বলবো বলবো করে বলা হয়নি শেষ পর্ব

0
59

#বলবো_বলবো_করে_বলা_হয়নি
#পর্ব_০৬
#অনন্যা_অসমি

গোছানো বিছানাই বারবার ঘুছিয়ে রাখছে তটিনী। আবার কখনো টেবিলে থাকা জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করে আবারো ঠিক করে রাখছে। এটা ইদানীং যেন তার নিত্যদিনের সকালের রুটিন। এই সময়টা মাধুর্য অফিসের জন্য তৈরি হয়ে থাকে। তটিনী আগে থেকেই সব গুছিয়ে রাখে, মাধুর্য নিজের মতো চুপচাপ তৈরি হতে থাকে। তটিনী ভেবেছিল বাহানা করে তাকে টাই পড়িয়ে দেবে কিন্তু বেচারির আশা অপূর্ণই রয়ে গেল। কারণ মাধুর্য টাই পড়েনা। কি আর করার আছে। নানা কাজের বাহানায় রুমে ঘুরঘুর করে সে আর আড়চোখে মাধুর্যকে পরখ করতে থাকে।

চিরুনি টেবিলে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল মাধুর্য। তটিনী জানে এখন সে সোফায় বসে পায়ে মোজা পড়বে।

ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে মাধুর্য তটিনীকে ডাকতে যাবে সেই মূহুর্তে তটিনী রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো। তবে তার কাছে পৌঁছানোর আগে থেমে গেল সে। মৃদুস্বরে বলে উঠল, ” ও মা গো….” এক পা উপরে তুলে চোখমুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মাধুর্য তাড়াতাড়ি ব্যাগটা রেখে এগিয়ে এলো। তটিনীর হাত থেকে টিফিন বক্সটা টেবিলে রেখে তাকে ধরে সোফায় বসাল।

” কি হয়েছে তটিনী? পায়ে ব্যথা পেয়েছ কি? দেখি পা এদিকে দাও।” পায়ে হাত দেওয়ার আগে সরিয়ে নিল সে।

” আরে কিছু হয়নি, আমি ঠিক আছে। আপনি যান, আপনার দেরি হয়ে যেতে পারে।”

” হবে না দেখি পা দেখাও।”

তটিনীর বাম পা সামনে এগিয়ে আনতেই মাধুর্যের চোখ কপালে উঠে গেল। তার বৃদ্ধা আঙ্গুলটির নখ ভেঙে একেবারে রক্তেমাখা মাখিয়ে হয়ে গিয়েছে। মাধুর্য একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে মলম আর তুলা নিয়ে এলো। রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বলল,

” সাবধানে চলাফেরা করবে তো। সবসময় এতো বেখেয়ালি হলে তো যখন তখন এরকম বিপদ হয়ে যাবে। তুমি এখন আর ছোট নেই তটিনী।”

” আপনার ব্যাগে খাবার রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই তাড়াতাড়ি করে দিতে গিয়েছে লেগে গিয়েছে।”

ব্যান্ডেজ করে উঠে দাঁড়াল মাধুর্য। বক্সটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বলল, ” আস্তে আস্তে উঠে দরজা লাগিয়ে দাও, না হলে কেউ ঢুকে যেতে পারে। সাবধানে থেকো আর দরজা খোলার পূর্বে দেখে নেবে কে এসেছে।”

তটিনীও বুঝদার মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।
.
.

বেলের শব্দ পেতেই দৌড়ে যেতে নিয়েও ফিরে এলো তটিনী। পুনরায় আয়নায় নিজেকে আরেকবার পরখ করে নিয়ে দ্রুত পায়ে দরজার কাছে এগিয়ে এলো।

দরজার খোলার পরই মুখে হাসি লেগে থাকা পরিপাটি হয়ে থাকা তটিনীকে দেখে মৃদু হাসল মাধুর্য। মেয়েটা যে তার আসার পূর্ব মূহুর্তে নিজেকে পরিপাটি করতে ব্যস্ত থাকে এটা সে জানে, ভালো লাগে তার। আগে সারাদিন কাজের পর বাড়িতে ফিরে সব কাজ একা গুছিয়ে করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠত সে। একা একা থাকতে তার একদম ভালো লাগত না, কথা বলার কোন মানুষও ছিল না বলে তার বাড়ি ফিরতেই মন টানতো না। এখন যেন তার মন বাড়ি ফেরার জন্য মন আনচান করে। এই কয়েকমাসে দরজার খোলার পর মুখে মিষ্টি হাসি থাকা তটিনীকে দেখে তার এমন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে যে কোনদিন এর ব্যতিক্রম হলে তার মন অস্থির হয়ে উঠে।

মাধুর্য মোজা খুলে গুছিয়ে রাখার পর তটিনী তাকে এক গ্লাস শরবত এগিয়ে গিল। শরবত পান করার সময় মাধুর্য খেয়াল করল মেয়েটা ওড়নার কোণ বারবার নিজের আঙ্গুলে পেঁচিয়ে যাচ্ছে। মুখে থাকা শরবতটা গিলে জানতে চাইল,

” তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন? কিছু বলবে? শরীর খারাপ হয়েছে? বাইরে থেকে কোনকিছু আনতে হবে কি?”

” না আপনি যেরকম ভাবছেন সেরকম কিছু নয়। আপনি যান কাপড় পরিবর্তন করে আসুন, আমি হালকা কিছু খাবার দিচ্ছি।”

মাধুর্য উঠে রুমের দিকে যাবে তখন তটিনী পেছন থেকে ডাকল। মাধুর্য তাকানোর পর আমতা আমতা করে বলল, ” কাল সন্ধ্যায় আপনার সময় হবে? আসলে ঢাকা থেকে আসার পর যা এনেছি তার অনেক কিছুই ইতোমধ্যে শেষ। আমি তো এখানে ভালো মতো কিছু চিনি না। তো যদি একটু…. ”

মাধুর্য বুঝল তটিনীর কথা। কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, ” ঠিক আছে তৈরি থেকো, নিয়ে যাবো।”

মাধুর্য রুমে চলে যেতেই তটিনী খুশিতে লাফাতে লাগল। মুখ থেকে যেন তার হাসি সরছেই না। হঠাৎ সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বিরবির করে বলল, ” পরশু দিন যে আমার জন্মদিন তা কি উনি জানেন? মনে তো হয়না। না জানলে না জানুক, উনি আমাকে কোন উপহার দিক বা না দিক আমি তো দেব। উফ… আমি যে আর অপেক্ষা করতে পারছিনা।” বলে মিটিমিটি হাসল তটিনী। তার মাথায় এখন অনেক কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে।

মাঝরাতে পানির পিপাসা অনুভব করছ মাধুর্য, ঘুম হালকা হয়ে এলো তার। শোয়া থেকে উঠে মাথার কাছে থাকা জগ থেকে পানি পান করল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত দু’টো বাজে। পুনরায় ঘুমানোর প্রস্তুতি নেবে তখন তার নজর আটকে গেল পাশে ঘুমিয়ে থাকা তটিনীর দিকে। মুচকি হাসল সে, বেণীর ভেতর থেকে কয়েকটা ছোট ছোট চুল বেরিয়ে তার মুখে লেপ্টে আছে। মৃদু হেসে আলতো হাতে চুলগুলো চোখের কাছ থেকে সরিয়ে দিল। মেয়েটা তার প্রথম নজর কেড়েছিল তার এক আত্নীয়ের বিয়েতে। সেদিন যতটা সময় বিয়েতে উপস্থিত ছিল তার চোখ অজানা কারণে বারবার এই নাম না জানা মেয়েটিকে খুঁজে চলেছিল। পরে অবশ্য নিত্যদিনের বিভিন্ন ঘটনার কারণে ভুলে গিয়েছিল৷ কিন্তু মেয়েটা যেন তার ভাগ্যেই ছিল, হ্যাঁ মাধুর্য তাই বিশ্বাস করে। তা না হলে এতো এতো মেয়ের ছবির মাঝে তার মায়ের কেনই বা তটিনীকেই পছন্দ হবে? সেদিন তার মা অনেকগুলো মেয়ের ছবি নিয়ে এসেছিলেন। উনি এবার মনঃস্থির করে রেখেছিলেন ছেলেকে বিয়ে না করিয়ে চট্টগ্রামে ফিরতে দেবেন না। হয় বিয়ে করে বউ নিয়ে যাবে না হয় বাবা-মায়ের সাথে থাকবে। এতো মেয়ের ছবির মাঝে তটিনীর ছবিটা সহজেই তার নজড় কেড়ে নেয়। এতোগুলা দিন পর আবারো মেয়েটাকে দেখে তার হৃদয় কেঁপে উঠল৷ সেদিন সে ঠিক করেছিল, ” তুমিই আমার জীবনসঙ্গিনী হবে। দ্বিতীয়বার যখন তোমার খোঁজ পেয়েছি তার হারিয়ে যেতে দেবো না।”

এই ভেবে অনেক কিছু করে সে তটিনীকে নিজের জীবনসঙ্গিনী রুপে পেয়েছে। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে সে কোন ভুল করেনি তো? কারণ তটিনী এখনো তার সাথে সহজ হয়ে উঠতে পারেনি। মাঝেমাঝে না চাইতেও তার অবচেতন মনে চিন্তা ভর করে যে ” তটিনী শুধু নিজের বাবা-মায়ের কারণে বিয়ে করে।”

এরূপ নানা চিন্তা ভাবনার মাঝেই ঘুম এসে ধরা দিল মাধুর্যের চোখে।
.
.

নিত্যদিনের মতো ফুরফুরে মেজাজে সব কাজ করছে তটিনী৷ আজ তাকে আরো বেশি খুশি দেখাচ্ছে কারণ সন্ধ্যায় সে আর মাধুর্য বাইরে যাবে। প্রতিদিনের মতো আজো মাধুর্য তৈরি হওয়ার সময় তটিনী রুমের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছিল। তবে আজ একটু ব্যতিক্রম হলো। মাধুর্য রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পেছনে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল, ” বাইরে এসো তটিনী৷ তোমার সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

সকালের নাস্তা শেষে মাধুর্য চুপচাপ সোফায় বসে রইল। তার অন্যরকম ব্যবহারে তটিনীর সন্দেহ হলো। কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল,

” আজ অফিস বন্ধ নাকি?”

” না যাবো। তবে তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। জানো আমি না অনেকদিন ধরে ভেবেছি। শেষপর্যন্ত সবকিছু ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জানি এই সিদ্ধান্তে আর কেউ খুশি হোক না হোক তুমি অনেক খুশি হবে।”

মাধুর্যের কথা বলার ধরণ তটিনীর সুবিধার মনে হলো না।

” কি সিদ্ধান্ত? আর আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? দয়া করে পরিষ্কার করে বলুন।”

” তুমি বলতে না তুমি আমাকে নিজের ইচ্ছেতে বিয়ে করোনি, বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের কারণে করেছ। আমিও তোমাকে বেশ অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি। অতঃপর বুঝলাম নিজের ইচ্ছে, ভালোলাগাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমি তোমার উপর তা চাপিয়ে দিচ্ছি। হয়তো তুমি তোমার পার্টনার থেকে আরো বেশি কিছু আশা করো যা আমার মধ্যে নেই। তাই তো তুমি বিয়েতে প্রথম দেখাতেই না করে দিয়েছিলে। যা হয়েছে তা পরিবর্তন করা তো সম্ভব নয় তবে সুধরে নেওয়া সম্ভব।”

মাধুর্যের কথা শুনে তটিনীর কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। দিবাস্বপ্ন দেখছে কিনা তার সন্দেহ হচ্ছে। কোনরকমে কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করল সে।

” আপনি এসব কি বলছেন? মাথা ঠিক আছে আপনার?”

” চিন্তা করো না তটিনী। তোমাকে আর কেউ জোড় করবে না। আমার কথাও ভেবো না, আমি যা ভুল করেছি তা আমিই ঠিক করে দেবো।”

কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেল মাধুর্য। তটিনী ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। সকাল থেকে কত কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছিল কিন্তু সব শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল। ভেবেছিল আজ মাধুর্যকে মনে থাকা গোপন কথাগুলো বলেই দেবে, তাদের সম্পর্ক আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে কিন্তু হায়! ভাগ্যে যেন অন্য কিছুই লিখে রেখেছেন বিধাতা। হু হু করে কেঁদে উঠল তটিনী৷ মজা করতে গিয়ে বলা কথা গুলোই যে তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা কেই বা জানত।
.
.

দরজা খোলার পর আজ যেন অন্য এক তটিনীকে দেখতে পেল মাধুর্য। তাদের বিয়ে হয়েছে নয়মাস হয়ে গিয়েছে, এই বাড়িতে তারা একসাথে আছে পাঁচমাসের উপরে। এই পাঁচমাসে এমন কোন দিন নেই যেদিন তটিনী পরিপাটি হয়ে মুখে হাসি রেখে দরজা খুলে দেয়নি। তবে আজ তটিনীর মুখে নেই কোন হাসি, মুখশ্রীতে ছেঁয়ে আছে বিষাদের ছায়া। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে, মাথার চুল এলোমেলো। অনেকখানি বিধ্বস্ত লাগছে তাকে। মাধুর্যের মুখশ্রীতেও ছেঁয়ে আছে গম্ভীর্যতা। কোনরকম কথা না বলে সে ভেতরে চলে গেল।

অনুভূতিহীনভাবে মাধুর্যকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে তটিনী। অন্যদিন দু’জনে একসাথে খাবার খেতো, সে পরে বসবে বলেও মাধুর্য জোড় করে বসাতো কিন্তু আজ মাধুর্য একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। চুপচাপ খেতে লাগল এবং এমন ভাব করল যেন এই মূহুর্তে এই জায়গায় সে ছাড়া অন্য কারো উপস্থিতিই নেই। ভীষণ রকমের কান্না পেল তটিনীর, দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ভাতগুলো নাড়াচাড়া করে চলেছে সে। ভাতের একটা দানাও তার মুখে উঠেনি। মাধুর্য খেয়ে উঠে গেল। হাত ধুয়ে টেবিলের কাছে এসে পানি খেয়ে গম্ভীর কন্ঠ বজায় রেখে বলল, ” রুমে টেবিলে একটা কাগজ আছে। খেয়ে ওটা পড়ে নিও তারপর নিজের মতামত জানাবে আমাকে।” বলে অন্য একটা রুমে গিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দিল সে। মাধুর্যের কথা শুনে তটিনীর খাওয়ার রুচি একদমই চলে গেল। কিন্তু খাবার নষ্ট হবে এই কারণে জোড় করে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘরে ফিরে এলো। দেখল ঠিকই টেবিল ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ।

” এটা কি ডির্ভোস পেপার? কিন্তু অর্ধেক বেলার মধ্যে তো এটা তৈরি করা সম্ভব না। তার মানে কি মাধুর্যের মনে আগে থেকেই সম্পর্ক শেষ করার চিন্তা ছিল? এতোগুলা দিনে কি আমাকে একটুও ভালোবাসতে পারেনি সে? ভালো না বাসুক অন্তত স্ত্রী হিসেবে কি একটুও দুর্বলতা তৈরি হয়নি তার মনে? হ্যাঁ এটা ঠিক যে আমি আমার মনের কথা মুখে বলতে পারিনি, জানি এটা আমার ব্যর্থতা তবে ভালোবাসা কি শুধু মুখে বললেই সত্যি হয়? সে কি তার প্রতি আমার ছোট ছোট কেয়ার, যত্ন এসবও কি লক্ষ্য করেনি? কখনই কি করেনি? এখন আমি বাবা-মাকে কি উওর দেব? এই মূহুর্তে যদি আমি তাদের এই বিষয়ে কিছু জানাই তবে তারা চিন্তা করবে। এখানেও এমন কেউ নেয় যে সামনাসামনি কথা কোন সিদ্ধান্ত নেব। কি করব এখন আমি?” কথাগুলো বলার সময় তটিনীর চোখ থেকে অনবরত জল ঝড়েই যাচ্ছিল। একসময় অনেক সাহস জুগিয়ে সে কাগজটা খুলে দেখল। কাগজটা সম্পূর্ণ দেখার পর কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের জল পড়া থেমে গেলেও পরমুহূর্তে আরো দ্বিগুণ বেগে তা গড়িয়ে পড়তে লাগল। কাগজটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ছুটে এলো পাশের রুমে।

মাধুর্য একটা বই খুলে বসে ছিল। কোথা থেকে তটিনী ছুটে এসে ধুম করে তার পিঠে একটা মেরে বসল। ব্যথায় মৃদু চিৎকার করে উঠল সে। পিঠে হাত দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল৷ চোখে জল কিন্তু মুখে রাগীভাবে তটিনীকে দেখে ব্যথা নিয়েও মৃদু হাসল মাধুর্য। সে জানত মেয়েটার প্রতিক্রিয়া এরূপই হবে। ঝাঁঝাল কন্ঠে কাগজটা দেখিয়ে তটিনী জানতে চাইল, ” এসব কি? কিসব লিখেছেন এখানে?”

” কেন? ভূল কি লিখলাম? যা সত্যি তাই লিখেছি।”

” কি সত্যি? কোন সত্যি নেই। মজা মনে হয় সব আপনার কাছে?”

” কোন সত্যি নেই? আসলেই? তুমি অস্বীকার করতে পারবে তুমি আমাকে আগে থেকেই পছন্দ করতে? আমি তোমাকে চেনার আগে থেকেই তুমি আমাকে চিনতে এটা অস্বীকার করতে পারবে?”

চুপ হয়ে গেল তটিনী। সে ভেবেছিল অন্যভাবে মাধুর্যকে কথাটা জানাবে কিন্তু সে ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাইনি তার বলার আগেই মাধুর্য সত্যিটা জেনে গিয়েছে। কাগজটাতে শুধু কয়েকটা লাইন লেখা ছিল।

” মনের কথা আগেই বলে দিলে পারতে। তাহলে আর এতো চোখের জল ফেলতে হতোনা। পুরোই ভুতনি লাগছে তোমাকে। এতোদিন তুমি আমার সাথে লুকোচুরি খেলেছ আজ না হয় আমি কয়েকঘন্টার জন্য খেললাম।”

” কখন থেকে জানতেন আপনি?”

তটিনীর একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সে বলল, ” এখান আসার আগে থেকেই আমি সব জানতাম। তোমার এক বান্ধবী আমাকে বলেছিল তবে সেও নিশ্চিত ছিল না। পরে আমি ঢাকা থেকে আসা তোমার বইখাতাগুলো ঘুছিয়ে রাখার সময় তোমার ডাইরিগুলো মাঝে একটা শেষ হয়ে যাওয়া ডাইরি খুঁজে পাই। তাতে অর্ধেকের ছেয়েও বেশি অংশ জুড়ে তো আমার কথাই লেখা ছিল। তখন আমি সহজেই বুঝতে পেরে গিয়েছি তোমার মাথায় কি চলছে। এতোদিন কিছু বলেনি কারণ আমি চাইছিলাম তুমি কি করো দেখতে। কাল তোমার জন্মদিন এটা আমার মনে আছে। তারউপর আগেরদিন যখন বললে আজ বাইরে যাবে তখনই ধারণা করেছিলাম তুমি হয়ত কিছু বলবে। তাই সকালবেলা ইচ্ছে করে তোমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম, জানতাম তুমি বোকা মেয়ে কিছুই বুঝবে না। তো কেমন লাগল জন্মদিনের চমক?”

তটিনী পুনরায় মাধুর্যের বাহুতে জোড়ে একটা থাপ্পড় মারল।

” আ…. দেখতে চিকন হলে কি হবে হাতে জোর আছে ভালো। পুরো হাত জ্বলে গেল আমার।”

” আরো মারব, মারতে মারতে শেষ করে ফেলবো। জানেন কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এতোটা চমকে গিয়েছিলাম, চিন্তা করতে করতে যদি হার্ট অ্যাটাক করে পড়ে থাকতাম তখন কি হতো? দেখার মতো তো কেউ নেই, তখন মরে পড়ে থাকলে আপনার মজা বেরিয়ে যেতো।”

” চুপ কিসব বাজে কথা বলছ। কেন? তুমি যখন আমার সাথে অভিনয় করেছিলে তার বেলা? প্রথমদিকে তো আমার মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করত এই ভেবে যে আমি বুঝি কাজটা ঠিক করিনি। যখন জানতে পেরেছি তোমার মনে এক কিন্তু মুখে আরেক তখন ইচ্ছে করছিল তুলে আছাড় মারি। ভেবেছিলাম তুমি বোকা, শান্তশিষ্ট কিন্তু পেটে পেটে যে এই চলছে তা তো বুঝতেও পারিনি।”

তটিনী বাচ্চাদের মতো হেসে মাধুর্যকে জড়িয়ে ধরে বলল, ” একটু মজা করেছি আরকি। আমি আপনার বিয়ে করা বউ, আমি আপনাকে না জ্বালালে আর কে জ্বালাবে? হুট করে হারিয়ে গিয়েছিলেন এরপর যখন পাত্রের জায়গায় আপনাকে দেখলাম তখনই মাথায় দুষ্টবুদ্ধি চেপেছে।”

মাধুর্য তটিনী মাথায় হাত রেখে বলল, ” সেসময় জানালে না কেন? সেসময় বলে দিলে এতোগুলা বছর অপেক্ষা করতে হতো না।”

” আপনি যদি প্রত্যাখান করেন এটা চিন্তা করে বলতে ভয় পেয়েছিলাম। আমি হুট করে কারো সাথে কথা বলতে পারিনা। অনেকবার চেষ্টা করেছি কিন্তু বলবো বলবো করে সময় অতিবাহিত হয়ে গেল আর একদিন হুট করে আপনিও হারিয়ে গেলেন।”

মাধুর্য তটিনীকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে তার চোখে তাকিয়ে বলল, ” বলবো বলবো করে যা এতো বছর বলতে পারোনি তা কি এখনো নিজের মাঝে লুকিয়ে রাখবে তটিনী? বলবে না?”

তটিনী হেসে মাধুর্যের গাল নিজের দু’হাতের মাঝে নিয়ে সুরেলা কন্ঠে গেয়ে উঠল,

” আরে hi, কিছু কথা ছিল মাথায়
যা আমি বলে দিতে চাই
কিন্তু উপায় কোথায়?
আরে hi, পাত্তা কেন তোমার নাই?
Text-এর reply-ও নাই
ক্যামনে বলি তোমায় “bye”?

Wait, না, প্রথম দেখাতে ভালোবাসিনি আমি
তবে ধিরে ধিরে জাগলো এই অনুভূতি
আমি সারাদিন ভেবে এই ভাবেই
যায় আমার রাত পেরিয়ে
দুনিয়া ভাবুক যা ভাবার আছে
তবে আমিতো ভাববো শুধু তোমাকে
ভেবে ভেবে এই ভাবে সময় আমার পেরিয়ে

বলবো বলবো করে বলা হয়নি
কপালে যাই থাকুক না কেন বলবো ভাবছি
এই কিছু কথা মনের যা আগে বলা হয়নি
ছিলাম আমি লুকিয়ে এতটা দিন
আজ, সাহস করে বলে দেবো ভাবছি
শোনো তাহলে মনের কথা

I love you, ooh
I love you, ooh
I love you, ooh
I love you.

____________________ সমাপ্ত____________________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here