প্রেয়সী পর্ব ২৩

0
686

#প্রেয়সী
#নন্দিনী_নীলা
২৩.

” একটা সত্যি কথা বলবি?” মধু তিন্নির দিকে চেয়ে দূর্বল গলায় প্রশ্ন করল।
তিন্নি তাকাল মধুর শুকনো মুখের দিকে। এখনো শরীরে অনেক জ্বর মধুর। জ্বরের জন্য চোখ মুখ লালচে ভাব হয়ে আছে। তিন্নি ওর দিকে সোজা হয়ে বসল। মধু গায়ে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে।
” বল।”
” তোর ভাই আমাকে পছন্দ করে কবে থেকে?”
” সেসব ভাইয়ের থেকেই শুনিস।”
শান্ত মুখশ্রী নিমিষেই শক্ত হয়ে উঠল মধুর। শক্ত গলায় বলল,,” থাক দরকার নাই। তোকে জিজ্ঞেস করাই ভুল হয়েছে আমার।”
” তুই এতো রাগী ছিলি না মধু। এমন রাগী হয়ে যাচ্ছিস কেন?”
” আমার জায়গায় তুই থাকলে কি করতি?”
” তোর ভাইয়ের সাথে চুটিয়ে প্রেম করতাম।”
মধু বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,,” একটা কথা বলবি প্লিজ?”
” কি কথা?” কপাল কুঁচকে বলল তিন্নি।
মধু বলল,” তোর আমার বন্ধুত্ব কি নিজ থেকে কাকতালীয় ভাবে হয়েছে নাকি এর পেছনে ও তোর ভাইয়ের হাত ছিল? দেখ এই উত্তর টা অন্তত দে।”
তিন্নি মধুর কপালে হাত দিয়ে বলল,,” দোস্ত রাগ করিস না প্লিজ। আমি সত্যি বললে তুই কষ্ট পাবি, রাগ করবি আরো। তার থেকে এসব এখন বাদ দে। তুই আগে সুস্থ হয়ে উঠ।”
” আমি এতো টেনশন মাথায় নিয়ে থাকতে পারছি না সত্যি।‌ প্লিজ কিছু অন্তত বল। যদি এক মুহুর্তের জন্য ও ফ্রেন্ড ভেবে থাকিস এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দে।”
তিন্নি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,” একদিন হঠাৎ ফুয়াদ ভাইয়া আমার রুমে এসে আমাকে বলল একটা মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। আমি অবাক হয়ে বলল কে সেই মেয়ে ভাইয়া! ভাইয়া কিছুই বলল না শুধু বলল,’ সেসব জেনে তোর কাজ কি? তুই তার সাথে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি করবি। একজন ভালো বন্ধু হবি তার ব্যস।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম,’ ভাইয়া মেয়েটাকে কোথায় পাব? একটা ছবি দেখাও না হলে তো চিনব না।’
ভাইয়া ছবি ছবি সমেত তোর ফেসবুক আইডি দেখালো। আমাকে বলল এই আইডিতে রিকোয়েস্ট দিতে। আমি বললাম,’ ভাইয়া এক্সেপ্ট যদি না করে?’
ভাইয়া তখন কি বলল জানিস?”
মধু উঠে বসে পড়েছে। কৌতুহল গলায় জিজ্ঞেস করল,
” কি বলল?”
” সে না করলেও আমি করে দেব।”
” হোয়াট আমার আইডির রিকোয়েস্ট তোর ভাই কিভাবে এক্সেপ্ট করবে?” বিস্মিত সুরে জিজ্ঞেস করল মধু।
তিন্নি বলল,,” ভাইয়া তার ল্যাপটপে তোর আইডি লগ‌ইন‌ করা দেখালো। আমি এটা দেখে তো চোখ বড়ো বড়ো করে বললাম,’ ভাইয়া তুমি মেয়েদের নামে ফেইক আইডি চালানো শুরু করলে কবে?’
ভাইয়া বলল,’ এটা কোন ফেইক আইডি না। এটা রিয়েল আইডি। এই যে প্রোফাইলে যার পিক দেখছিস এর সাথে তোর বন্ধুত্ব করতে হবে।’
আমি চমকানো স্বরে বললাম,,’ আরেকজনের আইডি তুমি লগ‌‌ইন করেছ কীভাবে?’ ঢোক গলায় জিজ্ঞেস করেছিল তিন্নি।
ফুয়াদ বলল,’ হ্যাক করা খুব কষ্টের কাজ নয়। তোর ভাইয়ের এই পেশায় অনেক অনৈতিক কাজ জানতে হয় এটা তো ছোটোখাটো কাজ।’ তিন্নি কে ফুয়াদ আর কিছুই সেদিন বলেনি। আর তিন্নি ও জিজ্ঞেস করতে পারে নি। ফুয়াদ সেদিন তিন্নির মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছিল। হ্যাক করার কথা শুনেই তিন্নি নিজের আইডির পরিষ্কার করতে লেগে গেল। ওর আইডি যদি কখনো হ্যাক করে ভাইয়া। কয়েকটা অপরিচিত ছেলের সাথে কথা বলেছিল তাই ভয়ে তাদের ব্লক করে দেয়।”
মধুর রাগে মন চাচ্ছে সব কিছু ধ্বংস করে দিতে। কেমন খাটাশ লোক ওর পার্সোনাল আইডি ওই লোকটা হ্যা করে নিয়েছে আর ও ঘুনাক্ষরেও তা বুঝতে পারল না। এতো বোকা আমি। আসলেই বোকা আমি নাহলে তিন্নির বন্ধু নামের অভিনয় কেন বুঝতে পারলাম না। বাবা কথাটা ঠিকি বলে আমি বোকা প্রচুর বোকা।
তিন্নি মধুর গরম হাত দুটো ধরে বলল,,” দোস্ত বিলিভ কর। আমি ভাইয়ার কথায় তোর সাথে ফ্রেন্ডশিপ শুরু করলেও কিন্তু পরে তোকে সত্যি কারের ফ্রেন্ড বানিয়েছি।‌”
মধু তিন্নির হাতের মুঠোয় থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলল,,”তুই প্লিজ আমার সামনে থেকে যা। তোকে এখন বিরক্ত লাগছে। খারাপ আচরণ করতে চাইছি না।”
তিন্নি মলিন মুখ করে বেরিয়ে এল। মধু ফেসবুকে ঢুকে আগে আইডি ডি এক্টিভ করল‌ তারপর চুপ করে শুয়ে র‌ইল।

মিতুল রাত থেকে রেগে বোম হয়ে আছে। কিন্তু রাগ দেখানোর মতো কাউকে পাচ্ছে না। রুম ছেড়ে বেরিয়ে এল। নক করল সমুদ্রের রুমে।
ব্রেকফাস্ট করে এসে সবাই রুমে বসে আছে। সমুদ্র ও বসেই ছিল তখনি দরজা ধাক্কার শব্দ পেয়ে দরজা খুলে দেখল মিতুলের অগ্নিশিখা রুপ।
” মিতুল হোয়াটস হাপেন্ড? এতো রেগে আছো কেন?”
মিতুল সমুদ্রের দিকে চেয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,,” ভেতরে আসব?”
সমুদ্র দরজা ছেড়ে দিয়ে বলল,,” আসো।”
মিতুল ভেতরে ঢুকে দেখল ফাহাদ বিছানায় শুয়ে গেমস খেলতে ব্যস্ত। মিতুল এক নজর ওর দিকে তাকিয়ে বলল,,” তুমি গতকাল রাতে আমাকে আটকালে কেন? নিজের ভাইকে না আটকে আমাকে কেন আটকালে? কেমন ভাই তোমার আমার সামনে আরেকটা মেয়েকে কোলে নিয়ে ঢং করল কিছুই বললে না কেউ।”
” এসব আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছো? ছোটো কে জিজ্ঞেস করো।”
” দেখো সমুদ্র তোমাকে জিজ্ঞেস করছি কারণ তুমি আমায় আটকালে কেন সেটা জানতে।”
” ও তো তোমার ভালোই জন্যেই আটকেছি যাতে সবার সামনে ছোটোর থেকে তিক্ত কথা শুনতে না হয়। দেখো আমি চাইনি তুমি সবার সামনে সিনক্রিয়েট করো আর ছোটোর কাছে অপমানিত হ‌ও।”
” সিনক্রিয়েট আমি করতাম?” হতবাক গলায় বলল মিতুল।
সমুদ্র বিপাকে পরে চুপ করে আছে।
মিতুল নিজেই আবার বলল,,” অনেক হয়েছে আর না এবার আন্টি কে সব জানাবো আমি। ফুয়াদ কি ওই মেয়েটার উপর দূর্বল‌। ওকি আমায় ঠকাতে চাইছে আমি তো এসব বসে বসে মেনে নিতে পারি না ইম্পসিবল।”
” নো মিতুল এসবে মাকে টানবে না। তুমি আগে ছোটোর সাথে কথা বলো।”
মিতুল রাগে গজগজ করে চলে গেল।
ফাহাদ ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই সমুদ্র কে উদ্দেশ্য করে বলল,,” ফুয়াদ ভাইয়া বলেছে মৌমাছিকে ভাবি বলতে। কিন্তু মৌমাছি কে ভাবি বললে খুব রাগ করে। কিন্তু মিতুল ভাবিকে ভাবি বললে খুশি হয়। এখন আমি ভাবি কাকে বলব বলো তো ভাইয়া।”
সমুদ্র ফাহাদের হাত থেকে একটানে ফোন কেড়ে নিয়ে বলল,” আমি জানি না।”
” ফোন নিলে কেন ভাইয়া খেলা তো শেষ হয়নি।”
” সারাদিন কিসের গেমস খেলা? যা এখান থেকে।”
ফাহাদ রাগ করে রুম থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে এসে তিন্নি কে পেয়ে তার কাছে চলে গেল।

মিতুল সমুদ্রের রুম থেকে বেরিয়ে ফুয়াদের রুমে নক করল‌। ভেতরে থেকে কোন সারা শব্দ না পেয়ে জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগল। রাগে একটা লাথি মেরে বসল।
ফুয়াদ, নাঈম, সাহিত্য তিন বন্ধু বাইরে গিয়েছিল। ফিরে এসে মিতুলের এই অবস্থা দেখে এগিয়ে এসে নাঈম জিজ্ঞেস করল,,” কি হয়েছে?”
চমকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল মিতুল। দেখল তিন জোড়া চোখ ওর দিকে হতবুদ্ধি চোখে তাকিয়ে আছে। মিতুল রাগের মাথায় করা কাজ মনে করে লজ্জা পেল। ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে দেখল ভ্রু কিশ্চিৎ কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে আছে প্রশ্নবিন্দু চোখে।‌
ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে মিতুল কিন্তু ফুয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে সব রাগ উবে গেছে। সেইদিন ছাদের কথা স্মরণ এ আসতেই ভীতু হয়ে গেল।
মিতুল ভীতু গলায় বলল,,”না মানে দরজা ধাক্কা দিয়েছিলাম কেউ সারা দিচ্ছে না তাই আরকি।”
সাহিত্য মিতুলের কথা শুনে এগিয়ে এসে বাইরে থেকে দরজার সিঁটকারি লাগানো দেখিয়ে বলল,,” কোন ধ্যানে মগ্ন ছিলে এটা চোখে পরে নি।”
মিতুলের মন চাচ্ছে সাহিত্যের মাথা ফাটিয়ে দিতে। চরম বেয়াদব এই লোকটা সব সময় বেশি বেশি। দাঁত খিচে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে সাহিত্যের দিকে। ওর কথায় উত্তর না দিয়ে ফুয়াদ কে বলল,,” তোমার সাথে আমার জরুরি কথা ছিল। একটু সময় হবে?”
ফুয়াদ ব্যস্ত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে বলল,,” সরি এই মুহূর্তে আমি প্রচুর বিজি। তোমাকে কোন সময় দিতে পারছি না।” বলেই ফুয়াদ দরজা খুলে ভেতরে চলে গেল।
মিতুল নাঈম আর সাহিত্যের সামনে এইভাবে ফুয়াদের প্রত্যাখ্যান পেয়ে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মাথা নিচু করে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে একবার আড়চোখে রুমের ভেতরে আগুন গরম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হনহনিয়ে স্থান ত্যাগ করল।
সাহিত্য আর নাঈম ভেতরে এসে বলল,,” তুই বিজি?”
ফুয়াদ বলল,,” না।”
” মিতুল কে মিথ্যে বললি কেন?”
” ওর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তাই।”
” ওর সাথে সব ক্লিয়ার কর।”
” ওর কাছে ক্লিয়ার করা মানে মায়ের কানে সব যাওয়া।”
” আন্টি কে কবে জানাবি।”
” আগে ওকে রাজি করা‌ই তারপর।”
” শুনেই জ্বর বাঁধিয়ে ফেলেছে।”
” আমার ভালোবাসা গ্রহণ করার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠতে একটু জ্বর দরকার‌ই ছিল।”

সাহিত্য ফুয়াদের ফোন বিছানায় থেকে হাতে তুলে নিল। একটা নাম ছাড়া নাম্বার থেকে অনেক গুলো মিসকল আসছে। ও হাতে নিতেই আরেকবার বেজে উঠল।
” কিরে এটা কে? তোরে এতো কল দিচ্ছে রিসিভ করছিস না?”
ফুয়াদ এক টানে ওর হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।নাঈম আর সাহিত্য সন্দেহ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
ফুয়াদ আমতা আমতা করে বলল,,” কি হলো ওভাবে তাকে আছিস কেন?”
” ফোন কেড়ে নিলি কেন, ওটা কে ছিল?”
” তোরা কি ভেবে সন্দেহ করছিস?”
নাঈম বলল,,” ওটা তো মধু হবে না শিউর। মিতুল?”
” ওটা একটা বয়স্ক পুরুষ মানুষ।সবাইকে মেয়ে ভাবিস কেন? মেয়েরা ছাড়া কি আমায় আর কেউ কল দেয় না?”
নাঈম বলল,,” এমন ভাবে কেড়ে নিলি তাতে লুকানো গার্লফ্রেন্ড ছাড়া কিছুই মাথায় আসেনি।”
” তোদের মাথায় এসব ছাড়া আর কি ঘুরে। আর নাঈম গার্লফ্রেন্ড লুকানোর স্বভাব তোর আমার না। আমি যা করব সবার সামনেই এখানে লুকানোর কিছুই নাই। আমার বোনের সাথে আমারি সামনে প্রেম করে বেরালি আমি ধরতেও পারলাম না।”
নাঈম বলল,,” কথায় না পারলে এক কথা বলে খোঁচা দিছ যাতে কিছু বলতে না পারি।”
” খোঁচা দেওয়ার মতো কাজ করছিস দিব না কেন?”
নাঈমের ফোনে রাহীর কল এল যথা সময়ে। নাঈম ফোন রিসিভ করেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সাহিত্য ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল,,” দেখছিস গার্লফ্রেন্ড কল দিতেই পালালো।”
ফুয়াদ ওর কাঁধে চাপড় দিয়ে বলল,,” আমিও যাই একটু দেখে আসি‌। তুই থাক।”
” সবাই জোড়া হয়ে যাচ্ছিস আমায় একা সিঙ্গেল রেখে। আমার অবস্থা সমুদ্র ভাইয়ের মতো হয়েছে‌। তোদের পাত্তা আর পাবো না যাই সমুদ্র ভাইয়ের সাথে বসে দুঃখ প্রকাশ করে আসি।”
সাহিত্য সমুদ্র কাছে গেল আর ফুয়াদ গেল মধুর কাছে।
#চলবে…..

ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here