভীর চোখে মীরার দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখেছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মীরাকে। চোখে কি তার মায়া! কি স্নিগ্ধ, পবিত্র লাগছে ভোরের প্রথম আলোয়। পেছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁটার কারণে মীরা হোঁচট খেলো রাস্তায়, পরতে গিয়েও সামলে নিলো নিজেকে। সামনে দৃষ্টি দিলো। পিছু না ফিরে সঙ্গী হলো আব্বাজানের। পেছনে রেখে গেলো কারোর এক বুক অপেক্ষার আর্তনাদ। মন ভরে দেখার এক বুক তৃষ্ণা। কেউ খুব করে চাচ্ছে, এই মূহুর্তটা থেমে যাক এখানেই। হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে চায় তার চোখের ভাষা। মনে মনেই আওড়ালো গানের দুই লাইন,

“আমি প্রথম দেখে পা’গল হইলাম
মন তো আর মানে না……
কাছে আইসো, আইসো রে, বন্ধু.. প্রেমের কারণে
ভালোবাইসো বাইসো রে, বন্ধু, আমায় যতনে”

চলবে……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here