মুঠোবন্দী লাজুকলতা পর্ব ১৬

0
49

#মুঠোবন্দী_লাজুকলতা
#অপরাজিতা_মুন
#পর্ব_১৬

🍁
বাসা ভর্তি সুস্বাদু খাবারের গন্ধ মৌ মৌ করছে। হরেক রকমের খাবারের ডিশ সাজানো ডাইনিং এ। আয়োজনের কোনো কমতি রাখছেন না বাড়ির গিন্নিরা। পুরো দমে তোড়জোড় করছেন শওকত রহমানও। কাল রাতে যখন মেয়েকে পাশে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তার সম্মতি আছে কি না তখন মীরা না করতে চেয়েও আব্বাজানের উৎসুক হাস্যজ্বল মুখের পানে চেয়ে আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারে নি। হ্যাঁ কিংবা না, কোনো নৈমিত্তিক উত্তর ও প্রদান করে নি সে। ফ্যাকাসে চেহারা নিয়ে জুলজুল চোখে তাকিয়ে ছিলো শুধু। নিরবতা সম্মতির লক্ষণ মনে করে শওকত রহমান আজকের দিনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।

দুপুরের মধ্যেই চলে আসবে ছেলে পক্ষ। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে হয়তো আজকেই বিয়ের তারিখ ধার্য করা হবে। সবার মাঝে ব্যাস্ততা থাকলেও উর্মি এবং মীরার মাঝে কোনো হেলদোল নেয়। দুজনে ঘাপটি মে*রে বসে আছে নরম বিছানায়। মীরা নিশ্চুপ স্থির হলেও উর্মি বরাবরের ন্যায় উল্টো। হাঁসফাঁস করছে কথা বলার জন্য। অনেক কথা মাথার ভেতর কিলবিল করছে কিন্তু মীরার নিরবতা দেখে কিছুতেই কথা এগোতে পারছে না। দুই একটা শব্দ উচ্চারণ ও করেছিলো এর মাঝে, কিন্তু মীরা কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করে নি একটুও। একা একা তো আর বকবর করা যায় না তাই চুপ হয়ে গেছে তখনি।

উর্মিও চায় মীরা নতুন জীবনে পা রাখুক, পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হোক। কিন্তু এতো দ্রুততার সহিত মীরার মতামত কে গ্রাহ্য না করে হোক সেটাও সে চায় না। আর বড় যে বিষয় তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো মীরাকে একা কেনো বিয়ে দিবে, উর্মিও তো আছে। ও কি বানের জলে ভেসে আসছে নাকি কুড়িয়ে পেয়েছে? কয়েক মাসের ছোট বড়, অথচ উর্মির কথা কেউ ভাবছেই না। এক সাথে বিয়ে দিলেই তো তাদের ল্যাটা চুকে যায়, উর্মিও খুশি হয়।
সানজিদা বেগম ডায়নিং থেকে চেঁচিয়ে ডাকছেন উর্মিকে। উর্মি শুনেও না শোনার ভান ধরে কপালে বিরক্তির সুক্ষ্ণ ভাঁজ ফেলে ধরাম করে চিৎ হয়ে শুয়ে পরলো বিছানায়। পাতলা ওড়নাটা দিয়ে মুখটাও ঢেকে ফেলল তাৎক্ষণিক। সে জানে মা কেনো ডাকছে তাকে। সাড়া দেওয়ার সাথে সাথেই বলবে গোসল কর দুজন, রেডি হ দ্রুত, এটা কর সেটা কর। হুহ, বয়েই গেছে তার। খুবই বিরক্তিকর! উর্মির তো মন চাচ্ছে মাইক লাগিয়ে বলতে, ‘ওতো ঠ্যাকা পরে নায় উর্মির অপর মানুষদের জন্য রেডি হওয়ার’। আজ এভাবেই শুয়ে শুয়ে মন খারাপ উদযাপন করবে বলে মনস্থির করলো। যদি তার ক্ষমতা থাকতো তাহলে এই বিয়ে সেই কখন ই নাকচ করে দিতো সে। হতে দিতো না কোনো ভাবেই। আগডুম বাগডুম চিন্তা করতে করতে হুট করে কিছু মনে পরলো উর্মির। তড়িৎগতিতে উঠে বসলো। কোলের উপর পরে থাকা ওড়নাটা কোনো রকমে মাথায় দিয়েই ছুটলো শওকত রহমানের রুমের দিকে। আজ একটা বোঝাপড়া আছে তার মামুজানের সাথে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ বোঝাপড়া। মীরার শেষ রক্ষাটা যদি হয় এবার।

_____________

রাইফ অফিসে ভীষণ ব্যাস্ত সময় পার করছে গত কয়েক দিন হলো। কাজের চা”প প্রচুর। এক গাদা ফাইলের স্তুপ পরে আছে তার সামনে। সাদা শার্ট এর স্লিভ কুনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রেখে হরদম একের পর এক ফাইল চেক করে যাচ্ছে। কখনো চোখ ফাইলে তো কখনও কম্পিউটারের স্কিনে। যদিও শারিরীক কোনো কাজ করতে হয় না তার তবুও ব্রেনে অতিরিক্ত প্রেসারের ফলে শরীর টাও ভালো লাগছে না তার। আর মন, সে তো অনেক আগে থেকেই খারাপ। মীরার দেখা পায় না কয়েক দিন হলো। দু-তিন দিন কেই মাসের সমান মনে হচ্ছে যেনো। অন্য দিকে মা অসুস্থ।সব মিলিয়ে হযবরল অবস্থা তার। কালো রংয়ের হাত ঘড়িতে চোখ বুলালো একবার। একটা বেজে উনত্রিশ মিনিট। আর এক মিনিট পর ই লাঞ্চ ব্রেক। আজ এখনি চলে যাবে সে। রাজিয়া বেগমের শরীর টা ভালো না। কাল রাতেও জাহাঙ্গীর আলম কে স্মরণ করে কান্না কাটি করেছেন। বিপি হাই, ঘাড়ের খিঁচুনি সাথে ডায়াবেটিস ও হাই হয়েছে। অবস্থা খারাপের দিকে। ডাক্তার দেখানো জুরুরি। এমন পরিস্থিতিতে অফিসে আসবে না বলে সকালেই বস কে কল দিয়েছিলো ছুটির জন্য। কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়াতে রাইফকে অনুরোধ করেছে যেনো একটু এসে কমপ্লিট করে দিয়ে যায়। শেষ করতে করতে দুপুর হয়েই গেলো।
মোটামুটি ইমপোর্টেন্ট কাজ গুলো শেষ রাইফের। বাকি গুলো অন্যরাও করতে পারবে। অফিস সহকারী কে ডেকে সে ফাইল ধরিয়ে দিলো বসের কাছে পৌঁছানোর জন্য। নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে পরলো বাসার উদ্দেশ্যে। এর ফাঁকে কল করে মায়ের খোঁজ খবর নিতে ভুলল না।

________________

হালকা বেগুনি রঙের সালোয়ার-কামিজ পরেছে মীরা। কোমড় সমান দীঘল কালো ভেজা চুলের আগা হতে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পরছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে বিছানা। উর্মি ধরাম ধরাম শব্দ করে মীরার কাছে এসে বসলো। সেই যে গিয়েছিলো শওকত রহমানের রুমে, মাত্র ফিরলো। মীরা উর্মির দিকে এক পলক তাকিয়ে আবারও মুখ ঘুরিয়ে আকাশ পানে দৃষ্টি রাখল। এমন পরিস্থিতিতে নবীজি (স:) এর বানী স্মরণ করেই আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রত্যাশা করছে। তার জন্য যেটা কল্যাণকর তাই ফরিয়াদ করছে মনে মনে।
উর্মি হতাশার শ্বাস ফেলল। মীরার কোলে মাথা রেখে বলল,

-‘তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে মীরা?’

মীরা নিচের দিকে মুখ নামালো। উর্মির মাথায় হাত বুলিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিলো,

-‘না।’

-‘সত্যি?’

উর্মি প্রশ্ন করলো ঠিকই কিন্তু উত্তরের জন্য আর অপেক্ষা করলো না। নিজের মতো করেই বলে গেলো,

-‘জানিস, আমার না খুব কষ্ট হচ্ছে। কেমন অস্থির অস্থির ও লাগছে। শরীর টাও কেমন অবশ অবশ। অজ্ঞান হবো নাকি?

-‘কি বলিস এসব? ইয়া আল্লাহ! দেখি ওঠ ওঠ।

উর্মি মীরার উত্তেজনা দেখে মুচকি হাসলো। স্মিত হেসে বলল,

-‘তোর না জানি কেমন লাগছে! নিশ্চয় আমার থেকে বেশি। এতো করে বললাল তাবুও মামুজান কে মানাতে পারলাম না রে।’

মীরা শান্ত হলো। এখন আর কোনো উত্তেজনা কাজ করছে না তার মাঝে। তবে রাগ হচ্ছে ভেতর ভেতর। মাতব্বরি করে ওকে কেনো যেতে হবে আব্বাজানের কাছে।
উর্মি এবার উঠে বসলো। মীরার হাত ধরে বলল,

-‘সবাই এতো স্বার্থপর কেনো বলতে পারিস? শুধু নিজের ভালো বুঝে। তোর ভালোটা কেউ বুঝলো না।’

-‘তুই তো বুঝলি।’

-‘আমি বুঝলে তুই কেনো তাহলে বুঝিস না তোর ভালো? এখনও সময় আছে না করে দে। তুই না করলে মামুজান ঠিক মানবে বিশ্বাস কর।’

-‘বিয়ে তো একদিন করতেই হবে উর্মি। আজ হোক কিংবা কাল। এভাবে তো আর জীবন চলে না তাই না? আব্বাজান কতো খুশি দেখছিস? আমি না করলে অসন্তুষ্ট হবেন তিনি। তাদের অখুশি আমি দেখতে পারবো না।’

-‘তুই.. তুই না কর প্লিজ। ওতো দূরে যেতে হবে না। বিয়ে যদি করতেই হয় কাছেই বিয়ে দেক তোকে। চোখের সামনে থাকবি তুই।’

মীরা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো উর্মির দিকে। কেমন যেনো আভাস পাচ্ছে উর্মির কথায়। সে তো কাউকে বলে নি কিছু। তবে? রাইফের কথাও মনে হলো। ভালো না বাসলেও এই কয়েক দিনে কেমন মায়া কাজ করে তার। রাইফের চোখে তাকে পাওয়ার ব্যাকুলতা দেখেছে সে। কাজ কর্মে দুষ্টুমি খেলা করলেও ওর গভীর দৃষ্টি যে তাকে নিজের করে নিতে চায়, আগলে রাখতে চায় তা মীরা অনুভব করেছে।
মীরা শুধু শুধু চিন্তা করছে ভেবে বলল,

-‘যা হবার হবে উর্মি। পরে দেখা যাবে। যা গোসলে যা।’

উর্মি কপট রাগ দেখলো। ঝাটকা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো বিছানা হতে। ওয়ারড্রব হতে কাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে যাবে সে মূহুর্তে মীরাকে এক নজর তাকিয়ে ডেকে উঠল,

-‘মীরু..’

-‘বল।’

সরাসরি মীরার চোখের দিকে তাকিয়ে স্মিত কন্ঠে বলল,

-‘বিয়েটা যদি করতেই হয় তাহলে রাইফ ভাইকেই কর প্লিজ।’

মীরার আত্মা ছ্যা’ত করে উঠলো। সহসা চমকে উঠলো তাৎক্ষণিক। শরীরে শিহরণ বয়ে গেলো, হৃদয়ে ব্যাকুলতা সৃষ্টি হলো। উত্তাল ঢেউ এর মতো বক্ষস্থলে উথাল-পাতাল অবস্থা। রাত থেকেই তো মীরার মন অস্থির হয়ে আছে, এই অস্থির অবস্থায় উর্মির কি খুব প্রয়োজন ছিলো অশান্ত করার?

চলবে…..

কি লিখেছি নিজেও জানি না। আজকের পর্ব মন মতো লিখতে পারি নি🥺
কি মনে হচ্ছে, অবশেষে কি সানাই বাজবে রাইফ মীরার?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here