মায়া মহল পর্ব ১৬

0
57

#মায়া_মহল (১৬) #রহস্য
কলমে #রেহানা_পুতুল
শাহের ভিতর থেকে দরজা ভিড়িয়ে দিলো। কিন্তু বন্ধ করলো না। মায়াকে বসতে বলল। মায়া জড়োসড়ো হয়ে শাহেরের মুখোমুখি একটি চেয়ারে বসলো।

যা জিজ্ঞেস করবো সত্যি আনসার দিবে বাঁচতে চাইলে।
রুষ্ট কন্ঠে বলল শাহের।

হ্যাঁ ছোটবাবু। সত্যিই বলব।

ওকেহ। যেই মানুষগুলো তোমার কারণে মারা গেলো, এদের মাঝে কেউ কি তোমাকে রে*প করেছে? এবং তুমি কেন এসব আমাকে বা আম্মাকে জানাওনি? এই দুটো প্রশ্নের জবাব চাই আগে।

মায়া বিমূঢ় হয়ে শাহেরের চোখের দিকে চাইলো। মনে মনে বলল,
তুমি কি জানো আমি তোমার আপন চাচাতো বোন?

চুপ করে থাকলে তুমিই লুজার হবে মায়া। জানি আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করাতে তোমার খারাপ লাগছে। লাগুক। তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। বল।

কেউই আমার কোন ক্ষতি করতে পারেনি ছোটবাবু। নিচু মাথায় কোমল কন্ঠে বলল মায়া। আর আপনাদের জানাইনি,পরে যদি উটকো ঝামেলা ভেবে আমাকে মহল থেকে তাড়িয়ে দেন তাই।

ওকে ফাইন। আমি সেদিন মলম লাগাতে গিয়ে তোমার শরীরে একটা তাবিজ দেখলাম। তোমার মা বলল, এই তাবিজ তোমাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করার তাবিজ। এটা কি আগে থেকেই জানতে তুমি?

হ্যাঁ জানতাম।

তারমানে জেনে শুনেই তুমি তাদেরকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গিয়েছো?

কঠিন স্বরে বলল শাহের।

একদম নাহ। আমি কেবল জানতাম আমার শরীরের তাবিজটা আমাকে সব বিপদ আপদ মানে ভূত,পেত্নীর বদ নজর থেকে রক্ষা করবে। আম্মা তাই বলেছে আগে। কিন্তু কোন পুরুষ মানুষ আমাকে খারাপ উদ্দেশ্য স্পর্শ করলে যে সে মারা যাবে এটা আমি কখনোই জানতাম না আজকের আগে। আম্মা আজ বলল সব শুনে।

যে পাঁচজন পুরুষ মানুষ মারা গেলো, এরা সবাই তোমাকে ব্যাড টাচ করতে চেয়েছে নাহ?

হুম। এরা সবাই বাজেভাবে কিছু করতে চেয়েছে আমার সঙ্গে।

আচ্ছা ক্লিয়ার হলাম। তোমাকেতো এবার আম্মা বের করে দিতে চাইবে। কি করবে তুমি?

আমিতো আপনাকে সব বললাম, আপনি উনাকে ম্যানেজ করে নেন। অন্তত আমার ফাইনাল পরিক্ষা পর্যন্ত থাকি। তারপর আপনারা না চাইলে প্রমিজ আমি চলে যাবো। পরিক্ষা সামনে। আমি এখন কোথায় যাবো? অসহায় কন্ঠে বলল মায়া।

ঠিক আছে মায়া। আমি আম্মাকে ম্যানেজ করে তোমার থাকার বিষয় নিশ্চিত করবো। এবং তোমার আম্মাও তোমার সাথেই থাকবে। তোমার জন্য আগের বরাদ্দকৃত রুমেই তুমি ও তোমার আম্মা থাকবে। তুমি আগের মতই মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করবে। কলেজে যাবে। কোচিং করবে।

অনেক ধন্যবাদ ছোট বাবু। আমি এবার যাই? আম্মা একা।

নাহ শোন, বলে শাহের মায়ার হাত টেনে ধরলো। মায়া চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে গেলো।কারণ শাহেরই তার থাকার ভরসা একমাত্র। নয়তো সব ভেস্তে যাবে তার।

শাহের বলল,
একটা ইম্পরট্যান্ট বিষয় মায়া।
তোমার তাবিজের বিষয়টা যদি সত্যি হয়,তাহলে আমি যে তোমাকে সেদিন মলম দিতে গিয়ে টাচ করলাম। এবং এই যে এখন তোমার হাত ধরলাম। আমার কেন কিছু হচ্ছে না?

মায়া আশ্চর্য চোখে শাহেরের দিকে চাইলো। বলল আমি জানিনাতো।
দুইদিন অপেক্ষা করে দেখেন।

নোও। আমি জানি এটা। তবে আমার জানাটা চূড়ান্ত করতে হলে এখন আমি তোমাকে আরেকটু নিবিড়ভাবে স্পর্শ করতে চাই মায়া। আর দুই তিনদিন ত হলোই।

মানে? মায়া কেঁদে ফেলল। বলল,

আমার দূর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন আপনি নিছক বাহানায়। তাইনা?

একদম নাহ মায়া। আমি কেবল শিউর হবো বলেই, শাহের মায়ার অধরযুগল দখল করে নিলো নিজের দুঠোঁট দিয়ে। খানিকক্ষন পরে মায়ার ঠোঁটদুটো উদ্ধার হলো। মায়া কাঁপছে ভয়ে,লজ্জায়,বিরক্তিতে। শাহের মায়াকে বুকে চেপে ধরলো কিছুক্ষণ। মায়ার ঘাড়ে নিজের চিবুক ঠেকিয়ে ধরলো। মায়া বিবশ হয়ে বিছানায় পড়ে গেলো। শাহের মায়ার উপর ঝুঁকে রইলো। তার উষ্ণ ভারি ঘন নিঃস্বাশ মায়ার ঘাড়ে, বুকে পড়ছে অনবরত । টকটকে লাল হয়ে আসা মায়ার রক্তিম ঠোঁটদুটো তিরতির করে নড়তে লাগলো।

শাহের মায়ার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
তুমি যে পরপর তিনটি চিরকুট পেলে, সেটা কে দিয়েছে বলতো?

এখন মনে হচ্ছে আপনি। কাঁপা স্বরে উত্তর দিলো মায়া।

ইউ আর রাইট বলে চুমোয় চুমোয় মায়ার সারাগাল ভিজিয়ে দিলো শাহের। সে মায়ার দু’চোখে চোখ রেখে শিহরিত কন্ঠে বলল,

আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি মায়া। এতে এতটুকু ভেজাল নেই। ভোরের নির্মল বাতাসের মতই তোমার প্রতি আমার প্রণয় বিশুদ্ধ। টাটকা। এজন্যই আমার কিছুই হয়নি। এবং হবেও না। ইটস ট্রু। মাইন্ড ইট মিস মায়াদেবী। তোমাকে আমার হৃদয় সিংহাসনের দেবী বানিয়ে পূজো দিতে চাই। শুধু একবার হ্যাঁ বলো। একবার ভাবো তোমার জন্য এতসব করেছি কেন? ভালোবাসি বলেইতো।

মায়া থরথর করে কাঁপছে। গোপনে বলে উঠলো, আসলেই তো তাই। তার মুখ দিয়ে কোন শব্দই উৎসারিত হচ্ছে না। সমস্ত অনুভূতি তার অবশ হয়ে আসছে। হাঁটতে গিয়েও পা ভেঙ্গে আসছে। শাহের মায়াকে ধরে তার রুমের সামনে দিয়ে আসলো।

পরেরদিন সকালেই শাহের আঞ্জুমান আরার রুমে গেলো। মায়া নির্দোষ বলে সব ব্যাখ্যা করলো তার কাছে। সে মায়াকে থাকতে অনুমতি দিলো। দুপুরেই মায়া ও তার মা তফুরা মায়ার রুমে চলে গেলো। মায়া স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। সবার সাথেই কথা বলছে আগের মতই। কিন্তু সেটা উপরে উপরেই।

তার জীবনের বিষাক্ত অতীত তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তিলে তিলে। বুকের গহীনে অসীম দুঃখ! সীমাহীন ঘৃণা! দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে সে। ক্ষণে ক্ষণে ভাঙচুর হচ্ছে ভিতরে! প্রতিশোধের দাবানল তার অন্তরে দাউদাউ করে জ্বলছে।
তবুও সে কলেজে যাচ্ছে আসছে। সুযোগ পেলেই পরশের সঙ্গে দেখা করে অতি সংগোপনে। ভীষণ নিরালায়। তার ভিতরে এখন অনেক প্রশ্ন এই মহলের সবাইকে নিয়ে। সে পরশকে জিজ্ঞেস করলো,

চাচা আঞ্জুমান ও তার স্বামী একসঙ্গে থাকেনা কেন? তেমন ভালো করে হেসে কথাও বলে না? কারণ কি? তারা সবাই একসঙ্গে খাবার খায়না কেন?

পরশ অকপটে যা সত্যি তাই জানালো মায়াকে। সে চায় মায়া তার অধিকার ফিরে পাক এই মহলে। সব বুঝে নিক নিজ গুনে ও শক্তিতে। সে বলল,

তারা বহু বছর ধরেই একসঙ্গে খায় না। তবে এটার নেপথ্যে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য বা কারণ নেই তাদের। এটা হলো সবাই সবার মতো থাকে। খাবার সময় তারা এক হতে পারে না। তাই যার যখন ইচ্ছে টেবিলে এসে নয়তো নিজের রুমে আরাম করে খায়।

আর কায়রুস ও তার স্ত্রী বিষয়টা হলো,
তারা এখন স্বামী স্ত্রী নয়। দুজনই তালাকপ্রাপ্ত। তাই যে যার মতো করে যার যার রুমে থাকে। আঞ্জুমান চলে যায়না, নিজের ইজ্জত খোয়া যায় সমাজে তাই। আবার কায়রুস ও অনুরোধ করে রাখছে তাকে মহলে। নয়তো সমাজে তারও ইজ্জত চলে যাবে। বাইরের সবাইর সামনে তারা স্বামী স্ত্রীর অভিনয় করে চলে। এজন্য কায়রুস ও তেমন বাড়িতে আসেনা। বছরে দরকার হইলে মাত্র দুইবার আসে। বিষয়টা ছোটবাবু ও জুবায়ের জানে। তারাও মাকে যেতে দেয়নি। এই হলো অবস্থা। বুঝলে মা।

চাচা উনাদের ডিভোর্সের কারণ?

কারণ তোমার মা বাবার মৃত্যু। একে অপরকে দোষী করে তারা। কায়রুস বলে, তুই প্রলুব্ধ করছত আমারে। তোর হিংসা বেশী। আবার তার বউ বলে আপনিইতো সারাদিন কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করতেন,
তাদের এক মেয়ে হইছে। তার ক্ষমতা হবে বেশী। সেই হবে সবার চোখের মনি। আরেকটা কারণ ছিলো সেই গুপ্তধন।

মায়া ভাবুকের ব্যয় চিন্তিত কন্ঠে বলল,

তাহলে উনি এখানে পরগাছা বা পরজীবির মতো পড়ে আছে। তবে তার আচরণ এত বিধ্বংসী কেন?

সেটা হলো। তার নিজস্ব অনেক গয়না আছে। আবার কায়রুস ঢাকা বাড়ি করেছে। সেই বাড়ি আঞ্জুমানের নামেই। এসব তালাকের পূর্বেই দিয়ে দিয়েছে। তাই তার এত দাপট ও দেমাগ। তোমার যতকিছু জানার আছে,আমাকে জিজ্ঞেস করবা। আমি সব জানাবো তোমারে মা। আমি ছাড়া কেউই সব জানে না।

মায়া ছোট্ট করে একটা তপ্ত স্বাশ ছাড়লো। মৃদু করে বলল,

হুম বুঝলাম চাচা। ক্লিয়ার করার জন্য কৃতজ্ঞতা চাচাজান। এবার এটা জানান আমাকে। আমার আম্মা আব্বাকে মেরে ফেলার বিষয়টা কি শাহের ভাই জানে?

না জানেনা। সেতো তখন ছোট ছিলো। তোমাদের না দেখে সে সারাদিন কেঁদে কেঁদে আমাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করতো।বলতো,
ছোট কাকু কই? ছোট মা কই? বাবু কই?

বলতাম তারা বেড়াতে গিয়ে গাড়ি এক্সিডেন্টে মরে গিয়েছে। এটা তার বাবা সবাইকে শিখিয়ে দিয়েছে।

আর জুবায়ের ভাই?

সে আসল ঘটনাই জানতো। চুপ ছিলো। কারণ তার তখন প্রতিবাদের বয়স হয়নি।

আমার তাবিজের বিষয় কেউ জানে?

নাহ এটা কেউই জানে না আমি ছাড়া।

মায়া থম মেয়ে বসে থাকে। দুচোখ ভিজে তার টইটম্বুর হয়ে যায় মা বাবার কথা মনে পড়তেই। কতটা ভালোবাসলে একজন বাবা তার কন্যার নামে সবকিছু উইল করে দেয়। আহারে তার কাজল মা। কতটা কলিজা ছেঁড়া মায়া হলে মৃত্যুর পূর্বেও অনুরোধ করে যায় তাবিজটা যেন সঙ্গেই থাকে আমার। অথচ এমনিই পোড়া কপাল আর হতভাগী সে। মা বাবার চেহারাটুকুও সে জানেনা কেমন।

আমি অহন যাই মা। বাগানে কাম আছে। তুমি সাবধানে কইরো যা করবা। মনে রাইখবা দেয়ালেরও কান আছে। মাটিরও চোখ আছে।

আচ্ছা চাচাজান।

মায়া শিকারির ন্যায় সুযোগ সন্ধানী হয়ে উঠে। কায়রুসের সঙ্গে নানা ছুতোয় গল্প করে। ভাব জমায়। গল্পাচ্ছলে বলে, সে মজা করে স্যুপ বানাতে পারে। চিকেন স্যুপ। কায়রুস তার হাতের স্যুপ খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

তারপরে মায়া কোন একদিন নির্জন দুপুরে পরিত্যক্ত একটি বাগানে যায়। নিদিষ্ট একটি গাছের সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। এই বাড়িতে আসার কয়দিন পরেই সে এই বিছুটি গাছ দেখেছিলো। এই বিছুটি পাতা সম্পর্কে সে খুব ভালো করেই জানে। তফুরাদের বাড়িতে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সে এই বিছুটি পাতা চিনে।

সেদিন সে হাঁটতে বেরিয়েছিলো ভর দুপুরে। বাতেন তাকে দেখে লোভ সংবরন করতে পারেনি। টেনে বাগানের ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলো। যার দুদিনের মাথায় হানিফও একই কাজ করেছিলো। সেদিনই নজরে পড়েছিলো তার গাছটি। এই গাছ আগাছা হিসেবেই গ্রামের বাগানে হয়ে থাকে। বেড়ে উঠে অযত্নে,অবহেলায়। কিন্তু এর ক্ষতিকর দিক ভয়াবহ। এই পাতার রসের সঠিক প্রয়োগ করলে যার বিষক্রিয়ায় একজন সুস্থ সবল মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। মায়া কয়েকটি তরতাজা বিছুটি পাতা ছিঁড়ে নিলো। লুকিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিলো। পাতাগুলোকে থেঁতলে নিলো। নিংড়ে রস বের করে একটি কৌটায় ভরে নিলো। ওড়নার নিচে লুকিয়ে চলে এলো।

সেদিন সন্ধ্যার অনেক পরে মায়া নিজের হাতে চিকেন স্যুপ বানিয়েছিলো। দুটি সুন্দর বাটিতে স্যুপ নিয়ে নিলো। একটিতে বিছুটি পাতার রস ঢেলে চামচ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিলো।

তারপর শাহেরের রুমে গিয়ে এক বাটি স্যুপ তার হাতে দিলো লাজুক মুখে।

শাহের উচ্ছ্বসিত হলো দারুণভাবে। স্যুপ খেতে খেতে বলল,

আমার প্রিয় স্যুপ বানিয়ে নিয়ে এসে ভালোবাসা সম্মতি প্রকাশ করার জন্য কৃতজ্ঞতা মহারাণী।

মায়া মিটমিটিয়ে হেসে যাচ্ছে। কিছু বলছে না।

তোমার মোহনীয় হাসিতে আমি মোহাচ্ছন্ন বিবি। আই লাভ ইউ মায়াবীনি মায়া। শাহের হাঁটু গেঁড়ে মায়ার সামনে বসলো। মায়ার হাতের পিঠে নরম চুমু খেলো। মায়া পুলকিত অনুভব করলো। কিছু না বলে শাহেরের সম্মুখ হতে প্রস্থান নিলো।

শাহের স্যুপের বাটি খালি করে ফেলল নিমিষেই। বেরিয়ে বাজারের দিকে গেলো জরুরী কাজে।

এরপর মায়া বাকি স্যুপের বাটি হাতে করে দ্রুত পায়ে হেঁটে কায়রুসের রুমের সামনে গেলো।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here