প্রেয়সী পর্ব ৪৩

1
1966

#প্রেয়সী
#নন্দিনী_নীলা
৪৩.

মধু অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। ওর দৃষ্টি ফুয়াদ আর মিতুলের দিকে। রিসোর্ট সম্পুর্ন অন্ধকার এখন লাইট জ্বলছে শুধু ফুয়াদ আর মিতুলের উপর। দু’জন এ দাড়িয়ে আছে হাসি মুখ করে। মধু ফুয়াদের মুখে হাসি জাস্ট সহ্য করতে পারছে না। বুকের ব্যথা করছে। প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়ে ওর হাত পা কাঁপছে।
ও তিন্নির পাশে ছিল তাই তিন্নির হাত ধরল খামচে। অন্ধকারে খেয়াল করল না ও যার হাত ধরেছে সে তিন্নি নয়। অন্য কেউ। ও কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,,” তিন্নি আমার খুব খারাপ লাগছে রে। আমি বোধহয় ফুয়াদ কে ভালোবেসে ফেলেছি। এখন আমার কি হবে।”
আবসা অন্ধকারে ছলছল করে উঠল‌ ওর চোখ জোড়া। তাকাল ও পাশে দেখল এটা তিন্নি নয় সমুদ্র। ও ছিটকে দূরে সরে দাঁড়িয়ে সরি বলতে লাগল।
সমুদ্র বলল,,” ইটস ওকে আমি কিছু মনে করিনি।”
মধু অন্ধকারে সরে গেল অন্যদিকে ও দেখতে পারবেনা ফুয়াদ কে অন্য কারো হতে। ওর চোখ এলিয়ে গলগলিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। বারবার মনে পড়তে লাগল ফুয়াদ আর ওকে ভালোবাসি বলবে না‌। ওকে জ্বালাতন করবে না। সে আজ থেকে শুধুই মিতুল এর।
ও অন্ধকারেই একটা চেয়ার টেনে বসল। এনগেজমেন্ট নিয়ে ঘোষণা করা হচ্ছে মধু বসে কাঁদছে ফুঁপিয়ে। ওর বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে।
” এতো কাঁদলে তো সুইটহার্ট তোমার এতো সুন্দর সাজ নষ্ট হয়ে যাবে।”
ফুয়াদ এর কন্ঠ স্বর কানে আসতেই মধু চমকে তাকাল পাশে। আবসা আলোতেই ফুয়াদের মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল। ওর পাশে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে লোকটা। মধু বসা থেকে উঠে দাঁড়াল আর চোখ উঁচিয়ে সামনে দেখল মিতুল একাই দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে দাঁড়ানো নাফিসা বেগম তিনি কিছু বলছে। মধু অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল ফুয়াদের দিকে।
” আপনি এখানে কেন?”
” হুম তোমাকে নিতে এলাম।”
মধুর গাল এখনো অশ্রু তে ভেজা। মধু হাত দিয়ে গাল মুছে বিস্মিত কন্ঠে বলল,,” মানে! আমাকে নিতে এসেছেন কেন?”
” চলো, গেলেই দেখতে পারবে কেন নিতে এসেছি।”

ফুয়াদ মধুর হাত ধরে টেনে ওকে নিয়ে গেল। মিতুল ফুয়াদের সাথে মধু কে দেখে চমকে উঠল। নাফিসা বেগম ফুয়াদ আর মিতুলের এনগেজমেন্ট এর এনাউজমেন্ট করে ফেলেছে। ফুয়াদ সবার সামনে মধু কে দাঁড় করিয়ে ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরে। আর মুখে অমায়িক হাসি ঝুলিয়ে বলল,,” মধু উইল ইউ মারি মি?”
মধু বিষ্ময় এ কথা বলতে ভুলে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ফুয়াদের হাসি উজ্জ্বল মুখের দিকে।
এদিকে নাফিসা বেগম ও চমকে উঠেছে। হতবিহ্বল চোখে ফুয়াদের দিকে তাকিয়েছে। রাগান্বিত চোখে মধু আর ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে আছে। ফুয়াদের সেদিকে খেয়াল নেই আর না আছে মধুর খেয়াল ও থমকে গেছে ফুয়াদের কাজে। মিতুল লজ্জায় অপমানে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে। ও নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে। ও মধু কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজে ফুয়াদ এর সামনে দাঁড়ানোর প্রয়াশ করল তখনি কেউ ওর হাত দুটো শক্ত করে ধরে টেনে সরিয়ে নিল। সে আর কেউ না তিন্নি আর রাহী।
খুশিতে মধুর চোখ ছলছল করে উঠেছে। ও এক মুহুর্ত এর জন্য ভেবেছিল ফুয়াদ কে ও হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এখন ফুয়াদ কে ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখে ওর সমস্ত ভয় দূর হয়ে এক রাশ লজ্জা ওকে ঘিরে ধরেছে।
অনুষ্ঠানের সবাই মধু কে ইয়েস বলার জন্য চিৎকার করছে। হাসাহাসি করছে। সবাই আনন্দে থাকলেও এখানে কয়েকজন আছে অসন্তুষ্ট মুখে।
নাফিসা বেগম না কিছু বলতে পারছে এতো মানুষের মধ্যে। এখন কিছু বলতে গেলেই সবার সামনে লজ্জায় পরতে হবে সেই ভয়ে উনি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে।

মিতুলের পরিবারের সবাই নাফিসা বেগম কে ডেকে অপমান শুরু করে দিয়েছে।
তিনি চুপ করে অপমান গিলছেন। মিতুল নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিয়েছে কিন্তু পারছে না। তাই চিৎকার করছে এতো সবার চিৎকারের ওর চিৎকার চেঁচামেচি কারো কানে যাবে নাই তাই নিশ্চিন্তে আছে রাহী আর তিন্নি।
” আমাকে যেতে দাও। এর ফল ভালো হবে না সবাই মিলে আমাকে ঠকাতে চাইছ। ফুয়াদ শুধু আমার। আজ আমাদের এনগেজমেন্ট হবে কথা ছিল ‌। ও তো রাজি ও ছিল। ”
তিন্নি অবাক হওয়ার মত করে বলল,,” ভাইয়া রাজি কখন হলো?”
” সকাল থেকে তো রাজিই মনে হয়েছে।”
রাহী বলল,,” তুমি কি এতোটাই বোকা ? নাকি অভিনয় করো।”
মিতুলের কাছে সবটাই পানির মতো পরিষ্কার হয়ে উঠল। ফুয়াদ সবটাই ওর সাথে ড্রামা করেছে। চোখ ভর্তি অশ্রু নিয়ে তাকাল ফুয়াদ আর মধুর দিকে।
মধুর হাতে ফুয়াদ রিং পরিয়ে দিচ্ছে। মধুর ঠোঁটের কোনে হাসি। ফুয়াদের মুখেও হাসির রেখা আংটি পরিয়ে ওর হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। মিতুল আর এক সেকেন্ড ও এখানে অপেক্ষা করে না। নিজের বাবা মা বোনের কাছে এগিয়ে ওদের হাত ছাড়িয়ে। মাকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তারা রাগে গজগজ করে উঠে। এখানে আর এক মুহূর্তও না।
মিতুল কে জোর করে নিয়ে বেরিয়ে আসে সবাই।

নাফিসা বেগম থমথমে মুখে বসে আছেন। সমুদ্র মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। নাফিসা বেগম সমুদ্র কে কাছে পেতেই ঠাস করে একটা চর মেরে বসলেন। সমুদ্র থাপ্পড় খেয়েও কোন হেলদোল দেখালো না। মায়ের হাত ধরে ফ্লোরে বসে পরল। আর মায়ের হাত ধরে রেখেই বলল,,” আম্মু খুব রাগ লাগছে?”
” ওই মেয়েকে এখানে এনে কেন আমাকে অপমান করলি তোরা দুই ভাই? তোকে আমি বলেছিলাম ওই মেয়ের থেকে সরিয়ে আনবি আমার ফুয়াদ কে। পারলি না। ওই মেয়ের বাপ ভাই যদি আমার ফুয়াদের কোন ক্ষতি করে আমি ওই মেয়েকে ছারব না‌।”
” ছোটোর কিছুই হবে না আম্মু। তুমি অযথাই টেনশন করছো।”
” ওর জন্য আমার বান্ধবীর সাথে আমার সম্পর্ক নষ্ট হলো। আর কোনদিন আমার মুখ দেখতেও আসবে না মনে হয়।”
” আন্টি তোমাকে বুঝবে জোর করে কিছু হয়না তুমি এসব নিয়ে ভেবো না।”
” তোরা কেউ আমায় এক দন্ড শান্তি দিলি না। তোর বাপ ও আমার সাথে রেগে আছে। এতো বলার পর ও আসলো না। এখন মনে হচ্ছে তার না আসাই ভালো হয়েছে। এসব দেখতে হচ্ছে না। আমার ও এখন চলে যাওয়া উচিত।”
” তোমার ছেলের এনগেজমেন্ট হচ্ছে তুমি চলে যাবে?”
” যেখানে আমার মতামতের কোন দাম নাই। সবার সামনে আমাকে অপমান করা হলো সেখানে থাকার মতো নির্লজ্জ আর হতে চাইছি না। তুই কি আমাকে বাসায় পৌছে দিতে পারবি?”
সমুদ্র বলল,,” এভাবে সবাই চলে গেলে..”
” বুঝতে পারছি। আমি ড্রাইভারের সাথেই চলে যাচ্ছি। তোরা থাক সবাই। বাবা মাকে ছাড়াই এখন সন্তানেরা বিয়ে করে শুনেছি সেটা আমার পরিবারের সন্তানেরা ও করবে জানা ছিল না।”
নাফিসা বেগম সত্যি ড্রাইভার নিয়ে চলে গেলেন।
সমুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাকে এগিয়ে দিলেন।

মধু ফুয়াদের বাহু জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আত্নীয় পরিজন, বন্ধু বান্ধব সবাই ফুয়াদ কে কনংগ্রাচুলেশন করতে লাগল। ফুয়াদ রিং পড়ানোর পর থেকে মধু শুধু ফুয়াদের মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে। এই যে এতো এতো মানুষ ওদের সাথে কথা বলতে আসছে ও তবুও নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে না। ফুয়াদ একাই সবার সাথে কথা বলছে মধু কথাও বলছে না কারো সাথে। ফুয়াদ মধু কে নিয়ে সবার থেকে একটা নিরিবিলি জায়গায় এল।
মধু কে সামনে দাঁড় করিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল শক্ত করে তারপর বলল,,” কি ব্যাপার সুইটহার্ট? একদিনে এতো ভালোবাসা দিচ্ছ? এতো দিন তো তাকাতেই না এখন দেখি পলক ও ফেলতে চাইছ না। আমি কি খুব সুন্দর হয়ে গেছি নাকি চোখ সরাতেই চাইছ না।”
মধু নিজের নজর ফুয়াদের মুখের দিকে রেখেই বলল,” আবার কবে দেখতে পারব জানি না তো তাই বেশি করে দেখে নিচ্ছি।”
” মানে?” সন্দেহীন গলায় চেয়ে দেখে জিজ্ঞেস করল ফুয়াদ।
মধু উত্তর না দিয়ে ফুয়াদের বুকে মাথা এলিয়ে দিল। চোখ বন্ধ করে ওর বুকে মাথা রাখল। শান্তি ময় নিঃশ্বাস ফেলে নিশ্চুপ র‌ইল। ফুয়াদ ওর কথার আগাগোড়া কিছুই না বুঝে ওর কাঁধ ধরে আবার সোজা করে দাড় করিয়ে বলল,,” হেঁয়ালি করে আমাকে টেনশন দিচ্ছ কেন মধু?”
মধু মলিন মুখে বলল,,” আমি তো আজকে চলে‌ যাব মানিকগঞ্জ।”
” হোয়াট?” বিষ্ময় এ হতভম্ব হয়ে গেল ফুয়াদ ওর কথায়।
” খালামনিকে আমি ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি উনি হয়তো চলেও এসেছে। দাঁড়ান একটা কল করে দেখি কোথায় আছে!”
মধু ফোন বের করে নাম্বার ডায়াল করতে যাবে। ফুয়াদ ওর হাত থেকে এক টানে ফোন নিয়ে নিল আর বলল,,” তুমি আমাকে না জানিয়ে তাকে আসতে বলেছ কেন?
মধু ফুয়াদের কঠিন কন্ঠস্বরে ভয় পেয়ে যায়। ও ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফুয়াদ চুল খামচে ধরে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হাঁসফাঁস করতে লাগে। এভাবে চলে যাওয়ার কথা বললে ও কি নিজেকে সামলাতে পারে? মধু ওকে কিছু না‌ জানিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেবে ও ভাবতেই পারেনি।
” কি হয়েছে ওমন করছেন কেন?” ভীত মুখে বলল মধু।
ফুয়াদ লাল বর্ণ চোখে ওর দিকে তাকাল ও ঢোক গিলল লাল চোখ দেখে।
মধুর ফোন ফুয়াদের হাতেই বেজে উঠল। ফুয়াদ স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল খালামনি লেখা। ও ফোন রিসিভ করে স্পিকার দিল। ওপাশ থেকে বলে উঠল,” কোথায় তুমি আমি তো কমিউনিটি সেন্টারের সামনে আছি।”
” খালামনি আমি ভেতরে আছি তুমি আসো।”
” ভেতরে গিয়ে আর কি হবে? তুমি বাইরে আসো।”
মধু ফুয়াদের দিকে তাকাল কি বলবে ও বুঝতে পারছে না। ফুয়াদ ওর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে নিজেই ফোন কেটে দিল‌ আর মধু হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এল।
মধু বাইরে এসেই খালামিন’কে দেখতে পেল। তাকে দেখতেই ওর বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব হলো। ও মায়া ভরা চোখে তাকাল ফুয়াদের দিকে। ফুয়াদ কে ছেড়ে যাবার কষ্টে ওর কান্না পেয়ে গেল। যখন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন তো একটু ও কষ্ট অনুভব হয়েছিল না। কিন্তু যেই ভালোবাসি বুঝতে পারল তারপর থেকেই কষ্ট বাড়তে লাগল।
মধু ফুয়াদের দিকে চেয়ে বলল,,” আমি অপেক্ষায় থাকব আপনার জন্য। আপনি আমাকে আনতে যাবেন তো আমার বাসায়?”
ফুয়াদ চোখ লাল করে তাকাল মধুর দিকে।
তারপর বলল,,” আমি এখনো তোমাকে বিদায় দেইনি মধু। তাই এখনি বিদায় বার্তা ছেড়ো না।”
” মানে?”
ফুয়াদ মানের উত্তর না দিয়ে মধুকে নিয়ে খালামনির কাছে আসলো।

#চলবে….

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here