প্রেয়সী পর্ব ৭

0
803

#প্রেয়সী
#নন্দিনী_নীলা
৭.

সকালে কোথা থেকে একটা সিম এনে দিল তিন্নি। আবারো সরি বলল কানে ধরে। মধু যেন ওকে ভুল না বুঝে। অবিশ্বাস বা সন্দেহ করে ও মানা করেনি। শুধু ভাইদের কথা অমান্য করবে না বলেই না করেছিল। মধুর কেন জানি সিমটা নিতে ইচ্ছে করল না। ওয়াইফাই কানেক্ট করে ফেসবুক আইডি লগ‌ইন করেছে রাতেই। তিন্নি জোর করে সিম লাগিয়ে দিল ফোনে। মধু না ও করল না। কারণ ওর সিম দরকার এখন খালামনির সাথে হোয়াটসঅ্যাপ এ কথা বলতে হবে। তার জন্যেই সিমের দরকার ছিল ওর। সিম কার এ নিয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। মধু হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্ট খুলে। ফেসবুকে খালাতো বোনের থেকে খালামনির নাম্বার নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ এ এড করে নিল। খালামনি রাতে এক্টিভ থাকে বেশি। এখন নাই তাই ফোন রেখে দিল। তিন্নি রুমের বাইরে এসে দেখল ফুয়াদ দাঁড়িয়ে।
” সিম নিয়েছে?”
তিন্নি মাথা দাঁড়িয়ে স্বীকার করল। সকালে ফুয়াদের কাছেই সিম চেয়েছিল তিন্নি তার থেকে নিয়েই দিয়েছে মধুকে।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে আছে আজ পুর্ণ পরিবার। আজ শুক্রবার তাই সবার ছুটি। আধ বয়স্ক দুজন লোক দেখল টেবিলে বসে আছে। তাদের বিপরীতে বসে আছে অচেনা একটা লোক তার পাশেই বসে চিত্রা ভাবি। এটা তাহলে ফাহাদের বড় ভাই! চার ভাইয়ের চেহারায় মিল না থাকলেও গায়ের রং এ মিল আছে । কারণ চারজন ফর্সা। এদিকে বড় ভাই মোশাররফ একটু খাটো প্রকৃতির। খুব বেশি না কিন্তু সমুদ্র আর ফুয়াদের তুলনায় কম। এদিকে সমুদ্র আর ফুয়াদ লম্বায় সমান। সমুদ্র নাকি ফুয়াদের থেকে তিন কি সারে তিন বছরের বড়।রাহী, ফাহাদ আর সমুদ্র বাদে সবাই টেবিলে আছে। তিন্নি আর মধু ও এসে দাঁড়াল। ওদের বসতে বলল নাফিসা। তিন্নি গিয়ে বসল নিজের বাবার পাশে। তার পাশেই আরেকটা চেয়ার ফাঁকা কিন্তু পরের চেয়ার টায় ফুয়াদ বসে আছে। মধু গিয়ে তিন্নি ও ফুয়াদের মাঝখানে বসল।
অস্বস্তি নিয়ে তাকাল ফুয়াদের দিকে। ফুয়াদ একটা গাঢ় দৃষ্টি ওর দিকে নিক্ষেপ করে আবার খাওয়াতে মনোযোগ দিয়েছে।
মধু নিচু স্বরে তিন্নি কে জিজ্ঞেস করল,,” ফাহাদ, রাহী আপু ক‌ই?”
” আপু তো ঘুমে। আর ফাহাদ বাসায় নাই গতকাল রাতে ও ফ্রেন্ডের বাসায় গেছে।”
” কখন? সন্ধ্যার পর ও তো বাসায় দেখলাম।”
” দশটার পর গেছে ওর বন্ধু এসেছিল নিতে।”
” ওহ।”
ইতস্তত বোধ করে জিজ্ঞেস করল,,” সমুদ্র কে ও দেখছি না!”
” ভাইয়া ও এখন ঘুমে। সে সারা রাত পার্টি করে সকাল বেলা ঘুমায়।”
” ওহ।” মুখ নিচু করে বলল মধু।

মধু আর থাকতে না পেরে বিকেলের দিকে মায়ের নাম্বারে কল করে বসল। ওর মা কল রিসিভ করার আগেই কল কেটে ফোন বন্ধ করে ফেলল। কথা বলার সাহস হলো না। আবার ফোন বন্ধ করল ব্যাক কল আসবে জানে। সেটা যাতে রিসিভ না করতে হয়।
রাতে মধু বেলকনিতে বসে ওর খালামনির সাথে বলছিল। ওর খালামনি কানাডা আছেন। একমাত্র এই বিয়ে নিয়ে খালামনি দ্বিমত পোষণ করেছিল‌। আর মধুর পক্ষে কথা বলেছিল। এবং মধু কে পালিয়ে যাওয়ার কথা তিনিই বলেছিল। খালামনি ওকে সবচেয়ে ভালবাসে। আর সব সময় ওর মতামত কে সমর্থন করে। আজ খালামনি না থাকলে এতো সাহস করে বাসা থেকে পালাতেই পারত না। আর তিন্নি না থাকলে থাকার জন্য নিরাপদ স্থান ও পেতো না। এই পরিবারের সবাই কমবেশি ভালো‌। ভালো না থাকলে কি একজন অপরিচিত মেয়েকে এভাবে আপন করে নেয়।
” রাগ করে এই বাসা ছাড়ার কথা ভেবো না মধু‌। তিন্নি তোমার সিমের ব্যবস্থা ও করেছে আর সরি ও বলেছে। এই অবস্থায় একা একটা মেয়ে রাস্তায় থাকাটা কতটা ঝুঁকি পূর্ণ জানো তুমি। এক রাতেই কত বিপদের সম্মুখীন হয়েছ। তাই তাদের খারাপ কথা শুনলেও একটু মানিয়ে থেকে যাও। দুলাভাই খুব রেগে আছেন তন্নতন্ন করে খুঁজছে তোমায়।” খালামনি বলল।
” তোমার সাথে বাপির কথা হয়েছে?”
” হবে না আবার। কি যে বলো না। আমাকে তো হুমকি দিচ্ছে। কোথায় আছো জানার জন্য সকাল বিকাল ফোন দিয়ে হুমকি দিচ্ছে। না পেরে আপা কে দিয়ে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল ও করেছে।”
নরম সুরে বলল মধু,,” শুধু কি বিয়ে দেওয়ার জন্য খুঁজছে! আমি কেমন আছি? কিভাবে আছি? এসব নিয়ে টেনশন করছেনা উনারা!”
” আপা চিন্তা করছে। অনেক কেঁদেছে কল দিয়ে।”
” মাম্মার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”
” ভুলেও এই কাজ করো না মধু। ধরা পরে যাবে। ধরা পরা মানেই বিয়ের পিঁড়িতে বসা।”
” আজ আমি কল দিয়েছিলাম মাম্মার নাম্বারে।”
” বলো কি?”
সব খুলে বলল মধু।
” বিয়ে করতে চাইলে ফিরে যাও বাসায়। আর যদি করতে না চাও তাহলে এখন লুকিয়ে থাকো। বাকিটা তোমার ইচ্ছে।”
” বিয়ে আমি এখন করত চাই না তুমি তো জানো আর তাছাড়া ওই সাফিন কে তো কখনোই করতে চাই না। খুব গায়ে পড়া টাইপের ও। আমার ওমন গায়ে পরা টাইপের ছেলে পছন্দ না। আমি তো আমার পছন্দের কাউকে বিয়ে করতে চাই। আমার পছন্দের জন এমন গায়ে পরা স্বভাবের একদমই থাকবে না।”
কথা শেষ করে মধু তিন্নির রুমে থেকে বেরিয়ে রাহীর রুমে এল। রাহী সাথে একটু গল্প করে ফিরে এসে তিন্নি কে বলল,,” চল না ছাদে যাই।”
” এতো রাতে ছাদে কেন যাবি?”
” এমনি ভালো লাগছে না। একটু প্রকৃতির হাওয়া নিলে ভালো লাগতো আয় না। আর ওতো রাত কোথায় কেবল না সারে দশটা বাজে। আমাদের বাসায় থাকতে আমি বারোটায় ও ছাদে যেতাম তাও একা।” মিথ্যা বলল তিন্নি কে রাজি করাতে।
তিন্নি চোখ কপালে তুলে বলল,,” ভূতে ধরে নাই তোরে এখনো?”
” ধূর মজা করবি না চল তো।”
” না ভাই আমার অন্ধকারে অনেক ভয় করে আমি যাব না।”
” আমি আছি তো। ভীতুর ডিম চল।”
” রাহী আপুকে নিয়ে যা। আপু ও ছাদে যায় মাঝে মাঝে।”
তিন্নির ভীতু মুখ দেখে বিরক্ত হলো মধু এগিয়ে এল আবার রাহীর রুমে। রাহী কে বলতেই রাজি হয়ে গেল। মধু আর রাহী ছাদে এসে দাঁড়াল। কথা বলতে বলতে রেলিং ধরে দাঁড়াল।
মধু লাফ দিয়ে রেলিং এ উঠে বসল।
রাহী উত্তেজিত গলায় বলল,,” পরে যাব কোথায় বসলে নামো।”
” আমার অভ্যাস আছে আপু। পরব না। তুমি ও বসো আরাম লাগবে দেখো।”
বলেই রাহীর‌ হাত ধরে টেনে ধরল মধু রাহী ভয়ে ছিটকে দূরে গিয়ে বলল,,” নো আমি উঠব না। এতো তাড়াতাড়ি মরার শখ নাই। তুমি বসে থাকো আমি দাঁড়িয়েই ঠিক আছি।
মধু রাহী ভয়ার্ত চোখ মুখ দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। রাহী নিচে দাঁড়িয়েই কথা বলছে আর মধু বসে। হঠাৎ রাহীর ফোন বেজে উঠল। মধুকে বলে একটু দূরে সরে এল কথা বলার জন্য। মধু রাহীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের ফোন বের করে টিপতে লাগল। আত্নীয় স্বজন সবাই অনেক মেসেজ করেছে তাই ও নিজের ফেসবুক একাউন্ট ডি এক্টিভ করে রেখেছে। ইউটিউব এ ঢুকে ফানি ভিডিও দেখছে আর হাসছে হঠাৎ একটা ভূতের ভিডিও আসলো। ও মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। এদিকে রাহী প্রেমে মগ্ন হয়ে একবারে কোনায় গিয়ে কথা বলছে মধুর কথা ভুলে।

” তুমি পিশাচ নাকি? একা ছাদে বসে আছো ভয় করছে না? আবার ভূতের নাটক দেখছ!”
মধু দেখতে দেখতে ভয় পাচ্ছিল কিন্তু দেখায় মনোযোগী হয়ে পরেছিল তাই ও কোথায় আছে বেমালুম ভুলে গেছে। একেতে ভুতের নাটক দেখছে সেখানে একটা ছেলে রাক্ষুসে। তার ভয়ংকর দাঁত ও কালো চোখ দেখাচ্ছে সেই মুহূর্তেই হঠাৎ একটা পুরুষালী ভরাট কন্ঠ নিজের কানে আসতেই ভয়ে ও চিৎকার করে উঠল। আধো অন্ধকারে সাদা শার্ট পরিহিত একটা অবয়ব দেখে হাত থেকে ফোন ফেলে দিল। ফোন গিয়ে পরল ছাদের ফ্লোরে। মধু শরীর ছেড়ে দিল ভূত বলে চেঁচিয়ে।
এদিকে ফুয়াদ ছাদে এসেই মধুকে একা শুনশান ছাদে একা রেলিং এ উঠে বসা দেখে চমকায়। কপাল কুঁচকে এগিয়ে আসে ওর দিকে। মধু ফোনে এতোটাই মগ্ন ছিল যে ফুয়াদের উপস্থিতি টের পায় না। ফুয়াদ এগিয়ে এসে দেখে মধু ভূতের ভিডিও দেখছে। ফুয়াদ ঘাড় নিচু করে একবার ফোনের দিকে তো একবার মধুর দিকে তাকায়। মধুর মুখটা ভরে শুকিয়ে গেছে। মেয়েটা ভয় পাচ্ছে তবুও দেখছে দেখে ফুয়াদের প্রচন্ড রাগ হলো। রাগী গলায় কথা বলে উঠল। আর মধু ভূত বলে ওকেই ভয় পেয়ে শরীর ছেড়ে দেয়। ফোনটা ছাদের ফ্লোরে পরলেও ও একেবারে ছাদ ছেড়ে বাগানে পরবে। মেয়েটা কি পাগল রেলিংয়ের ওপর থেকে কেউ এভাবে নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দেয়? ফুয়াদ নিজেও ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি মধুর কব্জি কেটে ধরে। মধু এতোক্ষণ বাগানের লাইটের আলোয় ফুয়াদের ফর্সা শক্তপোক্ত মুখটা দেখতে পেল। ভূতের ভয় পালিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। এবার ঘাড় নিচে কাত করে দেখল ও নিচে পরে যাচ্ছে ছাদ থেকে। এবার মরার ভয় দেখা দিল ওর চোখ মুখে। মৃত্যুর আতংক।
ঢোক গিলে ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে আছে।
মধু কান্না করে দিয়েছে ভয়ে। ফুয়াদ শক্ত করে ধরে রেখে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,” আর ইউ ম্যাড? এমন বোকামি কেন করলে? আমাকে দেখে কোন অ্যাংগেলে তোমার ভূত বলে মনে হলো। ভূত বলে চেঁচিয়ে উঠলে কেন? আর ভূতে যেহেতু এতোই ভয় ছাদে এসে ভূতের সিরিয়াল দেখছিলে কেন? ইডিয়েট।”
” আপনাকে অন্ধকারে সব সময় ভূতের মতো সাদা ড্রেস এ আমার সামনে আসতে কে বলেছে?”
মধুর কথা শুনে ফুয়াদ গমগমে গলায় বলল,,” তোমার ভয়ের জন্য আমায় ড্রেস আপ পরিবর্তন করতে হবে?”
মধু বলল,,” না না তেমনটা বলিনি। আপনি সেদিন ও সাদা পাঞ্জাবি পরা ছিলেন আমি আপনাকে ভূত ভেবেছিলাম। আজকেও তাই সাদা শার্ট পরে এসেছেন। আজকেও ভয় পেয়ে মরার পথে আছি।”
” এখানে দোষ কার? তোমার মতো বেয়াদব মেয়ের! যেগুলোতে ভয় পাও সেগুলো দেখো কেন? আবার জলজ্যান্ত মানুষ কে সব সময় ভূত ভেবে ভয় পাও গাধা‌।”
” সরি আমাকে তোলেন এখানে থেকে।” অসহায় মুখ করে বলল মধু।
ফুয়াদ তপ্ত রাগী শ্বাস ফেলে উপুড় হ‌ওয়া মধুর বাহু টেনে অর্ধেক তুলে আনল। তারপর দুহাতে কাঁধ ধরে উঁচু করে এনে ফেলল ছাদে। মধু ফুয়াদের শার্টের কলার খামচে রেখেছিল শক্ত করে। ফুয়াদের বুকের কাছে দুটো বোতাম খোলা ছিল। এজন্য গলা বুক উন্মুক্ত ছিল। মধুর খামচে ধরায় ওর হাতের বড় নখের আঁচড় লেগে যায় গলায়। ছাদে পা ফেলতেই হাত গুটিয়ে নেয় মধু। ভয়ে মধুর সারা শরীর থরথরিয়ে কাঁপছে। বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটা হচ্ছে সারা শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে।
ফুয়াদ ও ঘেমে উঠেছে। কপালে থেকে ঘাম মুছে ফুয়াদ মধুর দিকে তাকিয়ে বলল,,” দেখতে চিকনা হলেও ওজন কম না। দেখে তো মনেই হয়না এতো ভারি তুমি।ঠিক হাতির বাচ্চা।”
মধু ধন্যবাদ দিতে কাঁচুমাচু করছিল লজ্জায়। কিন্তু ওর লজ্জা নিমিষেই শুষে নিল ফুয়াদের টিটকারী মারা কথায়। লজ্জা গিয়ে মাটির নিচে চাপা পরল। আর অগ্নি শিখার মতো জ্বলন্ত চোখে তাকাল ফুয়াদের দিকে।
” কি‌ বললেন আমি হাতির বাচ্চার মতো?”
” উপস সরি হাতির মতো দেখতে নয়। ওজনে হাতির বাচ্চার মতো।”
রাগে মধু ফেটে পরে।

এদিকে মধুর সাথে ফুয়াদ কে দেখেই রাহী ভয়ে ফোন কেটে এগিয়ে এসেছে।
” মধু তুমি ঠিক আছো?” ঢোক গিলে বলল রাহী।
ফুয়াদ ভ্রু কুঁচকে বলল,,” তুই এখানে?”
মধু বলল,,” আমি আর আপুই তো ছাদে এসেছিলাম।”
ফুয়াদ বলল,,” এতোক্ষণ তুই কোথায় ছিলি?”
রাহী আমতা আমতা করতে লাগল।
মধু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল,,” আমি আপুকে কফি আনতে পাঠিয়েছিলাম। ভাবছিলাম দুজনে গল্প করব।”
রাহী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ফুয়াদ মধুর দিকে তাকিয়ে বলল,,” রিয়েলি? ওকে তো নিচে থেকে আসতে দেখলাম না। আর হাতে কফি ক‌ই?”
এবার মধু আর রাহী দুজনেই আমতা আমতা করতে লাগল।
#চলবে…
( গতকাল মধুর মনের কথা কে শুনল? এটা গোপন থাক আপাতত। সময় মতো কাঙ্খিত মানুষটি সামনে আসবে।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here