প্রেয়সী পর্ব ৩৮

0
534

#প্রেয়সী
#নন্দিনী_নীলা
৩৮.

” কাজ হয়েছে?” সমুদ্র বলল ফুয়াদ কে।
ফুয়াদ চিন্তিত মুখে বলল,,”না ওকে পাওয়া যায়নি। বাসায় ও ফিরেনি রাতে।”
সমুদ্র বলল,,” এখন কি করবি?”
“আপাতত কিছুই করব না। তুমি বাসায় ফিরে যাও।”
সমুদ্র একবার মধুর দিকে তাকিয়ে বলল,,”মধু আসি।”
মধু চোখ কটমট করে ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে ছিল।‌ সমুদ্র কথা বলতেই ওর দিকে তাকাল। সমুদ্র হাসি মুখ করে বিদায় নিয়ে চলে গেল। মধু ওখানেই বসে আছে গাল ফুলিয়ে। ফুয়াদ এগিয়ে এসে মধুর হাত ধরে টেনে দাঁড় করালো।
মধু দাঁত কিড়মিড় করে বলল,” কি হলো আমাকে টানছেন কেন?”
“আমাদের যেতে হবে! ফ্রেশ হয়ে আসো” বলেই হাত ছেড়ে দিল। মধু চরম বিষ্ময় নিয়ে তাকাল ফুয়াদের দিকে।
তারপর বলল,,” যেতে হবে মানে কোথায় যাব? আপনার বাসায়? সেখানে তো ভাইয়া আসছিল।”
“এখানে থেকে আপাতত যাওয়ার কথা বলছি। কোথায় যাব সেটা এখনো ঠিক করা হয় নাই।”
মধু প্রান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,,” আপনার নাম কি?”
প্রান্ত থতমত খেয়ে নড়েচড়ে বসল। এতোক্ষণ এক সোফায় জায়গা দখল করে বসে ছিল ও।
” জ্বি প্রান্ত হাসান।”
মধু বলল,,” এটা আপনার বাসা?”
” জ্বি।”
“খাবার থাকলে দিন আমার খুব খিদে পেয়েছে।”
ফুয়াদ গম্ভীর স্বরে বলল তখন,,” বাইরে খাবে চলো। এখানে কোন খাবারের ব্যবস্থা।”
মধু জেদি গলায় বলল,,” না আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না।”
” ওকে চলো তোমাকে মানিকগঞ্জের বাসে তুলে দেই।”
মধু আঁতকে উঠা গলায় বলল,,” এখন আমি বাসায় গেলে আমারে মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে ভাইয়া।”
” তো ফ্রেশ হয়ে আমার সাথে চলো।”
মধু অসহায় মুখ করে হাত মুখ ধুয়ে এল। তারপর ফুয়াদের সাথে বেরিয়ে পড়ল। ওরা বাসা থেকে বের হবার কিছু সময় বাদেই প্রান্তের বাসায় তিনজন লোক আসলো। সবাই এসেছে মধু কে খুঁজতে। এসে প্রান্ত কে ধরে জেরা করতে লাগল মধু কোথায়! প্রান্ত চোখ মুখ শুকিয়ে বলল,,” আমি জানি না।”
প্রান্ত আসলেই জানে না কিছু। ফুয়াদ যাওয়ার আগে জানায়নি কোথায় যাবে। শুধুমাত্র প্রান্ত কে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেছে। প্রান্তর কথা বিশ্বাস না করে লোকগুলো ওকে মেরে আধমরা করে ফেলে চলে গেল। ওরা চলে‌ যেতেই প্রান্ত কল দিল ফুয়াদের নাম্বারে কিন্তু বারবার ফোন সুইচ অফ বলতে লাগল। ও খুড়াতে খুড়াতে নিজেই হসপিটালে গেল। কলে ফুয়াদ কে না পেয়ে মেসেজ করে রাখল।

ফুয়াদ আর মধু গাড়িতেই ব্রেকফাস্ট করছে।
মধু ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে দিকে তাকিয়ে বলল,,” আমার জন্য চা নিয়ে আসেন।”
ফুয়াদ ওর দিকে কপাল কুঁচকে বলল,,”দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। তোমার চায়ের প্রয়োজন হলে নিয়ে আসো। এমন ভাবে অর্ডার করছো যেন আমি তোমার সেক্রেটারি।”
মধু মুখে হাসি এনে বলল,,” আপনি তো আমার সেক্রেটারিই‌।”
ফুয়াদ হাতের খাবার গাড়ির সামনে রেখে মধুর হাত ধরে এক টানে ওকে নিজের কাছে এনে বলল,,”আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড এন্ড হবু হাজবেন্ড।”
মধু চোখ ছোট ছোট করে বলল,,”জীবনেও আপনি আমার বয়ফ্রেন্ড না। আর হাজবেন্ড হ‌ওয়া তো দূরে কথা।”
ফুয়াদ মধুর কথা শুনে আরেকটু কাছে এনে ফিসফিস করে ওর কানে মুখ ঠেকিয়ে বলল,,”আমার সাথে চ্যালেন্স করো না সুইটহার্ট তাহলে কিন্তু…”
মধু দুই হাতের ওর বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,,”দূরে সরুন।” মধুর বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। ফুয়াদের গরম নিঃশ্বাস ওর কাঁধে আছড়ে পড়ছে। মধু নিঃশ্বাস আটকে ওকে দূরে যেতে বলছে। ফুয়াদ সরল না কানের কাছে থেকে মুখ এনে মধুর মুখোমুখি হলো। সরাসরি তাকাল ওর চোখের দিকে। মধু ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে নিতে চাইল।‌
কিন্তু পারল না ফুয়াদ ধমকে বলল,,” চোখ সরাবে না।”
মধু ভীতু গলায় বলল,,” কেন?”
” কাজ আছে!”
“কি কাজ?”
ফুয়াদ মিনিট খানিক ওর চোঁখের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে ওর হাত ছেড়ে দিল। মধু হাত ছাড়া পেতেই নিজের জায়গায় এসে বসল।
ফুয়াদ বলল,,”যাও দোকানে থেকে দুই কাপ চা নিয়ে আসো। দৌড়াদৌড়ি করে মাথা ধরে গেছে।”
মধু বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,,”আপনি. আমাকে অর্ডার করছেন?”
ফুয়াদ বলল,,” আর একটা কথা বললে কিন্তু সুইটহার্ট‌ এখনি তোমাকে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ব‌উ বানিয়ে পা টেপাবো।”
ফুয়াদের কথা শুনেই ভয়ে মধু ফুয়াদের পায়ের দিকে তাকাল। তারপর তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে গেল। ফুয়াদ টাকা ওর দিকে এগিয়ে দিল ও দাঁত কিড়মিড় করে টাকা নিয়ে চলে গেল।

মধু দোকানে এসে চা চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখনি নিজের পাশে কারো উপস্থিতি টের পেতেই দেখতে পায় ফুয়াদ দাঁড়িয়ে আছে।
মধু ওর দিকে তাকিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে বলে,,” তখন আসলেন না। এখন কেন আসলেন?”
” আমার ইচ্ছে।”
” শুধু শুধু আমাকে কষ্ট করালেন কেন নিজেই তো আসতে পারতেন?” ঝগড়াটে গলায় বলল মধু। দোকানে থাকা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মধু আর ফুয়াদের দিকে। দোকানদার চা দুই হাতে ধরে ওদের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। দিতেও পারছে না। ফুয়াদ দোকানদারের দিকে তাকিয়ে এক কাপ চা নিজের হাতে নিল। তারপর সেটা মধুর হাতে দিয়ে নিজের কাপ টা ও নিয়ে মধুর একহাত ধরে টেনে দোকানদারের সামনে থেকে গাড়ির কাছে নিয়ে এল।

প্রান্ত সারাদিন ফুয়াদের ফোনের আশায় ছিল। কিন্তু সারাদিন ফুয়াদের সাথে যোগাযোগ করতে পারল না। ফুয়াদের নাম্বারে থেকে কল আসলো রাত নয়টায়। প্রান্ত ফোন ধরেই দূর্বল গলায় হ্যালো বলল।
ফুয়াদ ফোন অপেন করতেই মেসেজ পেয়েছে। প্রান্ত মেসেজ এ সব জানিয়েছে। সব শুনে ফুয়াদ স্তব্ধ। ফুয়াদ মধু কে নিয়ে প্রান্তের বাসায় ছিল এটা মধুর ভাই জানল কি করে? তিনি তিনজন গুন্ডা পাঠিয়েছিল যারা মধুর খোঁজ না পেয়ে প্রান্ত কে ইচ্ছে মতো মেরে গেছে। ফুয়াদের খারাপ লাগল ওর জন্য প্রান্ত কে মার খেয়ে হসপিটালে থাকতে হচ্ছে।‌ বিষয়টা খুব খারাপ। কিন্তু কে এই খবর মধুর ভাইয়ের কানে দিল? কে? চারজন ছাড়া আর কেউ তো এই খবর জানতো না। আমি, মধু ও প্রান্ত ছাড়া আর মাত্র তো সমুদ্র ভাই জানত। সেও তো বলবে না। তাহলে কে? এখনো কি আমাদের পেছনে কেউ নজর রাখছে? ফুয়াদ কল কেটে বেলকনিতে থেকে রুমে আসলো। আসার আগে চারপাশে আরেকবার তাকাতে ভুলেনি। ওরা আছে এখন সাহিত্যের ফ্লাটে। এই বাসাটা এক তলা। আগে সাহিত্য রা এখানেই থাকতো‌ বিগত দশ বছর ধরে এই বাসা ফেলে ওরা শিফট হয়েছে ঢাকায়। এখনো এদিকে গাজীপুর আসলে এই বাসায় থাকে ওরা। বাসাটা বড়ো করার ইচ্ছে আছে সাহিত্যের বাবার। সব জায়গায় নজর রাখার কেউ না কেউ আছে তাই মধুকে নিয়ে ফুয়াদ এখানে এসেছে। ওরা বিকেলের দিকে এখানে এসে পৌঁছেছে। এখানে আসার আগে সাহিত্যের সাথে দেখা করেছিল। সাহিত্য ওদের বাসা দেখাশোনা করার লোককে বলেছে বাড়ি পরিষ্কার করে রাখতে‌ গেস্ট আসবে। এখানে এসে ওরা শান্তিতেই আছে। ফুয়াদ এক রুমে মধু আরেক রুমে। ফুয়াদ বেলকনিতে থেকে রুমে থেকে বেরিয়ে একদম মধুর রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। মধু কে নিয়ে এদিকে ওদিকে ঘুরে ফুয়াদের মনে হচ্ছে এখন ওরা দুজন সেইসব প্রেমিক যুগলের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যারা পরিবার থেকে নিজেদের ভালোবাসার স্বীকৃতি না পেয়ে পালিয়ে বেড়ায় ভালোবাসার জন্য। তাদের মতো মধুকে নিয়ে ফুয়াদ ঘুরে বেড়াচ্ছে মধুর পরিবারের নজরের বাইরে। যেন তাড়া ওর ভালোবাসার পক্ষে সবচে বড়ো বাধা যারা কাছে পেলেই ছিনিয়ে নেবে মধু কে ওর থেকে। ফুয়াদ মধুর দরজায় নক করল। মধু ফোনে চার্জে লাগিয়ে শুয়ে ছিল উঠে দেখে ফোনে এক পার্সেন্ট চার্জ ও হয় নাই তাই বিড়বিড় করছিল আর ফোন চার্জ লাগাচ্ছিল। তখনি ফুয়াদের আওয়াজ পেয়ে ও রুমে যেতে অনুমতি দিল।

ফুয়াদ রুমে পা রেখে দেখে মধু চার্জার আর ফোন নিয়ে যুদ্ধ করছে। ও এগিয়ে গেল কপাল কুঁচকায়। মধু ওকে কাছে এসে দাঁড়াতে দেখে বলল,,”আমার ফোন চার্জ হয়নি কেন?”
ফুয়াদ বলল,,” আমি কীভাবে বলব তোমার ফোন কেন চার্জ হয়নি!”
মধু ফোন আর চার্জার ফেলে দাঁড়াল কোমরে হাত দিয়ে তারপর ফুয়াদের দিকে চেয়ে বলল,,”আপনি আমার ঘুমের সু্যোগ পেয়ে কিছু করেছেন?”
ফুয়াদ ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে বলল,,” তোমার কি তাই মনে হচ্ছে? আমি ইচ্ছে করে তোমায় ফোন চার্জ হতে দিচ্ছি না। যাতে তুমি পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে না পারো।”
মধু বলল,,” আমি তো ফোনে চার্জ হলেও তিন্নি ছাড়া আর কারো সাথে যোগাযোগ করতাম না।”
” আর কারো সাথেই করতে না?”
মধু বলল,,” আর খালামনির সাথে যোগাযোগ করতাম। খালামনি দেশে আসবেন বলেছেন। তিনি আসলেই আমি তার সাথে বাসায় ফিরে যাব। খালামনি আমার সাথে থাকলে আর বাবা ভাইয়া কিছুই করতে পারবে না।‌ খালামনি সবাইকে সামলে নেবে।”
বলেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল মধু। ফুয়াদ মধুর দুই কাঁধ ধরে নিজের আরেকটু কাছে এনে দাঁড় করায়। ফুয়াদের স্পর্শ পেতেই কোমরে থেকে মধু নিজের হাত ছেড়ে দেয়‌‌।
মধু চোখ পিটপিট করে ফুয়াদ চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,,” কি করছেন?”
ফুয়াদ মধুর চোখের গভীরে ডুবে বলল,,” সুইটহার্ট, এখন তো তুমি কারো সাথেই কন্টাক্ট করতে পারবে না। পালিয়ে বেড়ানোর এই সময়টা শুধু আমাদের দুজনের একান্তই ব্যক্তিগত। এই সময়টা শুধু আমাদের প্রেমের জন্য বরাদ্দ।”
বলতে বলতে ফুয়াদ একহাতে মধুর কোমর চেপে ধরল। আরেক হাতে মধুর কপালে গালে জড়িয়ে থাকা ছোটো ছোটো চুল গুলো কানে গুঁজে দিল। মধুর গলা শুকিয়ে এল। ও ফুয়াদের স্পর্শে কেঁপে উঠল। মধুর গলা শুকিয়ে চৌচির হয়ে এল। ও শুকনো, ভীত মুখে তাকিয়ে আছে ফুয়াদের দিকে।‌
ফুয়াদ ওর ভীত মুখে দেখে মনে মনে হাসছে। মধুকে আরেকটু ভয় পাওয়াতে ওর মুখের উপর ঝুঁকে পরে। মধু ভয়ে সিটিয়ে যায়। চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায় ফুয়াদের দিকে কিছু বলতে চায় কিন্তু অদ্ভুত গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। ও কথা বলতে না পেরে চোখ খিচে বন্ধ করে। ফুয়াদ ওর দিকে ঝুঁকে ওর মুখে ফুঁ দেয়। ফুঁ দিতেই মধু চোখ মেলে তাকায়। ফুয়াদ ওর কোমর থেকে হাত ছাড়িয়ে সরে দাঁড়ায়। মধু বুকে ফুঁ দিয়ে রাগী চোখে তাকায় ওর দিকে। ফুয়াদ ওর রাগান্বিত মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
হাসতে হাসতে বলল,,” কি ম্যাডাম ভয় পেয়েছ?”
মধু রাগী গলায় বলল,,” বের হোন অসভ্য লোক।”
বলেই মধু রাগে বিছানায় বসল। ফুয়াদ হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল যাওয়ার আগে মধুর ফোনটা নিয়ে গেল সাথে।

#চলবে…..??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here