মুঠোবন্দী লাজুকলতা পর্ব ৩৬

0
63

#মুঠোবন্দী_লাজুকলতা
#অপরাজিতা_মুন
#পর্ব_৩৬

পর পর কেটে গেছে তিন দিন। দুই দিন হলো স্বামী এবং শাশুড়ীর অনুমতিতে আপন নীড়ে ফিরে এসেছে মীরা। অনেক দিন পর মেয়েকে কাছে পেয়ে শওকত রহমান যেনো একটুকরো চাঁদ হাতে পেয়েছেন। চোখের আড়াল হতে দিচ্ছেন না কিছুতেই। একটু এদিক সেদিক গেলেই রাশভারি বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটা ‘আম্মাজান, আম্মাজান। কই গেলো আমার আম্মাজান?’ বলে ডেকে ওঠেন। এই তো কিছুক্ষণ আগে শাশুড়ীকে এক পলক দেখতে পাঁচতলায় গিয়েছিলো মীরা, তার অনুপস্থিতিতে পুরো বাসা সুদ্ধ খুঁজে বেরিয়েছেন তিনি। স্বামীর এমন কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে খাদিজা বেগম যখন বললেন, মীরা উপরে গেছে তখনি ক্ষান্ত হয়েছেন।

মসজিদ হতে মাগরিবের সালাত আদায় করে বাসায় ফিরেই শওকত রহমান উঁকি দিলেন মেয়ের রুমে। দরজা খোলা তাই আর নক করার প্রয়োজন বোধ মনে করলেন না। বিছানার মাঝ বরাবর বসে আছে মীরা। তার চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক গুলো শাড়ি। সুতী, জামদানী, টাংগাইল শাড়ী বেশি। বেশির ভাগ শাড়ির রং সাদা, সবুজ কিংবা ঘি’য়ে।
মেয়েকে এক পলক দেখে শওকত রহমান গলা খাঁকারি দিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। পিতার পরিচিত কন্ঠস্বর কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই নুইয়ে রাখা মাথাটা তুলে মীরা সামনে তাকালো, চোখে চোখ পরতেই মিষ্টি একটা হাসি ছুড়ে দিলো প্রাণপ্রিয় আব্বাজানের জন্য। সালাম বিনিময় করে বাবাকে বসার ব্যাবস্থা করে দিতে বিছানা হতে কিছু শাড়ি সরিয়ে একপাশে রাখলো মীরা। রাশভারী প্রবীণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষটি মেয়ের কাছাকাছি এসে বসলেন। গাম্ভীর্য পূর্ণ চেহারায় সুন্দর একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন,

-‘কি করছে আমার আম্মাজান?’

-‘দাদীজানের শাড়িগুলো গোচাচ্ছি আব্বাজান। অনেক দিন তোলা ছিলো, আজ রোদে দিয়েছিলাম। ভাঁজ করা শেষ হলেই আলমারিতে রাখবো।’

-‘রেখে আর কি হবে? আম্মাজানের অনুপস্থিতিতে এগুলো সব তো আপনারই। সাথে নিয়ে যাবেন, মাঝে মাঝে পরবেন।’

মীরার মুখে মিঠে হাসিটা ফুটে উঠল আবারও। শুধু শাড়ি কেনো, বেঁচে থাকা কালীন পুরো মানুষটাই যে তার ছিলো। হাসির আড়ালে চাপা দীর্ঘশ্বাস টা বুকের মাঝেই চাপা রেখে হালকা বেগুনি রংয়ের একটা শাড়ি নাকের কাছে নিয়ে আঁখি পল্লব বন্ধ করে লম্বা একটা শ্বাস গ্রহণ করল মীরা। রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করলো নূর জাহান বেগমের শরীরের মমতাময়ী ঘ্রাণ। শাড়িটা শওকত রহমানের হাতে দিয়ে হাসি-হাসি মুখে বলল মীরা,

-‘দাদীজান আমাদের সাথেই আছে তাই না আব্বাজান। এই যে দেখেন, কতো গভীর ঘ্রাণ। এখনও ঠিক আগের মতোই।’

শওকত রহমানের আদলখানি মলিন হলো কিছুটা। নিজের মেয়ের মাঝে মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেও মায়ের শূন্য স্থান যে কখনোই পূরণ হবার নয়। সময়ের তালে তালে বয়স বাড়লেও মাতৃস্নেহের জন্য তার মন কাঁদে মাঝে মাঝেই। ভেতরের হাহাকার টা আড়াল করলেন মীরার থেকে। শাড়িটা আলতো হাতে ছুঁয়ে বুকে চেপে ধরলেন। মায়ের স্নেহময় কোলটাকে অনুভব করলেন সংগোপনে। অনেক গুলো ভাঁজ করা শাড়ি থেকে গাঢ়
সবুজ-কালো রংয়ের সংমিশ্রণে সুতোর বুননে কারুকার্যখচিত জামদানী শাড়িটা হাতে নিলেন। মীরার ন্যায় তিনিও নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিলেন। আগের থেকে কমে গেলেও, মায়ের সেই পরিচিত ঘ্রাণ ঠিকি বুঝতে সক্ষম হলেন তিনি।

-‘আম্মাজান?’

শাড়ি ভাঁজ করতে থাকা মীরার ব্যাস্ত হাত থেমে গেলো বাবার ডাকে। শাড়িতে নিবদ্ধ থাকা নজর ও ঘুড়ে গেলো আব্বাজানের দিকে। চোখে চোখ পরতেই শওকত রহমান এক গাল হেসে বললেন,

-‘নেন, এই শাড়িটা আলাদা করে রাখেন। সময় করে একদিন পরবেন। ভালো লাগবে।’

মীরা হাসি মুখে বাবার হাত থেকে শাড়িটা নিলো। শওকত রহমান আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে তবেই প্রস্থান করলেন রুম হতে।

_____________

মধ্যরাত্রি। পিনপিতন নিরবতা চারিদিক। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মীরার ঘুম ভাঙ্গল আকস্মিক কলিং বেলের উচ্চশব্দে। একবার, হ্যাঁ একবার ই বেজেছে। কে আসলো এতো রাতে? গভীর ঘুম ভাঙ্গার ফলে বিরক্তির সহিত চিন্তার সুক্ষ্ণ ভাঁজও ফুটে ওঠেছে কপালে। কান খাড়া করে আরেক বার কলিং বেলের শব্দের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো মীরা। না, আর বাজছে না। বুক অব্দি জড়িয়ে রাখা কাঁথাটা মাথা অব্দি টেনে চোখ মুখ ঢেকে নিলো। নয়ন জোড়া বন্ধ করে যখনি ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে তখনি পুনরায় উচ্চ আওয়াজে কলিং বেল বেজে উঠলো পর পর দুই বার। ধরফর করে উঠে বসল মীরা। পাশ হতে মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো রাত একটা বাজতে মাত্র মাঁচ মিনিট বাকি। আম্মা কিংবা আব্বাজান কে ডেকে তুলে দেখা উচিত কে এসেছে। চোখ কচলে ঠান্ডা ফ্লোরে পা রাখলো গমনের উদ্দেশ্যে।

তিন তলার সদর দরজার সামনে অস্থির ভাবে পায়চারী করছে রাইফ। শুধু বাহির টাই তার অস্থির না, সেই সাথে ভেতরটাও তুফানের ন্যায় অস্থির। অফিসিয়াল কাজে চারদিনের জন্য ঢাকা গেলেও আগে ভাগে কাজ শেষ হওয়াতে তিন দিনের মাথাতেই বাসায় ব্যাক করেছে সে। অনেক রাতে ফিরেছে বলে আর ফোন করে জানায়নি মীরাকে। জার্নি করে এসেছে, একেবারে সকালেই না হয় দেখা করবে। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছিলো ঘুমাতে গিয়ে। এপাশ ওপাশ করেও রাইফ ঘুমাতে পারছিলো না কিছুতেই। মীরাকে স্মরণ হচ্ছিলো বার বার। ঘড়িতে ঘন্টার কাটা তখন বারোটার ঘরে আর মিনিটের কাটা পয়তাল্লিশে। রাত্রি বারোটা বেজে পপয়তাল্লিশ মিনিট। এখন মীরাকে আনতে যাওয়ার উপযুক্ত সময় না। সাত-পাঁচ ভেবে বেপরোয়া মনটাকে যা খুশি তাই বোঝ দিয়ে নাকে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা রত রাইফ পুনরায় ব্যার্থ হলো। নাহ, থাকা যাচ্ছে না নিদ্রাহীন ভাবে শুয়ে থাকতে। পিঠ টা টনটনে ব্যাথা করছে তার। সোজা উঠে বসলো সে। এভাবে নিজেকে শাস্তি দেওয়ার কোনো মানেই দেখছে না রাইফ। নিজের বউ, নিজের শশুড় বাড়ি। রাত আর বিরাত আছে নাকি? যখন মন চাই তখনি যেতে পারবে। সেই মূহুর্তে কি হলো কে জানে! আগা মাথা আর কিছুই তখন ভাবে নি রাইফ। ফটাফট উঠে লম্বা-লম্বি চেক চেক সাদা কালো টিশার্ট গায়ে জড়িয়েই ছুটে এসেছে শশুড় বাড়ির তিন তলার সদর দরজায়। এখানে আসার পর পর ই মনে হয়েছিলো বিশাল একটা ভুল কাজ করে ফেলেছে সে। ফোনটা সাথে আনা উচিত ছিলো। ফোনটা সাথে থাকলে এভাবে আর ঘর সুদ্ধ মানুষকে কলিং বেল চেপে জাগাতে হতো না। একটা কল করেই মীরাকে ফুরুৎ করে বেরিয়ে আনা যেতো। থাক ওসব, এসে যখন পড়েছে তখন আর ফিরে যাবে না সে। বউ কে সাথে নিয়েই যাবে। একবার কলিং বেল চেপে দাঁড়িয়ে থাকা রাইফ অধৈর্য হয়েছিলো কারো সাড়াশব্দ না পেয়ে। কতো ঘুম ঘুমায় রে বাবা! তিনজন মানুষের একজনও সজাগ পাচ্ছে না। ধৈর্য আর বাঁধ মানেনি তার। পর পর দু বার কলিং বেলের সুইচ চেপেই ক্ষান্ত হলো সে। সেকেন্ড দশেকের মাঝে অবশেষে রাইফের ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা নিয়ে দরজা খুললেন খাদিজা বেগম। ঘুম কাতুরে মধ্য বয়সী মহিলার চোখে মুখে বিস্ময়ের ছাপ। রাইফ কে দেখে মুখে জোর পূর্বক হাসি টেনে দরজা থেকে সরে গিয়ে বললেন,

-‘এতো রাতে রাইফ? আসো ভেতরে আসো। কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’

অসুবিধা তো হয়েছে। অবশ্যই হয়েছে। কেনো হবে না? নতুন বউ ছাড়া এই রাইফের অসুবিধা তো হবেই। এটাই স্বাভাবিক। উল্টো অসুবিধা না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। রাইফ অগ্রসর হলো, প্রবেশ করলো বাসার ভেতর। মীরার রুমের দিকে তাকিয়ে বলল,

-‘হ্যাঁ আম্মা। অসুবিধা একটু হয়েছে। মীরা কই?’

প্রশ্নটা করে বুঝতে পারলো প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। মীরা এতো রাতে কোথায় আর থাকবে? স্বামীকে আ’ঙ্গার করে, দু চোখের ঘুম কেড়ে নিয়ে নিজে আরামে ঘুমাচ্ছে নিশ্চয়ই। ছটফট করতে থাকা রাইফের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছেন খাদিজা বেগম। এতো দিন হলো জামাতা হয়েছে, ছেলেটার এমন আচরণ যে আজকেই প্রথম। কেমন যেনো অদ্ভুত আচরণ।

-‘দাঁড়িয়ে কেনো? বসো। কখন আসছো ঢাকা থেকে?’

-‘এইতো একটু আগে।’

কথাটা বলেই উচ্চস্বরে ‘মীরা’ নাম ধরে ডেকে উঠলো রাইফ। তার ধৈর্য আর কুলালো না সত্যি। এতোক্ষণে তো চলে আসার কথা। মীরা ঘুম কাতুরে ঠিক আছে। তাই বলে এতোটা? রাইফের ডাক কি তার কানে যাচ্ছে না? আজব ব্যাপার স্যাপার! খাদিজা বেগম রাইফের এমন আচরণের কূল কিনারা পাচ্ছেন না কিছুতেই। অস্বস্তি মূলক ভঙ্গিতে শুধালেন,

-‘রাইফ বাবা, এতো রাতে কোনো কিছুর কি দরকার?’

-‘হ্যাঁ দরকার তো আম্মা। মীরাকে দরকার। একটু ডেকে দেন না প্লিজ। এতো লেট করছে কেনো আসতে!’

পরপর কয়েক বার কলিং বেলের শব্দ এবং শেষে নিজের নাম রাইফের কন্ঠে শুনতেই মাত্র ফ্লোরে পা রাখা মীরা কোনো রকমে লাইট জ্বা/লিয়ে ধরফর করে দৌড়ে নিজ রুম হতে বাহিরে এসেছে। কিন্তু রাইফের মুখে ‘মীরাকে দরকার’ কথাটা শুনে চলমান পদক্রম শ্লথ হলো। এভাবে কেউ শাশুড়ীকে বলে নাকি যে তার মেয়েকে দরকার! দিন দিন লোকটা কেমন লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে। মায়ের সামনে রাইফের মুখে এমন কথায় লজ্জা পেলো খানিক। স্বামীর ডাকে যতটা উৎসাহের সহিত ছুটে এসেছিলো, ততটাই নিভে গেলো রাইফের শেষ কথাটুকু শুনে। পায়ের আওয়াজে মীরার দিকে তাকালো রাইফ। পরিচিত সেই হাসিটা দিয়েই তাকিয়েছে সে। কিন্তু মীরার এমন রূপ তার জান ক/বজ করে নিলো যেনো। মোচড় দিলো ছোট্ট বক্ষপিঞ্জর। চক্ষুদ্বয় কোটর ছেড়ে বাহিরে আসবে যে কোনো সময়। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে ঠোঁট জোড়াও ফাঁক হয়েছে কিঞ্চিৎ। সবুজ রঙের শাড়িতে মীরাকে সবুজ শ্যামল প্রকৃতির থেকেও যেনো সুন্দর লাগছে রাইফের কাছে। ঘুম থেকে ওঠা মীরার ফোলা ফোলা তৈলাক্ত চোখ মুখ সদ্য বৃষ্টিতে ভেজে দূর্বাঘাসের মতোই স্নিগ্ধ লাগছে। রাইফের নে/শা/লো দৃষ্টি মীরাকে আড়ষ্ট করলো বেশ। লোকটি কি ভুলে গেলো নাকি এখানে তার শাশুড়ীও আছে। মীরা নিজেই এগিয়ে এলো, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পরে নজর এদিক সেদিক ঘুরিয়ে শুধালো,

-‘কখন এসেছেন?’

মীরার রূপের মোহে আচ্ছন্ন হওয়া রাইফ যন্ত্রের ন্যায় জবাব দিলো,

-‘অনেক ক্ষণ’

মীরা রাইফের এমন জবাবে এবার সত্যি বিপাকে পরলো। ধ্যান ভাঙ্গাতে এসে নিজেই রাইফের এমন নে/শা/ময় চাহনিতে কাবু হচ্ছে। খাদিজা বেগম মীরার দিকে তাকিয়ে রাইফকে ঘরে নিয়ে যেতে আদেশ করলেন। ব্যাস, ধ্যান ভাঙ্গলো রাইফের। ঝটপট উঠে দাঁড়ালো সে। মীরার হাতটা খপ করে ধরে খাদিজা বেগমের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল,

-‘মীরাকে নিতে আসছিলাম। নিয়ে যাচ্ছি। চিন্তা করবেন না। এখন সব ঠিকঠাক আম্মা। ঘুমান।’

কথাটা বলে মীরার দিকে তাকালো রাইফ। কন্ঠস্বর কিছুটা চেপে মৃদ্যু আওয়াজে বলল,

-‘কি দেখছো? আসো। কি করবো বলো? তোমাকে ছাড়া ঘুম আসছিলো না তো। দিন দিন কেমন বাজে অভ্যাসে পরিনত হচ্ছো। ভালো ভালো। এভাবেই থেকো, পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই একটুও।’

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here